সর্দি-কাশি সারছে না? নাগাড়ে শুকনো কাশি, গলাব্যথা ও ঢোক গিলতে কষ্ট সাধারণ ভাইরাল জ্বরের লক্ষণ নাও হতে পারে। জেনে নিন, কোন ৩টি রোগের ইঙ্গিত হতে পারে।
আবহাওয়ার হঠাৎ পরিবর্তনের কারণে ঘরে ঘরে সর্দি-কাশি, গলাব্যথা ও জ্বরের সমস্যা দেখা দিচ্ছে। কখনও গরম, কখনও বৃষ্টি, আবার কখনও ঠান্ডা হাওয়া—এই ওঠানামার মধ্যে অনেকেরই শুকনো কাশি শুরু হচ্ছে। কারও ক্ষেত্রে কয়েক দিন পর জ্বর কমে গেলেও কাশি থেকে যাচ্ছে। আবার কারও গলায় তীব্র ব্যথা, ঢোক গিলতে সমস্যা, বুকে চাপ বা শ্বাসকষ্টের মতো উপসর্গ দেখা দিচ্ছে।
সাধারণ সর্দি-কাশি বা ভাইরাল সংক্রমণের কারণে এমন সমস্যা হওয়া অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু উপসর্গ দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকলে কিংবা ক্রমশ তীব্র হলে বিষয়টিকে শুধু ‘ভাইরাল জ্বর’ বলে এড়িয়ে যাওয়া ঠিক নয়। কারণ একই ধরনের উপসর্গের আড়ালে হাঁপানি, গলার ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণ, টনসিলের সমস্যা বা অন্য শ্বাসনালির অসুখও থাকতে পারে।
বিশেষ করে শুকনো কাশি রাতে বা ভোরে বেশি হওয়া, শ্বাস নেওয়ার সময় বাঁশির মতো শব্দ, বুক চেপে আসা, উচ্চ জ্বর, গলায় তীব্র ব্যথা, ঢোক গিলতে অসুবিধা কিংবা মুখ-গলা ফুলে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
সাধারণ ভাইরাল সর্দি-কাশির ক্ষেত্রে নাক দিয়ে জল পড়া, নাক বন্ধ, হালকা জ্বর, গলাব্যথা, শরীর খারাপ, মাথাব্যথা ও কাশি দেখা দিতে পারে। অনেক ক্ষেত্রেই কয়েক দিনের মধ্যে উপসর্গ ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে।
কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, সব কাশি বা গলাব্যথা ভাইরাসের কারণে হয় না। সংক্রমণের ধরন, ব্যক্তির বয়স, অ্যালার্জির ইতিহাস, ধূমপানের অভ্যাস এবং অন্যান্য শারীরিক সমস্যার উপর উপসর্গের ধরন নির্ভর করতে পারে।
তাই কাশি যদি কমার পরিবর্তে বাড়তে থাকে, কয়েক সপ্তাহ ধরে থেকে যায়, বারবার ফিরে আসে অথবা তার সঙ্গে শ্বাসকষ্ট ও বুকে চাপের মতো সমস্যা যুক্ত হয়, তাহলে কারণ খুঁজে দেখা প্রয়োজন।
নাগাড়ে কাশি এবং শ্বাসনালির প্রদাহের অন্যতম কারণ হতে পারে হাঁপানি বা অ্যাজমা। অনেকের ক্ষেত্রে হাঁপানির প্রধান উপসর্গ হিসেবে কাশি দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে রাতের দিকে বা ভোরের দিকে কাশি বাড়লে বিষয়টি নজরে রাখা প্রয়োজন।
হাঁপানিতে শ্বাসনালির ভিতরের অংশে প্রদাহ তৈরি হয় এবং শ্বাসনালি অতিরিক্ত সংবেদনশীল হয়ে পড়ে। ধুলোবালি, ধোঁয়া, পরাগরেণু, পশুর লোম, ঠান্ডা বাতাস কিংবা অন্য কোনও অ্যালার্জেনের সংস্পর্শে এলে উপসর্গ বেড়ে যেতে পারে।
শ্বাসনালি সরু হয়ে যাওয়ার ফলে বাতাস চলাচলে সমস্যা তৈরি হয়। এর ফলে কাশি, শ্বাসকষ্ট এবং শ্বাস নেওয়ার সময় বাঁশির মতো শব্দ হতে পারে।
১. রাত বা ভোরের দিকে কাশি বাড়া।
২. বারবার শুকনো কাশি হওয়া।
৩. শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া।
৪. শ্বাস নেওয়ার সময় বাঁশির মতো শব্দ বা ‘হুইজিং’ হওয়া।
৫. বুকে চাপ বা টান অনুভূত হওয়া।
৬. ধুলো, ধোঁয়া, ঠান্ডা বাতাস বা নির্দিষ্ট অ্যালার্জেনের সংস্পর্শে উপসর্গ বেড়ে যাওয়া।
তবে গলায় তীব্র ব্যথা বা ঢোক গিলতে সমস্যা হাঁপানির প্রধান লক্ষণ নয়। এই ধরনের উপসর্গ থাকলে গলা বা টনসিলের সংক্রমণসহ অন্য কারণও বিবেচনা করা প্রয়োজন।
