শুধু টম্যাটো আর কয়েকটি মশলাতেই বানান টক-ঝাল-মিষ্টি ঘন তরকারি—রুটির সঙ্গে জমবে দারুণ!
ঘরে সব্জি নেই, বাজার করার সময়ও হয়নি? চিন্তার কিছু নেই। হাতের কাছে কয়েকটি টম্যাটো থাকলেই তৈরি করে ফেলতে পারেন দারুণ স্বাদের ঘন টম্যাটোর তরকারি। রুটির সঙ্গে খাওয়ার জন্য এই তরকারি যেমন সহজে তৈরি করা যায়, তেমনই এর স্বাদও একঘেয়ে নয়। টম্যাটোর টকভাব, গুড়ের মিষ্টি, শুকনোলঙ্কার ঝাল এবং বিভিন্ন মশলার সুগন্ধ মিলে তৈরি হয় একেবারে অন্য রকম স্বাদের একটি পদ।
অনেক সময় বাড়িতে রান্নার জন্য পর্যাপ্ত সব্জি বা আনাজ থাকে না। বিশেষ করে সপ্তাহের ব্যস্ত দিনে বাজার থেকে অনেক কিছু কিনে আনা সম্ভব হয় না। এমন পরিস্থিতিতে রান্নাঘরে থাকা টম্যাটোই হয়ে উঠতে পারে মূল উপকরণ। সামান্য মশলা, ঘি এবং কয়েকটি সাধারণ উপকরণ দিয়ে তৈরি করা যায় ঘন ও মশলাদার এই তরকারি। রুটি, পরোটা কিংবা অন্য কোনও ভারতীয় রুটির সঙ্গে এটি পরিবেশন করা যায়।
এই টম্যাটোর তরকারির বিশেষত্ব হল এর স্বাদের ভারসাম্য। টম্যাটোর স্বাভাবিক টকভাবকে সামলে দেয় গুড়ের মিষ্টি। তার সঙ্গে শুকনোলঙ্কার ঝাল, আদা, কাঁচালঙ্কা, কারিপাতা এবং সর্ষের ফোড়ন যোগ করে আলাদা মাত্রা। শেষে ঝুরিভাজা ছড়িয়ে দিলে তরকারিতে আসে সামান্য মচমচে ভাব, যা নরম রুটির সঙ্গে খেতে বেশ ভাল লাগে।
রন্ধনশিল্পী রণবীর ব্রারের শেখানো এই ধরনের রেসিপি বিশেষ করে সেই সময়ের জন্য উপযোগী, যখন রান্নাঘরে বেশি সব্জি মজুত থাকে না। কম উপকরণে সহজে রান্না করা যায় বলেই এটি ব্যস্ত দিনের জন্যও বেশ কার্যকর একটি পদ। রান্নার জন্য খুব বেশি সময় বা জটিল কোনও কৌশলের প্রয়োজন নেই। শুধু কয়েকটি ধাপ ঠিকভাবে মেনে চললেই তৈরি হয়ে যাবে ঘন, ঝাল-মিষ্টি টম্যাটোর তরকারি।
এই রেসিপির উপকরণগুলি বেশ সাধারণ এবং বেশিরভাগই রান্নাঘরে সহজেই পাওয়া যায়। প্রয়োজন হবে ঘি, সর্ষেদানা, টম্যাটো, আদা, কারিপাতা, কাঁচালঙ্কা, হিং, শুকনোলঙ্কাগুঁড়ো, হলুদগুঁড়ো, টম্যাটোবাটা, গুড়, ঝুরিভাজা এবং নুন।
এ ক্ষেত্রে টম্যাটোই হল মূল উপকরণ। চারটি বড় টম্যাটো বড় টুকরো করে কেটে নিতে হবে। পাশাপাশি এক কাপ টম্যাটোবাটা ব্যবহার করা হবে, যা তরকারিকে আরও ঘন ও টম্যাটোর স্বাদকে আরও গভীর করে তুলবে।
রান্নায় ঘি ব্যবহারের ফলে তরকারিতে সুন্দর গন্ধ ও সমৃদ্ধ স্বাদ আসে। সর্ষেদানা দিয়ে তৈরি ফোড়ন, আদা, কাঁচালঙ্কা এবং কারিপাতার সুগন্ধও এই পদটির স্বাদ বাড়িয়ে দেয়। গুড় ব্যবহারের ফলে টম্যাটোর টকভাবের সঙ্গে একটি মিষ্টি ভারসাম্য তৈরি হয়।
প্রথমে কড়াই গরম করে তাতে ৩ টেবিলচামচ ঘি দিন। ঘি গরম হলে সর্ষেদানা দিয়ে ফোড়ন দিন। সর্ষেদানা ফুটতে শুরু করলে তার মধ্যে কুচোনো আদা, কাঁচালঙ্কা এবং কারিপাতা দিয়ে দিন।
