Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

রাজ্যে ডেঙ্গির চোখরাঙানি বাড়ছে! শুরু হাই রিস্ক পিরিয়ড,কোন জেলায় কত আক্রান্ত?

রাজ্যে ফের উদ্বেগ বাড়াচ্ছে ডেঙ্গি! শুরু হয়ে গিয়েছে ডেঙ্গির হাই রিস্ক পিরিয়ড, ফলে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। বর্ষার মরশুম এবং তার পরবর্তী সময়ে জমা জল মশার বংশবিস্তারের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে, যার জেরে ডেঙ্গি সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়তে পারে। রাজ্যের কোন জেলায় কতজন আক্রান্ত হয়েছেন, কোথায় সংক্রমণের পরিস্থিতি বেশি উদ্বেগজনক এবং স্বাস্থ্য দফতরের তরফে কী পদক্ষেপ করা হচ্ছে, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে বাড়ছে কৌতূহল। জ্বর, মাথাব্যথা, গায়ে ব্যথা কিংবা চোখের পিছনে ব্যথার মতো উপসর্গ দেখা দিলে অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। পাশাপাশি বাড়ির আশপাশে জল জমতে না দেওয়া, মশারি ব্যবহার এবং মশার কামড় থেকে নিজেকে সুরক্ষিত রাখাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ডেঙ্গি পরিস্থিতি সম্পর্কে সঠিক তথ্য জানতে সরকারি স্বাস্থ্য দফতরের সর্বশেষ পরিসংখ্যানের দিকে নজর রাখা প্রয়োজন।

রাজ্যে ডেঙ্গির চোখরাঙানি বাড়ছে! শুরু হাই রিস্ক পিরিয়ড,কোন জেলায় কত আক্রান্ত?
স্বাস্থ্য সচেতনতা

পশ্চিমবঙ্গে ফের উদ্বেগ বাড়াচ্ছে ডেঙ্গি। বর্ষার মরশুম পেরিয়ে যাওয়ার পরেও মশাবাহিত এই রোগের সংক্রমণ নিয়ে সতর্ক থাকতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। আবহাওয়ার পরিবর্তন, বৃষ্টির জল জমে থাকা এবং মশার বংশবিস্তারের অনুকূল পরিবেশের কারণে বছরের এই সময়ে ডেঙ্গির ঝুঁকি বাড়তে পারে। কলকাতা থেকে শুরু করে উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন জেলা, সর্বত্রই মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধে সচেতনতা জরুরি। কোন জেলায় কতজন ডেঙ্গিতে আক্রান্ত হয়েছেন, কোথায় সংক্রমণের পরিস্থিতি বেশি উদ্বেগজনক এবং স্বাস্থ্য দফতর কী ধরনের পদক্ষেপ করছে, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে কৌতূহল বাড়ছে। তবে জেলাভিত্তিক আক্রান্তের সঠিক সংখ্যা জানতে হলে সর্বশেষ সরকারি পরিসংখ্যানের উপর নির্ভর করা প্রয়োজন। কারণ, প্রতিদিন নতুন আক্রান্তের সংখ্যা পরিবর্তিত হতে পারে। একই সঙ্গে কোনও জেলার মোট আক্রান্তের সংখ্যা এবং সাম্প্রতিক সময়ে সংক্রমণ বৃদ্ধির হার এক বিষয় নয়। তাই ডেঙ্গি পরিস্থিতি বুঝতে হলে মোট সংক্রমণের পাশাপাশি স্থানীয় পরিস্থিতি এবং স্বাস্থ্য দফতরের নজরদারির দিকেও নজর রাখা জরুরি।

২০২৬ সালের ৭ অক্টোবর পর্যন্ত প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে জানানো হয়েছিল, পশ্চিমবঙ্গে মোট ১০,১৭৭টি ডেঙ্গি সংক্রমণের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছিল। গত বছরের একই সময় পর্যন্ত এই সংখ্যা ছিল ১২,৬৫২। অর্থাৎ, তুলনামূলকভাবে চলতি বছরের মোট আক্রান্তের সংখ্যা কম ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলিতে নতুন সংক্রমণ বৃদ্ধির খবর উদ্বেগ তৈরি করেছে। সেপ্টেম্বর মাসে রাজ্যে ৩,৯৪৮টি নতুন সংক্রমণের ঘটনা নথিভুক্ত হওয়ার কথা প্রকাশিত হয়েছিল। অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহেও প্রায় ১,১০০ জনের আক্রান্ত হওয়ার খবর সামনে আসে। এই পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, বছরের মোট আক্রান্তের সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় কম থাকলেও সংক্রমণের সাম্প্রতিক প্রবণতা নজরে রাখা অত্যন্ত জরুরি। তবে এই সংখ্যাগুলি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে দেওয়া হয়েছে। পরবর্তী সময়ে আক্রান্তের সংখ্যা পরিবর্তিত হয়ে থাকতে পারে। তাই বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে নিশ্চিত হতে স্বাস্থ্য দফতরের সর্বশেষ বুলেটিন দেখা প্রয়োজন।

