Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

সকালে উঠেই বিছানা গুছিয়ে ফেলেন এই অভ্যাসই কি ক্ষতি করছে আপনার ফুসফুসের

সকালে ঘুম থেকে উঠে সঙ্গে সঙ্গে বিছানা গুছিয়ে ফেলার অভ্যাস অনেকের কাছেই পরিচ্ছন্নতার পরিচায়ক। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অভ্যাসই অজান্তে শ্বাসপ্রশ্বাসের সমস্যার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। বিশেষ করে যাঁদের শ্বাসনালী আগে থেকেই সংবেদনশীল বা হালকা অস্বস্তি রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে এই অভ্যাস আরও বেশি ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে। তাই সকালে বিছানা গুছোনোর আগে কিছুটা সময় অপেক্ষা করা শ্বাসযন্ত্রের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী হতে পারে।

ঘুম থেকে উঠেই চাদর ভাঁজ করে খাট ঝেড়ে নেওয়ার অভ্যাস বহু বাড়িতেই ছোটবেলা থেকে শেখানো হয়। পরিচ্ছন্নতা, শৃঙ্খলা ও গুছিয়ে রাখার শিক্ষা যেন এই অভ্যাসের সঙ্গেই ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বিছানা না গোছালে বাড়ির বড়দের বকুনি খাওয়াটাও অনেকের শৈশবের পরিচিত অভিজ্ঞতা। তাই স্বাভাবিক ভাবেই সকালের প্রথম কাজ হিসেবে বিছানা গুছিয়ে ফেলা বহু মানুষের কাছে একটি ভাল অভ্যাস হিসেবেই বিবেচিত হয়। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ঘর মানেই স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন—এই ধারণা আমাদের মনে গভীরভাবে গেঁথে রয়েছে।

কিন্তু সাম্প্রতিক একাধিক বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও বিশেষজ্ঞ মতামত বলছে, এই তথাকথিত ‘ভাল অভ্যাস’-এর মধ্যেই লুকিয়ে থাকতে পারে শ্বাসযন্ত্রের জন্য নীরব বিপদ। বিশেষ করে যাঁদের শ্বাসনালী সংবেদনশীল, যাঁরা হাঁপানি, অ্যালার্জি, সাইনাস বা দীর্ঘদিনের কাশি ও শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যায় ভুগছেন, তাঁদের ক্ষেত্রে সকালে ঘুম থেকে উঠেই বিছানা গুছিয়ে ফেলার অভ্যাস ক্ষতিকারক হয়ে উঠতে পারে। এমনকি আপাতদৃষ্টিতে সুস্থ মানুষদের ক্ষেত্রেও দীর্ঘদিন ধরে এই অভ্যাস বজায় থাকলে ধীরে ধীরে শ্বাসযন্ত্রের উপর তার নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে মত বিশেষজ্ঞদের।

ঘুমের সময় শরীর থেকে ঘাম ও জলীয় বাষ্প বের হয়, যা বিছানার চাদর, বালিশ ও গদির ভিতরে জমে থাকে। পাশাপাশি ত্বক থেকে ঝরে পড়ে অসংখ্য মৃত কোষ। এই সব মিলিয়ে বিছানার ভিতরে তৈরি হয় উষ্ণ ও আর্দ্র পরিবেশ, যা ডাস্ট মাইট নামের অতি ক্ষুদ্র জীবের বংশবিস্তারের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। এই ডাস্ট মাইট চোখে দেখা না গেলেও এদের উপস্থিতি শ্বাসযন্ত্রের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হতে পারে।

ডাস্ট মাইটের দেহাংশ ও মল বাতাসে মিশে অ্যালার্জেন হিসেবে কাজ করে। শ্বাসের সঙ্গে এই কণাগুলি শরীরে প্রবেশ করলে হাঁচি, কাশি, নাক বন্ধ হওয়া, চোখ জ্বালা, গলা খুসখুস করা কিংবা হাঁপানির উপসর্গ তীব্র হয়ে উঠতে পারে। সকালে ঘুম থেকে উঠেই যদি চাদর ও কম্বল ভাঁজ করে রাখা হয়, তবে রাতে জমে থাকা আর্দ্রতা বাইরে বেরোবার সুযোগ পায় না। বরং তা বিছানার ভিতরেই আটকে থেকে ডাস্ট মাইটের বেঁচে থাকার অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিছানা কিছু সময় খোলা অবস্থায় রেখে দিলে জমে থাকা আর্দ্রতা বাষ্পীভূত হয়ে যায়। ফলে বিছানা শুকনো থাকে এবং জীবাণুর বংশবিস্তার অনেকটাই কমে যায়। তাই স্বাস্থ্য রক্ষার স্বার্থে সকালে ঘুম থেকে উঠেই তাড়াহুড়ো করে বিছানা গুছিয়ে ফেলার বদলে খানিকটা সময় অপেক্ষা করাই শ্রেয়। পরিচ্ছন্নতার পাশাপাশি সঠিক পদ্ধতিতে পরিচর্যা করলেই শ্বাসযন্ত্র সুস্থ রাখা সম্ভব।

