ভারতীয় বিনিয়োগকারীরা এখন আর শুধুমাত্র দেশের বাজারেই সীমাবদ্ধ নেই। সাম্প্রতিক এক রিপোর্ট অনুযায়ী, ক্রমশই বিদেশি বাজারে বিনিয়োগের পরিধি বাড়াচ্ছেন ভারতের ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা। শেয়ার, মিউচুয়াল ফান্ড, রিয়েল এস্টেট ও স্টার্টআপ বিভিন্ন খাতে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগে আগ্রহ বাড়ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈশ্বিক বৈচিত্র্য, ঝুঁকি কমানো এবং উন্নত রিটার্নের লক্ষ্যেই এই প্রবণতা বাড়ছে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও সহজ বিনিয়োগ নীতির ফলে এখন বিদেশে বিনিয়োগ আগের তুলনায় অনেক সহজ হয়ে উঠেছে।
ভারতীয় বিনিয়োগ জগতে এক গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন স্পষ্ট হয়ে উঠছে। দীর্ঘদিন ধরে দেশের শেয়ার বাজার, রিয়েল এস্টেট কিংবা সোনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা ভারতীয় বিনিয়োগকারীরা এখন ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক বাজারের দিকে ঝুঁকছেন। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ভারতীয় ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা আগের তুলনায় অনেক বেশি হারে বিদেশি সম্পদে বিনিয়োগ করে নিজেদের পোর্টফোলিওকে বৈচিত্র্যময় করছেন।
এই পরিবর্তন শুধুমাত্র ধনী বা অতি উচ্চবিত্ত শ্রেণির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। মধ্যবিত্ত ও উচ্চ-মধ্যবিত্ত পরিবারের বিনিয়োগকারীরাও এখন বিদেশি শেয়ার, মিউচুয়াল ফান্ড, এক্সচেঞ্জ ট্রেডেড ফান্ড (ETF), রিয়েল এস্টেট এমনকি আন্তর্জাতিক স্টার্টআপেও বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হচ্ছেন। অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি ভারতীয় বিনিয়োগ সংস্কৃতির এক নতুন অধ্যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রবণতার অন্যতম প্রধান কারণ হলো বৈচিত্র্যকরণ (Diversification)। একমাত্র দেশের বাজারের উপর নির্ভর না করে বিদেশি সম্পদে বিনিয়োগ করলে ঝুঁকি অনেকটাই কমানো যায়। একই সঙ্গে উন্নত দেশগুলির শক্তিশালী কোম্পানি, প্রযুক্তি খাত এবং উদ্ভাবনী স্টার্টআপে বিনিয়োগের মাধ্যমে ভালো রিটার্ন পাওয়ার সম্ভাবনাও বাড়ে।
রিপোর্ট অনুযায়ী, ভারতীয় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বিদেশি শেয়ার ও এক্সচেঞ্জ ট্রেডেড ফান্ড (ETF)-এ বিনিয়োগের প্রবণতা সবচেয়ে বেশি বেড়েছে। বিশেষ করে মার্কিন প্রযুক্তি সংস্থাগুলি—যেমন প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সবুজ শক্তি খাতের কোম্পানিগুলি—ভারতীয় বিনিয়োগকারীদের বিশেষ আকর্ষণ করছে।
এছাড়াও বিদেশি রিয়েল এস্টেট বাজারেও আগ্রহ বাড়ছে। আমেরিকা, দুবাই ও ইউরোপের কিছু শহরে আবাসিক ও বাণিজ্যিক সম্পত্তিতে বিনিয়োগ করছেন বহু ভারতীয়। এর পেছনে রয়েছে স্থিতিশীল আয়, মুদ্রা বৈচিত্র্য এবং ভবিষ্যতে সম্পদের মূল্যবৃদ্ধির সম্ভাবনা।
ডিজিটাল বিনিয়োগ প্ল্যাটফর্ম এবং ফিনটেক সংস্থাগুলির ভূমিকা এই পরিবর্তনের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আগে যেখানে বিদেশে বিনিয়োগ করতে জটিল কাগজপত্র ও বড় অঙ্কের অর্থ প্রয়োজন হত, এখন সেখানে মোবাইল অ্যাপ বা অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমেই তুলনামূলক কম অর্থে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ করা সম্ভব হচ্ছে।
