পোলিয়োর কারণে চলাফেরায় অসুবিধা হলেও কেরলের এন এস রাজাপ্পন প্রতিদিন নৌকা নিয়ে ভেম্বানাদ হ্রদে যান। জল থেকে ভাসমান আবর্জনা সংগ্রহ করে হ্রদ পরিষ্কার রাখার চেষ্টা করেন তিনি। পরিবেশ রক্ষায় তাঁর এই নিরলস কাজ অনেকের কাছে অনুপ্রেরণা।
কেরলের কোট্টায়াম জেলার এন এস রাজাপ্পনের কাছে ভেম্বানাদ হ্রদ শুধু পরিচিত জলাশয় নয়, জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক জায়গা। শৈশবে পোলিয়োয় আক্রান্ত হওয়ার পর থেকে তিনি হাঁটতে পারেন না। তবু বছরের পর বছর নৌকা নিয়ে হ্রদ ও সংলগ্ন জলপথ থেকে প্লাস্টিকের বোতল সংগ্রহ করে চলেছেন। তাঁর কাজ পরিচিতি পেয়েছে, এসেছে সম্মানও। কিন্তু সেই পরিচিতির আড়ালে রয়ে গিয়েছে অল্প আয়, ক্ষতিগ্রস্ত বাড়ি এবং আবর্জনা সংগ্রহের কঠিন দৈনন্দিন পরিশ্রম।
চারপাশে দিনের ব্যস্ততা শুরু হওয়ার আগেই রাজাপ্পনের কাজ শুরু হয়। বাড়ি থেকে মীনচিল নদীর দিকে যান তিনি। সেই নদী গিয়ে মিশেছে ভেম্বানাদ হ্রদে। নৌকা নিয়ে জলপথে বেরিয়ে তাঁর নজর থাকে ভেসে থাকা প্লাস্টিকের বোতল ও অন্য সংগ্রহযোগ্য বর্জ্যের দিকে। কোথাও একটি বোতল, কোথাও জমে থাকা কয়েকটি—যা পান, নৌকায় তুলে নেন।
কাজটি শুনতে সহজ মনে হতে পারে। কিন্তু রাজাপ্পনের জন্য নৌকায় ওঠা থেকে শুরু করে জলপথে ঘুরে আবর্জনা সংগ্রহ, তারপর তা নিয়ে ফিরে আসা—প্রতিটি ধাপেই শারীরিক পরিশ্রম রয়েছে। শৈশবে পোলিয়োয় আক্রান্ত হওয়ার ফলে তাঁর পা হাঁটুর নীচ থেকে পক্ষাঘাতগ্রস্ত। চলাফেরায় দুই হাতই তাঁর প্রধান ভরসা। সেই হাতেই তিনি নৌকা চালান, আবার জল থেকে বোতলও তোলেন। প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, দীর্ঘ সময় ধরে তিনি এই কাজ করেন; কোনও কোনও বর্ণনায় দিনে ১৭ ঘণ্টা কাজের কথাও বলা হয়েছে। তবে কাজের সময় বা প্রতিদিন সংগৃহীত বর্জ্যের পরিমাণ সব দিন এক রকম থাকে, এমন ধরে নেওয়ার কারণ নেই।
রাজাপ্পনের গল্পকে কেবল শারীরিক প্রতিবন্ধকতা অতিক্রমের গল্প হিসেবে দেখলে তাঁর শ্রমের একটি বড় অংশ চোখ এড়িয়ে যায়। জলে ভাসা আবর্জনা তোলা তাঁর কাজের শুরু। সংগৃহীত প্লাস্টিক পরিষ্কার করা, শুকোনো এবং পরে সংগ্রহের জন্য গুছিয়ে রাখাও তাঁর দৈনন্দিন দায়িত্বের অংশ। একটি বোতল জল থেকে সরিয়ে স্থলে আনা এবং সেটিকে বর্জ্য সংগ্রহ ব্যবস্থার হাতে পৌঁছে দেওয়ার মাঝখানে যে শ্রম থাকে, রাজাপ্পন তা নিজের হাতে করেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, পাঁচ বছর বয়সে পোলিয়োমাইলাইটিসে আক্রান্ত হন রাজাপ্পন। তার প্রভাবে তাঁর দুই পা পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়ে। নিয়মিত দৈনিক মজুরির কাজ করা তাঁর পক্ষে কঠিন ছিল। ফলে এমন কাজের খোঁজ করতে হয়েছে, যা তিনি নিজের শারীরিক অবস্থার মধ্যে থেকে করতে পারেন। জল ও নৌকার সঙ্গে দীর্ঘ পরিচিতি তাঁকে সেই পথ দেখিয়েছে।
