বীরভূমের খয়রাশোল ব্লকের পাথরকুচি গ্রাম পরিচিত কাঁসা-পিতলের বাসন তৈরির ঐতিহ্যের জন্য। গ্রামের এক চিলতে গলিতে পাশাপাশি সাত দুর্গাপুজো আজও বহন করে চলেছে প্রাচীন ইতিহাস, ঐতিহ্য ও বাঙালির শারদোৎসবের আবেগ।
বীরভূমের খয়রাশোল ব্লকের পাথরকুচি গ্রাম। কাঁসা-পিতলের বাসন তৈরির ঠুকঠাক আওয়াজের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরেই জড়িয়ে রয়েছে এই গ্রামের পরিচিতি। এখানকার মানুষের জীবনযাত্রা, পেশা এবং স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে ধাতুর কাজের এক নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু এই গ্রামের পরিচয় শুধু কাঁসা-পিতলের বাসন তৈরির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। দুর্গাপুজোর মরশুমে পাথরকুচির কর্মকার পাড়ায় পা রাখলে সামনে আসে এমন এক দৃশ্য, যা সহজেই নজর কাড়ে দর্শনার্থীদের। মাত্র একশো মিটারের একটি সঙ্কীর্ণ গলির মধ্যে পাশাপাশি মাথা তুলে দাঁড়িয়ে রয়েছে সাতটি দুর্গাদালান। এক জায়গায় পরপর সাতটি দুর্গাদালানের এই উপস্থিতি পাথরকুচি গ্রামকে দিয়েছে এক বিশেষ পরিচিতি।
দুর্গাপুজো বাঙালির কাছে শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়। এই উৎসবের সঙ্গে মিশে রয়েছে পারিবারিক স্মৃতি, সামাজিক বন্ধন, শিল্পকলা, লোকসংস্কৃতি এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বয়ে চলা নানা ঐতিহ্য। শহরের বড় বাজেটের পুজো থেকে শুরু করে গ্রামের ছোট্ট উঠোনের পুজো—প্রতিটি আয়োজনের পিছনেই থাকে মানুষের আবেগ ও বিশ্বাসের গল্প। বীরভূমের পাথরকুচির কর্মকার পাড়ার সাত দুর্গাদালান সেই গ্রামবাংলার ঐতিহ্যেরই এক উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।
বীরভূম জেলার খয়রাশোল ব্লকের অন্তর্গত পাথরকুচি গ্রাম মূলত কাঁসা-পিতলের বাসন তৈরির কাজের জন্য পরিচিত। ধাতুর উপর হাতুড়ির আঘাত, বাসন তৈরির শব্দ এবং কারিগরদের পরিশ্রম এই এলাকার দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে মিশে রয়েছে। কাঁসা-পিতলের বাসন বাংলার গৃহস্থালির সংস্কৃতিতে বহুদিন ধরেই গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করে আছে। পুজো-পার্বণ, পারিবারিক অনুষ্ঠান কিংবা দৈনন্দিন ব্যবহারে এই ধরনের বাসনের ঐতিহ্য আজও মানুষের মনে বিশেষ স্থান ধরে রেখেছে।
পাথরকুচির পরিচিতিও সেই ঐতিহ্যবাহী শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। তবে কোনও গ্রামের পরিচয় শুধু তার পেশাকে ঘিরে তৈরি হয় না। সেই গ্রামের উৎসব, সামাজিক সম্পর্ক, ধর্মীয় আচার এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডও তার স্বতন্ত্র পরিচয় গড়ে তোলে। পাথরকুচির ক্ষেত্রে দুর্গাপুজো সেই পরিচয়ের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।
