Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

পুজো উদ্বোধনে তারকার জৌলুস কমছে, অতিথি মন্ত্রী-বিধায়করাই, শহরে আসছেন গোবিন্দা, দিল্লি যাচ্ছেন ঋতুপর্ণা

পুজো উদ্বোধনে তারকাদের উপস্থিতি ঘিরে পাড়ায় পাড়ায় প্রতিযোগিতা! মিমি-শ্রাবন্তীদের নিয়ে চমক দেওয়ার লড়াইয়ে জমে উঠেছে পুজোর প্রস্তুতি।

পুজো উদ্বোধনে তারকাদের জৌলুস কমছে, অতিথি মন্ত্রী-বিধায়করাই! কলকাতায় গোবিন্দা, দিল্লি যাচ্ছেন ঋতুপর্ণা

দুর্গাপুজো মানেই উৎসব, আনন্দ, আড্ডা আর আলোর রোশনাই। কলকাতার পুজোকে ঘিরে উন্মাদনা শুধু মণ্ডপ, প্রতিমা কিংবা থিমের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। পুজোর উদ্বোধনে কোন তারকা আসছেন, কোন অভিনেতা বা অভিনেত্রীর হাত ধরে মণ্ডপের পর্দা উঠছে, তা নিয়েও থাকে ব্যাপক কৌতূহল। বিশেষ করে নামী পুজোগুলির ক্ষেত্রে তারকাদের উপস্থিতি যেন আলাদা আকর্ষণ। পাড়ার পুজোয় প্রিয় অভিনেতা-অভিনেত্রীকে হাজির করানো অনেক সময় সম্মান ও প্রতিযোগিতার বিষয় হয়ে ওঠে। এক পুজো কমিটি কোনও জনপ্রিয় অভিনেত্রীকে নিয়ে এলে পাশের পুজোও পরের বছর আরও বড় চমক দেওয়ার পরিকল্পনা করে। এভাবেই পুজো উদ্বোধনকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে এক বিশেষ সাংস্কৃতিক আবহ।

কিন্তু এবছর সেই পরিচিত ছবিতে কিছুটা পরিবর্তন চোখে পড়ছে বলে দাবি করছেন অনুষ্ঠান আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন। রাজনৈতিক পালাবদল, পুজো কমিটির দায়িত্বে পরিবর্তন এবং বাজেট নিয়ে অনিশ্চয়তার মতো বিষয়ের প্রভাব পড়েছে তারকাদের আমন্ত্রণের ক্ষেত্রে। কয়েকটি বড় পুজোয় চলচ্চিত্র জগতের পরিচিত মুখের বদলে মন্ত্রী-বিধায়কদের প্রধান অতিথি হিসেবে দেখা যাচ্ছে। কোথাও আবার তারকাদের উপস্থিতি থাকলেও আগের মতো সর্বত্র তারকাখচিত উদ্বোধনের ছবি চোখে পড়ছে না।

তবে তার মানে এই নয় যে পুজো উদ্বোধন থেকে বিনোদন জগতের তারকারা পুরোপুরি সরে গিয়েছেন। বিভিন্ন পুজো কমিটির পরিকল্পনায় এখনও রয়েছেন বাংলা ও হিন্দি চলচ্চিত্রের পরিচিত মুখেরা। কলকাতায় বলিউড অভিনেতা গোবিন্দার আসার সম্ভাবনা, সমাজসেবী সংঘের অনুষ্ঠানে প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের উপস্থিতি এবং দিল্লির পুজোয় ঋতুপর্ণা সেনগুপ্তের যোগ দেওয়ার খবর সেই আগ্রহকেই নতুন করে উসকে দিয়েছে।

পুজো উদ্বোধন ঘিরে তারকা-প্রতিযোগিতা

কলকাতার দুর্গাপুজোয় তারকাদের উপস্থিতির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে দীর্ঘদিনের এক সংস্কৃতি। বড় পুজো কমিটিগুলি উদ্বোধনের দিন এমন কাউকে হাজির করতে চায়, যাঁকে দেখতে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিশেষ আগ্রহ তৈরি হবে। কখনও সেই তালিকায় থাকেন জনপ্রিয় চলচ্চিত্র অভিনেতা, কখনও অভিনেত্রী, আবার কখনও সংগীত জগতের পরিচিত শিল্পীরা।