এই উপকরণগুলি ঘিতে কিছুক্ষণ নাড়াচাড়া করতে হবে। আদা ও কারিপাতা থেকে সুগন্ধ বেরিয়ে আসা পর্যন্ত রান্না করুন। এই ধাপটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ফোড়নের সুগন্ধই পরে তৈরি হওয়া তরকারির স্বাদে বড় ভূমিকা রাখবে।
আদা, কাঁচালঙ্কা ও কারিপাতা থেকে সুন্দর গন্ধ বেরিয়ে এলে কড়াইয়ে এক চিমটে হিং দিন। এর পর হলুদগুঁড়ো এবং শুকনোলঙ্কাগুঁড়ো যোগ করুন।
মশলাগুলি অল্প সময়ের জন্য নাড়াচাড়া করে নিন। খুব বেশি সময় ধরে শুকনো মশলা ভাজার প্রয়োজন নেই। মশলা ঘিতে ভালভাবে মিশে গেলেই পরের ধাপে চলে যেতে পারেন।
এ বার আগে থেকে বড় টুকরো করে রাখা টম্যাটোগুলি কড়াইয়ে দিয়ে দিন। মশলার সঙ্গে টম্যাটো ভালভাবে মাখিয়ে নিতে হবে। টম্যাটোর টুকরোগুলি যেন মশলার আবরণে ভালভাবে মিশে যায়, সেদিকে খেয়াল রাখুন।
টম্যাটো নাড়াচাড়া করার সময় ধীরে ধীরে নরম হতে শুরু করবে। এর পর এক কাপ টম্যাটোবাটা কড়াইয়ে যোগ করুন। সব উপকরণ একসঙ্গে ভালভাবে মিশিয়ে নিন।
এ বার টম্যাটোর মিশ্রণটি ১০-১৫ মিনিট ধরে রান্না করতে হবে। মাঝেমধ্যে নাড়তে থাকুন, যাতে কড়াইয়ের তলায় লেগে না যায়।
ধীরে ধীরে টম্যাটো নরম হয়ে আসবে এবং মিশ্রণটি ঘন হতে শুরু করবে। টম্যাটোবাটার সঙ্গে বড় টুকরো টম্যাটো মিশে গিয়ে একটি ঘন কাইয়ের মতো মিশ্রণ তৈরি হবে। এই সময় রান্নাঘরে টম্যাটো ও মশলার সুন্দর গন্ধ ছড়িয়ে পড়বে।
টম্যাটোর মিশ্রণ ঘন হয়ে এলে প্রয়োজন অনুযায়ী অল্প জল দিন। খুব বেশি জল দেওয়ার দরকার নেই, কারণ এই পদটি মূলত ঘন করে পরিবেশন করা হয়।
এর পর স্বাদমতো নুন এবং ২-৩ টেবিলচামচ গুড় যোগ করুন। গুড়ের পরিমাণ নিজের স্বাদ অনুযায়ী সামান্য কম-বেশি করা যেতে পারে। তবে টম্যাটোর টকভাবের সঙ্গে মিষ্টির ভারসাম্য বজায় রাখাই এই তরকারির মূল বৈশিষ্ট্য।
এ বার বাকি ১ টেবিলচামচ ঘি দিয়ে সব উপকরণ ভালভাবে মিশিয়ে নিন। আরও প্রায় তিন মিনিট রান্না করুন। এই সময় টম্যাটোর সঙ্গে গুড়, ঘি ও মশলা ভালভাবে মিশে গিয়ে তরকারিতে একটি সুন্দর ঘনত্ব তৈরি হবে।
রান্নার একেবারে শেষে একমুঠো মোটা ঝুরিভাজা দিয়ে দিন। হালকা করে মিশিয়ে নিয়ে গ্যাস বন্ধ করে দিতে পারেন। চাইলে পরিবেশনের সময় উপর থেকেও সামান্য ঝুরিভাজা ছড়িয়ে দেওয়া যায়।
গরম গরম রুটির সঙ্গে পরিবেশন করুন টম্যাটোর এই ঘন তরকারি।
এই তরকারির স্বাদ একেবারেই আলাদা ধরনের। প্রথমে টম্যাটোর টকভাব অনুভূত হলেও তার সঙ্গে গুড়ের মিষ্টি একটি ভারসাম্য তৈরি করে। শুকনোলঙ্কা ও কাঁচালঙ্কা যোগ করে ঝাল স্বাদ, আর আদা, কারিপাতা ও সর্ষের ফোড়ন এনে দেয় সুগন্ধ।
ঘি ব্যবহারের কারণে তরকারিতে একটি সমৃদ্ধ স্বাদ আসে। অন্য দিকে ঝুরিভাজা যোগ করার ফলে নরম ও ঘন তরকারির মধ্যে সামান্য মচমচে টেক্সচার পাওয়া যায়। তাই রুটির সঙ্গে খাওয়ার সময় প্রতিটি কামড়ে একাধিক স্বাদের অনুভূতি পাওয়া যায়।
