সাঁইথিয়ার পুজোর চেনা ছবিতে এবার বড় বদল। বছরের পর বছর থিমের অভিনব ভাবনা, মণ্ডপসজ্জা এবং নানান চমক দিয়ে দর্শকদের নজর কেড়েছে যে পুজোগুলি, এবার সেই আয়োজনেই দেখা গেল ভিন্ন ছবি। থিমের পুজো বন্ধ হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই উঠছে নানা প্রশ্ন। কেন হঠাৎ এমন সিদ্ধান্ত? এর নেপথ্যে কি শুধুই আয়োজনের খরচ ও প্রস্তুতির সমস্যা, নাকি রয়েছে অন্য কোনও কারণ? স্থানীয়দের একাংশের মধ্যে শুরু হয়েছে আলোচনা। দীর্ঘদিনের পুজোর ধরন বদলে যাওয়ায় অনেকেরই মনে পড়ছে আগের বছরের জমজমাট আয়োজনের কথা। একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠছে, সাম্প্রতিক পরিবর্তন বা পালাবদলের কোনও প্রভাব কি পড়েছে পুজোর পরিকল্পনায়? যদিও কারণ নিয়ে নানা আলোচনা থাকলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের নেপথ্যে ঠিক কী রয়েছে, তা নিয়ে স্পষ্ট ছবি এখনও সামনে আসেনি। সাঁইথিয়ার পুজোয় এই পরিবর্তন তাই নজর কেড়েছে স্থানীয় বাসিন্দা থেকে দর্শনার্থী সবারই।
দুর্গাপুজো মানেই শুধু দেবী দুর্গার আরাধনা নয়। বাঙালির কাছে এই উৎসবের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে মণ্ডপসজ্জা, আলোর ঝলক, প্রতিমার বৈচিত্র্য এবং নতুন নতুন ভাবনার চমক। বিশেষ করে গত কয়েক দশকে বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে থিমের পুজো উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ হয়ে উঠেছে। কলকাতা থেকে জেলা—বড় বাজেটের পুজো হোক কিংবা স্থানীয় ক্লাবের আয়োজন, থিমের মাধ্যমে নিজেদের আলাদা করে তুলে ধরার চেষ্টা কমবেশি সর্বত্রই দেখা যায়। সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে সাঁইথিয়ার পুজোর ছবিতে এবার যে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে, তা স্বাভাবিকভাবেই নজর কেড়েছে।
বছরের পর বছর ধরে থিমের পুজোকে ঘিরে যে আগ্রহ তৈরি হয়েছিল, এবার সেখানে যেন অন্য সুর। সাঁইথিয়ায় থিমের পুজো বন্ধ হওয়াকে ঘিরে স্থানীয় মহলে শুরু হয়েছে নানা আলোচনা। কেন বদলাল এত বছরের চেনা ছবি? হঠাৎ থিমের আয়োজন থেকে সরে আসার কারণ কী? শুধুই আর্থিক চাপ, নাকি পুজোর ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন? নাকি এর নেপথ্যে রয়েছে কোনও বড় ধরনের পালাবদল? প্রশ্ন উঠছে একাধিক।
তবে এই প্রশ্নগুলির সবকটির উত্তর এখনও একসঙ্গে স্পষ্ট নয়। ফলে স্থানীয়দের মধ্যে যে আলোচনা বা জল্পনা তৈরি হয়েছে, তাকে সরাসরি চূড়ান্ত কারণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এই পরিবর্তনকে ঘিরে নানা সম্ভাবনা সামনে আসছে। আর সেই কারণেই সাঁইথিয়ার পুজোর বদলে যাওয়া ছবি নিয়ে আগ্রহ বাড়ছে।