ডেঙ্গির হাই রিস্ক পিরিয়ড কেন গুরুত্বপূর্ণ, তা বুঝতে হলে প্রথমে এই রোগের সংক্রমণের পদ্ধতি সম্পর্কে জানা দরকার। ডেঙ্গি একটি ভাইরাসজনিত রোগ, যা মূলত সংক্রমিত এডিস মশার কামড়ের মাধ্যমে মানুষের শরীরে ছড়ায়। বৃষ্টির জল বিভিন্ন জায়গায় জমে থাকলে এডিস মশার বংশবিস্তারের সুযোগ তৈরি হতে পারে। বাড়ির ছাদ, বারান্দা, ফুলের টব, পরিত্যক্ত টায়ার, প্লাস্টিকের পাত্র, নির্মীয়মাণ বাড়ি কিংবা খোলা জায়গায় পড়ে থাকা বিভিন্ন সামগ্রীতে জল জমলে সেখান থেকে মশার প্রজনন হতে পারে। বর্ষার সময় বৃষ্টির কারণে এই ধরনের জমা জলের সমস্যা বাড়ে। আবার বৃষ্টি কমে গেলেও অনেক জায়গায় জল জমে থেকে যায়। ফলে বর্ষার পরেও ডেঙ্গির ঝুঁকি পুরোপুরি শেষ হয়ে যায় না। তাই শুধু বৃষ্টির সময় নয়, তার পরবর্তী কয়েক সপ্তাহেও নিয়মিত সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

পশ্চিমবঙ্গের মতো জনবহুল রাজ্যে ডেঙ্গি প্রতিরোধের ক্ষেত্রে শহর এবং গ্রাম, দুই এলাকার পরিস্থিতির উপরই নজর রাখা জরুরি। শহরাঞ্চলে ঘনবসতি, নির্মাণকাজ, নিকাশি ব্যবস্থার সমস্যা এবং বিভিন্ন জায়গায় জমা জল মশার বংশবিস্তারের সুযোগ তৈরি করতে পারে। অন্যদিকে গ্রামীণ এলাকায় বাড়ির আশপাশের পাত্র, জল জমে থাকা গর্ত, অপরিষ্কার নিকাশি এবং পরিত্যক্ত সামগ্রী থেকেও সমস্যা তৈরি হতে পারে। ফলে ডেঙ্গি প্রতিরোধের জন্য এক ধরনের ব্যবস্থা সব জায়গায় সমানভাবে কার্যকর হবে, এমন নয়। স্থানীয় পরিস্থিতি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। কোথাও মশার ঘনত্ব বেশি হলে সেখানে নিয়মিত নজরদারি, জমা জল সরানো এবং প্রয়োজনমতো মশা নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করা গুরুত্বপূর্ণ।

সাম্প্রতিক সংবাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাজ্যের কয়েকটি গ্রামীণ ও শহুরে এলাকাকে বিশেষ নজরদারির আওতায় রাখা হয়েছে। কলকাতা, বিধাননগর এবং হাওড়ার কয়েকটি পুরসভা ওয়ার্ডের পাশাপাশি মুর্শিদাবাদ, দক্ষিণ ২৪ পরগনা, নদিয়া, জলপাইগুড়ি, বীরভূম ও হুগলির কিছু এলাকার পরিস্থিতির উপর নজর রাখার খবর প্রকাশিত হয়েছে। তবে কোনও এলাকাকে বিশেষ নজরদারির আওতায় রাখা হয়েছে বলেই গোটা জেলায় সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত রয়েছেন, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায় না। নির্দিষ্ট কোনও এলাকায় সংক্রমণের হার বাড়তে পারে, অথচ জেলার অন্য অংশে পরিস্থিতি তুলনামূলক নিয়ন্ত্রণে থাকতে পারে। আবার আক্রান্তের মোট সংখ্যা বেশি হলেও সাম্প্রতিক সংক্রমণ বৃদ্ধির হার কম হতে পারে। তাই জেলার নামের সঙ্গে নির্দিষ্ট আক্রান্তের সংখ্যা উল্লেখ করার আগে সংশ্লিষ্ট সময়ের সরকারি তথ্য যাচাই করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