পুজোর উদ্বোধনে তারকার উপস্থিতি একাধিকভাবে পুজো কমিটিকে সাহায্য করে। প্রথমত, উদ্বোধনের দিন মণ্ডপে দর্শকদের আগ্রহ বাড়ে। দ্বিতীয়ত, তারকার উপস্থিতির ছবি ও খবর সংবাদমাধ্যম এবং সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। তৃতীয়ত, পুজোর প্রচারেও এই উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। ফলে পুজোর বাজেট তৈরির সময় অনেক কমিটি তারকাদের পারিশ্রমিকের জন্য আলাদা অর্থ বরাদ্দ করে।

এই প্রতিযোগিতা অনেক সময় পাড়ার মানুষের আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। এক পাড়ার পুজোয় কোনও জনপ্রিয় অভিনেত্রী এলে অন্য পাড়ার বাসিন্দারাও জানতে চান, তাঁদের পুজোয় কে আসছেন। কে বেশি পরিচিত মুখকে আনতে পারল, কার উদ্বোধনে বেশি ভিড় হল, কোন পুজোর ছবি বেশি ছড়াল—এমন নানা বিষয় ঘিরে তৈরি হয় উৎসবের বাইরেও আলাদা উত্তেজনা।

তবে তারকাদের আমন্ত্রণ জানানো যে সব পুজো কমিটির পক্ষে সমানভাবে সম্ভব, তা নয়। জনপ্রিয়তার পাশাপাশি শিল্পীর পারিশ্রমিক, যাতায়াত, নিরাপত্তা, মঞ্চের আয়োজন এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচও বিবেচনা করতে হয়। ফলে বাজেটের পরিবর্তন হলে তার প্রভাব পড়তে পারে উদ্বোধনের পরিকল্পনাতেও।

রাজনৈতিক পালাবদলে বদলাচ্ছে পুজোর উদ্বোধনের ছবিও?

এবছরের পুজোকে ঘিরে আলোচনার অন্যতম বিষয় রাজনৈতিক পালাবদল। রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বিভিন্ন পুজো কমিটির দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের মধ্যেও পরিবর্তন এসেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। আগে যাঁরা তারকাদের সঙ্গে যোগাযোগ, আমন্ত্রণ এবং অনুষ্ঠানের আয়োজনের দায়িত্ব সামলাতেন, তাঁদের কেউ কেউ এখন আর সেই ভূমিকায় নেই। তার ফলে কিছু পুজোয় আগের পরিচিত ব্যবস্থাপনা বজায় রাখা কঠিন হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহলের কয়েকজন।

পুজো কমিটির সঙ্গে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের সম্পর্ক কলকাতার উৎসবের পরিসরে নতুন কিছু নয়। বিভিন্ন সময়ে জনপ্রতিনিধিরা পুজোর উদ্বোধন করেছেন, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছেন এবং উৎসবের আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত থেকেছেন। তবে রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলালে আমন্ত্রিত অতিথিদের তালিকাতেও পরিবর্তন আসতে পারে।

এবার কয়েকটি পুজোয় মন্ত্রী বা বিধায়কদের প্রধান অতিথি হিসেবে রাখার প্রবণতা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। এর পিছনে রাজনৈতিক পরিচিতি বাড়ানোর আগ্রহ কাজ করছে কি না, তা নিয়ে নানা মত রয়েছে। আবার কোনও কোনও আয়োজকের বক্তব্য, পুজোর আর্থিক সীমাবদ্ধতা এবং নতুন পরিস্থিতিতে পরিকল্পনা নিয়ে অনিশ্চয়তাও সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করছে।