টম্যাটোর তরকারিটি ঘন করে রান্না করা হয়। ফলে এটি পাতলা ঝোলের মতো নয়, বরং রুটির সঙ্গে সহজেই মেখে খাওয়া যায়। রুটি, ফুলকা বা পরোটার সঙ্গে এই পদ পরিবেশন করা যেতে পারে।
বিশেষ করে যখন বাড়িতে আলু, ফুলকপি, পটল, বেগুন বা অন্য কোনও সব্জি নেই, তখন এই রেসিপিটি বেশ কাজে আসতে পারে। কয়েকটি টম্যাটো ও কিছু সাধারণ মশলা দিয়েই তৈরি হয়ে যায় একটি সম্পূর্ণ সাইড ডিশ।
টম্যাটোর তরকারি তৈরি করার সময় কয়েকটি বিষয় খেয়াল রাখলে স্বাদ আরও ভাল হবে। প্রথমত, টম্যাটো যেন ভালভাবে সেদ্ধ হয়। টম্যাটো ও টম্যাটোবাটা যত ভালভাবে রান্না হবে, তরকারির স্বাদ ও ঘনত্ব তত ভাল হবে।
দ্বিতীয়ত, গুড় একসঙ্গে বেশি না দিয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার করা ভাল। টম্যাটোর টকভাব এবং গুড়ের মিষ্টির মধ্যে ভারসাম্য থাকাই এই পদের আসল বৈশিষ্ট্য।
তৃতীয়ত, জল খুব বেশি দেওয়া উচিত নয়। বেশি জল দিলে তরকারি পাতলা হয়ে যেতে পারে। প্রয়োজন হলে অল্প অল্প করে জল যোগ করা ভাল।
শেষে ঝুরিভাজা দেওয়ার কারণে তরকারিতে আলাদা একটি টেক্সচার তৈরি হয়। তাই পরিবেশনের ঠিক আগে এটি যোগ করলে মচমচে ভাবটি আরও ভালভাবে পাওয়া যায়।
প্রতিদিনের রান্নায় সবসময় অনেক রকম সব্জি হাতে থাকা সম্ভব নয়। কখনও বাজার করা হয়ে ওঠে না, কখনও আবার হঠাৎ করে বাড়িতে অতিথি চলে আসেন। এমন পরিস্থিতিতে টম্যাটো দিয়ে তৈরি এই তরকারি হতে পারে সহজ সমাধান।
এই রেসিপির সবচেয়ে বড় সুবিধা হল, এতে এমন কোনও উপকরণ নেই যা সাধারণ রান্নাঘরে খুব কঠিনে পাওয়া যায়। টম্যাটো, ঘি, সর্ষে, আদা, কাঁচালঙ্কা, কারিপাতা এবং কয়েকটি মশলা দিয়েই রান্নাটি করা যায়। রান্নার পদ্ধতিও খুব সহজ।
তাই ব্যস্ত দিনের দুপুর বা রাতের খাবারে দ্রুত কিছু তৈরি করতে হলে এই টম্যাটোর তরকারি চেষ্টা করে দেখতে পারেন। গরম রুটির সঙ্গে পরিবেশন করলে সাধারণ উপকরণ দিয়েও তৈরি হতে পারে সুস্বাদু ও মনভরানো একটি খাবার।
ঘরে সব্জির জোগান কম থাকলেও সুস্বাদু রান্নার জন্য সবসময় অনেক উপকরণের প্রয়োজন হয় না। কয়েকটি টম্যাটো, সামান্য ঘি এবং রান্নাঘরে থাকা কিছু মশলা দিয়েই তৈরি করা যায় টক-ঝাল-মিষ্টি স্বাদের এই ঘন টম্যাটোর তরকারি।
টম্যাটোর টকভাব, গুড়ের মিষ্টি, লঙ্কার ঝাল এবং সর্ষে-আদা-কারিপাতার সুগন্ধ মিলিয়ে তৈরি এই পদটি রুটির সঙ্গে পরিবেশনের জন্য বেশ উপযোগী। রান্নার শেষে ঝুরিভাজা যোগ করলে স্বাদ ও টেক্সচারে আসে বাড়তি বৈচিত্র্য।
তাই ঘরে যদি এই মুহূর্তে বেশি সব্জি না-ও থাকে, কয়েকটি টম্যাটো থাকলেই রান্নাঘরে তৈরি করে ফেলতে পারেন এই সহজ ও সুস্বাদু তরকারি।