রাজাপ্পন জানিয়েছেন, রাস্তায় চলাফেরার চেয়ে নৌকা চালানো তাঁর কাছে সহজ। এই কথাটির মধ্যে তাঁর সিদ্ধান্তের বাস্তব দিকটি স্পষ্ট। তিনি যে কাজটি বেছে নিয়েছেন, সেটি শুধু পরিবেশ রক্ষার ইচ্ছা থেকে আসেনি; জীবিকা অর্জনের প্রয়োজন এবং নিজের দক্ষতাও এর সঙ্গে জড়িত। নৌকা চালাতে পারা তাঁকে জলপথে কাজের সুযোগ দিয়েছে। সেই কাজ করতে গিয়েই ভেম্বানাদ ও আশপাশের জলাশয় থেকে প্লাস্টিক সরানোর দায়িত্ব তিনি নিজের মতো করে নিয়েছেন।
প্লাস্টিকের বোতল বিক্রি করে তাঁর আয় হয়, যদিও তা খুব বেশি নয়। স্থানীয় কেউ তাঁকে বর্জ্য সংগ্রহের জন্য ডাকলে কখনও অর্থ দেন। ফলে কাজটির দুটি দিক পাশাপাশি চলে: একদিকে সামান্য আয়ের ব্যবস্থা, অন্যদিকে জলাশয় থেকে আবর্জনা সরানো। তাঁর কাজকে সম্মান জানাতে হলে এই দুই বাস্তবতাই দেখতে হবে। পরিবেশ পরিষ্কারের উপকারের পাশাপাশি এটিও মনে রাখা দরকার যে রাজাপ্পনের নিজের জীবনযাত্রা ওই অল্প আয়ের উপর নির্ভর করে।
ভেম্বানাদ হ্রদের আশপাশে ছোট নৌকায় রাজাপ্পনকে স্থানীয় মানুষ বহু বছর ধরেই দেখেছেন। পরে তাঁর কাজের ছবি ও ভিডিয়ো বৃহত্তর পরিসরে ছড়িয়ে পড়ে। তখন অনেকেই জানতে পারেন, তিনি শুধু নৌকা নিয়ে জলপথে ঘুরছেন না; ভেসে থাকা প্লাস্টিকের বোতল সংগ্রহ করছেন। প্রকাশিত বিবরণে বলা হয়েছে, তিনি মূলত বোতলই তোলেন। কখনও দিনে কয়েক বস্তা বোতল জমে, তারপর সেগুলি পরিষ্কার ও শুকিয়ে সংরক্ষণ করেন। স্থানীয় সংস্থা পরে সেই বর্জ্য সংগ্রহ করে নিয়ে যায়। Anandabazar
জলাশয়ে পড়ে থাকা একটি প্লাস্টিকের বোতল তোলার কাজ ছোট বলে মনে হতে পারে। কিন্তু বহু মানুষের ফেলে দেওয়া বর্জ্য যখন জমতে থাকে, তখন তা সরানোর প্রয়োজনও বাড়ে। রাজাপ্পনের কাজ সেই সমস্যাটিকেই সামনে আনে। বোতলটি জলে পৌঁছনোর আগে কোথায় ছিল, কে ব্যবহার করেছিলেন, কেন যথাযথ জায়গায় ফেলা হয়নি—এসব প্রশ্নের উত্তর তাঁর কাছে থাকার কথা নয়। তবু শেষ পর্যন্ত জল থেকে সেটি তুলে আনার দায়িত্ব তাঁর মতো একজন মানুষের হাতে এসে পড়ে।
এখানে আরেকটি বিষয়ও স্পষ্ট। রাজাপ্পন যত পরিশ্রমই করুন, একটি বড় হ্রদ ও তার সঙ্গে যুক্ত জলপথ তিনি একা পরিষ্কার রাখতে পারবেন না। তাঁর কাজের মূল্য কমে যায় না; বরং বোঝা যায়, উৎসেই বর্জ্য ফেলা আটকানো, নিয়মিত সংগ্রহের ব্যবস্থা রাখা এবং সংগৃহীত প্লাস্টিক সঠিক পথে পাঠানো কত প্রয়োজন। পরিবেশ রক্ষার আলোচনায় একজন মানুষের নিষ্ঠা যেমন জায়গা পায়, তেমনই বর্জ্য ব্যবস্থার দায়িত্বও আলোচনায় থাকা উচিত।