বছরের অন্যান্য সময়ে গ্রামের যে গলিতে মানুষের স্বাভাবিক যাতায়াত, দুর্গাপুজোর মরশুমে সেই গলিই হয়ে ওঠে বিশেষ আকর্ষণের কেন্দ্র। সরু পথের দু’পাশে পাশাপাশি থাকা সাতটি দুর্গাদালান যেন একই সঙ্গে বহন করে চলেছে গ্রামের ধর্মীয় ঐতিহ্য এবং সামাজিক ইতিহাসের স্মৃতি।
পাথরকুচির কর্মকার পাড়ার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হল, মাত্র একশো মিটারের একটি সঙ্কীর্ণ গলিতে পাশাপাশি রয়েছে সাতটি দুর্গাদালান। সাধারণত দুর্গাপুজোর কথা উঠলে মানুষের মনে ভেসে ওঠে বড় মণ্ডপ, আলোকসজ্জা, প্রতিমা, ঢাকের বাদ্যি এবং দর্শনার্থীদের ভিড়। কিন্তু পাথরকুচির আকর্ষণ অন্য জায়গায়। এখানে একই গলিতে পরপর সাতটি দুর্গাদালানের উপস্থিতি তৈরি করেছে এক বিরল পরিবেশ।
একটি ছোট্ট এলাকার মধ্যে এতগুলি দুর্গাদালান পাশাপাশি থাকার বিষয়টি স্বাভাবিকভাবেই কৌতূহল তৈরি করে। একটি গলি দিয়ে হাঁটতে হাঁটতেই একের পর এক পুজোর আয়োজন চোখে পড়া দর্শনার্থীদের কাছে এক বিশেষ অভিজ্ঞতা হয়ে উঠতে পারে। প্রতিটি দুর্গাদালানের নিজস্ব পরিচয়, পারিবারিক বা সামাজিক স্মৃতি এবং পুজোকে ঘিরে মানুষের আবেগ এই এলাকার সামগ্রিক আকর্ষণকে আরও বাড়িয়ে তোলে।
পাথরকুচির সাত দুর্গাদালান শুধু স্থাপত্যগত উপস্থিতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়। এগুলি একসঙ্গে একটি এলাকার উৎসবকেন্দ্রিক জীবনযাত্রার ছবিও তুলে ধরে। দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে কীভাবে একটি পাড়ার পরিচিতি গড়ে উঠতে পারে, তার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ এই কর্মকার পাড়া।
বাংলার বহু প্রাচীন দুর্গাপুজোর ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে জমিদারবাড়ি, রাজপরিবার কিংবা বিত্তশালী পরিবারের নাম। অতীতে বহু জায়গায় পারিবারিক দুর্গাপুজো ছিল সামাজিক মর্যাদা ও ঐতিহ্যের প্রতীক। বড় বাড়ির দুর্গাদালানকে কেন্দ্র করে একত্রিত হতেন আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী এবং এলাকার মানুষ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই পুজোগুলির অনেকগুলি স্থানীয় ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
কিন্তু পাথরকুচির সাত দুর্গাদালানের বিশেষত্ব হল, এই আয়োজনের পরিচয় কোনও রাজা বা জমিদারের অহংকারকে ঘিরে নয়। সাধারণ মানুষের হাত ধরে গড়ে ওঠা এই পুজোর পরিসরই এলাকার স্বাতন্ত্র্যকে সামনে নিয়ে আসে। গ্রামের মানুষ, তাঁদের বিশ্বাস এবং দুর্গাপুজোকে ঘিরে তৈরি হওয়া সামাজিক সম্পর্ক—এই সবকিছু মিলেই পাথরকুচির কর্মকার পাড়ার পরিচয়।
সাধারণ মানুষের উদ্যোগে কোনও উৎসব দীর্ঘদিন ধরে টিকে থাকা সহজ কাজ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে আয়োজন, প্রস্তুতি, সময়, শ্রম এবং মানুষের পারস্পরিক সহযোগিতা। পুজোকে ঘিরে বহু মানুষের অংশগ্রহণ একটি সামাজিক বন্ধন তৈরি করতে পারে। সেই বন্ধনের মাধ্যমেই একটি উৎসব এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মের কাছে পৌঁছে যায়।