হাঁপানির ক্ষেত্রে শ্বাসনালির প্রদাহ ও অতিরিক্ত সংবেদনশীলতার কারণে সামান্য ঠান্ডা বাতাস, ধুলো বা ধোঁয়াতেও কাশি শুরু হতে পারে। অনেক সময় জ্বর বা সর্দি-কাশির একটি সাধারণ সংক্রমণের পরেও হাঁপানির উপসর্গ বেড়ে যেতে পারে।
তাই সর্দি-কাশি হওয়ার পর জ্বর কমে গেলেও যদি কাশি দীর্ঘদিন ধরে থেকে যায় এবং বিশেষ করে রাতে বা ভোরে বাড়ে, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া দরকার।
নিজে থেকে কাশির ওষুধ বা ইনহেলার শুরু না করে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও চিকিৎসা করা উচিত।
গলায় তীব্র ব্যথা, খাবার বা জল গিলতে কষ্ট এবং জ্বর থাকলে টনসিল বা গলার সংক্রমণের কথাও ভাবা হয়। ভাইরাসের পাশাপাশি কিছু ক্ষেত্রে ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণের কারণেও গলা অত্যন্ত ব্যথা করতে পারে।
টনসিল গলার দুই পাশে থাকা লিম্ফয়েড টিস্যু। সংক্রমণ হলে টনসিল ফুলে যেতে পারে এবং গিলতে ব্যথা হতে পারে। কখনও টনসিলের উপর সাদা বা হলদে দাগও দেখা যায়।
১. গলায় তীব্র ব্যথা।
২. খাবার বা জল গিলতে ব্যথা বা কষ্ট।
৩. জ্বর।
৪. গলার দুই পাশে টনসিল ফুলে যাওয়া।
৫. গলার লিম্ফ নোড ফুলে যাওয়া বা ব্যথা করা।
৬. গলা বসে যাওয়া বা কথা বলতে অস্বস্তি।
৭. কিছু ক্ষেত্রে টনসিলের উপর সাদা দাগ বা আবরণ দেখা যাওয়া।
এ ধরনের উপসর্গ হলে শুধু ভাইরাল জ্বর ভেবে বসে থাকা ঠিক নয়। বিশেষ করে জ্বর বেশি হলে, গিলতে সমস্যা বাড়লে বা কয়েক দিনেও উপসর্গ না কমলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
প্রতিটি গলাব্যথার জন্য অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োজন হয় না। ভাইরাসজনিত সংক্রমণে অ্যান্টিবায়োটিক সাধারণত কাজ করে না। আবার নির্দিষ্ট ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণের ক্ষেত্রে চিকিৎসক প্রয়োজন মনে করলে অ্যান্টিবায়োটিক দিতে পারেন।
তাই নিজের ইচ্ছায় দোকান থেকে অ্যান্টিবায়োটিক কিনে খাওয়া উচিত নয়। ভুলভাবে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করলে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এবং অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সের মতো সমস্যা তৈরি হতে পারে।
গলা অত্যন্ত ফুলে যাওয়া, তীব্র গলাব্যথা, ঢোক গিলতে মারাত্মক সমস্যা এবং কথা বলতে কষ্টের মতো উপসর্গ দেখা দিলে সাধারণ গলাব্যথার বাইরে গুরুতর সংক্রমণও থাকতে পারে।
কখনও টনসিলের পাশে পুঁজ জমে ‘পেরিটনসিলার অ্যাবসেস’-এর মতো সমস্যা তৈরি হতে পারে। এ ক্ষেত্রে গলার এক পাশে বেশি ব্যথা, মুখ খুলতে সমস্যা, গলার স্বর বদলে যাওয়া, লালা গিলতে না পারা বা অতিরিক্ত লালা পড়ার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
মুখ, গলা বা চোখের আশপাশে অস্বাভাবিক ফোলাভাব থাকলে আরও সতর্ক হতে হবে। কারণ ফোলাভাবের কারণ শুধুমাত্র ভাইরাল সংক্রমণ নাও হতে পারে। অ্যালার্জি, সংক্রমণ বা অন্য কোনও সমস্যার কারণেও মুখ-গলা ফুলে যেতে পারে।
নিচের কোনও লক্ষণ থাকলে দেরি না করে চিকিৎসকের সাহায্য নেওয়া উচিত—
বিশেষ করে শ্বাসনালি আটকে যাওয়ার মতো অনুভূতি, জিহ্বা বা গলার আকস্মিক ফোলাভাব এবং শ্বাসকষ্ট হলে এটি জরুরি পরিস্থিতি হতে পারে।
সর্দি-কাশির পর কিছু মানুষের কাশি সংক্রমণ সেরে যাওয়ার পরও কিছুদিন থাকতে পারে। তাই কয়েক দিন কাশি থাকলেই গুরুতর অসুখ হয়েছে এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