একসময় থিমের পুজো মানেই ছিল দর্শকদের জন্য বাড়তি আকর্ষণ। সাধারণ প্রতিমা ও মণ্ডপের বাইরে গিয়ে কোনও নির্দিষ্ট বিষয়কে সামনে রেখে গোটা পুজোর পরিকল্পনা করা হত। কখনও গ্রামবাংলার হারিয়ে যাওয়া কোনও দৃশ্য, কখনও কোনও ঐতিহাসিক ঘটনা, কখনও পরিবেশ সচেতনতার বার্তা, আবার কখনও সম্পূর্ণ কাল্পনিক কোনও ভাবনা—থিমের বৈচিত্র্যেই তৈরি হত পুজোর পরিচিতি।
সাঁইথিয়াতেও সেই প্রবণতার প্রভাব ছিল। পুজোর দিনগুলিতে স্থানীয় মানুষের পাশাপাশি আশপাশের এলাকার দর্শনার্থীদের মধ্যেও বিভিন্ন পুজো ঘিরে আগ্রহ দেখা যেত। থিমের মণ্ডপ দেখতে পরিবার নিয়ে বেরিয়ে পড়া, বন্ধুদের সঙ্গে পুজো পরিক্রমা করা কিংবা নতুন মণ্ডপের ছবি তুলে সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাগ করে নেওয়া—সব মিলিয়ে পুজোর আবহে আলাদা মাত্রা যোগ করত এই আয়োজন।
কিন্তু এবার সেই চেনা ছবিতেই পরিবর্তন।
থিমের পুজো না থাকার অর্থ শুধু মণ্ডপের নকশা বদলে যাওয়া নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি পুজোর সাংস্কৃতিক পরিচয়। কোনও ক্লাব বছরের পর বছর যে ধরনের আয়োজন করে এসেছে, হঠাৎ সেখানে পরিবর্তন এলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে। বিশেষ করে যদি সেই পুজোর অন্যতম পরিচয় হয়ে থাকে থিম, তাহলে সেই থিম বন্ধ হওয়া অনেকের কাছেই বড় পরিবর্তন।
স্থানীয়দের একাংশের বক্তব্য, থিমের পুজো আয়োজন করা সহজ কাজ নয়। একটি থিম নির্ধারণ থেকে শুরু করে মণ্ডপের নকশা, শিল্পীদের সঙ্গে যোগাযোগ, প্রয়োজনীয় উপকরণ সংগ্রহ, শ্রমিক নিয়োগ, আলোকসজ্জা এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করা—সবকিছুর জন্য বড়সড় পরিকল্পনা প্রয়োজন। তার সঙ্গে যুক্ত হয় খরচ। থিম যত জটিল হয়, কাজের পরিমাণ ও ব্যয়ও তত বাড়তে পারে।
সেই জায়গা থেকে অনেক পুজো কমিটিই এখন খরচের বিষয়টি নতুন করে ভাবছে। পুজোর বাজেট শুধু মণ্ডপেই শেষ হয় না। প্রতিমা, আলো, নিরাপত্তা, বিদ্যুৎ, পুরস্কার, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, ভোগ, প্রচার—সব মিলিয়ে একটি বড় পুজোর আয়োজনের খরচ অনেকটাই বেড়ে যেতে পারে। ফলে আগের মতো বড় আকারে থিমের পুজো করা সব কমিটির পক্ষেই সম্ভব হয় না।
সাঁইথিয়ার ক্ষেত্রেও কি সেই আর্থিক হিসাব কাজ করেছে? প্রশ্নটি উঠছে। কিন্তু শুধুমাত্র এই কারণেই থিমের পুজো বন্ধ হয়েছে, এমন কোনও নিশ্চিত তথ্য সামনে না আসা পর্যন্ত তা দাবি করা যায় না। বরং এটিকে সম্ভাব্য কারণগুলির একটি হিসেবে দেখা যেতে পারে।
এর পাশাপাশি রয়েছে পুজো পরিচালনার বিষয়টি। একটি পুজো কমিটির দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের পরিবর্তন হলে অনেক সময় আয়োজনের ধরনও বদলে যায়। নতুন কমিটি নতুন পরিকল্পনা আনতে পারে। আবার পুরনো কমিটির কোনও সিদ্ধান্ত বা দীর্ঘদিনের পরিকল্পনাও পরিবর্তিত হতে পারে। সেই জায়গা থেকেই ‘পালাবদল’-এর প্রসঙ্গ সামনে আসছে।