পাথরকুচির সাত দুর্গাদালানের কথা তাই শুধু সাতটি পুজোর গল্প নয়। এটি গ্রামবাংলার মানুষের নিজস্ব উদ্যোগে ঐতিহ্য ধরে রাখার একটি ছবিও বটে।
দুর্গাপুজোর সময় বাঙালির গ্রামগুলিতে বদলে যায় পরিবেশ। বাড়িঘর পরিষ্কার করা, পুজোর প্রস্তুতি, নতুন পোশাক, আত্মীয়দের আগমন এবং প্রতিমা দর্শনের পরিকল্পনা—সব মিলিয়ে তৈরি হয় উৎসবের আবহ। শহরের মতো গ্রামেও দুর্গাপুজো মানুষের দৈনন্দিন জীবনে এক বিশেষ পরিবর্তন নিয়ে আসে।
পাথরকুচির কর্মকার পাড়াতেও দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে তৈরি হয় এক আলাদা আবেশ। সঙ্কীর্ণ গলিতে পাশাপাশি থাকা সাতটি দুর্গাদালান এই উৎসবকে আরও স্বতন্ত্র করে তুলেছে। একটি পাড়ার মধ্যে এতগুলি পুজোর উপস্থিতি দর্শনার্থীদের কাছে যেমন আকর্ষণীয়, তেমনই স্থানীয় মানুষের কাছেও তা নিজস্ব পরিচয় ও ঐতিহ্যের অংশ।
গ্রামের পুজো মানেই শুধু প্রতিমা দর্শন নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে মানুষের পরিচিত মুখ, প্রতিবেশীদের সঙ্গে দেখা হওয়া, পুরনো স্মৃতি ফিরে দেখা এবং পরিবারের ছোট-বড় সদস্যদের একত্রিত হওয়ার সুযোগ। অনেক সময় এই উৎসবের মধ্য দিয়েই নতুন প্রজন্ম নিজেদের এলাকার ইতিহাস ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হয়।
পাথরকুচির কর্মকার পাড়ার সাত দুর্গাদালানও সেই বৃহত্তর গ্রামীণ সংস্কৃতির অংশ হিসেবে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
বাংলার দুর্গাপুজোর ইতিহাসে বনেদি বাড়ির পুজোর একটি উল্লেখযোগ্য জায়গা রয়েছে। বহু পরিবারে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে দুর্গার আরাধনা চলে আসছে। কোথাও রয়েছে প্রাচীন দুর্গাদালান, কোথাও পারিবারিক আচার, আবার কোথাও পুজোর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে স্থানীয় লোককথা ও স্মৃতি। এই পুজোগুলির গুরুত্ব কেবল ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে সীমাবদ্ধ নয়; এগুলি একটি এলাকার সাংস্কৃতিক পরিচয়ের ধারকও।
তবে ঐতিহ্য মানেই সবসময় রাজবাড়ি বা জমিদারবাড়ি নয়। সাধারণ মানুষের উদ্যোগে তৈরি হওয়া পুজোও স্থানীয় ইতিহাসের অংশ হয়ে উঠতে পারে। কোনও পাড়ার মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টা, বহু বছরের অভ্যাস এবং উৎসবকে ঘিরে গড়ে ওঠা সম্পর্ক একটি পুজোকে বিশেষ মর্যাদা দেয়।
পাথরকুচির সাত দুর্গাদালান এই দৃষ্টিকোণ থেকে আকর্ষণীয়। এখানে একই সঙ্কীর্ণ গলিতে সাতটি দুর্গাদালানের উপস্থিতি একটি স্বতন্ত্র দৃশ্য তৈরি করেছে। এই দৃশ্যের মধ্যে যেমন রয়েছে ধর্মীয় উৎসবের আবেদন, তেমনই রয়েছে স্থানীয় মানুষের উদ্যোগের পরিচয়।