ঘুমের সময় শরীরে কী ঘটে?

মানুষ ঘুমের মধ্যে থাকলেও শরীর সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় থাকে না। ঘুমের সময় শরীর থেকে ঘাম বের হয়, শ্বাসের সঙ্গে জলীয় বাষ্প নির্গত হয়, এবং ত্বক থেকে অগণিত মৃত কোষ ঝরে পড়ে। এই সব মিলিয়ে বিছানার চাদর, বালিশের কাভার, কম্বল ও গদির ভিতরে আর্দ্রতা ও উষ্ণতার এক ধরনের পরিবেশ তৈরি হয়। এটি স্বাভাবিকভাবে অনেক সময় চোখে না পড়লেও, এই আর্দ্র ও উষ্ণ আবহ শ্বাসনালী সংবেদনশীল ব্যক্তিদের জন্য সমস্যার কারণ হতে পারে। বিশেষ করে ভারতীয় আবহাওয়ায়, যেখানে অধিকাংশ ঘরেই পর্যাপ্ত বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা নেই, সেখানে এই আর্দ্র পরিবেশ আরও দ্রুত গড়ে ওঠে।

অনেক বাড়িতে সাধারণত সকালে উঠে সঙ্গে সঙ্গে জানলা বা দরজা খোলার আগে বিছানা দ্রুত গুছিয়ে ফেলা হয়। এতে রাতের ঘাম ও জলীয় কণা বাইরে বের হওয়ার সুযোগ পায় না। বরং চাদর, কম্বল ও বালিশ ভাঁজ করে রাখার ফলে সেই সিক্ত উষ্ণতা ভিতরে আটকে থাকে। এই পরিবেশে পোকা-মাকড়ের একটি ক্ষুদ্র প্রজাতি, যা আমরা ডাস্ট মাইট নামে জানি, সহজেই জন্মাতে ও বংশ বিস্তার করতে পারে।

ডাস্ট মাইট আকারে খুব ছোট হলেও এদের প্রভাব শ্বাসনালীর উপর বড় হতে পারে। এরা মানুষের মৃত ত্বককোষ খেয়ে বেঁচে থাকে এবং উষ্ণ, আর্দ্র পরিবেশে দ্রুত বংশ বিস্তার করে। এই জীবাণুর দেহাংশ ও মল বাতাসে মিশে অ্যালার্জেনের কাজ করে। ফলে শ্বাসের সঙ্গে শরীরে প্রবেশ করলে হাঁচি, কাশি, নাক বন্ধ হওয়া, চোখের জ্বালা বা হাঁপানির মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।

অতএব সকালে ঘুম থেকে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে তাড়াহুড়ো করে বিছানা গুছিয়ে ফেলার পরিবর্তে কিছু সময় খোলা রেখে দেওয়া উচিত। খানিকটা সময় বাতাস চলাচলের মাধ্যমে বিছানার ভিতরের আর্দ্রতা শুকিয়ে গেলে ডাস্ট মাইটের বংশ বিস্তার কমে যায়। এটি শ্বাসনালীর জন্য অনেকটা স্বাস্থ্যকর পরিবেশ তৈরি করে এবং দীর্ঘমেয়াদে শ্বাসযন্ত্র সুস্থ রাখতেও সাহায্য করে।

ডাস্ট মাইট কী এবং কেন বিপজ্জনক?