তবে পালাবদল বলতে ঠিক কী বোঝানো হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। কোনও নির্দিষ্ট কমিটির নেতৃত্ব বদল, স্থানীয় সংগঠনের কাঠামোয় পরিবর্তন, পুজোর দায়িত্বে নতুন মানুষের আসা কিংবা বৃহত্তর সামাজিক-রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রভাব—সবকিছুকেই সাধারণ অর্থে পালাবদলের সঙ্গে যুক্ত করা যেতে পারে। কিন্তু একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পরিবর্তনকে পুজোর থিম বন্ধের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করার আগে প্রয়োজন নির্ভরযোগ্য প্রমাণ।
এখানেই সাঁইথিয়ার বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিবেদনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি উঠে আসে—থিমের পুজো বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সত্যিই কি কোনও পালাবদলের সম্পর্ক রয়েছে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে প্রথমেই দেখতে হবে পুজোর পরিচালন কাঠামোয় কী পরিবর্তন হয়েছে। যারা আগে পুজোর দায়িত্বে ছিলেন, তারা কি এখনও একইভাবে যুক্ত? পুজো কমিটির সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় কোনও পরিবর্তন এসেছে কি না? আগের থিমের পুজো চালিয়ে যাওয়ার মতো পরিকল্পনা ছিল কি না? যদি পরিকল্পনা থেকেও তা বাতিল হয়ে থাকে, তাহলে কেন বাতিল করা হল?
এই প্রশ্নগুলির উত্তর স্থানীয় পুজো কমিটি, আয়োজক এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য থেকেই স্পষ্ট হতে পারে।
পুজোর ইতিহাসের দিকে তাকালেও বিষয়টি আরও পরিষ্কার হতে পারে। কোনও পুজো যদি দীর্ঘদিন ধরে থিমের মাধ্যমে দর্শকদের আকর্ষণ করে থাকে, তাহলে হঠাৎ সেই ধারার পরিবর্তন সাধারণত কোনও না কোনও সিদ্ধান্তের ফল। কখনও বাজেট কমে যায়, কখনও উদ্যোক্তাদের আগ্রহ বদলে যায়, কখনও জায়গার সমস্যা হয়, আবার কখনও নিরাপত্তা বা প্রশাসনিক নিয়মের কারণে বড় আকারের মণ্ডপ তৈরি করা সম্ভব হয় না।
বর্তমান সময়ে পুজোর সঙ্গে নিরাপত্তা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বড় থিমের মণ্ডপ তৈরি হলে দর্শকের ভিড়ও বাড়তে পারে। ফলে প্রবেশ ও বেরোনোর পথ, অগ্নিনিরাপত্তা, বিদ্যুৎ সংযোগ, পার্কিং এবং যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ—সবকিছুর উপর বাড়তি চাপ পড়ে। স্থানীয় প্রশাসনের অনুমোদন ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত নিয়ম মেনে চলাও জরুরি। তাই কোনও কমিটি যদি মনে করে বড় থিমের বদলে তুলনামূলক সরল আয়োজন করা হবে, তার পেছনে বাস্তব ব্যবস্থাপনার কারণও থাকতে পারে।
