প্রত্যাশার তুলনায় ভারতের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ভালো থাকায় চলতি অর্থবর্ষ ২০২৬-২৭-এর GDP বৃদ্ধির পূর্বাভাস বাড়াল বিশ্বব্যাংক। আগের ৬.৬ শতাংশ থেকে তা বাড়িয়ে ৭.১ শতাংশ করা হয়েছে। শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ চাহিদা, শিল্পোৎপাদন ও রফতানি বৃদ্ধিকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে
ভারতের অর্থনীতির জন্য বড় সুখবর। প্রত্যাশার তুলনায় দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ভালো থাকায় চলতি অর্থবর্ষ ২০২৬-২৭-এর জন্য ভারতের GDP বৃদ্ধির পূর্বাভাস বাড়িয়ে ৭.১ শতাংশ করল বিশ্বব্যাংক। এর আগে চলতি অর্থবর্ষে ভারতের অর্থনৈতিক বৃদ্ধির হার ৬.৬ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছিল আন্তর্জাতিক এই আর্থিক প্রতিষ্ঠান। অর্থাৎ আগের পূর্বাভাসের তুলনায় বৃদ্ধির সম্ভাবনা ০.৫ শতাংশীয় পয়েন্ট বাড়ানো হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের অক্টোবর ২০২৬-এর India Development Update-এ ভারতের অর্থনীতির এই নতুন পূর্বাভাস প্রকাশ করা হয়েছে। সংস্থার মতে, বিশ্ব অর্থনীতিতে নানা অনিশ্চয়তা, ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং জ্বালানির দামের ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও ভারতের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড প্রত্যাশার তুলনায় বেশি শক্তিশালী রয়েছে। বিশেষ করে দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা এবং রফতানির ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রবণতা অর্থনীতিকে গতি দিতে সাহায্য করছে।
চলতি বছরের এপ্রিল মাসে প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের India Development Update-এ FY27-এর জন্য ভারতের GDP বৃদ্ধির পূর্বাভাস ছিল ৬.৬ শতাংশ। সেই সময় মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, বাড়তে থাকা জ্বালানির দাম এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় সম্ভাব্য সমস্যাকে ভারতের অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল।
কিন্তু পরবর্তী সময়ে ভারতের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড প্রত্যাশার তুলনায় ভালো থাকায় সেই পূর্বাভাস সংশোধন করেছে বিশ্বব্যাংক। অক্টোবরের আপডেটে FY27-এর GDP বৃদ্ধির হার ৭.১ শতাংশ হতে পারে বলে জানানো হয়েছে।
এই সংশোধন ভারতের অর্থনীতির স্থিতিস্থাপকতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হিসেবেই দেখছে অর্থনৈতিক মহল। কারণ আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে নানা চাপ থাকা সত্ত্বেও দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক কার্যকলাপ পুরোপুরি থমকে যায়নি।
ভারতের অর্থনীতির অন্যতম বড় শক্তি হল দেশের বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজার। বিশ্বব্যাংকের নতুন পূর্বাভাসেও শক্তিশালী দেশীয় চাহিদাকে অর্থনৈতিক বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
মানুষের ভোগব্যয় বা private consumption অর্থনীতির গতি ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। গ্রামীণ ও শহুরে—দুই ক্ষেত্রেই চাহিদার পরিবর্তন অর্থনীতির বিভিন্ন অংশে প্রভাব ফেলছে। এর সঙ্গে বিনিয়োগ এবং সরকারি সহায়তাও বৃদ্ধির গতিকে সমর্থন করছে।
বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, ভারতের অর্থনীতির অভ্যন্তরীণ ভিত্তি এখনও যথেষ্ট শক্তিশালী। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে অনিশ্চয়তা বা ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হলেও তার প্রভাব সামাল দেওয়ার মতো কিছু অর্থনৈতিক সক্ষমতা ভারতের রয়েছে।