তবে সব পুজো কমিটির সিদ্ধান্তের কারণ এক নয়। কোথাও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে আমন্ত্রণ জানানোর পরিকল্পনা আগে থেকেই থাকতে পারে, কোথাও আবার তারকাদের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে পরিবর্তন ঘটেছে। তাই কয়েকটি পুজোর অভিজ্ঞতা থেকে গোটা কলকাতার পুজো উদ্বোধনের চিত্র সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো ঠিক হবে না।

শ্রীভূমি স্পোর্টিং ক্লাবের উদ্বোধন নিয়ে আলোচনা

কলকাতার বড় পুজোগুলির মধ্যে শ্রীভূমি স্পোর্টিং ক্লাবের নাম বিশেষভাবে পরিচিত। মণ্ডপের আয়োজন, থিম এবং উদ্বোধনের অতিথিদের ঘিরে প্রতি বছরই এই পুজোকে কেন্দ্র করে মানুষের আগ্রহ থাকে। অতীতে এই পুজোর উদ্বোধনে চলচ্চিত্র জগতের একাধিক পরিচিত মুখের উপস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

এবার শ্রীভূমি স্পোর্টিং ক্লাবের উদ্বোধন ঘিরে সেই পরিচিত তারকাখচিত ছবির বদলে অন্য ধরনের আয়োজনের কথা উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মণ্ডপ উদ্বোধন করেছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। ফলে উদ্বোধনের মঞ্চে তারকাদের উপস্থিতির বদলে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের ভূমিকা বেশি করে আলোচনায় এসেছে।

বড় পুজোর উদ্বোধনে কে উপস্থিত থাকছেন, তা শুধু অনুষ্ঠানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। এর সঙ্গে পুজোর প্রচার, সংবাদমাধ্যমের আগ্রহ এবং দর্শকদের প্রত্যাশাও জড়িয়ে থাকে। ফলে শ্রীভূমির মতো পরিচিত পুজোয় অতিথির তালিকায় পরিবর্তন এলে তা নিয়ে আলোচনা হওয়াই স্বাভাবিক।

তবে কোনও পুজোয় তারকা কম থাকলেই তার আকর্ষণ কমে যায়, এমন নয়। মণ্ডপের নকশা, প্রতিমার শিল্পকলা, আলোকসজ্জা এবং দর্শনার্থীদের জন্য আয়োজনও পুজোর জনপ্রিয়তা নির্ধারণ করে। উদ্বোধনের অতিথি সেই সামগ্রিক উৎসবের একটি অংশ মাত্র।

হিন্দুস্থান স্পোর্টিং ও বেলেঘাটা ৩৩ পল্লিতেও অতিথি হিসেবে জনপ্রতিনিধিরা

দক্ষিণ কলকাতার হিন্দুস্থান স্পোর্টিং ক্লাব এবং বেলেঘাটা ৩৩ পল্লির মতো পুজোও দর্শকদের কাছে পরিচিত। এই পুজোগুলির উদ্বোধন ঘিরেও অতিথিদের তালিকা নিয়ে আলোচনা চলছে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর কয়েকটি পুজোয় মন্ত্রী বা বিধায়কদের প্রধান অতিথি হিসেবে দেখা যাচ্ছে।

এর ফলে একটি প্রশ্ন সামনে এসেছে—পুজো উদ্বোধনে তারকাদের জনপ্রিয়তার জায়গা কি ধীরে ধীরে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বেরা দখল করছেন? বাস্তবে বিষয়টি এতটা সরল নয়। পুজো কমিটিগুলি নিজেদের পরিকল্পনা, বাজেট, যোগাযোগ এবং অনুষ্ঠানের উদ্দেশ্য অনুযায়ী অতিথি নির্বাচন করে। কোনও পুজো তারকা-নির্ভর উদ্বোধন বেছে নিতে পারে, আবার কোনও পুজো জনপ্রতিনিধি বা সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তিকে সামনে রাখতে পারে।

তারকাদের উপস্থিতি সাধারণত বিনোদন এবং জনপ্রিয় সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত। অন্যদিকে, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের উপস্থিতির সঙ্গে প্রশাসনিক যোগাযোগ, সামাজিক পরিচিতি এবং স্থানীয় রাজনীতির নানা দিক জড়িয়ে থাকতে পারে। তাই অতিথি নির্বাচন পুজো কমিটির নিজস্ব সিদ্ধান্তের বিষয়।