মুর্শিদাবাদ জেলার কয়েকটি গ্রামীণ এলাকায় ডেঙ্গি পরিস্থিতি নিয়ে নজরদারি বাড়ানোর খবর সামনে এসেছে। গ্রামীণ এলাকায় ডেঙ্গি নিয়ন্ত্রণ করতে হলে বাড়ির আশপাশ পরিষ্কার রাখা এবং জল জমার জায়গাগুলি চিহ্নিত করা জরুরি। অনেক সময় ছোট পাত্রে জমে থাকা জলও মশার প্রজননের জন্য যথেষ্ট হতে পারে। তাই বড় জলাশয় বা নিকাশি নালার পাশাপাশি বাড়ির উঠোন, ফুলের টব এবং পরিত্যক্ত সামগ্রী নিয়মিত পরীক্ষা করা দরকার। স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মীরা জ্বরের রোগীদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে পারেন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পরীক্ষার পরামর্শ দিতে পারেন। কোনও এলাকায় একসঙ্গে একাধিক জ্বরের রোগী দেখা গেলে বিষয়টি দ্রুত স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষকে জানানোও গুরুত্বপূর্ণ। তবে আক্রান্তের সংখ্যা সম্পর্কে অনুমান না করে নির্ভরযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে পরিস্থিতি মূল্যায়ন করাই সবচেয়ে যুক্তিযুক্ত।

কলকাতা ও শহরতলিতেও ডেঙ্গি প্রতিরোধে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় অল্প জায়গায় বহু মানুষের বসবাস, নির্মাণস্থলে জমা জল এবং নিকাশি সমস্যার কারণে মশার বংশবিস্তারের সুযোগ তৈরি হতে পারে। বাড়ির ভিতর পরিষ্কার থাকলেও ছাদ, বারান্দা কিংবা পাশের ফাঁকা জমিতে জল জমে থাকলে ঝুঁকি থেকে যায়। তাই শুধু নিজের বাড়ি পরিষ্কার রাখলেই হবে না, আশপাশের পরিবেশের দিকেও নজর দেওয়া দরকার। কলকাতা পুরনিগম, বিধাননগর পুরনিগম এবং হাওড়া পুরনিগমের মতো স্থানীয় প্রশাসনিক সংস্থাগুলির পরিচ্ছন্নতা অভিযান, নিকাশি ব্যবস্থা পরীক্ষা এবং মশা নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। তবে মশা মারার স্প্রে করা হয়েছে বলেই সংক্রমণের ঝুঁকি সম্পূর্ণ দূর হয়ে যায় না। মশার ডিম পাড়ার জায়গাগুলি চিহ্নিত করে জল সরিয়ে ফেলা এবং নিয়মিত পরিষ্কার রাখাই দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপায়।

ডেঙ্গির ক্ষেত্রে সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে সতর্কতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে সেপ্টেম্বর মাসে নতুন আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহেও সংক্রমণের খবর সামনে আসায় পরিস্থিতির উপর নজর রাখার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। তবে এই সময়েই প্রত্যেক বছর একই হারে সংক্রমণ বাড়বে, এমন কোনও নিয়ম নেই। বৃষ্টিপাতের পরিমাণ, তাপমাত্রা, আর্দ্রতা, জমা জলের পরিস্থিতি এবং স্থানীয় মশার ঘনত্বের উপর সংক্রমণের প্রবণতা নির্ভর করতে পারে। একই সঙ্গে কতজন পরীক্ষা করাচ্ছেন এবং রোগ শনাক্তকরণের ব্যবস্থা কতটা সক্রিয়, সেটিও নথিভুক্ত আক্রান্তের সংখ্যাকে প্রভাবিত করতে পারে। তাই একটি নির্দিষ্ট মাসে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েছে বলেই শুধু আবহাওয়াকে দায়ী করা ঠিক নয়। পরিস্থিতি বোঝার জন্য একাধিক তথ্য একসঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

