Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

হৃদরোগের ঝুঁকি কমালেও এই চার সমস্যায় লাল লঙ্কা খাওয়া বিপজ্জনক

লাল লঙ্কায় থাকা ক্যাপসাইসিন যৌগ মশলাদার স্বাদের পাশাপাশি শরীরের প্রদাহ কমাতে সহায়তা করে

লাল লঙ্কা নিয়ে আমাদের সমাজে দীর্ঘদিন ধরেই একটি ভুল ধারণা প্রচলিত রয়েছে যে এটি স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর বিশেষ করে হৃদযন্ত্র ও হজম প্রক্রিয়ার জন্য অনেকেই মনে করেন নিয়মিত লাল লঙ্কা খেলে শরীরে প্রদাহ বাড়ে গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা হয় এবং নানা জটিলতা দেখা দেয় সেই কারণে বহু মানুষ খাবারে লাল লঙ্কার ব্যবহার কমিয়ে দিয়েছেন বা একেবারেই বাদ দিয়েছেন কিন্তু আধুনিক পুষ্টিবিজ্ঞান ও সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে এই ধারণা সম্পূর্ণ ভ্রান্ত সঠিক পরিমাণে ও সঠিকভাবে লাল লঙ্কা গ্রহণ করলে এটি শরীরের জন্য অসংখ্য উপকার বয়ে আনতে পারে ।

এই বিষয়ে বিশিষ্ট পুষ্টিবিদ রুজুতা দ্বিবেকর স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে লাল লঙ্কা হৃদরোগের জন্য অন্যতম উপকারী একটি প্রাকৃতিক খাদ্য উপাদান তাঁর মতে সমস্যা হয় তখনই যখন মানুষ অতিরিক্ত মাত্রায় বা নিজের শারীরিক অবস্থার কথা না ভেবে লাল লঙ্কা গ্রহণ করেন সঠিক পরিমিতি বজায় রাখলে এটি ওষুধের মতো কাজ করতে পারে ।

লাল লঙ্কার প্রধান সক্রিয় উপাদান হল ক্যাপসাইসিন এই যৌগটিই লঙ্কাকে তার ঝাল স্বাদ প্রদান করে ক্যাপসাইসিনের উপর বহু বৈজ্ঞানিক গবেষণা হয়েছে এবং দেখা গেছে এটি শরীরের ভেতরের প্রদাহ কমাতে অত্যন্ত কার্যকর প্রদাহ দীর্ঘদিন শরীরে জমে থাকলে তা হৃদরোগ ডায়াবেটিস উচ্চ রক্তচাপ এবং ক্যানসারের মতো মারাত্মক অসুখের ঝুঁকি বাড়ায় ক্যাপসাইসিন সেই প্রদাহ কমিয়ে শরীরকে ভিতর থেকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে ।

হৃদযন্ত্রের সুস্থতার ক্ষেত্রে লাল লঙ্কার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ক্যাপসাইসিন রক্তনালিকে প্রসারিত করতে সাহায্য করে ফলে রক্ত চলাচল স্বাভাবিক ও মসৃণ হয় রক্তপ্রবাহ ঠিক থাকলে হৃদযন্ত্রের উপর চাপ কম পড়ে এবং হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের ঝুঁকিও কমে এছাড়াও ক্যাপসাইসিন খারাপ কোলেস্টেরল অর্থাৎ এলডিএল কমাতে সাহায্য করে এবং ভালো কোলেস্টেরল এইচডিএল বজায় রাখতে সহায়ক হয় এই ভারসাম্য হৃদরোগ প্রতিরোধের ক্ষেত্রে অত্যন্ত জরুরি

অনেক গবেষণায় দেখা গেছে যেসব দেশে মানুষ নিয়মিত ঝাল খাবার খান বিশেষ করে লাল লঙ্কা ব্যবহার করেন সেখানে হৃদরোগজনিত মৃত্যুর হার তুলনামূলকভাবে কম শুধু তাই নয় লাল লঙ্কা রক্তে প্লেটলেট জমাট বাঁধা রোধ করতে সাহায্য করে যার ফলে রক্ত জমে গিয়ে ধমনি ব্লক হওয়ার সম্ভাবনাও হ্রাস পায় ।

লাল লঙ্কা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে অনেকেই জানেন না যে কাঁচা লাল লঙ্কায় কমলালেবুর তুলনায় বেশি ভিটামিন সি থাকতে পারে ভিটামিন সি শরীরের ইমিউন সিস্টেম শক্তিশালী করে সর্দি কাশি ভাইরাল সংক্রমণ থেকে দ্রুত সেরে উঠতে সাহায্য করে এছাড়াও এটি শরীরের কোষকে ক্ষয় থেকে রক্ষা করে ।