তবে এবছর রাজনৈতিক পালাবদলের প্রেক্ষাপটে এই পরিবর্তনগুলি আরও বেশি করে নজরে আসছে। তারকাদের জৌলুস কমছে বলে যে আলোচনা তৈরি হয়েছে, তার পিছনে এই নতুন পরিস্থিতির ভূমিকা রয়েছে বলেই মনে করছেন কিছু আয়োজক।

মহানায়ক উত্তম কুমারের শতবর্ষে বিশেষ চমক সমাজসেবী সংঘের

এবছর পুজোর উদ্বোধনে তারকাদের উপস্থিতি নিয়ে আলোচনার মধ্যেও ব্যতিক্রমী আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে কয়েকটি পুজোয়। বালিগঞ্জের সমাজসেবী সংঘের থিম মহানায়ক উত্তম কুমারের শতবর্ষকে কেন্দ্র করে সাজানো হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে উত্তম কুমারের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর অভিনয়, পর্দার উপস্থিতি এবং জনপ্রিয়তা কয়েক প্রজন্মের দর্শকের মনে বিশেষ জায়গা তৈরি করেছে। তাই তাঁকে কেন্দ্র করে কোনও পুজোর থিম তৈরি হলে তার সঙ্গে বাংলা সিনেমার ইতিহাস এবং সাংস্কৃতিক স্মৃতির সম্পর্ক তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক।

এই বিশেষ আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত করতে ক্লাব কর্তৃপক্ষ উত্তম কুমারের সহ-অভিনেত্রী সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায় এবং মাধবী মুখোপাধ্যায়কে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন বলে খবর। তাঁদের পাশাপাশি অভিনেতা প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়েরও উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।

এই ধরনের আয়োজনের গুরুত্ব শুধু তারকাদের উপস্থিতিতে নয়, বরং বাংলা সিনেমার ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার মধ্যেও রয়েছে। উত্তম কুমারের সঙ্গে কাজ করেছেন এমন শিল্পীদের উপস্থিতি দর্শকদের কাছে স্মৃতিমেদুর মুহূর্ত তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাস নিয়ে আগ্রহও বাড়তে পারে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, পুজো উদ্বোধনের জন্য প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের পারিশ্রমিক প্রায় সাড়ে তিন লক্ষ টাকা। তবে এই অঙ্কটি সূত্রের দেওয়া তথ্য হিসেবে বিবেচ্য; সংশ্লিষ্ট পক্ষের আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ ছাড়া একে চূড়ান্ত পারিশ্রমিক বলা যায় না।

কলকাতায় আসতে পারেন বলিউড তারকা গোবিন্দা

বাংলা পুজোর মঞ্চে শুধু টলিউডের তারকারাই নন, বলিউডের পরিচিত মুখদেরও আমন্ত্রণ জানানো হয়। হিন্দি চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় অভিনেতা গোবিন্দা সেই তালিকায় অন্যতম আকর্ষণীয় নাম। তাঁর অভিনয়, নাচ এবং কমেডির জন্য দীর্ঘদিন ধরেই দর্শকদের মধ্যে পরিচিতি রয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিউটাউনের একটি পুজোর উদ্বোধনে যোগ দিতে কলকাতায় আসতে পারেন গোবিন্দা। তাঁকে আনতে পুজো কমিটির প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ লক্ষ টাকা খরচ হতে পারে বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে।

এই অঙ্কটি যথেষ্ট বড় হওয়ায় বিষয়টি বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। কোনও জনপ্রিয় বলিউড তারকাকে উদ্বোধনে আনার ক্ষেত্রে পারিশ্রমিকের পাশাপাশি যাতায়াত, নিরাপত্তা, আতিথেয়তা এবং অন্যান্য ব্যবস্থাপনার খরচও থাকতে পারে। ফলে কোনও শিল্পীকে আমন্ত্রণ জানানোর মোট বাজেট শুধু তাঁর পারিশ্রমিকের অঙ্কের সমান নাও হতে পারে।

