Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

কন্যাসন্তান হলে বন্দুক রাখা দরকার ঋচার বিতর্কিত মন্তব্য ঘিরে কোন কোন বক্তব্যে শোরগোল?

শক্ত ও স্পষ্ট মতামতের জন্য বারবার বিতর্কের কেন্দ্রে উঠে এসেছেন তিনি। জন্মদিনের দিনে ফিরে দেখা যাক, অভিনেত্রী ঋচার এমন কিছু মন্তব্য, যা বি-টাউনে তীব্র শোরগোল ফেলেছিল।

শক্ত কণ্ঠস্বর, স্পষ্ট অবস্থান: ঋচা চড্ডার বিতর্কিত মন্তব্য ও নির্ভীক যাত্রাপথ

বলিউডে এমন অভিনেত্রী খুব বেশি নেই, যাঁরা শুধু অভিনয়ের জন্যই নয়, বরং নিজের মতামত, অবস্থান ও সামাজিক দায়বদ্ধতার কারণেও নিয়মিত আলোচনার কেন্দ্রে থাকেন। ঋচা চড্ডা সেই বিরল তালিকার অন্যতম নাম। ‘গ্যাংস অফ ওয়াসেপুর’-এর সাহসী অভিনয় থেকে শুরু করে ‘মাসান’, ‘ফুকরে’, ‘লাভ সোনিয়া’র মতো ছবিতে বাস্তবধর্মী চরিত্রে নিজেকে প্রমাণ করেছেন তিনি। তবে রুপোলি পর্দার বাইরেও ঋচা বারবার উঠে এসেছেন খবরের শিরোনামে—তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য, নারীবাদী অবস্থান ও সামাজিক প্রশ্নে নির্ভীক মত প্রকাশের জন্য।

বুধবার তাঁর জন্মদিন উপলক্ষে ফিরে দেখা যাক, সেই সমস্ত মন্তব্য ও অবস্থান, যা কখনও প্রশংসা কুড়িয়েছে, আবার কখনও তৈরি করেছে তীব্র বিতর্ক। কিন্তু প্রতিটি ক্ষেত্রেই একটাই বিষয় স্পষ্ট—নিজের বিশ্বাস থেকে কখনও সরে আসেননি ঋচা।

অভিনেত্রী ঋচা: প্রচলিত ‘নায়িকা’ ছাঁচ ভাঙার গল্প

বলিউডে পা রাখার সময় থেকেই ঋচা বুঝে গিয়েছিলেন, তিনি তথাকথিত ‘ডল ফেস’ নায়িকার তালিকায় পড়বেন না। চিকন গড়ন, ছিপছিপে শরীর বা নিখুঁত সৌন্দর্যের প্রচলিত ধারণার বাইরে থাকা সত্ত্বেও নিজের জায়গা তৈরি করেছেন তিনি অভিনয়ের জোরে।

শুরুর দিকেই তাঁকে শুনতে হয়েছিল নানা কটাক্ষ—চেহারা, ওজন, পোশাক, এমনকি হাঁটাচলা নিয়েও। কিন্তু সেই সব মন্তব্য তাঁকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। বরং আরও দৃঢ় করেছে তাঁর মনোবল। ঋচা বারবার বলেছেন, অভিনয় কোনও সৌন্দর্য প্রতিযোগিতা নয়। এখানে চরিত্রের গভীরতা ও সত্যিই আসল।

নারীবাদ নিয়ে ঋচার স্পষ্ট অবস্থান

নারীবাদ নিয়ে বলিউডে বহু আলোচনাই হয়, কিন্তু ঋচা চড্ডার বক্তব্য বরাবরই আলাদা। তিনি নারীবাদকে কখনও ‘পুরুষ-বিরোধী’ বলে দেখেননি। বরং তাঁর মতে, নারীবাদ মানে সমানাধিকার।

একাধিক সাক্ষাৎকারে ঋচা জানিয়েছেন, ছোটবেলা থেকেই তাঁকে শিখিয়ে দেওয়া হয়েছিল—একজন নারীর সবচেয়ে বড় সাফল্য বিয়ে করা ও সংসার করা। না হলে সমাজ তাকে ব্যর্থ বলবে। এই পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার সঙ্গে বড় হতে হতে এক সময় তিনি নিজেই প্রশ্ন তুলতে শুরু করেন—কেন একজন নারীর সাফল্যের মাপকাঠি শুধু সংসার?