ভারতের শিল্পক্ষেত্রের পারফরম্যান্সও নতুন পূর্বাভাসের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। উৎপাদন, পরিকাঠামো এবং বিদ্যুৎ ক্ষেত্রের মতো বিভিন্ন শিল্পখাতে কার্যকলাপ শক্তিশালী রয়েছে বলে বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়নে উঠে এসেছে।
শিল্পোৎপাদন শক্তিশালী হলে তার প্রভাব শুধু GDP-তেই পড়ে না। কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ, পরিবহণ, পরিষেবা এবং ভোগব্যয়ের উপরও তার প্রভাব পড়ে। তাই শিল্পক্ষেত্রে ভালো পারফরম্যান্স সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করে।
ভারতের রফতানি ক্ষেত্রও বিশ্বব্যাংকের নতুন পূর্বাভাসে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বিভিন্ন অনিশ্চয়তা এবং বাণিজ্যনীতির পরিবর্তনের মধ্যেও ভারতের রফতানি প্রত্যাশার তুলনায় ভালো হয়েছে বলে বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়নে উল্লেখ করা হয়েছে।
রফতানি বাড়লে দেশের বৈদেশিক বাণিজ্য পরিস্থিতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। পাশাপাশি শিল্প ও পরিষেবা ক্ষেত্রেও তার সুফল পৌঁছতে পারে। ভারতের অর্থনৈতিক বৃদ্ধির ক্ষেত্রে তাই রফতানির এই শক্তিশালী প্রবণতাকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
বিশ্বব্যাংকের অক্টোবরের আপডেট অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে ভারতের অর্থনৈতিক বৃদ্ধির হার ৭.৮ শতাংশ ছিল। শক্তিশালী বিনিয়োগ এবং ব্যক্তিগত ভোগব্যয়ের কারণে সেই বৃদ্ধি সম্ভব হয়েছে।
এই পরিসংখ্যানও ভারতের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ FY26-এ শক্তিশালী বৃদ্ধির পর FY27-তেও ৭.১ শতাংশ বৃদ্ধির পূর্বাভাস দেওয়া হচ্ছে। যদিও আগের বছরের তুলনায় বৃদ্ধির হার কিছুটা কম, তবু বিশ্বের বড় অর্থনীতিগুলির মধ্যে ভারতের বৃদ্ধির হার উল্লেখযোগ্য বলেই মনে করছে বিশ্বব্যাংক।
ভারতের অর্থনীতির জন্য বিশ্বব্যাংকের নতুন পূর্বাভাস ইতিবাচক হলেও ঝুঁকির কথাও স্পষ্টভাবে জানিয়েছে সংস্থাটি। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম, El Niño-র সম্ভাব্য প্রভাব, এবং শেয়ারবাজারে বড় ধরনের সংশোধন অর্থনীতির সামনে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
ভারত জ্বালানির জন্য আন্তর্জাতিক বাজারের উপর উল্লেখযোগ্যভাবে নির্ভরশীল। ফলে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম দীর্ঘ সময় বেশি থাকলে আমদানি খরচ বাড়তে পারে। তার প্রভাব মুদ্রাস্ফীতি থেকে শুরু করে শিল্পের উৎপাদন খরচ এবং সাধারণ মানুষের খরচ—বিভিন্ন ক্ষেত্রেই পড়তে পারে।
আবহাওয়ার পরিবর্তনও ভারতের অর্থনীতির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিশেষ করে কৃষিক্ষেত্রের উপর বৃষ্টিপাতের প্রভাব অত্যন্ত বেশি। El Niño-র কারণে বৃষ্টিপাতের ধরনে পরিবর্তন হলে কৃষি উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
কৃষিক্ষেত্রে সমস্যা হলে গ্রামীণ আয় এবং গ্রামীণ ভোগব্যয়ের উপরও প্রভাব পড়তে পারে। তাই অর্থনীতির সামগ্রিক বৃদ্ধির ক্ষেত্রে আবহাওয়ার পরিস্থিতিও নজরে রাখছে বিশ্বব্যাংক।
বিশ্বব্যাংক আরও একটি ঝুঁকির কথা উল্লেখ করেছে—শেয়ারবাজারে বড় ধরনের সংশোধন হলে মূলধনের প্রবাহে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আচরণে পরিবর্তন এলে emerging market অর্থনীতিগুলিতে তার প্রভাব পড়তে পারে।
তবে ভারতের শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ বাজার এবং অর্থনীতির কিছু মৌলিক শক্তি এই ধরনের বহিরাগত ধাক্কা সামলাতে সাহায্য করতে পারে বলে বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়ন।
বিশ্বব্যাংকের সামগ্রিক দক্ষিণ এশিয়া সংক্রান্ত মূল্যায়নেও ভারতের গুরুত্ব স্পষ্ট। দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনৈতিক বৃদ্ধির ক্ষেত্রে ভারত অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের অক্টোবরের আপডেটে ২০২৬ সালের জন্য দক্ষিণ এশিয়ার প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৬.৯ শতাংশ করা হয়েছে।