গোবিন্দার মতো পরিচিত তারকার উপস্থিতি দর্শকদের মধ্যে বাড়তি আগ্রহ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে যাঁরা তাঁকে বড় পর্দায় দেখে বড় হয়েছেন, তাঁদের কাছে সরাসরি দেখার সুযোগ আকর্ষণীয় হতে পারে। তবে তাঁর কলকাতা সফর এবং উপস্থিতি চূড়ান্ত কি না, তা নিশ্চিত তথ্যের ভিত্তিতেই বিবেচনা করা উচিত।

news image
আরও খবর

দিল্লির পুজোয় যোগ দেবেন ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত

পুজোর সময় বাংলা চলচ্চিত্রের তারকারা শুধু কলকাতা বা শহরতলির মণ্ডপেই সীমাবদ্ধ থাকেন না। রাজ্যের বিভিন্ন জেলা এবং দেশের অন্য শহরেও পুজোর উদ্বোধন ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে তাঁদের আমন্ত্রণ জানানো হয়। এর ফলে দুর্গাপুজোর উৎসব কলকাতার বাইরেও তারকাদের উপস্থিতিতে বিশেষ মাত্রা পায়।

অভিনেত্রী ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত এ বছর দিল্লির একটি পুজোর অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলা চলচ্চিত্রে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করা ঋতুপর্ণার উপস্থিতি দিল্লির বাঙালি সম্প্রদায়ের পুজো উদ্‌যাপনে বাড়তি আকর্ষণ তৈরি করতে পারে।

কলকাতার বাইরে দুর্গাপুজো আয়োজনের ক্ষেত্রে প্রবাসী বাঙালিদের আবেগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কর্মসূত্রে বা অন্য কারণে দিল্লি-সহ বিভিন্ন শহরে বসবাস করলেও বহু মানুষ দুর্গাপুজোর সময় বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি, খাবার এবং সামাজিক মিলনমেলার সঙ্গে যুক্ত থাকতে চান। সেই আবহে কোনও পরিচিত বাংলা অভিনেত্রীর উপস্থিতি উৎসবের আনন্দ বাড়াতে পারে।

ঋতুপর্ণার দিল্লি সফরের খবর তাই শুধু তারকাদের তালিকার অংশ নয়, বরং বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে থাকা বাঙালিদের পুজোর সঙ্গে সাংস্কৃতিক সংযোগেরও একটি দিক তুলে ধরে।

শ্রাবন্তী, অঙ্কুশ ও কৌশানীর পারিশ্রমিক কত?

পুজো উদ্বোধন এবং উৎসবের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তারকাদের পারিশ্রমিক নিয়েও মানুষের কৌতূহল থাকে। প্রতিবেদনে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাংলা চলচ্চিত্রের অভিনেত্রী শ্রাবন্তী চট্টোপাধ্যায় একটি পুজো উদ্বোধনের জন্য প্রায় দু'লক্ষ টাকা পারিশ্রমিক নেন বলে সূত্রের দাবি। শহরতলির একটি পুজোয় তাঁকে দেখা যেতে পারে বলেও খবর রয়েছে।

অভিনেতা অঙ্কুশ হাজরার ক্ষেত্রেও পুজো উদ্বোধনের পারিশ্রমিক প্রায় দু'লক্ষ টাকা বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে, অভিনেত্রী কৌশানী মুখোপাধ্যায়ের পুজো উপলক্ষে কয়েকটি অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে। তাঁর পারিশ্রমিক প্রায় দেড় লক্ষ টাকা বলে সূত্রের দাবি।

এই অঙ্কগুলি শিল্পীদের প্রতিটি অনুষ্ঠানের জন্য নির্দিষ্ট বা সর্বজনীনভাবে প্রযোজ্য, এমন ধরে নেওয়া উচিত নয়। অনুষ্ঠানটির ধরন, সময়, স্থান, যাতায়াত, উপস্থিতির সময়সীমা এবং চুক্তির শর্ত অনুযায়ী পারিশ্রমিক বদলাতে পারে। সংশ্লিষ্ট শিল্পী বা তাঁদের প্রতিনিধির আনুষ্ঠানিক বক্তব্য ছাড়া এগুলিকে সূত্রনির্ভর তথ্য হিসেবেই দেখা উচিত।

