বুধবার তামিলাগা ভেট্টিরি কাজ়াগম নেতা তথা মুখ্যমন্ত্রী বিজয় তামিলনাড়ু বিধানসভায় আস্থাভোটে অংশ নেন। ভোটে তাঁর নেতৃত্বাধীন সরকার ১৪৪ জন বিধায়কের সমর্থন পেয়ে আস্থা ভোটে জয়লাভ করে।
তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে নতুন ঝড়, ভাঙনের মুখে এডিএমকে
দক্ষিণ ভারতের রাজনীতিতে ফের এক বড়সড় রাজনৈতিক ভূমিকম্পের ইঙ্গিত মিলছে। তামিলনাড়ুর প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তথা এডিএমকে প্রধান Edappadi K. Palaniswami বুধবার বিধানসভায় আস্থাভোটের পর দলের ২৪ জন বিদ্রোহী বিধায়কের সদস্যপদ খারিজের দাবি জানিয়ে স্পিকারের দ্বারস্থ হয়েছেন। অভিযোগ, এই বিধায়কেরা মুখ্যমন্ত্রী Joseph Vijay-এর আনা আস্থাপ্রস্তাবকে সমর্থন করেছেন, যা দলীয় শৃঙ্খলার সরাসরি লঙ্ঘন।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে তামিলনাড়ুর রাজনৈতিক মহলে তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এর ফলে গত চার দশকের মধ্যে তৃতীয়বার বড় ভাঙনের মুখে পড়তে চলেছে All India Anna Dravida Munnetra Kazhagam বা এডিএমকে।
আস্থাভোট ঘিরে নাটকীয় পরিস্থিতি
বুধবার তামিলনাড়ু বিধানসভায় মুখ্যমন্ত্রী জোসেফ বিজয় তাঁর সরকারের প্রতি আস্থা প্রমাণের জন্য আস্থাপ্রস্তাব আনেন। রাজনৈতিকভাবে এই ভোট ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ গত কয়েক মাস ধরেই রাজ্যে রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং জোট সমীকরণ নিয়ে নানা জল্পনা চলছিল।
আস্থাভোটে বিরোধী দলগুলির একাংশ সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিলেও এডিএমকের ২৪ জন বিধায়ক হঠাৎ করেই সরকারের পাশে দাঁড়ান। এই ঘটনাই দলীয় নেতৃত্বকে চরম অস্বস্তিতে ফেলে দেয়।
ভোটাভুটির পরপরই ইকে পলানীস্বামী সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে বলেন,
“দলবিরোধী কার্যকলাপ বরদাস্ত করা হবে না। যারা দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করে সরকারের পাশে দাঁড়িয়েছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এরপরই স্পিকারের কাছে ওই ২৪ জন বিধায়কের সদস্যপদ খারিজের আবেদন জানানো হয়।
কেন এত গুরুত্বপূর্ণ এই ঘটনা?
তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে এডিএমকে শুধু একটি রাজনৈতিক দল নয়, বরং একটি ঐতিহাসিক শক্তি। কিংবদন্তি অভিনেতা ও প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী M. G. Ramachandran-এর হাত ধরে গড়ে ওঠা এই দল বহু দশক ধরে রাজ্যের ক্ষমতার কেন্দ্রে থেকেছে।
পরে J. Jayalalithaa-র নেতৃত্বে দল আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। কিন্তু জয়ললিতার মৃত্যুর পর থেকেই দলের ভিতরে নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব বাড়তে থাকে।
বর্তমান পরিস্থিতি সেই দ্বন্দ্বকে আরও প্রকাশ্যে এনে দিল।
এডিএমকের ইতিহাসে ভাঙনের অধ্যায়
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এডিএমকের ইতিহাসে এটি নতুন কিছু নয়। গত চার দশকে দলটি একাধিকবার বড় ভাঙনের মুখে পড়েছে।
প্রথম বড় ভাঙন
১৯৮৭ সালে এম জি রামচন্দ্রনের মৃত্যুর পর দল দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। একদিকে ছিলেন তাঁর স্ত্রী জানকি রামচন্দ্রন, অন্যদিকে জয়ললিতা। সেই সময় দলীয় সংঘর্ষ তামিলনাড়ুর রাজনীতিকে প্রবলভাবে নাড়া দিয়েছিল।
দ্বিতীয় বড় ভাঙন
২০১৬ সালে জয়ললিতার মৃত্যুর পর ফের শুরু হয় নেতৃত্বের লড়াই। ও পন্নিরসেলভম ও শশীকলা গোষ্ঠীর দ্বন্দ্ব এডিএমকেকে কার্যত দুর্বল করে দেয়। পরে ইকে পলানীস্বামী ধীরে ধীরে দলের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে আনেন।
এবার তৃতীয় বড় সংকট
বর্তমান পরিস্থিতিতে আবারও দলীয় বিদ্রোহ প্রকাশ্যে চলে এসেছে। ২৪ জন বিধায়কের অবস্থান স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে দলের অন্দরে বড় অংশ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ।
থলপতি বিজয়ের উত্থান এবং নতুন সমীকরণ
তামিল চলচ্চিত্র জগতের জনপ্রিয় অভিনেতা Vijay দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক জল্পনার কেন্দ্রে ছিলেন। তাঁর জনপ্রিয়তা বিপুল, বিশেষ করে যুবসমাজের মধ্যে।
রাজনৈতিক মহলের মতে, সেই জনপ্রিয়তাকেই কাজে লাগিয়ে তিনি ধীরে ধীরে নিজের রাজনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী করছেন। আস্থাভোটে এডিএমকের একাংশের সমর্থন পাওয়া তাঁর রাজনৈতিক সাফল্য হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
অনেকে মনে করছেন, ভবিষ্যতে তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে ডিএমকে বনাম এডিএমকের পুরনো দ্বৈরথ বদলে গিয়ে নতুন ত্রিমুখী সমীকরণ তৈরি হতে পারে।
দলত্যাগ আইন কী বলছে?
