Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

একযুগ পর গেইলের রেকর্ড ভাঙলেন রাজস্থান তারকা, টি-২০তে গড়লেন সর্বোচ্চ রানের নতুন নজির

ক্রিস গেইলের সেই ১৭৫ রানের বিধ্বংসী ইনিংসের ১৩ বছর পর টি-২০ ক্রিকেটে ভাঙল তাঁর দীর্ঘদিনের রেকর্ড।

টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে এক যুগেরও বেশি সময় ধরে অক্ষত থাকা ক্রিস গেইলের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত রানের রেকর্ড অবশেষে ভেঙে গেল। ২০১৩ সালে আইপিএলে রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরুর হয়ে ৬৬ বলে অপরাজিত ১৭৫ রানের যে ঐতিহাসিক ইনিংস খেলেছিলেন ‘ইউনিভার্স বস’, দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে সেটিই ছিল পুরুষদের টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত রানের নজির। এবার দক্ষিণ আফ্রিকার ঘরোয়া ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটে সেই রেকর্ড পেরিয়ে গেলেন মাত্র ২০ বছর বয়সি লুয়ান-ড্রে প্রেটোরিয়াস।

দক্ষিণ আফ্রিকার ঘরোয়া ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে টাইটান্স ও নাইটসের ম্যাচে ব্যাট হাতে কার্যত ঝড় তোলেন প্রেটোরিয়াস। টসের পর প্রথমে ব্যাট করতে নেমে টাইটান্সের ইনিংসের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হয়ে ওঠেন এই তরুণ ওপেনার। দলের মোট ২৬৭ রানের মধ্যে একাই করেন ১৮৮ রান। মাত্র ৭৯ বলের এই ইনিংস সাজানো ছিল ১৫টি চার এবং ১৩টি বিশাল ছক্কায়। তাঁর ব্যাটিংয়ের আক্রমণাত্মক ধরন এবং অবিশ্বাস্য স্ট্রাইক রেট ম্যাচের শুরু থেকেই নজর কাড়ে।

প্রেটোরিয়াসের স্ট্রাইক রেট ছিল প্রায় ২৩৮। অর্থাৎ প্রায় প্রতি চার বলে পাঁচ রানের কাছাকাছি করে রান তুলেছেন তিনি। শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ব্যাটিং করলেও ইনিংসের গতি সময়ের সঙ্গে আরও বেড়েছে। মাত্র ২৪ বলে অর্ধশতরান পূর্ণ করেন দক্ষিণ আফ্রিকার এই তরুণ ব্যাটার। এরপর মাত্র আরও ১৬ বল খেলে তিন অঙ্কের রানে পৌঁছে যান তিনি। অর্থাৎ মাত্র ৪০ বলেই শতরান পূর্ণ করে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে নিজের বিধ্বংসী ব্যাটিংয়ের পরিচয় দেন প্রেটোরিয়াস।

শতরানের পরও থামেননি তিনি। আরও ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে তাঁর ব্যাট। মাত্র ৫৮ বলে ১৫০ রানের মাইলফলক স্পর্শ করেন। শেষ পর্যন্ত ৭৯ বলে ১৮৮ রানে অপরাজিত থেকে মাঠ ছাড়েন। তাঁর ইনিংসে ছিল ১৫টি চার এবং ১৩টি ছক্কা। অর্থাৎ বাউন্ডারি থেকেই আসে বিপুল সংখ্যক রান। এমন আগ্রাসী ব্যাটিংয়ের ফলেই টাইটান্সের স্কোর পৌঁছে যায় ২৬৭ রানে।

এই ইনিংসের সবচেয়ে বড় তাৎপর্য হল, এর মাধ্যমেই ভেঙে গেল ক্রিস গেইলের দীর্ঘদিনের রেকর্ড। ২০১৩ সালের আইপিএলে রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরুর হয়ে পুনে ওয়ারিয়র্সের বিরুদ্ধে মাত্র ৬৬ বলে ১৭৫ রান করেছিলেন গেইল। সেই ম্যাচে তাঁর ব্যাট থেকে এসেছিল ১৩টি চার এবং ১৭টি ছক্কা। গেইলের সেই ইনিংস টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের ইতিহাসে অন্যতম স্মরণীয় ব্যাটিং পারফরম্যান্স হিসেবে জায়গা করে নেয়।

দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে গেইলের ১৭৫ রানের রেকর্ড অক্ষত ছিল। বিশ্বের বিভিন্ন টি-টোয়েন্টি লিগে একের পর এক বিস্ফোরক ইনিংস দেখা গেলেও কেউ সেই স্কোর পেরোতে পারেননি। অবশেষে দক্ষিণ আফ্রিকার ঘরোয়া ক্রিকেটে ২০ বছরের লুয়ান-ড্রে প্রেটোরিয়াস সেই অসম্ভবকে সম্ভব করলেন। মাত্র ৭৯ বলে ১৮৮ রান করে তিনি গেইলের ১৭৫ রানকে পিছনে ফেলে দিলেন।

প্রেটোরিয়াসের এই ইনিংস আরও একটি কারণে বিশেষ। পুরুষদের টি-টোয়েন্টিতে দীর্ঘ ইনিংস খেলার তালিকাতেও নিজের জায়গা করে নিয়েছেন তিনি। ৭৯ বল খেলে ১৮৮ রান করার মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি বল খেলার নজিরের ক্ষেত্রেও তিনি অস্ট্রেলিয়ার অ্যারন ফিঞ্চ এবং মার্কাস স্টয়নিসের সঙ্গে যৌথভাবে শীর্ষে উঠে এসেছেন। ফলে একই ম্যাচে একাধিক রেকর্ডের সঙ্গে নিজের নাম জড়িয়ে ফেলেছেন এই তরুণ ব্যাটার।

লুয়ান-ড্রে প্রেটোরিয়াসের নাম ভারতীয় ক্রিকেটপ্রেমীদের কাছেও অপরিচিত নয়। আইপিএলে রাজস্থান রয়্যালসের হয়ে খেলেছেন তিনি। তবে আইপিএলের মঞ্চে এখনও পর্যন্ত নিজের প্রতিভার পুরোপুরি প্রকাশ ঘটানোর সুযোগ পাননি এই দক্ষিণ আফ্রিকান ব্যাটার। গত মরশুমে রাজস্থান রয়্যালসের হয়ে মাত্র দু’টি ম্যাচ খেলার সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি। তার মধ্যে ব্যাটিং করার সুযোগ পেয়েছিলেন একটি ম্যাচে।

লখনউয়ের বিরুদ্ধে সেই ম্যাচে ব্যাট হাতে মাত্র ৭ রান করেছিলেন প্রেটোরিয়াস। ফলে আইপিএলে তাঁর পরিসংখ্যান খুব একটা উজ্জ্বল না হলেও দক্ষিণ আফ্রিকার ঘরোয়া ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটে এবার এমন এক ইনিংস খেললেন, যা রাতারাতি তাঁকে ক্রিকেট বিশ্বের আলোচনায় নিয়ে এসেছে।

ক্রিস গেইলের রেকর্ড ভাঙার পর স্বাভাবিকভাবেই প্রেটোরিয়াসের এই ইনিংস নিয়ে ক্রিকেটমহলে চর্চা শুরু হয়েছে। গেইল নিজে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে আগ্রাসী ব্যাটিংয়ের অন্যতম প্রতীক। ১৭৫ রানের সেই ঐতিহাসিক ইনিংসের পর বহু বছর ধরে তাঁর নামই ছিল টি-টোয়েন্টিতে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত রানের সঙ্গে জড়িয়ে। সেই রেকর্ড যখন ভাঙল, তখনও সেটি হল একই ধরনের বিস্ফোরক ব্যাটিংয়ের মাধ্যমে।

news image
আরও খবর

তবে গেইলের ইনিংস এবং প্রেটোরিয়াসের ইনিংসের মধ্যে সময়ের ব্যবধানও যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। ২০১৩ সালে গেইল যখন ১৭৫ রান করেছিলেন, তখন টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে এত বেশি সংখ্যক ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ নিয়মিতভাবে আয়োজন করা হত না। বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে টি-টোয়েন্টি লিগের সংখ্যা এবং ম্যাচের পরিমাণ অনেক বেড়েছে। তার মধ্যেও এত বছর ধরে গেইলের রেকর্ড অক্ষত থাকা তাঁর ইনিংসের মাহাত্ম্য বোঝায়।

প্রেটোরিয়াসের ১৮৮ রানের ইনিংস সেই রেকর্ডেরই নতুন অধ্যায় তৈরি করল। মাত্র ২০ বছর বয়সে এমন একটি বিশ্বমানের রেকর্ড নিজের নামে করা তাঁর ভবিষ্যৎ ক্রিকেট কেরিয়ারের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রিকেটে একজন তরুণ ব্যাটার হিসেবে তাঁর প্রতি আগ্রহ আরও বাড়বে বলেই স্বাভাবিক।