তারকাদের পারিশ্রমিকের অঙ্ক শুনে অনেকের মনে প্রশ্ন উঠতে পারে, পুজো কমিটিগুলি এত টাকা খরচ করে কেন? এর একটি কারণ হল, পরিচিত মুখকে উদ্বোধনে আনলে পুজোর প্রচার বাড়তে পারে। সামাজিক মাধ্যমে ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা থাকে। আবার উদ্বোধনের দিন দর্শকদের আগ্রহও বাড়তে পারে। তবে এই খরচ পুজোর সামগ্রিক বাজেটের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা কমিটিকেই বিচার করতে হয়।

ছোটপর্দার তারকারাও ব্যস্ত পুজোর মরশুমে

শুধু বড় পর্দার অভিনেতা-অভিনেত্রীরাই নন, ছোটপর্দার তারকারাও দুর্গাপুজোর সময় বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নেন। কলকাতা থেকে শুরু করে শহরতলি এবং জেলার বিভিন্ন পুজোয় তাঁদের আমন্ত্রণ জানানো হয়। অনেক ক্ষেত্রেই তাঁরা মঞ্চে উপস্থিত থাকেন, দর্শকদের সঙ্গে কথা বলেন এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের অংশ হন।

প্রতিবেদনে দেওয়া সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, অভিনেত্রী অঙ্কিতা মল্লিকের পারিশ্রমিক প্রায় ৫৫ হাজার টাকা এবং সুস্মিতা দে-র পারিশ্রমিক প্রায় ৬০ হাজার টাকা। অভিনেতা সাহেব ভট্টাচার্যের ক্ষেত্রে এই অঙ্ক প্রায় ৭০ হাজার টাকা বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ছাড়া রণজয় বিষ্ণু, দিতিপ্রিয়া রায় এবং তৃণা সাহার পারিশ্রমিক এক লক্ষ টাকার কাছাকাছি বলে সূত্রের দাবি। এই অঙ্কগুলিও আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত না হলে সম্ভাব্য বা সূত্রনির্ভর পারিশ্রমিক হিসেবেই বিবেচনা করা উচিত।

ছোটপর্দার শিল্পীদের জনপ্রিয়তা অনেক সময় ধারাবাহিকের দর্শকসংখ্যা এবং চরিত্রের গ্রহণযোগ্যতার সঙ্গে যুক্ত থাকে। ফলে কোনও ধারাবাহিকের পরিচিত মুখকে পুজোর মঞ্চে দেখার জন্য দর্শকদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি হয়। বিশেষ করে যাঁরা নিয়মিত টেলিভিশনের অনুষ্ঠান দেখেন, তাঁদের কাছে প্রিয় অভিনেতা-অভিনেত্রীকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ আলাদা আনন্দের।

পুজোর মরশুমে একাধিক অনুষ্ঠান থাকায় ছোটপর্দার শিল্পীদের সময়সূচিও ব্যস্ত হয়ে ওঠে। একই দিনে বিভিন্ন জায়গায় উপস্থিত থাকার পরিকল্পনা করতে হলে যাতায়াত এবং সময়ের হিসাবও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

কমছে অনুষ্ঠানের বুকিং, বলছেন আয়োজকরা

তারকাদের পারিশ্রমিকের পাশাপাশি এবছর অনুষ্ঠান আয়োজনের সামগ্রিক চাহিদা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। আয়োজক তোচন ঘোষের বক্তব্য অনুযায়ী, এবছর অনুষ্ঠানের বুকিং আগের তুলনায় কম এসেছে। তিনি পুজো কমিটিগুলির আর্থিক সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, করোনা-পরবর্তী সময় থেকেই অনুষ্ঠানের সংখ্যা কমার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, আর এবছর বুকিং আরও কমেছে।