সরকারি নীতিও এই প্রবণতাকে কিছুটা সহায়ক করেছে। লিবারালাইজড রেমিট্যান্স স্কিম (LRS)-এর আওতায় ভারতীয় নাগরিকরা নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে বিদেশে বিনিয়োগের সুযোগ পাচ্ছেন। এর ফলে বৈধ ও নিয়ন্ত্রিত পথে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ করা সহজ হয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্কও করছেন। বিদেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে মুদ্রা ঝুঁকি, আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা এবং ভিন্ন দেশের করনীতি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকা জরুরি। সঠিক আর্থিক পরামর্শ ছাড়া বিনিয়োগ করলে ক্ষতির সম্ভাবনাও থাকে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ভারতীয় বিনিয়োগকারীদের দৃষ্টিভঙ্গিতে একটি বড় পরিবর্তন এসেছে। দেশের বাজারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকে গুরুত্ব দিয়ে তাঁরা নিজেদের আর্থিক ভবিষ্যৎ আরও শক্তিশালী করার চেষ্টা করছেন। আগামী দিনে এই প্রবণতা আরও বাড়বে বলেই মনে করছেন অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরা।
এই প্রবণতার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো ঝুঁকি কমানো ও বৈচিত্র্যকরণ। শুধুমাত্র একটি দেশের বাজারের উপর নির্ভর করলে অর্থনৈতিক মন্দা, রাজনৈতিক অস্থিরতা বা নীতিগত পরিবর্তনের কারণে বিনিয়োগকারীরা বড় ধাক্কা খেতে পারেন। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে বিনিয়োগ করলে সেই ঝুঁকি অনেকটাই ভাগ হয়ে যায়।
দ্বিতীয় কারণ হলো উন্নত অর্থনীতির স্থিতিশীলতা। আমেরিকা, ইউরোপ, জাপান কিংবা কিছু উপসাগরীয় দেশের অর্থনীতি তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল এবং দীর্ঘমেয়াদে ধারাবাহিক বৃদ্ধি বজায় রাখে। ফলে সেখানে বিনিয়োগ করলে দীর্ঘমেয়াদে স্থায়ী রিটার্ন পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
তৃতীয় কারণ হলো বৈশ্বিক সংস্থায় অংশীদার হওয়ার সুযোগ। অ্যাপল, গুগল, মাইক্রোসফট, অ্যামাজন, টেসলার মতো বিশ্বখ্যাত সংস্থায় সরাসরি বা পরোক্ষভাবে বিনিয়োগ করার সুযোগ ভারতীয় বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ করছে।
রিপোর্ট অনুযায়ী, ভারতীয় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আগ্রহ দেখা যাচ্ছে বিদেশি শেয়ার ও ETF-এ। বিশেষ করে মার্কিন স্টক মার্কেট ভারতীয় বিনিয়োগকারীদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বাস্থ্য পরিষেবা ও সবুজ শক্তি খাতের সংস্থাগুলি বিশেষভাবে নজর কাড়ছে।
ETF-এর মাধ্যমে বিনিয়োগকারীরা একসঙ্গে একাধিক সংস্থায় বিনিয়োগ করতে পারছেন, যা ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করছে। কম খরচ, স্বচ্ছতা এবং সহজ লেনদেনের সুবিধার কারণে ETF বিদেশি বিনিয়োগের একটি জনপ্রিয় মাধ্যম হয়ে উঠেছে।
শুধু শেয়ার নয়, আন্তর্জাতিক মিউচুয়াল ফান্ডেও আগ্রহ বাড়ছে। অনেক ভারতীয় ফান্ড হাউস এখন বিদেশি বাজারের উপর ভিত্তি করে ফান্ড চালু করছে। এর ফলে সরাসরি বিদেশি স্টক বেছে নেওয়ার ঝামেলা ছাড়াই আন্তর্জাতিক বাজারে অংশগ্রহণ করা সম্ভব হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন বিনিয়োগকারীদের জন্য এই ধরনের ফান্ড তুলনামূলকভাবে নিরাপদ ও সহজ বিকল্প।
রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, ভারতীয় বিনিয়োগকারীদের একাংশ বিদেশি রিয়েল এস্টেট বাজারেও আগ্রহ দেখাচ্ছেন। বিশেষ করে দুবাই, আমেরিকার কিছু শহর, কানাডা এবং ইউরোপের নির্দিষ্ট অঞ্চলে আবাসিক ও বাণিজ্যিক সম্পত্তিতে বিনিয়োগ বাড়ছে।
এর প্রধান কারণ হলো স্থিতিশীল ভাড়ার আয়, সম্পদের মূল্যবৃদ্ধির সম্ভাবনা এবং মুদ্রা বৈচিত্র্য। অনেক ক্ষেত্রেই বিদেশে সম্পত্তি কিনে ভাড়া দেওয়ার মাধ্যমে নিয়মিত আয় করছেন ভারতীয় বিনিয়োগকারীরা।
বিদেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও ফিনটেক সংস্থাগুলির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আগে যেখানে বিদেশে বিনিয়োগ করতে জটিল কাগজপত্র, ব্যাংকিং প্রক্রিয়া ও বড় অঙ্কের অর্থ প্রয়োজন হত, এখন সেখানে মোবাইল অ্যাপ বা অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমেই অল্প অর্থে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ করা সম্ভব হচ্ছে।
এই প্রযুক্তিগত উন্নতির ফলে তরুণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যেও বিদেশি বিনিয়োগের আগ্রহ বেড়েছে।
ভারত সরকারের লিবারালাইজড রেমিট্যান্স স্কিম (LRS) বিদেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা পালন করছে। এই স্কিমের আওতায় ভারতীয় নাগরিকরা নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে বিদেশে টাকা পাঠিয়ে বিনিয়োগ করতে পারেন। ফলে বৈধ ও নিয়ন্ত্রিত পথে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ করা সহজ হয়েছে।
তবে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক ও সরকার নিয়মিত এই বিনিয়োগের উপর নজর রাখছে, যাতে অর্থ পাচার বা অনিয়ম না ঘটে।
বিদেশে বিনিয়োগের সঙ্গে কিছু ঝুঁকিও রয়েছে। মুদ্রা বিনিময় হারের ওঠানামা বিনিয়োগের রিটার্নে প্রভাব ফেলতে পারে। পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের করনীতি ও আইনি কাঠামো বোঝা অত্যন্ত জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সঠিক আর্থিক পরামর্শ ছাড়া বিদেশে বিনিয়োগ করলে ক্ষতির সম্ভাবনাও থাকে। তাই বিনিয়োগের আগে পর্যাপ্ত গবেষণা করা অত্যন্ত প্রয়োজন।
ভারতীয় বিনিয়োগ জগতে এক নতুন প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। সাম্প্রতিক এক রিপোর্টে জানানো হয়েছে, দেশের বিনিয়োগকারীরা ক্রমশ নিজেদের বিনিয়োগ পোর্টফোলিওকে আন্তর্জাতিক স্তরে প্রসারিত করছেন। শুধুমাত্র ভারতের শেয়ার বাজার বা স্থাবর সম্পত্তিতে বিনিয়োগ না করে এখন অনেকেই আমেরিকা, ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য এবং এশিয়ার অন্যান্য উন্নত অর্থনীতির দিকে নজর দিচ্ছেন।
তরুণ প্রজন্ম এবং প্রবাসী ভারতীয়দের (NRI) মধ্যেও এই প্রবণতা স্পষ্ট। আন্তর্জাতিক বাজার সম্পর্কে সচেতনতা, ডিজিটাল সাক্ষরতা এবং বৈশ্বিক সংযোগের কারণে তাঁরা সহজেই বিদেশে বিনিয়োগ করতে পারছেন।
অনেক তরুণ বিনিয়োগকারী এটিকে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক নিরাপত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখছেন।
অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী দিনে ভারতীয় বিনিয়োগকারীদের বিদেশমুখী বিনিয়োগ আরও বাড়বে। বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গে ভারতের সংযোগ যত বাড়বে, ততই আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের গুরুত্ব বৃদ্ধি পাবে।
তবে একই সঙ্গে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারের শক্তি বজায় রাখাও জরুরি। ভারসাম্যপূর্ণ পোর্টফোলিও গঠনই ভবিষ্যতের বিনিয়োগ কৌশলের মূল চাবিকাঠি।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ভারতীয় বিনিয়োগকারীদের দৃষ্টিভঙ্গিতে এক মৌলিক পরিবর্তন ঘটছে। দেশের বাজারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে তাঁরা নিজেদের আর্থিক ভবিষ্যৎ আরও নিরাপদ ও শক্তিশালী করার চেষ্টা করছেন।
এই প্রবণতা শুধু ব্যক্তিগত সম্পদ বৃদ্ধির ক্ষেত্রেই নয়, বরং ভারতের আর্থিক ব্যবস্থাকে আরও বৈশ্বিক ও পরিণত করে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। আগামী দিনে বিদেশমুখী এই বিনিয়োগ ধারা কতটা বিস্তৃত হয়, সেদিকেই এখন নজর অর্থনৈতিক মহলের।