বড় হয়ে তিনি বুঝেছিলেন, নারীবাদ কোনও জটিল তত্ত্ব নয়। এটি খুবই সাধারণ একটি ধারণা—পুরুষ ও নারী সমান অধিকার পাবে। কাউকে খাটো করে অন্য কাউকে বড় করা নয়, বরং সকলের জন্য সমান সুযোগ তৈরি করাই নারীবাদের মূল লক্ষ্য।

এই বক্তব্য অনেকের কাছে অনুপ্রেরণা হয়ে উঠলেও, কেউ কেউ আবার তাঁকে ‘অতি নারীবাদী’ বলেও কটাক্ষ করেছেন। তবে ঋচা বরাবরের মতোই সেসব সমালোচনায় গুরুত্ব দেননি।

কন্যাসন্তান হলে বন্দুক রাখতে হবে—বিতর্কের কেন্দ্রে ঋচা

সবচেয়ে বেশি বিতর্ক তৈরি করেছিল ঋচার একটি মন্তব্য—কন্যাসন্তানের জন্মের পর তাঁর অনুভূতি নিয়ে করা মন্তব্য। তিনি বলেছিলেন, ভারতে কন্যাসন্তান জন্মানো মানেই মেয়ের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ। প্রথমে তাঁর মনে হয়েছিল, বন্দুক কিনে রাখতে হবে।

এই বক্তব্য প্রকাশ্যে আসতেই সামাজিক মাধ্যমে ঝড় ওঠে। কেউ একে অতিরঞ্জিত বলে কটাক্ষ করেন, কেউ আবার দেশ ও সমাজকে অপমান করার অভিযোগ তোলেন।

পরে ঋচা নিজেই বিষয়টি স্পষ্ট করেন। তিনি বলেন, কথাটি তিনি বলেছিলেন প্রতীকী অর্থে। মেয়েদের নিরাপত্তা নিয়ে যে ভয় ও উদ্বেগ একজন মা অনুভব করেন, সেটাই প্রকাশ পেয়েছিল ওই মন্তব্যে। পরে তিনি আরও বলেন, অস্ত্র নয়—তিনি চান তাঁর মেয়েকে এমনভাবে বড় করতে, যাতে সে নিজেই দৃঢ়চেতা, আত্মবিশ্বাসী ও সচেতন নাগরিক হয়ে উঠতে পারে।

এই মন্তব্য আসলে সমাজের আয়না ধরেছিল—যেখানে মেয়েদের নিরাপত্তা নিয়ে ভয় এখনও বাস্তব।


স্বাভাবিক প্রসব নিয়ে সমাজমাধ্যমে ঝড়

কন্যাসন্তানের জন্মের পর ঋচা সমাজমাধ্যমে জানিয়েছিলেন যে, তাঁর সন্তানের জন্ম হয়েছে স্বাভাবিক পদ্ধতিতে, অস্ত্রোপচার নয়। এই সাধারণ ঘোষণাও যে এত বিতর্কের জন্ম দিতে পারে, তা হয়তো তিনি নিজেও ভাবেননি।

নেটাগরিকদের একাংশ ‘নর্ম্যাল ডেলিভারি’ শব্দচয়ন নিয়ে আপত্তি তোলেন। কেউ কেউ বলেন, এতে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সন্তানের জন্ম দেওয়া মায়েদের ছোট করা হচ্ছে।

এই কটাক্ষের জবাবে ঋচা একেবারেই সরাসরি ভাষায় উত্তর দেন। তিনি লেখেন, যদি ‘যোনি-প্রসব’ শব্দ ব্যবহার না করে ‘নর্ম্যাল ডেলিভারি’ লেখা হয়, তাতে সমস্যা কোথায়? এটি তাঁর ব্যক্তিগত পাতা এবং তিনি কী লিখবেন, সেটা তাঁর সিদ্ধান্ত। তিনি আরও স্পষ্ট করে বলেন—“আমার যোনি আমার সন্তান। নারী স্বাধীনতা আমায় এই অধিকারই শিখিয়েছে।”

এই মন্তব্য আবারও সমাজে শরীর, মাতৃত্ব ও নারী স্বাধীনতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু করে।


রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিবাদে সক্রিয় ঋচা

২০২০ সালে জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে হিংসার ঘটনায় প্রতিবাদে নেমেছিলেন দেশের বহু মানুষ। বলিউডের কয়েকজন অভিনেতাও সেই প্রতিবাদে সামিল হন। তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন ঋচা চড্ডা।

news image
আরও খবর

তিনি প্রকাশ্যে মিছিলে অংশ নেন এবং সামাজিক মাধ্যমে প্রতিবাদ জানান। এর ফলস্বরূপ তাঁকে ট্রোল করা হয়, কটাক্ষ করা হয়, এমনকি ‘দেশদ্রোহী’ বলেও দাগানো হয়।

এই সব আক্রমণেও তিনি পিছিয়ে আসেননি। বরং বারবার বলেছেন, দেশের নাগরিক হিসেবে প্রশ্ন তোলা ও প্রতিবাদ করার অধিকার তাঁর আছে। দেশপ্রেম মানে অন্ধ সমর্থন নয়—ভুল দেখলে তা নিয়ে কথা বলাও দেশপ্রেমের অঙ্গ।

সৌন্দর্যবোধ ও শরীর নিয়ে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি

ঋচা চড্ডা কখনওই তথাকথিত গ্ল্যামারাস নায়িকার তকমা গায়ে মাখেননি। বরং তিনি বারবার সৌন্দর্য নিয়ে সমাজের ভ্রান্ত ধারণার বিরুদ্ধে কথা বলেছেন।

ঐশ্বর্যা রাইয়ের ওজন বৃদ্ধি নিয়ে যখন সোশ্যাল মিডিয়ায় কটাক্ষ চলছিল, তখন ঋচা প্রকাশ্যে তার প্রতিবাদ করেন। তিনি বলেন, বিশ্বের অন্যতম সুন্দরী নারীকে নিয়েও যদি এমন মন্তব্য করা হয়, তা হলে সমস্যা তাঁর চেহারায় নয়—সমস্যা মন্তব্যকারীদের মানসিকতায়।

ঋচার মতে, কাউকে ট্রোল করা বা শরীর নিয়ে কটাক্ষ করা আসলে মানসিক অসুস্থতারই পরিচয়।

বিতর্ক নয়, বার্তা দিতেই কথা বলেন ঋচা

ঋচা চড্ডার প্রতিটি মন্তব্য যে সকলের পছন্দ হবে, এমনটা তিনি নিজেও আশা করেন না। কিন্তু তিনি বিশ্বাস করেন—চুপ করে থাকলে বদল আসে না। তাঁর বক্তব্য, বিতর্ক তৈরি করাই উদ্দেশ্য নয়; উদ্দেশ্য হল সমাজের অসংগতিগুলিকে সামনে আনা।

একজন অভিনেত্রী হয়েও তিনি নিজেকে শুধু বিনোদনের জগতে সীমাবদ্ধ রাখেননি। বরং নিজের পরিচিতি ও প্রভাবকে ব্যবহার করেছেন সামাজিক প্রশ্ন তোলার জন্য।

জন্মদিনে ফিরে দেখা: ঋচা চড্ডা কেন আলাদা

আজ তাঁর জন্মদিনে ঋচা চড্ডাকে শুধু অভিনেত্রী হিসেবেই নয়, একজন সচেতন নাগরিক হিসেবেও দেখা যায়। তিনি নিখুঁত নন, ভুলও করতে পারেন—কিন্তু নিজের অবস্থান নিয়ে কখনও আপস করেন না।

বলিউডে যেখানে অনেকেই বিতর্ক এড়িয়ে চলেন, সেখানে ঋচা বারবার প্রশ্ন তোলেন। আর সেই কারণেই তিনি আলাদা। তাঁকে ভালোবাসুন বা অপছন্দ করুন—উপেক্ষা করা কঠিন।

উপসংহার

ঋচা চড্ডা শুধুমাত্র বলিউডের একজন প্রতিভাবান অভিনেত্রী নন, তিনি বর্তমান সময়ের একজন স্পষ্টভাষী, সচেতন ও সাহসী কণ্ঠস্বর। এমন এক ইন্ডাস্ট্রিতে দাঁড়িয়ে, যেখানে বহু মানুষ জনপ্রিয়তা ও কাজ হারানোর ভয়ে নিজের মতামত প্রকাশ করতে দ্বিধাগ্রস্ত হন, সেখানে ঋচা বারবার প্রমাণ করেছেন—নিজের অবস্থান পরিষ্কার রাখাই তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি। তাঁর সাহসী চরিত্র শুধু সিনেমার পর্দাতেই সীমাবদ্ধ নয়, বাস্তব জীবনেও তিনি সেই চরিত্রকেই বাঁচিয়ে রাখেন।