news image
আরও খবর

ডেঙ্গির উপসর্গ সম্পর্কে সচেতন থাকাও অত্যন্ত জরুরি। সাধারণত জ্বর, মাথাব্যথা, চোখের পিছনে ব্যথা, পেশি ও গাঁটে ব্যথা, বমি বমি ভাব এবং ত্বকে র‌্যাশ দেখা দিতে পারে। তবে প্রত্যেক রোগীর ক্ষেত্রে একই ধরনের উপসর্গ দেখা যায় না। কারও জ্বর বেশি হতে পারে, আবার কারও ক্ষেত্রে প্রাথমিক লক্ষণ তুলনামূলক হালকা থাকতে পারে। তাই জ্বর হলেই সেটিকে সাধারণ ভাইরাল সংক্রমণ ধরে নিয়ে অবহেলা করা উচিত নয়। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানো এবং শরীরের অবস্থার উপর নজর রাখা দরকার। বিশেষ করে জ্বরের সঙ্গে শরীরে তীব্র ব্যথা, অস্বাভাবিক দুর্বলতা কিংবা অন্য কোনও উদ্বেগজনক উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া উচিত।

ডেঙ্গির ক্ষেত্রে কিছু সতর্কতামূলক লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে হাসপাতালে যেতে হবে। তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি, নাক বা মাড়ি দিয়ে রক্তপাত, রক্তবমি, অস্বাভাবিক ঘুমঘুম ভাব, অস্থিরতা কিংবা শ্বাসকষ্টের মতো লক্ষণ গুরুতর অবস্থার ইঙ্গিত হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে জ্বর কমে যাওয়ার সময় বা তার পরেও রোগীর অবস্থা খারাপ হতে পারে। তাই জ্বর কমে গিয়েছে বলেই বিপদ কেটে গিয়েছে, এমন ধরে নেওয়া উচিত নয়। শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি, গর্ভবতী মহিলা এবং আগে থেকে অন্য রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নিজে থেকে ওষুধ খাওয়া বা পরীক্ষা ছাড়াই রোগ নির্ধারণ করা বিপজ্জনক হতে পারে। ডেঙ্গি সন্দেহ হলে চিকিৎসকের নির্দেশ অনুযায়ী পরীক্ষা, পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ এবং বিশ্রামের ব্যবস্থা করা জরুরি।

ডেঙ্গি প্রতিরোধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপগুলির একটি হল মশার বংশবিস্তারের জায়গা দূর করা। বাড়ির আশপাশে কোথাও জল জমে থাকলে তা নিয়মিত সরিয়ে ফেলতে হবে। ফুলের টবের নীচে রাখা পাত্র, বালতি, ড্রাম, পুরনো টায়ার এবং জল জমতে পারে এমন অন্যান্য সামগ্রী পরিষ্কার রাখা প্রয়োজন। জল রাখার পাত্র ঢেকে রাখলে মশা সেখানে ডিম পাড়ার সুযোগ কমে। ছাদ, বারান্দা এবং বাড়ির পিছনের অংশ সপ্তাহে অন্তত একবার পরীক্ষা করা যেতে পারে। ফ্রিজের জল জমার অংশ কিংবা অন্য কোনও সরঞ্জামের নীচে জল জমছে কি না, সেটিও খেয়াল করা দরকার। স্কুল, অফিস, দোকান, নির্মাণস্থল এবং অন্যান্য জনবহুল জায়গাতেও একই ধরনের সতর্কতা প্রয়োজন। কারণ, একটি ছোট জায়গায় মশার বংশবিস্তার হলেও সেখান থেকে আশপাশের মানুষের সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়তে পারে।

মশার কামড় এড়ানোর জন্য দিনের বেলাতেও সতর্ক থাকা জরুরি। এডিস মশা দিনের বেলায় বেশি সক্রিয় থাকায় শুধু রাতে মশারি ব্যবহার করলেই সম্পূর্ণ সুরক্ষা পাওয়া যায় না। প্রয়োজন অনুযায়ী অনুমোদিত মশা প্রতিরোধক ব্যবহার করা, শরীরের খোলা অংশ ঢেকে রাখে এমন পোশাক পরা এবং দরজা-জানালায় মশা আটকানোর জাল ব্যবহার করা যেতে পারে। ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে মশা প্রতিরোধক ব্যবহারের সময় পণ্যের নির্দেশাবলি মেনে চলা জরুরি। পাশাপাশি বাড়ির আশপাশে জমা জল সরানোর কাজে পরিবারের প্রত্যেক সদস্যকে যুক্ত করা যেতে পারে। কোনও পাড়ায় দীর্ঘদিন ধরে জল জমে থাকলে স্থানীয় প্রশাসনকে জানানো উচিত। পরিচ্ছন্নতা অভিযান এবং জনসচেতনতা বাড়ানোর মাধ্যমে ডেঙ্গির ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করা সম্ভব।