এই বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, পুজোর অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা শুধু তারকাদের জনপ্রিয়তার ওপর নির্ভর করে না। কমিটির হাতে কত টাকা রয়েছে, স্পনসরশিপ কতটা পাওয়া যাচ্ছে, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের জন্য কতটা বরাদ্দ রাখা সম্ভব—এসব বিষয়ও সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলে।

দুর্গাপুজো আয়োজনের খরচের মধ্যে থাকে মণ্ডপ নির্মাণ, প্রতিমা, আলো, বিদ্যুৎ, নিরাপত্তা, স্বেচ্ছাসেবক, প্রচার এবং দর্শনার্থীদের জন্য নানা ব্যবস্থা। তার সঙ্গে বড় মাপের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান যোগ হলে বাজেট আরও বাড়ে। ফলে কোনও পুজো কমিটি যদি আর্থিক চাপ অনুভব করে, তাহলে তারকাদের আমন্ত্রণ বা অনুষ্ঠানসংখ্যা কমানোর সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

অন্যদিকে, কিছু পুজো কমিটি হয়তো তারকাদের বদলে স্থানীয় শিল্পী, সাংস্কৃতিক দল বা সামাজিকভাবে পরিচিত ব্যক্তিদের নিয়ে অনুষ্ঠান সাজানোর কথা ভাবতে পারে। এতে খরচ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি স্থানীয় প্রতিভাকে তুলে ধরার সুযোগও তৈরি হয়।

নতুন পরিস্থিতিতে অতিথি নির্বাচনে সংশয়

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক অনুষ্ঠান আয়োজকের বক্তব্য অনুযায়ী, নতুন সরকার আসার পর কয়েকটি পুজো কমিটির মধ্যে কতটা জাঁকজমক করা সম্ভব, তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে। তাঁর দাবি, কিছু কমিটি মন্ত্রী-বিধায়কদের সঙ্গে পরিচিতি বাড়ানোর উদ্দেশ্যেও তাঁদের পুজোর উদ্বোধনে আমন্ত্রণ জানাচ্ছে।

তবে এই বক্তব্য সংশ্লিষ্ট এক আয়োজকের অভিজ্ঞতা ও মতামত হিসেবে দেখা উচিত। সব পুজো কমিটি একই কারণে অতিথি নির্বাচন করছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর মতো তথ্য এখানে নেই। রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে আমন্ত্রণ জানানোর পিছনে সামাজিক যোগাযোগ, স্থানীয় সম্পর্ক, প্রশাসনিক উপস্থিতি অথবা অনুষ্ঠানের নিজস্ব পরিকল্পনাও থাকতে পারে।

এখানে আর্থিক বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। তারকাদের পারিশ্রমিক বেশি হলে কমিটি বিকল্প অতিথি বেছে নিতে পারে। আবার কোনও পুজো যদি বিশেষ কোনও চলচ্চিত্রের ইতিহাস বা সাংস্কৃতিক বিষয়কে কেন্দ্র করে আয়োজন করে, তাহলে সেই ক্ষেত্রের শিল্পীদের আমন্ত্রণ জানানোই বেশি উপযুক্ত বলে মনে হতে পারে।

অতএব, এবছরের পরিবর্তনকে একমাত্র রাজনৈতিক কারণ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যেমন ঠিক হবে না, তেমনই বাজেটের সমস্যাকেই একমাত্র কারণ বলে ধরে নেওয়াও যুক্তিসঙ্গত নয়। পুজো কমিটির সিদ্ধান্তে একাধিক বিষয় একসঙ্গে কাজ করতে পারে।

পুজোর জৌলুস কি শুধু তারকাদের উপস্থিতিতেই নির্ভরশীল?