গ্রামবাংলার এমন বহু পুজো স্থানীয় পরিসরে পরিচিত হলেও বৃহত্তর মানুষের কাছে সেগুলির সব কাহিনি সমানভাবে পৌঁছয় না। তাই পাথরকুচির মতো জায়গার পুজো নিয়ে আলোচনা হলে বাংলার দুর্গাপুজোর বৈচিত্র্য সম্পর্কে নতুন করে জানার সুযোগ তৈরি হয়।
দুর্গাপুজোর সময় মানুষ নতুন নতুন পুজো দেখতে ভালোবাসেন। কোথাও প্রতিমার বিশেষত্ব, কোথাও মণ্ডপের নকশা, কোথাও আবার বহু বছরের ঐতিহ্য দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করে। পাথরকুচির কর্মকার পাড়ার সাত দুর্গাদালানের আকর্ষণ হল একই জায়গায় পাশাপাশি থাকা সাতটি পুজোর উপস্থিতি।
একশো মিটারের একটি সরু গলির মধ্যে পরপর সাতটি দুর্গাদালান—এই তথ্যই জায়গাটিকে স্বতন্ত্র করে তোলে। সাধারণত একটি পুজো দেখতে গেলে দর্শনার্থীদের এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় যেতে হয়। কিন্তু এখানে একটি ছোট্ট গলির মধ্যেই একাধিক দুর্গাদালান দেখতে পাওয়ার বিষয়টি আলাদা আগ্রহ তৈরি করে।
এ ধরনের স্থান দর্শনার্থীদের কাছে কেবল পুজো দেখার জায়গা নয়, স্থানীয় ঐতিহ্য জানার সুযোগও তৈরি করতে পারে। একটি গ্রামের জীবনযাত্রা, মানুষের পেশা এবং উৎসবের মধ্যে কীভাবে সম্পর্ক গড়ে উঠেছে, তা বোঝার ক্ষেত্রেও এই ধরনের অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ।
তবে সাতটি দুর্গাদালানের প্রতিটির ইতিহাস, প্রতিষ্ঠাকাল এবং পুজোর বিশেষ আচার সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানতে স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছ থেকে নির্ভরযোগ্য বিবরণ সংগ্রহ করা প্রয়োজন। তাতে পাথরকুচির এই অনন্য ঐতিহ্যের সম্পূর্ণ ছবি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে।
দুর্গাপুজোকে ঘিরে বাংলার সমাজে তৈরি হয় এক বিশেষ মিলনক্ষেত্র। একই এলাকার মানুষ উৎসবের প্রস্তুতি থেকে শুরু করে পুজোর দিনগুলির নানা কর্মকাণ্ডে অংশ নেন। অনেকের কাছে পুজো হল পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ, আবার অনেকের কাছে এটি প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্ক আরও দৃঢ় করার উপলক্ষ।
গ্রামের ক্ষেত্রে এই সামাজিক বন্ধনের গুরুত্ব আরও বেশি করে অনুভূত হতে পারে। কারণ, একই এলাকার মানুষের সঙ্গে দৈনন্দিন জীবনের সম্পর্ক অনেক সময় দীর্ঘদিনের। উৎসব সেই সম্পর্ককে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে।
পাথরকুচির কর্মকার পাড়ার সাতটি দুর্গাদালানকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া উৎসবের পরিবেশও এই সামাজিক গুরুত্বের কথা মনে করিয়ে দেয়। একই গলিতে পাশাপাশি একাধিক পুজোর উপস্থিতি এলাকার সামগ্রিক পরিচয়কে আরও স্পষ্ট করে। এটি দেখায়, একটি পাড়ার ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয় গড়ে উঠতে পারে বহু মানুষের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে।