তাঁর মন্তব্য ঘিরে বিতর্ক হয়েছে, কখনও তীব্র সমালোচনা, কখনও কটাক্ষ, আবার কখনও ব্যক্তিগত আক্রমণের শিকারও হয়েছেন তিনি। কিন্তু লক্ষণীয় বিষয় হল—এই বিতর্কগুলির অধিকাংশই কোনও না কোনও গভীর সামাজিক সমস্যার দিকে আঙুল তুলেছে। নারী নিরাপত্তা, লিঙ্গসমতা, মাতৃত্ব, শরীর নিয়ে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি, রাজনৈতিক সচেতনতা—এই সমস্ত বিষয়েই ঋচা নির্ভীকভাবে কথা বলেছেন। অনেক সময় তাঁর বক্তব্য মানুষের অস্বস্তির কারণ হয়েছে, কারণ তিনি সেই সব প্রশ্ন সামনে এনেছেন, যেগুলি নিয়ে সমাজ কথা বলতে চায় না বা এড়িয়ে যেতে পছন্দ করে।

ঋচা চড্ডার ক্ষেত্রে বিতর্ক কখনও উদ্দেশ্য নয়, বরং তা তাঁর বক্তব্যের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া। তিনি যে কথাগুলি বলেন, তা হয়তো সবসময় পরিমিত বা কূটনৈতিক ভাষায় বলা নয়, কিন্তু তাতে এক ধরনের সততা রয়েছে। তিনি বিশ্বাস করেন, সামাজিক বদল আনতে গেলে মাঝেমধ্যে অস্বস্তিকর প্রশ্ন তুলতেই হয়। নীরবতা বা আপস কোনও সমস্যার সমাধান নয়—এই দর্শনেই তিনি চলেন।

তাঁর জীবনের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, তিনি নিজেকে নিখুঁত বা সর্বজ্ঞ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেন না। ভুল হতে পারে, মত বদলাতেও পারেন—এই স্বীকারোক্তি তাঁর মানবিক দিকটিকেই তুলে ধরে। কন্যাসন্তান প্রসঙ্গে তাঁর মন্তব্য হোক বা স্বাভাবিক প্রসব নিয়ে সমাজমাধ্যমে দেওয়া জবাব—সব ক্ষেত্রেই তিনি নিজের অভিজ্ঞতা ও অনুভূতির কথা খোলাখুলি বলেছেন। আর সেখানেই বহু নারীর সঙ্গে তাঁর এক অদৃশ্য সংযোগ তৈরি হয়েছে।

একজন অভিনেত্রী হিসেবে ঋচা প্রথাগত সৌন্দর্য ও নায়িকাসুলভ ইমেজের বাইরে দাঁড়িয়ে নিজের জায়গা তৈরি করেছেন। ঠিক তেমনই একজন মানুষ হিসেবেও তিনি সমাজের প্রচলিত ছাঁচ ভাঙতে ভয় পান না। চেহারা, শরীর, পোশাক বা জীবনযাপন—এই সব বিষয় নিয়ে সমাজের আরোপিত ধারণার বিরুদ্ধে তিনি ধারাবাহিকভাবে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর এই অবস্থান বহু তরুণ-তরুণীকে নিজের মতো করে বাঁচার সাহস জুগিয়েছে।

সবচেয়ে বড় কথা, ঋচা চড্ডা আমাদের মনে করিয়ে দেন যে, জনপ্রিয়তা বা খ্যাতি মানেই দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব শুধু বিনোদন দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং সমাজের ভুল, বৈষম্য ও অসংগতি নিয়ে কথা বলার মধ্যেও তা অন্তর্ভুক্ত। তিনি সেই দায়িত্ব এড়িয়ে যাননি।

অতএব বলা যায়, ঋচা চড্ডার আসল সাফল্য শুধু পুরস্কার বা হিট ছবিতে নয়। তাঁর সাফল্য লুকিয়ে রয়েছে সেই প্রশ্নগুলিতে, যেগুলি তিনি সাহস করে তুলেছেন; সেই আলোচনা গুলিতে, যেগুলি তিনি উসকে দিয়েছেন; এবং সেই ভাবনায়, যা মানুষকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। আর ঠিক সেখানেই তিনি আলাদা—একজন অভিনেত্রী হিসেবে নয়, একজন সচেতন নাগরিক ও নির্ভীক নারী হিসেবে।

Preview image