টাইটান্সের ২৬৭ রানের ইনিংসের মূল ভিত তৈরি করেছিলেন প্রেটোরিয়াস। তাঁর ১৮৮ রান বাদ দিলে দলের বাকি ব্যাটারদের অবদান তুলনামূলকভাবে অনেক কম। ফলে দলের মোট রানের প্রায় ৭০ শতাংশের কাছাকাছি রান একাই করেছেন তিনি। টি-টোয়েন্টির মতো দ্রুতগতির ক্রিকেটে একটি দলের স্কোরে একজন ব্যাটারের এত বড় অবদান অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য।

এই ইনিংসের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হল তাঁর বাউন্ডারি মারার ক্ষমতা। ১৫টি চার ও ১৩টি ছক্কা মিলিয়ে মোট ২৮টি বাউন্ডারি মেরেছেন তিনি। অর্থাৎ ১৮৮ রানের বড় অংশই এসেছে বাউন্ডারি থেকে। পাওয়ার হিটিং, দ্রুত রান তোলা এবং বড় শট খেলার ক্ষেত্রে তাঁর দক্ষতা এই ম্যাচে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

মাত্র ২৪ বলে ৫০, ৪০ বলে ১০০ এবং ৫৮ বলে ১৫০—এই পরিসংখ্যানই বলে দেয়, ইনিংস যত এগিয়েছে প্রেটোরিয়াসের ব্যাটিং ততই ভয়ঙ্কর হয়েছে। বিশেষ করে ১৫০ থেকে ১৮৮ পর্যন্ত পৌঁছনোর সময়ও তাঁর রান করার গতি কমেনি। শেষ পর্যন্ত অপরাজিত থাকা আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অর্থাৎ শুধু দ্রুত রান করাই নয়, দীর্ঘ সময় ক্রিজে থেকে ইনিংসকে শেষ পর্যন্ত টেনে নিয়ে যাওয়ার ক্ষমতাও দেখিয়েছেন তিনি।

টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে রেকর্ড ভাঙার ইতিহাসে ক্রিস গেইলের নাম দীর্ঘদিন ধরে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ১৭৫ রানের সেই ইনিংসের আগে ও পরেও গেইল বহু বিস্ফোরক ইনিংস খেলেছেন। কিন্তু তাঁর ১৭৫ রান ছিল একটি বিশেষ মাইলফলক। এবার সেই মাইলফলক পেরিয়ে ১৮৮ রানে পৌঁছে নতুন মানদণ্ড তৈরি করলেন প্রেটোরিয়াস।

তবে এই রেকর্ডের পর তাঁর সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে ধারাবাহিকতা বজায় রাখা। একটি অসাধারণ ইনিংস একজন ক্রিকেটারকে আলোচনায় আনতে পারে, কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ও বড় ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে নিয়মিত সাফল্যই শেষ পর্যন্ত একজন খেলোয়াড়ের পরিচয় তৈরি করে। প্রেটোরিয়াস ইতিমধ্যেই ঘরোয়া ক্রিকেটে নিজের বিস্ফোরক ব্যাটিংয়ের প্রমাণ দিয়েছেন। এখন নজর থাকবে তিনি ভবিষ্যতে দক্ষিণ আফ্রিকার হয়ে এবং আইপিএলের মতো বড় মঞ্চে কীভাবে পারফর্ম করেন।

রাজস্থান রয়্যালসের হয়ে পাওয়া সীমিত সুযোগে সাফল্য না পেলেও এবার ১৮৮ রানের ইনিংস প্রেটোরিয়াসকে নতুন করে আলোচনায় এনে দিয়েছে। আইপিএলের মতো প্রতিযোগিতায় ভবিষ্যতে তাঁর দিকে ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলির নজর আরও বাড়তে পারে। তবে বর্তমানে সবচেয়ে বড় খবর হল, ২০ বছর বয়সেই তিনি টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের ইতিহাসে এমন একটি রেকর্ড গড়েছেন, যার সঙ্গে এতদিন শুধু ক্রিস গেইলের নামই জড়িয়ে ছিল।

এক যুগেরও বেশি সময় ধরে গেইলের ১৭৫ রান ছিল টি-টোয়েন্টির সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত স্কোর। সেই রেকর্ড এখন অতীত। দক্ষিণ আফ্রিকার তরুণ লুয়ান-ড্রে প্রেটোরিয়াস ৭৯ বলে ১৮৮ রান করে নতুন ইতিহাস লিখেছেন। ১৫টি চার, ১৩টি ছক্কা, ২৩৭-এর বেশি স্ট্রাইক রেট এবং একের পর এক দ্রুত মাইলফলক পেরিয়ে তাঁর এই ইনিংস ইতিমধ্যেই টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের স্মরণীয় পারফরম্যান্সগুলির মধ্যে জায়গা করে নিয়েছে। আগামী দিনে এই তরুণ ব্যাটারের কেরিয়ার কোন দিকে এগোয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

Preview image