লাল লঙ্কায় থাকা ভিটামিন এ চোখের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী এটি চোখের শুষ্কতা কমায় রাতকানা রোগ প্রতিরোধে সাহায্য করে ত্বককে উজ্জ্বল ও সুস্থ রাখতেও ভিটামিন এ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয় এছাড়াও লাল লঙ্কায় আয়রন রয়েছে যা রক্তস্বল্পতা দূর করতে সহায়ক এবং ফাইবার রয়েছে যা হজম প্রক্রিয়াকে উন্নত করে ।

হজমের ক্ষেত্রে লাল লঙ্কার ভূমিকা নিয়ে সবচেয়ে বেশি ভুল ধারণা রয়েছে অনেকেই মনে করেন ঝাল মানেই হজমের শত্রু কিন্তু বাস্তবে সঠিক পরিমাণে লাল লঙ্কা হজম শক্তি বাড়াতে সাহায্য করে ক্যাপসাইসিন লালারস ও পাচকরস নিঃসরণ বাড়ায় ফলে খাবার দ্রুত ও ভালোভাবে হজম হয় অন্ত্রের গতিশীলতা বাড়ে এবং কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা কমে ।

ওজন নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রেও লাল লঙ্কা একটি কার্যকর উপাদান ক্যাপসাইসিন শরীরের মেটাবলিজম বাড়াতে সাহায্য করে যার ফলে ক্যালোরি দ্রুত বার্ন হয় এটি ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে এবং অতিরিক্ত খাওয়ার প্রবণতা কমায় অনেক গবেষণায় দেখা গেছে নিয়মিত অল্প পরিমাণ লাল লঙ্কা গ্রহণ করলে শরীরের ফ্যাট জমার প্রবণতা কমে ।

লাল লঙ্কা মানসিক স্বাস্থ্যের উপরও ইতিবাচক প্রভাব ফেলে ঝাল খাবার খেলে শরীরে এন্ডরফিন নামক হ্যাপি হরমোন নিঃসৃত হয় যা মানসিক চাপ উদ্বেগ এবং হতাশা কমাতে সাহায্য করে এজন্য অনেকেই ঝাল খাবার খাওয়ার পর এক ধরনের তৃপ্তি ও আনন্দ অনুভব করেন

ত্বকের ক্ষেত্রেও লাল লঙ্কার উপকারিতা রয়েছে এতে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ত্বকের বার্ধক্য ধীর করে ফাইন লাইন ও বলিরেখা কমাতে সাহায্য করে রক্ত সঞ্চালন ভালো হওয়ার ফলে ত্বক উজ্জ্বল ও প্রাণবন্ত দেখায় ।

তবে এত উপকারিতার মাঝেও একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা রয়েছে লাল লঙ্কা সবার জন্য উপযুক্ত নয় যাদের দীর্ঘদিনের অ্যাসিডিটি আলসার গ্যাস্ট্রিক জ্বালাপোড়া ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম বা গুরুতর হজম সমস্যা রয়েছে তাদের ক্ষেত্রে লাল লঙ্কা সমস্যার কারণ হতে পারে অতিরিক্ত লাল লঙ্কা খেলে বুক জ্বালা পেটে ব্যথা ডায়রিয়া বমি এমনকি অর্শ রোগের সমস্যা বাড়তে পারে ।

news image
আরও খবর

এই কারণে পুষ্টিবিদরা সবসময় পরিমিত পরিমাণে লাল লঙ্কা খাওয়ার পরামর্শ দেন নিজের শরীরের সিগন্যাল বোঝা অত্যন্ত জরুরি যদি লাল লঙ্কা খাওয়ার পর অস্বস্তি হয় তাহলে অবশ্যই তা কমানো বা এড়িয়ে চলা উচিত ।

সঠিকভাবে লাল লঙ্কা গ্রহণের জন্য কিছু বিষয় মনে রাখা দরকার রান্নায় খুব বেশি তেল ও অতিরিক্ত মশলার সঙ্গে লাল লঙ্কা ব্যবহার না করাই ভালো কাঁচা লাল লঙ্কা বা সামান্য শুকনো লাল লঙ্কা খাবারে যোগ করলে তার পুষ্টিগুণ বেশি পাওয়া যায় খালি পেটে ঝাল খাওয়ার অভ্যাস এড়িয়ে চলা উচিত ।

সব মিলিয়ে বলা যায় লাল লঙ্কা কোনো শত্রু নয় বরং সঠিক মাত্রায় এটি শরীরের এক শক্তিশালী বন্ধু হৃদযন্ত্র থেকে শুরু করে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হজম ও ওজন নিয়ন্ত্রণ সর্বত্রই এর ইতিবাচক ভূমিকা রয়েছে অন্ধভাবে প্রচলিত ধারণা মেনে না নিয়ে বিজ্ঞানসম্মত দৃষ্টিভঙ্গিতে খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলাই সুস্থ জীবনের মূল চাবিকাঠি ।