তবে সাঁইথিয়ার মানুষের কাছে বিষয়টি শুধু প্রশাসনিক বা আর্থিক নয়। কারণ পুজো একটি আবেগের জায়গা। বছরের পর বছর যে আয়োজন দেখে মানুষ অভ্যস্ত, সেটি হঠাৎ বদলে গেলে স্বাভাবিকভাবেই তাঁদের মধ্যে কৌতূহল তৈরি হয়।
অনেকের কাছে থিমের পুজো মানে ছিল পুজোর দিনগুলিতে নতুন কিছু দেখার সুযোগ। একটি নির্দিষ্ট পুজোকে কেন্দ্র করে পরিবারের সঙ্গে বেরিয়ে পড়া, মণ্ডপের সামনে ছবি তোলা, শিশুদের নিয়ে ঘোরা—সবকিছুই ছিল সেই অভিজ্ঞতার অংশ। তাই থিম বন্ধ হলে সেই দর্শনার্থীদের একটা অংশের মধ্যে হতাশা তৈরি হওয়াও অস্বাভাবিক নয়।
আবার অন্য একটি দিকও রয়েছে। থিমের পুজো সবসময় যে সবার পছন্দের হবে, তা নয়। কেউ কেউ মনে করেন, পুজোর মূল বিষয় হওয়া উচিত দেবীর আরাধনা। অতিরিক্ত থিম, মণ্ডপসজ্জা কিংবা প্রতিযোগিতার পরিবেশের কারণে কখনও কখনও পুজোর আধ্যাত্মিক দিকটি আড়ালে চলে যেতে পারে। ফলে সাধারণ বা সাবেকি পুজোয় ফিরে আসার সিদ্ধান্তকেও অনেকে ইতিবাচকভাবে দেখতে পারেন।
এই বিতর্ক নতুন নয়। বাংলার দুর্গাপুজোর ইতিহাসে সাবেকি পুজো এবং থিমের পুজো—দুই ধারাই পাশাপাশি চলে এসেছে। একদিকে রয়েছে বনেদি বাড়ির ঐতিহ্য, অন্যদিকে রয়েছে ক্লাব সংস্কৃতির নতুন নতুন পরীক্ষা। সময়ের সঙ্গে থিমের পুজো জনপ্রিয় হলেও সাবেকি আয়োজনের আবেদন এখনও যথেষ্ট শক্তিশালী।
সাঁইথিয়ার ক্ষেত্রেও যদি থিমের বদলে সাবেকি বা সরল আয়োজনকে গুরুত্ব দেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে সেটিকে পুজোর একটি নতুন দিক হিসেবেও দেখা যায়। তবে সেটি আয়োজকদের সিদ্ধান্ত কি না, নাকি পরিস্থিতির চাপে নেওয়া হয়েছে, তা জানা জরুরি।
এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে স্থানীয় অর্থনীতিও। পুজোর সময় একটি জনপ্রিয় থিমের মণ্ডপকে কেন্দ্র করে ছোট ব্যবসায়ীদের বিক্রি বাড়তে পারে। খাবারের দোকান, অস্থায়ী স্টল, খেলনা, পোশাক কিংবা অন্যান্য পসরা নিয়ে ব্যবসায়ীরা বসেন। দর্শনার্থী বাড়লে তাঁদের ব্যবসার সুযোগও বাড়ে। তাই থিমের পুজো বন্ধ হলে তার প্রভাব শুধু পুজো কমিটির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না।
তবে একই সঙ্গে বেশি ভিড়ের কারণে যানজট, আবর্জনা, শব্দদূষণ এবং নিরাপত্তার মতো সমস্যাও তৈরি হতে পারে। তাই একটি এলাকার পুজোর ধরন পরিবর্তনের পেছনে এই সামাজিক বিষয়গুলিও বিবেচনায় থাকতে পারে।
সাঁইথিয়ার পুজোকে ঘিরে বর্তমানে যে প্রশ্নগুলি উঠছে, তার মধ্যে অন্যতম—আগের মতো বড় আয়োজনের প্রয়োজনীয়তা কি কমেছে? নাকি নতুন প্রজন্মের পছন্দ বদলেছে? নাকি আয়োজকদের মধ্যে পরিবর্তনের ফলে পুজোর পরিকল্পনাও বদলে গেছে?
সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে পুজোর মণ্ডপের পরিচিতিও অনেকটা বদলে গিয়েছে। আগে কোনও পুজোর জনপ্রিয়তা মূলত স্থানীয় দর্শনার্থীদের উপর নির্ভর করত। এখন একটি মণ্ডপের ছবি বা ভিডিও মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়তে পারে। ফলে পুজো কমিটিগুলির উপর নতুন ধরনের চাপও তৈরি হয়েছে। প্রত্যেক বছর আগের বছরের চেয়ে নতুন কিছু করার প্রত্যাশা তৈরি হয়।
কিন্তু সেই প্রতিযোগিতা চালিয়ে যাওয়াও ব্যয়বহুল। একটি সফল থিমের পর পরের বছর আরও বড় কিছু করার চাপ থাকে। ফলে কমিটিকে বাজেট, সময় এবং শ্রম—তিনটি বিষয়ই সামলাতে হয়। কোনও বছর সেই সামর্থ্য না থাকলে থিম বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।
সাঁইথিয়ায় এবার ঠিক এমন কিছু হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। তবে বিষয়টি যে স্থানীয়ভাবে আলোচনার জন্ম দিয়েছে, তাতে সন্দেহ নেই।
‘নেপথ্যে কি পালাবদল’—এই প্রশ্নটি তাই শুধু রাজনৈতিক অর্থে দেখলে বিষয়টি অসম্পূর্ণ থেকে যায়। পুজোর কমিটির মধ্যে নেতৃত্বের পরিবর্তনও একটি পালাবদল হতে পারে। পুরনো উদ্যোক্তাদের জায়গায় নতুন প্রজন্ম দায়িত্ব নিলে তাঁদের পুজো সম্পর্কে ধারণাও আলাদা হতে পারে। কেউ হয়তো বড় থিমের বদলে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানকে গুরুত্ব দেবেন। কেউ আবার মণ্ডপের চেয়ে প্রতিমায় বেশি খরচ করতে চাইবেন।
আবার কেউ হয়তো পুজোর বাজেট কমিয়ে এলাকার মানুষের জন্য অন্য কোনও সামাজিক কাজ করতে চাইবেন। যেমন স্বাস্থ্য শিবির, বস্ত্র বিতরণ, শিক্ষামূলক উদ্যোগ বা অন্যান্য জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি। সে ক্ষেত্রেও পুজোর দৃশ্যমান জাঁকজমক কমলেও অন্য ধরনের সামাজিক গুরুত্ব বাড়তে পারে।
তাই থিমের পুজো বন্ধ হওয়াকে একমাত্র নেতিবাচক পরিবর্তন হিসেবে দেখাও ঠিক হবে না। আসল বিষয় হল, সিদ্ধান্তের পেছনে কী যুক্তি রয়েছে এবং স্থানীয় মানুষের কাছে সেই সিদ্ধান্তের গ্রহণযোগ্যতা কতটা।
সাঁইথিয়ার মতো মফস্বল শহরের পুজোর ক্ষেত্রে স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পুজো শুধু কমিটির কয়েকজনের আয়োজন নয়। এলাকার বহু মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এর সঙ্গে যুক্ত থাকেন। চাঁদা সংগ্রহ, মণ্ডপ তৈরি, প্রতিমা আনা, আলো লাগানো, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান—সব ক্ষেত্রেই স্থানীয়দের অংশগ্রহণ থাকে। তাই পুজোর ধরন বদলালে তাঁদের মতামতও গুরুত্বপূর্ণ।
যাঁরা বছরের পর বছর থিমের পুজো দেখেছেন, তাঁদের কাছে এই পরিবর্তন স্বাভাবিকভাবেই বড়। কেউ হয়তো পুরনো দিনের মণ্ডপের কথা মনে করছেন, কেউ নতুন আয়োজন নিয়ে অপেক্ষা করছেন। আবার কেউ হয়তো মনে করছেন, পুজোর মূল আনন্দ থিমে নয়, মানুষের মিলনেই।
এই জায়গায় সুস্থ আলোচনাই সবচেয়ে প্রয়োজনীয়। কোনও গুজব বা অনুমানের ভিত্তিতে থিম বন্ধের সঙ্গে কোনও ব্যক্তি বা রাজনৈতিক পক্ষকে সরাসরি যুক্ত করে ফেলা উচিত নয়। পুজোর মতো সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিষয়কে কেন্দ্র করে এমন অভিযোগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য জানা জরুরি।