ভারতের সংবিধানের দশম তফসিল অনুযায়ী, কোনও বিধায়ক যদি দলীয় হুইপ অমান্য করেন বা দলবিরোধী অবস্থান নেন, তাহলে তাঁর সদস্যপদ খারিজ হতে পারে।
এই ক্ষেত্রে এডিএমকে নেতৃত্ব দাবি করেছে যে ২৪ জন বিধায়ক দলের নির্দেশ অমান্য করেছেন। তাই তাঁদের বিরুদ্ধে দলত্যাগ আইনে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
তবে রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, বিষয়টি এত সহজ নয়। কারণ অভিযুক্ত বিধায়কেরা যদি দাবি করেন যে তাঁরা দল ভাঙেননি, বরং দলের বৃহত্তর স্বার্থে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তাহলে আইনি লড়াই দীর্ঘ হতে পারে।
স্পিকারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ
এখন পুরো বিষয়টির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন বিধানসভার স্পিকার। তিনি যদি সদস্যপদ খারিজের আবেদন গ্রহণ করেন, তাহলে তামিলনাড়ুর রাজনৈতিক সমীকরণ নাটকীয়ভাবে বদলে যেতে পারে।
অন্যদিকে, যদি সিদ্ধান্ত নিতে দেরি হয় বা আবেদন খারিজ করা হয়, তাহলে এডিএমকের ভিতরে বিদ্রোহ আরও বাড়তে পারে।
বিজেপি ও ডিএমকের অবস্থান
এই ঘটনায় অন্যান্য রাজনৈতিক দলও পরিস্থিতির দিকে নজর রাখছে।
Dravida Munnetra Kazhagam ইতিমধ্যেই এডিএমকের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব নিয়ে কটাক্ষ শুরু করেছে। ডিএমকে নেতাদের দাবি, এডিএমকের ভিতরে নেতৃত্ব নিয়ে গভীর অসন্তোষ রয়েছে।
অন্যদিকে Bharatiya Janata Party আপাতত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। কারণ দক্ষিণ ভারতে রাজনৈতিক প্রভাব বাড়ানোর ক্ষেত্রে এডিএমকে এখনও বিজেপির গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী শক্তি।
সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়া
তামিলনাড়ুর সাধারণ মানুষের মধ্যেও এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। একাংশ মনে করছেন, রাজনৈতিক অস্থিরতা রাজ্যের উন্নয়নে প্রভাব ফেলতে পারে। অন্যদিকে অনেক তরুণ ভোটার থলপতি বিজয়ের উত্থানকে নতুন বিকল্প হিসেবে দেখছেন।
সোশ্যাল মিডিয়াতেও বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। “নতুন তামিলনাড়ু রাজনীতি” এখন অন্যতম ট্রেন্ডিং বিষয়।
আগামী দিনে কী হতে পারে?