রাজাপ্পনের কাজ এক দিনে শুরু হয়নি এবং সমাজমাধ্যমে পরিচিত হওয়ার পরেও শুরু হয়নি। প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, কোট্টায়ামের কুমারাকোম অঞ্চলে ভেম্বানাদ হ্রদ ও সংলগ্ন জলপথ থেকে তিনি বহু বছর ধরে প্লাস্টিক সংগ্রহ করেছেন। স্থানীয়দের কাছে ছোট নৌকায় তাঁর উপস্থিতি পরিচিত দৃশ্য ছিল। পরে কোট্টায়ামের এক চিত্রগ্রাহকের তৈরি ভিডিয়ো ছড়িয়ে পড়লে তাঁর কাজের কথা আরও মানুষ জানতে পারেন।
ভাইরাল ছবি বা ভিডিয়োতে সাধারণত কোনও কাজের কয়েকটি মুহূর্ত দেখা যায়। রাজাপ্পনের ক্ষেত্রে সেই কয়েক মুহূর্তের পিছনে রয়েছে বহু দিনের পুনরাবৃত্তি—জলে যাওয়া, বোতল তোলা, বোঝা নিয়ে ফেরা, বর্জ্য গুছিয়ে রাখা। পরিচিতি পাওয়ার আগে এই কাজ তিনি করতেন; পরিচিতি পাওয়ার পরেও তাঁর প্রয়োজনীয় কাজের ধরন বদলায়নি। তাই তাঁর কাহিনিতে আলোচনার কেন্দ্রে থাকা উচিত দীর্ঘ দিনের শ্রম।
এই পরিচিতি অবশ্য তাঁর কাছে সহায়তাও পৌঁছে দিয়েছে। তাঁর কাজের প্রশংসা হয়েছে বিভিন্ন জায়গায়। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ‘মন কি বাত’ অনুষ্ঠানে তাঁর পরিচ্ছন্নতার প্রতি অঙ্গীকারের কথা উল্লেখ করেছিলেন। প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনি পুরস্কার, আর্থিক সহায়তা, মোটরচালিত হুইলচেয়ার এবং একটি মোটরবোটও পেয়েছেন। বড় নৌকা পাওয়ার ইচ্ছা তাঁর ছিল, কারণ তাতে আরও বেশি এলাকায় কাজ করা সম্ভব হতে পারে।
স্বীকৃতি রাজাপ্পনের কাজকে মানুষের সামনে এনেছে। তবে স্বীকৃতির পাশাপাশি তাঁর নিয়মিত আয়, নিরাপদে থাকা এবং বয়স বাড়ার সঙ্গে কাজ চালিয়ে যাওয়ার বাস্তব প্রয়োজনও গুরুত্বপূর্ণ। এক দিনের সংবর্ধনা কিংবা একটি ভাইরাল ভিডিয়োর চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা তাঁর জীবনে বেশি প্রভাব ফেলতে পারে।
রাজাপ্পনের জীবন শুধু হ্রদের জলেই সীমাবদ্ধ নয়। জলের ধারে তাঁর থাকার জায়গাটিও নিরাপদ থাকা প্রয়োজন। প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কয়েক বছর আগের বন্যায় তাঁর বাড়ি মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। সেই সময়ে তাঁকে নৌকায় আশ্রয় নিতে হয়। সংগৃহীত বর্জ্যও নষ্ট হয়ে যায়। পরে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে তিনি আবার কাজে ফেরেন।
বর্জ্য হারানোর ঘটনাটি তাঁর জীবিকার দিকটিও মনে করিয়ে দেয়। জমিয়ে রাখা প্লাস্টিক তাঁর কাছে নিছক ফেলে দেওয়া জিনিস নয়; বহু দিনের শ্রম এবং সম্ভাব্য আয়ের অংশ। বন্যার জলে তা হারানো মানে আবার শুরু থেকে সংগ্রহ করা। বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া ও কাজের উপকরণ হারানো—দুটি আঘাত একই সময়ে সামলাতে হয়েছে তাঁকে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনি একটি