লাল লঙ্কা নিয়ে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব যা ধীরে ধীরে শরীরের ভেতরে ইতিবাচক পরিবর্তন আনে নিয়মিত অল্প পরিমাণে লাল লঙ্কা খাওয়ার অভ্যাস শরীরকে ঝাল সহনশীল করে তোলে ফলে হঠাৎ গ্যাস্ট্রিক বা অস্বস্তির সম্ভাবনাও কমে যায় অনেক পুষ্টিবিদ মনে করেন এটি এক ধরনের প্রাকৃতিক ট্রেনিংয়ের মতো কাজ করে যেখানে শরীর নিজেই তার পাচনতন্ত্রকে শক্তিশালী করে নেয় ।

গ্রামবাংলার খাদ্যসংস্কৃতিতে লাল লঙ্কার ব্যবহার বহু পুরনো ভাত ডাল তরকারি মাছ মাংস প্রায় সব রান্নাতেই অল্প হলেও লাল লঙ্কার উপস্থিতি দেখা যায় প্রাচীনকাল থেকেই মানুষ অভিজ্ঞতার মাধ্যমে বুঝে নিয়েছিল যে লাল লঙ্কা শুধু স্বাদ বাড়ায় না বরং শরীর গরম রাখতে সংক্রমণ থেকে বাঁচাতে এবং পরিশ্রমের পর শক্তি ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করে আধুনিক বিজ্ঞান আজ সেই প্রাচীন জ্ঞানকেই নতুন করে প্রমাণ করছে ।

লাল লঙ্কা শরীরের রক্ত সঞ্চালন ভালো করার কারণে ঠান্ডা হাত পা সমস্যা কমাতে সাহায্য করে যাঁরা সবসময় ঠান্ডা অনুভব করেন বা রক্ত চলাচল কম থাকার কারণে অবসন্নতা অনুভব করেন তাঁদের ক্ষেত্রে অল্প লাল লঙ্কা উপকারী হতে পারে এটি শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে এবং ক্লান্তি দূর করে ।

অনেক গবেষণায় দেখা গেছে লাল লঙ্কা ইনসুলিন সংবেদনশীলতা উন্নত করতে সাহায্য করে ফলে টাইপ টু ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমতে পারে অবশ্য ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে খাবারে লাল লঙ্কা যোগ করা উচিত তবুও পরিমিত ঝাল রক্তে শর্করার হঠাৎ ওঠানামা নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে ।

লাল লঙ্কা শরীরের ডিটক্স প্রক্রিয়াতেও সাহায্য করে এটি ঘাম বাড়িয়ে শরীর থেকে ক্ষতিকর টক্সিন বের করে দিতে সহায়তা করে ঘামের মাধ্যমে শরীর পরিষ্কার হওয়া একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া আর লাল লঙ্কা সেই প্রক্রিয়াকে সক্রিয় করে তোলে এর ফলে ত্বক পরিষ্কার হয় এবং শরীর হালকা অনুভব করে ।

মানসিক দিক থেকেও লাল লঙ্কার ভূমিকা অবহেলার নয় ঝাল খাবার খাওয়ার সময় যে সামান্য জ্বালাভাব হয় তা শরীরকে সতর্ক করে এবং মস্তিষ্কে এক ধরনের উদ্দীপনা তৈরি করে এই উদ্দীপনা কাজের প্রতি মনোযোগ বাড়াতে সাহায্য করে তাই অনেকেই বলেন ঝাল খাবার খেলে অলসতা কমে এবং কাজের গতি বাড়ে ।

তবে মনে রাখতে হবে লাল লঙ্কা কোনো ম্যাজিক নয় এটি একটি খাদ্য উপাদান যার উপকারিতা নির্ভর করে জীবনযাত্রার সামগ্রিক অভ্যাসের উপর সুষম খাদ্য পর্যাপ্ত জল ঘুম ও নিয়মিত শরীরচর্চার সঙ্গে মিললেই লাল লঙ্কা তার সর্বোচ্চ উপকার দিতে পারে ।

সবশেষে বলা যায় ভয় নয় সচেতনতার সঙ্গে লাল লঙ্কাকে গ্রহণ করাই বুদ্ধিমানের কাজ শরীরের প্রয়োজন বুঝে পরিমাণ ঠিক করলে এই সাধারণ মশলাই হয়ে উঠতে পারে সুস্থ জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ সহচর ।

Preview image