রাজনৈতিক মহলের মতে, আগামী কয়েক সপ্তাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সম্ভাব্য কয়েকটি পরিস্থিতি হতে পারে—
বিদ্রোহী বিধায়কদের সদস্যপদ খারিজ
এডিএমকের ভিতরে আরও বড় ভাঙন
নতুন রাজনৈতিক জোট গঠন
আগাম নির্বাচনের জল্পনা
থলপতি বিজয়ের রাজনৈতিক অবস্থান আরও শক্তিশালী হওয়া
সব মিলিয়ে তামিলনাড়ুর রাজনীতি এখন অত্যন্ত অনিশ্চিত মোড়ে দাঁড়িয়ে।
এই বিতর্ক কেবল একটি রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব নয়, বরং রাজ্যের বৃহত্তর রাজনৈতিক সমীকরণেও গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ, এআইএডিএমকে-র মতো ঐতিহ্যবাহী দলের ভিত নড়ে গেলে তার সরাসরি সুবিধা নিতে পারে প্রতিপক্ষ দলগুলো, বিশেষ করে ডিএমকে।
বর্তমানে তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে নেতৃত্বের প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। জয়ললিতার মৃত্যুর পর থেকেই এআইএডিএমকে-র মধ্যে নেতৃত্ব নিয়ে টানাপোড়েন চলছিল। ও পন্নীরসেলভম ও ইকে পলানীস্বামীর দ্বন্দ্ব সেই সেই অস্থিরতারই বহিঃপ্রকাশ। দলের সাধারণ কর্মী থেকে শুরু করে সিনিয়র নেতাদের মধ্যেও বিভাজন স্পষ্ট। কেউ পলানীস্বামীর পাশে দাঁড়িয়েছেন, আবার কেউ মনে করছেন দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে নতুন নেতৃত্বের প্রয়োজন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে তার প্রভাব আগামী নির্বাচনে পড়তে বাধ্য। কারণ ভোটাররা সাধারণত স্থিতিশীল নেতৃত্বকেই বেশি গুরুত্ব দেন। যদি দল বারবার আদালত, নির্বাচন কমিশন ও অভ্যন্তরীণ কোন্দলের মধ্যে জড়িয়ে পড়ে, তাহলে সাধারণ মানুষের আস্থা কমে যেতে পারে। বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের একটি বড় অংশ এখন উন্নয়ন, কর্মসংস্থান ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। তারা পুরনো রাজনৈতিক সংঘাতের চেয়ে কার্যকর নেতৃত্ব দেখতে চায়।
অন্যদিকে ডিএমকে ইতিমধ্যেই এই পরিস্থিতিকে নিজেদের পক্ষে কাজে লাগানোর চেষ্টা শুরু করেছে। মুখ্যমন্ত্রী এম কে স্ট্যালিনের নেতৃত্বে দল সংগঠনকে আরও শক্তিশালী করতে ব্যস্ত। তারা চাইছে বিরোধী শিবিরের দুর্বলতাকে সামনে এনে নিজেদের স্থিতিশীল ও ঐক্যবদ্ধ শক্তি হিসেবে তুলে ধরতে। ফলে এআইএডিএমকে-র অভ্যন্তরীণ সংকট যত বাড়বে, ডিএমকের রাজনৈতিক অবস্থান তত মজবুত হতে পারে।
তবে রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই। তামিলনাড়ুর রাজনৈতিক ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, এখানকার ভোটাররা প্রয়োজনে চমক দিতে জানেন। অনেক সময় দুর্বল বলে মনে হওয়া দলও জনসমর্থনের জোরে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। সেই কারণে ইকে পলানীস্বামীর বিরুদ্ধে ওঠা দাবি শেষ পর্যন্ত কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে আদালতের সিদ্ধান্ত, দলের সাংগঠনিক শক্তি এবং সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়ার উপর।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো জোট রাজনীতি। আগামী লোকসভা ও বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিজেপি-সহ জাতীয় দলগুলোর সঙ্গে আঞ্চলিক দলগুলোর সমীকরণও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। এআইএডিএমকে যদি নিজেদের অভ্যন্তরীণ সমস্যা দ্রুত মেটাতে না পারে, তাহলে সম্ভাব্য জোট রাজনীতিতেও তারা পিছিয়ে পড়তে পারে। আবার যদি দল ঐক্যবদ্ধ হয়ে শক্ত অবস্থান নিতে পারে, তাহলে তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে নতুন সমীকরণও তৈরি হতে পারে।
সব মিলিয়ে, বর্তমান পরিস্থিতি তামিলনাড়ুর রাজনীতিকে এক নতুন মোড়ে এনে দাঁড় করিয়েছে। আগামী কয়েক মাসে রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ কোন দিকে যায়, সেটাই এখন সবার নজরে। শুধু একটি দলের ভবিষ্যৎ নয়, বরং পুরো রাজ্যের রাজনৈতিক ভারসাম্যই অনেকাংশে নির্ভর করছে এই সংঘাতের পরিণতির উপর।
উপসংহার
তামিলনাড়ুর রাজনৈতিক ইতিহাসে এডিএমকে বহুবার সংকটের মুখে পড়েছে, কিন্তু প্রতিবারই কোনও না কোনওভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। তবে এবারের পরিস্থিতি অনেক বেশি জটিল বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
একদিকে দলের অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ, অন্যদিকে থলপতি বিজয়ের ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা— এই দুইয়ের চাপে এডিএমকের ভবিষ্যৎ এখন বড় প্রশ্নের মুখে।
ইকে পলানীস্বামীর সদস্যপদ খারিজের দাবি শেষ পর্যন্ত কতটা সফল হয়, সেটাই এখন দেখার। তবে এটুকু স্পষ্ট, তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে নতুন অধ্যায় শুরু হয়ে গেছে।