ডেঙ্গি নিয়ন্ত্রণে সরকারি স্বাস্থ্য দফতর এবং স্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত রোগের তথ্য সংগ্রহ, সন্দেহজনক সংক্রমণ শনাক্ত করা, প্রয়োজনমতো পরীক্ষা করানো এবং আক্রান্ত এলাকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা দরকার। কোনও এলাকায় অস্বাভাবিক হারে জ্বরের রোগী বাড়লে বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। মশার বংশবিস্তারের জায়গা চিহ্নিত করা, পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালানো এবং সাধারণ মানুষকে সচেতন করার মাধ্যমে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করা সম্ভব। তবে এই কাজ কার্যকর করতে হলে স্থানীয় বাসিন্দাদের সহযোগিতাও প্রয়োজন। বাড়ির আশপাশে জল জমতে না দেওয়া এবং অসুস্থ হলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়ার মতো ছোট পদক্ষেপও জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

ডেঙ্গি নিয়ে কোনও খবর পড়ার সময় তথ্যের উৎস এবং তারিখ যাচাই করা জরুরি। সামাজিক মাধ্যমে অনেক সময় আক্রান্তের সংখ্যা, মৃত্যুর খবর বা নির্দিষ্ট জেলাকে হটস্পট ঘোষণা করার মতো তথ্য ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু সব তথ্য নির্ভরযোগ্য নয়। কোনও প্রতিবেদনে আক্রান্তের সংখ্যা দেওয়া থাকলে সেটি কোন তারিখ পর্যন্ত হিসাব করা হয়েছে, তা দেখা দরকার। আবার সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা এবং পরীক্ষায় নিশ্চিত আক্রান্তের সংখ্যা এক নয়। তাই দুটি প্রতিবেদনের পরিসংখ্যান তুলনা করার সময় তাদের সময়সীমা ও তথ্যের ধরন একই কি না, তা বিবেচনা করতে হবে। সরকারি স্বাস্থ্য দফতরের বুলেটিন এবং সংশ্লিষ্ট স্থানীয় প্রশাসনের প্রকাশিত তথ্যের উপর নির্ভর করাই সবচেয়ে ভালো উপায়।

পশ্চিমবঙ্গে ডেঙ্গির হাই রিস্ক পিরিয়ডে সতর্কতা বাড়ানোর প্রয়োজন থাকলেও আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। সঠিক সময়ে রোগ শনাক্ত করা, চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং মশার বংশবিস্তার বন্ধ করার মাধ্যমে ঝুঁকি কমানো সম্ভব। তবে ডেঙ্গিকে হালকাভাবে নেওয়াও উচিত নয়। জ্বরের মতো উপসর্গ দেখা দিলে অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে এবং গুরুতর লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে। একই সঙ্গে ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার পাশাপাশি আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার রাখার দায়িত্বও পালন করতে হবে।

সব মিলিয়ে, রাজ্যে ডেঙ্গির পরিস্থিতি সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং সর্বশেষ সরকারি পরিসংখ্যানের দিকে নজর রাখা এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৬ সালের ৭ অক্টোবর পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে মোট আক্রান্তের সংখ্যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় কম থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে নতুন সংক্রমণের খবর উদ্বেগ তৈরি করেছে। মুর্শিদাবাদ-সহ কয়েকটি জেলার গ্রামীণ এলাকা এবং কলকাতা, বিধাননগর ও হাওড়ার নির্দিষ্ট শহুরে এলাকায় বিশেষ নজরদারির খবরও সামনে এসেছে। তবে প্রতিটি জেলার নির্ভুল বর্তমান আক্রান্তের সংখ্যা জানতে সর্বশেষ সরকারি জেলা-ভিত্তিক তথ্য প্রয়োজন। অনুমানভিত্তিক সংখ্যা প্রকাশের পরিবর্তে যাচাই করা তথ্যের উপর নির্ভর করাই দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার পরিচয়। প্রশাসন ও সাধারণ মানুষের যৌথ উদ্যোগ, নিয়মিত নজরদারি এবং সময়মতো চিকিৎসার মাধ্যমেই ডেঙ্গির বিরুদ্ধে লড়াই আরও কার্যকর করা সম্ভব।

Preview image