তবে কাশি যদি ক্রমশ বাড়ে, কয়েক সপ্তাহ ধরে না কমে, বারবার ফিরে আসে অথবা শ্বাসকষ্ট, বুকব্যথা, রক্ত ওঠা, দীর্ঘস্থায়ী জ্বর বা ওজন কমার মতো অন্য উপসর্গের সঙ্গে থাকে, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
কাশির কারণ বুঝতে চিকিৎসক রোগীর ইতিহাস, শারীরিক পরীক্ষা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন পরীক্ষা করতে পারেন।
আবহাওয়ার পরিবর্তন সরাসরি সবসময় অসুস্থতার কারণ নয়। তবে ঠান্ডা বাতাস, ধুলো, ধোঁয়া, পরাগরেণু এবং বাতাসের দূষণ অনেকের শ্বাসনালির সমস্যা বাড়িয়ে দিতে পারে।
যাদের অ্যালার্জি বা হাঁপানির প্রবণতা রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে ঠান্ডা বাতাস বা পরিবেশের কিছু উপাদান কাশি ও শ্বাসকষ্টের ট্রিগার হতে পারে।
বর্ষাকাল বা ঋতু পরিবর্তনের সময়ে ভাইরাসজনিত শ্বাসনালির সংক্রমণও ছড়াতে পারে। ফলে একই সময়ে অনেক মানুষের মধ্যে সর্দি-কাশি ও জ্বরের সমস্যা দেখা দিতে পারে।
কাশি বা গলাব্যথা হলে পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়া, শরীরে পানিশূন্যতা না হতে দেওয়া এবং ধোঁয়া ও ধুলোর সংস্পর্শ এড়িয়ে চলা গুরুত্বপূর্ণ।
গলা আরাম দিতে অনেকে উষ্ণ তরল পান করেন। বয়স ও শারীরিক অবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এটি আরাম দিতে পারে। ধূমপান করলে তা বন্ধ রাখা বা অন্তত অসুস্থতার সময়ে সম্পূর্ণ এড়িয়ে চলা উচিত।
কাশি বা জ্বরের ওষুধ নিজের ইচ্ছায় দীর্ঘদিন খাওয়া উচিত নয়। বিশেষ করে অ্যান্টিবায়োটিক, স্টেরয়েড বা ইনহেলার চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া শুরু করা ঠিক নয়।
সর্দি-কাশি বা গলাব্যথা সাধারণত হালকা সমস্যা হলেও কিছু লক্ষণকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। যেমন—
কাশি দীর্ঘস্থায়ী হওয়া: কয়েক সপ্তাহ ধরে কাশি না কমলে।
শ্বাসকষ্ট: স্বাভাবিক কাজকর্মের সময়ও শ্বাস নিতে কষ্ট হলে।
বুকে ব্যথা: কাশির সঙ্গে নতুন করে বুকে ব্যথা বা চাপ তৈরি হলে।
উচ্চ জ্বর: জ্বর দীর্ঘস্থায়ী হলে বা শারীরিক অবস্থা খারাপ হলে।
গিলতে সমস্যা: জল বা খাবার গিলতে তীব্র ব্যথা বা বাধা অনুভূত হলে।
মুখ বা গলা ফুলে যাওয়া: বিশেষ করে হঠাৎ ফোলাভাব দেখা দিলে।
রক্ত ওঠা: কাশির সঙ্গে রক্ত এলে দ্রুত চিকিৎসা প্রয়োজন।
সর্দি, কাশি, জ্বর ও গলাব্যথা খুব সাধারণ উপসর্গ। তাই উপসর্গ দেখা দিলেই ভয় পাওয়ার প্রয়োজন নেই। কিন্তু একই উপসর্গের পিছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে।
রাত বা ভোরে বারবার শুকনো কাশি, শ্বাসকষ্ট ও হুইজিং থাকলে হাঁপানির বিষয়টি চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করা যেতে পারে। অন্যদিকে তীব্র গলাব্যথা, জ্বর এবং ঢোক গিলতে সমস্যা থাকলে টনসিল বা গলার সংক্রমণের কারণ খুঁজে দেখা দরকার। আর গলা বা মুখের ফোলাভাবের সঙ্গে শ্বাসকষ্ট কিংবা লালা গিলতে না পারার মতো সমস্যা হলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, শুধু উপসর্গ দেখে নিজে নিজে রোগের নাম ঠিক না করা। একই ধরনের কাশি বা গলাব্যথা বিভিন্ন রোগে হতে পারে। প্রয়োজন হলে চিকিৎসক পরীক্ষা করে কারণ নির্ধারণ করবেন এবং সেই অনুযায়ী চিকিৎসা দেবেন।
সুতরাং, আবহাওয়া পরিবর্তনের সময়ে সর্দি-কাশি ও জ্বর হলেও উপসর্গের স্থায়িত্ব এবং তীব্রতার দিকে নজর রাখুন। কাশি দীর্ঘস্থায়ী হলে, গলায় তীব্র ব্যথা বা ঢোক গিলতে সমস্যা হলে এবং বিশেষ করে শ্বাসকষ্ট বা মুখ-গলা ফুলে গেলে বিষয়টি অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।