ভারতের অর্থনীতি তুলনামূলকভাবে দ্রুত বাড়ায় গোটা অঞ্চলের সামগ্রিক বৃদ্ধিতেও তার বড় প্রভাব পড়ে। বিশেষ করে ভারতের অভ্যন্তরীণ বাজার, পরিষেবা ক্ষেত্র, শিল্প এবং বিনিয়োগের গতি আঞ্চলিক অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
অক্টোবরের India Development Update-এ ভারতের অর্থনীতির পাশাপাশি Artificial Intelligence বা AI নিয়েও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের মতে, ভারতের বড় প্রযুক্তিগত কর্মীশক্তি, শক্তিশালী IT পরিষেবা ক্ষেত্র এবং ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার AI-ভিত্তিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে দেশকে সুবিধাজনক অবস্থানে রেখেছে।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ভারতে private AI investment ২০২৪ সালের ১.২ বিলিয়ন ডলার থেকে ২০২৫ সালে বেড়ে ৪.১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। পাশাপাশি Global Capability Centres-এ কর্মরত পেশাদারের সংখ্যাও ২০২৪ সালের ১.৯ মিলিয়ন থেকে ২০২৫ সালে ২.৩৬ মিলিয়নে পৌঁছেছে।
AI-র ব্যবহার আগামী দিনে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, নতুন ধরনের কর্মসংস্থান তৈরি এবং পরিষেবা খাতের সম্প্রসারণে ভূমিকা রাখতে পারে বলে বিশ্বব্যাংক মনে করছে।
বিশ্বব্যাংকের নতুন পূর্বাভাস থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট—বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও ভারতের অর্থনীতির অভ্যন্তরীণ ভিত্তি তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী। দেশীয় চাহিদা, শিল্প, পরিষেবা, বিনিয়োগ এবং রফতানি—বিভিন্ন ক্ষেত্রের সম্মিলিত পারফরম্যান্স অর্থনীতিকে প্রত্যাশার চেয়ে ভালো জায়গায় নিয়ে এসেছে।
তবে ৭.১ শতাংশের পূর্বাভাসকে নিশ্চিত ফলাফল হিসেবে দেখা যাবে না। GDP বৃদ্ধির পূর্বাভাস বিভিন্ন অর্থনৈতিক ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির উপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হতে পারে। বিশ্বব্যাংক নিজেও জানিয়েছে, তাদের পূর্বাভাস নতুন তথ্য এবং পরিবর্তিত বৈশ্বিক পরিস্থিতির ভিত্তিতে নিয়মিত সংশোধিত হতে পারে।
আগামী দিনে ভারতের অর্থনৈতিক বৃদ্ধির ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কোথায় দাঁড়ায়, বিশ্ব বাণিজ্যের পরিস্থিতি কী হয়, রফতানি কতটা শক্তিশালী থাকে, কৃষিক্ষেত্রে আবহাওয়ার প্রভাব কেমন হয় এবং দেশের অভ্যন্তরীণ ভোগব্যয় কতটা বজায় থাকে—এসবের উপর নজর থাকবে।
একই সঙ্গে শিল্প ও পরিকাঠামোয় বিনিয়োগের গতি এবং পরিষেবা খাতের সম্প্রসারণও গুরুত্বপূর্ণ হবে। প্রযুক্তি এবং AI-র ব্যবহার যদি উৎপাদনশীলতা ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে, তাহলে তা ভারতের দীর্ঘমেয়াদি বৃদ্ধির সম্ভাবনাকে আরও শক্তিশালী করতে পারে।
সব মিলিয়ে, বিশ্বব্যাংকের ৬.৬ শতাংশ থেকে ৭.১ শতাংশে GDP বৃদ্ধির পূর্বাভাস বৃদ্ধি ভারতের অর্থনীতির জন্য নিঃসন্দেহে ইতিবাচক বার্তা। প্রত্যাশার তুলনায় ভালো অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ চাহিদা এবং রফতানির ভালো পারফরম্যান্স এই সংশোধনের পিছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে।
তবে আন্তর্জাতিক তেলের দাম, El Niño এবং বৈশ্বিক আর্থিক বাজারের অস্থিরতার মতো ঝুঁকিও সামনে রয়েছে। ফলে এখন মূল প্রশ্ন হল—এই ইতিবাচক গতি আগামী মাসগুলিতেও কতটা ধরে রাখতে পারে ভারত। আপাতত বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস বলছে, FY27-এও ভারত বিশ্বের দ্রুততম বর্ধনশীল বড় অর্থনীতিগুলির অন্যতম হয়ে থাকার সম্ভাবনা রাখে।