যদি সত্যিই কমিটির নেতৃত্বে পরিবর্তন হয়ে থাকে, তাহলে সেই পরিবর্তনের সময়কাল এবং সিদ্ধান্তের সঙ্গে তার সম্পর্ক খতিয়ে দেখা দরকার। যদি বাজেট কমে থাকে, তাহলে আগের বছরের তুলনায় এবারের খরচের পার্থক্যও গুরুত্বপূর্ণ। যদি প্রশাসনিক কারণ থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্ট নির্দেশ বা অনুমতির বিষয়টিও সামনে আসতে পারে।
অর্থাৎ, সাঁইথিয়ায় থিমের পুজো বন্ধের গল্পটি একাধিক স্তরে দেখা প্রয়োজন। একদিকে রয়েছে পুজোর ঐতিহ্য, অন্যদিকে অর্থনীতি। একদিকে রয়েছে দর্শকদের প্রত্যাশা, অন্যদিকে আয়োজকদের বাস্তব সমস্যা। তার সঙ্গে যুক্ত হতে পারে নেতৃত্বের পরিবর্তন, সামাজিক পরিবেশ এবং স্থানীয় রাজনীতির প্রভাব।
এই পরিবর্তনের ফলে আগামী দিনে সাঁইথিয়ার পুজো কোন দিকে যাবে, সেটিও দেখার বিষয়। থিমের পুজো কি আবার ফিরবে? নাকি এবার থেকে অন্য ধরনের আয়োজনই হয়ে উঠবে নতুন পরিচয়? পুরনো ঐতিহ্য আর নতুন পরিকল্পনার মধ্যে কোন পথ বেছে নেবে পুজো কমিটিগুলি?
এখনই তার উত্তর দেওয়া কঠিন।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট সাঁইথিয়ার পুজোর চেনা ছবিতে এবার পরিবর্তন এসেছে এবং সেই পরিবর্তন স্থানীয়দের নজর এড়ায়নি। বছরের পর বছর থিমের মাধ্যমে যে পুজো দর্শকদের আকর্ষণ করেছে, সেই জায়গায় এবার অন্য ধরনের আয়োজন দেখতে পাওয়া গেলে প্রশ্ন উঠবেই। আর সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই সামনে আসছে ‘পালাবদল’-এর প্রসঙ্গ।
কিন্তু পালাবদল যদি থেকেও থাকে, তার প্রকৃতি কী সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। এটি কি শুধু পুজো কমিটির সাংগঠনিক পরিবর্তন? নাকি অর্থনৈতিক বাস্তবতার কারণে নেওয়া সিদ্ধান্ত? নাকি এর পেছনে রয়েছে আরও কোনও কারণ? সবকিছুই নির্ভর করছে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য এবং নির্ভরযোগ্য তথ্যের উপর।
দুর্গাপুজো বাঙালির কাছে আবেগের উৎসব। তাই পুজোর মণ্ডপে একটি ছোট পরিবর্তনও অনেক বড় আলোচনার বিষয় হয়ে উঠতে পারে। সাঁইথিয়ার ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। থিমের পুজো বন্ধ হওয়ার ঘটনায় কেউ পুরনো দিনের স্মৃতি মনে করছেন, কেউ নতুন আয়োজনের অপেক্ষায় রয়েছেন, আবার কেউ খুঁজছেন পরিবর্তনের আসল কারণ।
শেষ পর্যন্ত পুজোর সাফল্য শুধু থিমের জাঁকজমকে নির্ভর করে না। মানুষের অংশগ্রহণ, নিরাপদ পরিবেশ, সুন্দর আয়োজন এবং উৎসবের আনন্দ সবকিছুর সমন্বয়েই একটি পুজো মানুষের মনে জায়গা করে নেয়। তাই থিম থাকল কি থাকল না, তার পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে পুজোর সামগ্রিক পরিবেশ।
সাঁইথিয়ার এবারের পরিবর্তন সেই বৃহত্তর প্রশ্নটিই সামনে আনছে পুজোর পরিচয় কি শুধু থিমে, নাকি তার চেয়েও বড় কিছুতে?
উত্তর হয়তো মিলবে পুজোর দিনগুলিতেই। দর্শক কতটা সাড়া দেন, স্থানীয় মানুষ কীভাবে এই নতুন আয়োজনকে গ্রহণ করেন এবং আগামী বছর আয়োজকেরা কী সিদ্ধান্ত নেন তার উপরই নির্ভর করবে সাঁইথিয়ার পুজোর পরবর্তী অধ্যায়।