তারকাদের উপস্থিতি দুর্গাপুজোর একটি আকর্ষণীয় অংশ হলেও পুজোর আসল শক্তি আরও অনেক বড়। কলকাতার দুর্গাপুজো মূলত শিল্প, সংস্কৃতি, সামাজিক মিলন এবং সামগ্রিক উৎসবের অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত। কোনও মণ্ডপের বিশেষ থিম, প্রতিমার নকশা, আলোর ব্যবহার, পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ কিংবা দর্শনার্থীদের জন্য সুব্যবস্থা—এসব বিষয়ও একটি পুজোকে জনপ্রিয় করে তুলতে পারে।

অনেক দর্শনার্থী নির্দিষ্ট কোনও তারকাকে দেখার জন্য উদ্বোধনের দিন মণ্ডপে যান। আবার বহু মানুষ পুজোর দিনগুলিতে প্রতিমা দর্শন, বন্ধুদের সঙ্গে ঘোরা, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো এবং শহরের বিভিন্ন মণ্ডপের শিল্পকর্ম দেখতেই বেশি আগ্রহী। ফলে উদ্বোধনের মঞ্চে কে উপস্থিত থাকছেন, তা পুজোর সামগ্রিক সাফল্যের একটি মাত্র দিক।

তারকাদের উপস্থিতি কমলেও কোনও পুজো যদি সুন্দর থিম, আকর্ষণীয় প্রতিমা এবং ভালো ব্যবস্থাপনা উপহার দিতে পারে, তাহলে দর্শকদের আগ্রহ বজায় থাকতে পারে। আবার বিপুল অর্থ খরচ করে তারকাকে আনলেও মণ্ডপের অন্য দিকগুলি দুর্বল হলে সেই পুজোর সামগ্রিক অভিজ্ঞতা প্রত্যাশা পূরণ নাও করতে পারে।

এই কারণেই পুজো কমিটিগুলির সামনে চ্যালেঞ্জ হল বাজেট, সাংস্কৃতিক আকর্ষণ এবং দর্শকদের প্রত্যাশার মধ্যে ভারসাম্য রাখা। কে উদ্বোধন করছেন, তার পাশাপাশি পুজোর মূল আয়োজন কতটা আকর্ষণীয়, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

শেষ কথা

এবছরের দুর্গাপুজো উদ্বোধন ঘিরে তারকাদের উপস্থিতি, রাজনৈতিক পালাবদল এবং অনুষ্ঠান আয়োজনের বাজেট—তিনটি বিষয়ই আলোচনায় উঠে এসেছে। কয়েকটি বড় পুজোয় মন্ত্রী-বিধায়কদের প্রধান অতিথি হিসেবে দেখা যাচ্ছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। অন্যদিকে, সমাজসেবী সংঘের মতো পুজোয় বাংলা চলচ্চিত্রের পরিচিত শিল্পীদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। নিউটাউনের একটি পুজোয় গোবিন্দার আসার সম্ভাবনা এবং দিল্লির পুজোয় ঋতুপর্ণা সেনগুপ্তের যোগ দেওয়ার খবরও দর্শকদের আগ্রহ বাড়াচ্ছে।

একই সঙ্গে বিভিন্ন তারকার পারিশ্রমিক এবং অনুষ্ঠানের বুকিং কমে যাওয়ার বিষয়টি পুজো আয়োজনের অর্থনৈতিক দিকটি সামনে এনেছে। তবে কয়েকটি পুজোর অভিজ্ঞতা থেকে গোটা শহরের পুজো উদ্বোধনের চিত্র বদলে গিয়েছে, এমন চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর আগে আরও বিস্তৃত তথ্য প্রয়োজন।

শেষ পর্যন্ত দুর্গাপুজোর আনন্দ শুধু উদ্বোধনের মঞ্চে কে থাকছেন, তার ওপর নির্ভর করে না। তারকাদের উপস্থিতি উৎসবের জৌলুস বাড়াতে পারে, কিন্তু পুজোর প্রাণ থাকে মানুষের অংশগ্রহণ, শিল্প-সংস্কৃতি এবং একসঙ্গে আনন্দ করার মধ্যেই। এবছর সেই উৎসবে কোথাও তারকার ঝলক, কোথাও জনপ্রতিনিধিদের উপস্থিতি, আবার কোথাও থিম ও শিল্পকলাই হয়ে উঠতে পারে প্রধান আকর্ষণ।

Preview image