ছোট, আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িতে একা থাকেন। কাছেই থাকা বোন খাবারের ব্যবস্থা করতে সাহায্য করেন; কিছু স্থানীয় মানুষও পাশে থাকেন। এই বিবরণ তাঁর সামাজিক সহায়তার একটি ছবি দেয়। একই সঙ্গে মনে করিয়ে দেয়, যে মানুষটি জলাশয়ের আবর্জনা সরাচ্ছেন, তাঁর নিজের একটি নিরাপদ বাসস্থানের প্রয়োজনও রয়েছে। এক সাক্ষাৎকারে মাথার উপর একটি ছাদ চাওয়ার কথাই জানিয়েছিলেন তিনি।
রাজাপ্পনের কাজের মধ্যে একটি কঠিন দ্বন্দ্ব রয়েছে। জলাশয়ে প্লাস্টিক কম পড়লে পরিবেশের জন্য সেটি ভাল খবর। কিন্তু সংগ্রহযোগ্য বোতল কমে গেলে সেগুলি বিক্রি করে পাওয়া তাঁর আয়ও কমে যায়। কোভিডকালের অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রকাশিত বিবরণে এই সমস্যার কথা এসেছে। পর্যটন ও চলাচল কম থাকায় জলে বর্জ্যও কম দেখা গিয়েছিল বলে তিনি জানিয়েছিলেন। পরিষ্কার জল দেখে তিনি খুশি হয়েছিলেন, কিন্তু নিজের জীবিকা নিয়ে উদ্বেগও ছিল।
এটি শুধু রাজাপ্পনের ব্যক্তিগত সমস্যা হিসেবে দেখার বিষয় নয়। বর্জ্য সংগ্রহের সঙ্গে যুক্ত বহু মানুষের কাজের মূল্য তৈরি হয় সমাজের ফেলে দেওয়া জিনিস থেকে। অথচ পরিচ্ছন্ন পরিবেশ সবার লক্ষ্য হওয়া উচিত। এই দুই প্রয়োজনকে একসঙ্গে ভাবতে গেলে প্রশ্ন ওঠে: যাঁরা বছরের পর বছর আবর্জনা সরিয়ে জনসাধারণের উপকার করছেন, তাঁদের শ্রমের মূল্য কি শুধু বিক্রি করা বর্জ্যের পরিমাণ দিয়ে মাপা যায়?
রাজাপ্পনের ক্ষেত্রে প্রশ্নটি আরও সরাসরি। তিনি যদি আজ হ্রদে কম বোতল পান, তবে পরিচ্ছন্নতার দিক থেকে সেটি ইতিবাচক হতে পারে। কিন্তু তাঁর আয় কী ভাবে বজায় থাকবে, সেটিও ভাবতে হবে। তাঁর কাজের জন্য নিয়মিত পারিশ্রমিক, বর্জ্য সংগ্রহের নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়ক সরঞ্জাম থাকলে ব্যক্তির জীবিকা ও জলাশয়ের পরিচ্ছন্নতা—দুই বিষয়েই স্থিতি আসতে পারে। এটি তাঁর সম্পর্কে প্রকাশিত তথ্য থেকে উঠে আসা একটি বৃহত্তর সামাজিক প্রশ্ন; এমন কোনও নির্দিষ্ট ব্যবস্থা ইতিমধ্যে চালু আছে বলে দাবি নয়।
রাজাপ্পনকে নিয়ে লেখা হলে তাঁর দৃঢ়তা ও পরিবেশের প্রতি দায়বদ্ধতার কথা স্বাভাবিকভাবেই আসে। কিন্তু তাঁকে শুধু ‘অনুপ্রেরণা’ বলে থেমে গেলে তাঁর কাজের বাস্তব প্রয়োজনগুলি আড়ালে পড়তে পারে। জলপথে কাজ করতে নৌকা প্রয়োজন, সংগৃহীত বর্জ্য রাখার জায়গা প্রয়োজন, তা নিয়মিত তুলে নেওয়ার ব্যবস্থাও প্রয়োজন। তাঁর নিজের জন্য নিরাপদ চলাচল, আয় ও বাসস্থান সমান জরুরি।
বিশেষ করে বয়স বাড়ার সঙ্গে দীর্ঘ সময় নৌকায় কাজ করা কতটা কঠিন হতে পারে, তা সহজেই বোঝা যায়। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিদিনের কাজের সময়কে স্থায়ী নিয়ম হিসেবে ধরে নেওয়া উচিত নয়; বরং এত দীর্ঘ শ্রমের বিবরণ তাঁর কাজের কষ্ট সম্পর্কে ধারণা দেয়। পরিবেশের জন্য তাঁর অবদান স্বীকার করার পাশাপাশি সেই শ্রমের উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানোও গুরুত্বপূর্ণ।