উৎসবের এমন পরিবেশ নতুন প্রজন্মকে নিজেদের শিকড় সম্পর্কে জানতে সাহায্য করে। বড়দের মুখে পুরনো দিনের গল্প শোনা, পুজোর রীতিনীতি সম্পর্কে জানা এবং এলাকার বিশেষত্ব উপলব্ধি করার মধ্য দিয়ে ঐতিহ্য এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে পৌঁছে যায়।
কোনও প্রাচীন পুজোকে দীর্ঘদিন ধরে বাঁচিয়ে রাখতে হলে শুধু প্রতিমা তৈরি বা পুজোর আয়োজন করলেই চলে না। প্রয়োজন ইতিহাস সম্পর্কে সচেতনতা, স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ এবং পরবর্তী প্রজন্মের কাছে ঐতিহ্যের গুরুত্ব তুলে ধরা। বিশেষ করে যে সব পুজো একটি এলাকার স্বতন্ত্র পরিচয় বহন করে, সেগুলির ইতিহাস নথিবদ্ধ করা গুরুত্বপূর্ণ।
পাথরকুচির সাত দুর্গাদালান নিয়ে স্থানীয়ভাবে তথ্য সংগ্রহ করা হলে এই পুজোগুলির অতীত সম্পর্কে আরও জানা সম্ভব। প্রতিটি দুর্গাদালান কবে তৈরি হয়েছিল, কীভাবে পুজোর সূচনা হয়েছিল, কোন কোন পারিবারিক বা সামাজিক রীতি এখনও প্রচলিত রয়েছে—এ ধরনের তথ্য সংরক্ষিত থাকলে ভবিষ্যতের গবেষক ও দর্শনার্থীরাও উপকৃত হবেন।
স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দাদের স্মৃতিচারণ, পুরনো ছবি, পারিবারিক নথি এবং পুজো পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের বক্তব্য এই ইতিহাস নির্মাণে সহায়ক হতে পারে। একই সঙ্গে বর্তমান প্রজন্মের অংশগ্রহণও জরুরি, যাতে ঐতিহ্য শুধু অতীতের স্মৃতিতে আটকে না থেকে বর্তমান জীবনেও সক্রিয় থাকে।
পাথরকুচির মতো গ্রামের ক্ষেত্রে এই কাজের গুরুত্ব আরও বেশি। কারণ, এখানকার পরিচয় একদিকে ঐতিহ্যবাহী কাঁসা-পিতলের শিল্পের সঙ্গে যুক্ত, অন্যদিকে সাতটি দুর্গাদালানের বিরল উপস্থিতির সঙ্গেও সম্পর্কিত। এই দুই পরিচয়কে পাশাপাশি তুলে ধরলে গ্রামের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য আরও ভালোভাবে বোঝা যাবে।
কলকাতার বড় বাজেটের পুজো, থিম মণ্ডপ এবং আলোকসজ্জা প্রতি বছর সংবাদমাধ্যমের শিরোনামে উঠে আসে। কিন্তু বাংলার দুর্গাপুজোর জগৎ আরও অনেক বিস্তৃত। প্রত্যন্ত গ্রাম, ছোট পাড়া, প্রাচীন বাড়ি এবং স্থানীয় মানুষের উদ্যোগে গড়ে ওঠা পুজোগুলিও এই উৎসবের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
কোনও পুজো তার প্রাচীন রীতির জন্য পরিচিত, কোনওটি পারিবারিক ঐতিহ্যের জন্য, আবার কোনওটি বিশেষ ভৌগোলিক অবস্থান বা একসঙ্গে অনেকগুলি পুজোর উপস্থিতির জন্য মানুষের নজর কাড়ে। পাথরকুচির সাত দুর্গাদালান এই বৈচিত্র্যেরই একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত।
এখানে সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হল একটি ছোট্ট গলির মধ্যে পাশাপাশি সাতটি দুর্গাদালানের উপস্থিতি। এই দৃশ্য মনে করিয়ে দেয়, দুর্গাপুজোর সৌন্দর্য শুধু বড় আয়োজন বা জাঁকজমকের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। স্থানীয় মানুষের উদ্যোগ, তাঁদের বিশ্বাস এবং একটি জায়গার নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচয়ও কোনও পুজোকে বিশেষ করে তুলতে পারে।
গ্রামবাংলার এমন পুজোগুলিকে সামনে আনা হলে পর্যটন ও স্থানীয় সংস্কৃতি সম্পর্কে মানুষের আগ্রহও বাড়তে পারে। তবে সেই সঙ্গে প্রয়োজন স্থানীয় ঐতিহ্যের প্রতি সম্মান, পরিবেশের পরিচ্ছন্নতা এবং দর্শনার্থীদের দায়িত্বশীল আচরণ।
কাঁসা-পিতলের বাসনের ঠুকঠাক শব্দ পাথরকুচি গ্রামের পরিচিতির একটি বড় অংশ। কিন্তু দুর্গাপুজোর সময় কর্মকার পাড়ার সাত দুর্গাদালান এই গ্রামের পরিচয়ে নতুন মাত্রা যোগ করে। শিল্প ও উৎসব—দুইয়ের উপস্থিতি একটি গ্রামকে কীভাবে আলাদা করে তুলতে পারে, পাথরকুচি তার একটি সুন্দর উদাহরণ।
একদিকে রয়েছে পরিশ্রমী কারিগরদের ঐতিহ্যবাহী পেশা, অন্যদিকে রয়েছে দুর্গাপুজোকে ঘিরে মানুষের আবেগ ও সামাজিক বন্ধন। এই দুইয়ের মধ্যে দিয়ে গ্রামটির সাংস্কৃতিক পরিচয় আরও সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে।
পাথরকুচির এই বিশেষত্ব সম্পর্কে জানতে আগ্রহী মানুষদের কাছে কর্মকার পাড়া একটি আকর্ষণীয় গন্তব্য হয়ে উঠতে পারে। তবে সেখানে গেলে স্থানীয় মানুষের দৈনন্দিন জীবন, কারিগরদের কাজ এবং পুজোর আয়োজনের প্রতি সম্মান দেখানো জরুরি। সরু গলিতে ভিড় হলে চলাচলে অসুবিধা হতে পারে, তাই দর্শনার্থীদের সচেতন থাকা প্রয়োজন।
বীরভূমের খয়রাশোল ব্লকের পাথরকুচি গ্রামের কর্মকার পাড়ার সাত দুর্গাদালান শুধু একটি বিরল দৃশ্য নয়; এটি গ্রামবাংলার ঐতিহ্য, মানুষের উদ্যোগ এবং উৎসবকেন্দ্রিক সামাজিক জীবনের কথাও মনে করিয়ে দেয়। মাত্র একশো মিটারের একটি সঙ্কীর্ণ গলিতে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকা সাতটি দুর্গাদালান সহজেই যে কারও কৌতূহল জাগাতে পারে।
রাজা-জমিদারদের পৃষ্ঠপোষকতার বাইরে সাধারণ মানুষের হাত ধরে গড়ে ওঠা এই আয়োজন বাংলার দুর্গাপুজোর বহুমাত্রিক চরিত্রকে তুলে ধরে। এখানে গুরুত্ব পায় মানুষের অংশগ্রহণ, এলাকার নিজস্ব পরিচয় এবং উৎসবকে ঘিরে তৈরি হওয়া আবেগ।
দুর্গাপুজো বাঙালির কাছে আনন্দের উৎসব। কিন্তু পাথরকুচির মতো জায়গার পুজো দেখিয়ে দেয়, এই উৎসব একই সঙ্গে ইতিহাস, লোকসংস্কৃতি এবং স্থানীয় ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখার মাধ্যমও হতে পারে। তাই বীরভূমের পাথরকুচির সাত দুর্গাদালানের কথা উঠলে কেবল একটি গলির কথা মনে পড়ে না—মনে পড়ে গ্রামবাংলার মানুষের নিজস্ব উদ্যোগে গড়ে ওঠা এক স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক পরিচয়ের কথা।
কাঁসা-পিতলের বাসনের জন্য পরিচিত পাথরকুচি দুর্গাপুজোর মরশুমে তার এই অন্য পরিচয়েই বিশেষভাবে নজর কাড়ে। একশো মিটারের সরু গলিতে পাশাপাশি সাত দুর্গাদালানের এই দৃশ্য বাংলার পুজোর বৈচিত্র্যের মধ্যে এক অনন্য সংযোজন।