তাঁর পাওয়া মোটরবোট ও হুইলচেয়ারের মতো সহায়তা চলাফেরা ও কাজের সুযোগ বাড়াতে পারে। কিন্তু কোনও একটি সরঞ্জাম পাওয়া মানেই জীবিকার সব সমস্যা মিটে যাওয়া নয়। যে জলাশয় থেকে তিনি বর্জ্য সরান, সেখানে নিয়মিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কতটা কার্যকর, সংগৃহীত প্লাস্টিক কত দ্রুত সরানো হয় এবং রাজাপ্পনের মতো কর্মীদের কাজের মূল্য কী ভাবে দেওয়া হয়—এই প্রশ্নগুলিও তাঁর গল্পের অংশ।
ভেম্বানাদ হ্রদ থেকে একটি বোতল তোলার দৃশ্যের মধ্যেই বৃহত্তর একটি সম্পর্ক ধরা পড়ে। কেউ প্লাস্টিক ব্যবহার করেন, কেউ সেটি অসতর্কভাবে ফেলে দেন, আর অন্য কেউ পরে সেই বর্জ্য সরাতে সময় ও শক্তি ব্যয় করেন। রাজাপ্পনের কাজ এই শেষ ধাপটিকে দৃশ্যমান করে। আমরা সাধারণত পরিষ্কার জল দেখতে চাই; সেই জল পরিষ্কার রাখার শ্রম কার, তা নিয়ে কম ভাবি।
তাঁর কাজে ব্যক্তিগত উদ্যোগের শক্তি রয়েছে। হাঁটতে না পারার সীমাবদ্ধতার মধ্যেও তিনি নিজের জানা জলপথে কাজের রাস্তা খুঁজেছেন। আবার তাঁর অভিজ্ঞতা দেখায়, ব্যক্তিগত উদ্যোগকে দীর্ঘ দিন টিকিয়ে রাখতে সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা প্রয়োজন। এক জন মানুষ আবর্জনা তুলতে পারেন; কিন্তু জলাশয়ে আবর্জনা ফেলা বন্ধ করা সকলের দায়িত্ব।
যাঁরা ভেম্বানাদ হ্রদ দেখেন, তাঁদের কাছে সেটি প্রকৃতির অংশ। রাজাপ্পনের কাছে সেই জল জীবনযাত্রা, কাজ এবং দীর্ঘ দিনের পরিচয়ের জায়গা। তিনি জল থেকে প্লাস্টিক সরিয়ে চলেছেন কারণ সেটি তাঁর পক্ষে সম্ভব এবং প্রয়োজনীয় বলে মনে করেন। তাঁর এই কাজের সবচেয়ে গভীর বার্তা সম্ভবত এখানেই: পরিবেশ রক্ষার দায়িত্ব কোনও একজনের উপর চাপিয়ে দেওয়া যায় না, কিন্তু একজন মানুষের নিয়মিত কাজ আমাদের নিজেদের দায়িত্বের কথা মনে করিয়ে দিতে পারে।
এন এস রাজাপ্পনের নৌকা, সংগৃহীত প্লাস্টিকের বোতল এবং ভেম্বানাদ হ্রদের ছবি সহজেই মানুষের নজর কাড়ে। সেই ছবির বাইরে রয়েছে পোলিয়োর প্রভাব নিয়ে বেড়ে ওঠা, উপযুক্ত জীবিকার পথ খোঁজা, বন্যায় ঘর হারানোর অভিজ্ঞতা এবং অল্প আয়েও কাজ চালিয়ে যাওয়ার দীর্ঘ ইতিহাস। তাঁর কাজ প্রশংসা পেয়েছে—এটি আনন্দের। পাশাপাশি তাঁর শ্রমের ন্যায্য মূল্য ও নিরাপদ জীবনের প্রয়োজনও আলোচনায় থাকা উচিত।
রাজাপ্পন প্রতিদিন যতটুকু পারেন, জল থেকে আবর্জনা সরান। বাকিটা নির্ভর করে আমরা জলাশয়ে কী ফেলছি, বর্জ্য কোথায় জমা করছি এবং পরিচ্ছন্নতার কাজে যুক্ত মানুষদের কতটা সম্মান ও সহায়তা দিচ্ছি তার উপর।