ডাস্ট মাইট আসলে অত্যন্ত ক্ষুদ্র আকারের পোকা, যাদের খালি চোখে দেখা যায় না। এরা মূলত মানুষের মৃত ত্বককোষ খেয়ে বেঁচে থাকে এবং উষ্ণ ও আর্দ্র পরিবেশে দ্রুত বংশবিস্তার করে। বিছানা, বালিশ, গদি ও কম্বল ডাস্ট মাইটের সবচেয়ে প্রিয় আশ্রয়স্থল।

news image
আরও খবর

এই ডাস্ট মাইট নিজেরা কামড়ায় না বা সংক্রমণ ঘটায় না ঠিকই, কিন্তু এদের মল ও মৃত দেহের অংশ বাতাসে মিশে গিয়ে মারাত্মক অ্যালার্জেন হিসেবে কাজ করে। শ্বাসের সঙ্গে এই কণাগুলি শরীরে প্রবেশ করলে হাঁচি, কাশি, নাক বন্ধ হওয়া, চোখ চুলকানো, গলা খুসখুস করা, এমনকি হাঁপানির তীব্রতা বেড়ে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।

গবেষণায় কী বলছে?

একাধিক আন্তর্জাতিক গবেষণায় উঠে এসেছে, ঘরের ভিতরে সবচেয়ে বেশি অ্যালার্জেন জমে থাকে বিছানাপত্রে। আমেরিকান লাং অ্যাসোসিয়েশনের মতে, একটি সাধারণ বিছানায় গড়ে প্রায় ১৫ লক্ষ পর্যন্ত ডাস্ট মাইট থাকতে পারে। প্রতিদিন রাতে প্রায় ৭–৮ ঘণ্টা ধরে মানুষ এই অ্যালার্জেনের সরাসরি সংস্পর্শে থাকে, যা শ্বাসযন্ত্রের উপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, হাঁপানি আক্রান্ত ব্যক্তি, শিশু, বয়স্ক মানুষ এবং যাঁরা দীর্ঘদিন সাইনাস বা শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যায় ভুগছেন, তাঁদের জন্য ঘরের ধুলোর মাত্রা কমিয়ে রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অথচ সকালে ঘুম থেকে উঠেই বিছানা গুছিয়ে ফেলার অভ্যাস সেই ঝুঁকিই আরও বাড়িয়ে দেয়।

কেন সকালে সঙ্গে সঙ্গে বিছানা গুছোনো উচিত নয়?

ঘুমের সময় জমে থাকা আর্দ্রতা যদি কিছু সময়ের জন্য খোলা বাতাসে থাকতে পারে, তবে তা ধীরে ধীরে বাষ্পীভূত হয়ে যায়। এতে বিছানার চাদর ও গদির ভিতর শুষ্ক পরিবেশ তৈরি হয়, যা ডাস্ট মাইটের বেঁচে থাকার জন্য অনুকূল নয়। কিন্তু সকালে সঙ্গে সঙ্গে চাদর ও কম্বল ভাঁজ করে ফেললে এই আর্দ্রতা আটকে যায় এবং জীবাণু বৃদ্ধির সুযোগ পায়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিছানা অন্তত ১–২ ঘণ্টা খোলা অবস্থায় রেখে দিলে ঘরের বাতাস চলাচলের মাধ্যমে সেই সিক্ততা অনেকটাই কমে যায়। ফলে ধুলোকণা ও অ্যালার্জেনের পরিমাণও হ্রাস পায়।

শীতের সকালে সমস্যা আরও বাড়ে কেন?

শীতকালে অনেকেই জানলা বন্ধ রাখেন ঠান্ডা এড়ানোর জন্য। তার উপর মোটা কম্বল, লেপ ব্যবহার করার ফলে বিছানার ভিতরে উষ্ণতা ও আর্দ্রতা আরও বেশি জমে। সকালে উঠেই যদি সব গুটিয়ে রাখা হয়, তবে সেই উষ্ণ সিক্ত পরিবেশ দীর্ঘ সময় ধরে থেকে যায়। ফলে শীতকালে শ্বাসকষ্ট, সাইনাস, ঠান্ডাজনিত সমস্যা বেড়ে যাওয়ার একটি কারণ হতে পারে এই অভ্যাস।

তা হলে কী করা উচিত?

পরিচ্ছন্নতার অভ্যাস ত্যাগ করার প্রয়োজন নেই, শুধু পদ্ধতিটা একটু বদলালেই যথেষ্ট। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী—

ঘুম থেকে উঠেই বিছানার চাদর ও কম্বল আলতো করে তুলে কিছু সময়ের জন্য খোলা রাখুন।
সম্ভব হলে জানলা খুলে দিন, যাতে বাইরের তাজা বাতাস ঘরে ঢোকে।
রোদ এলে আরও ভাল—সূর্যের আলো জীবাণুনাশক হিসেবে কাজ করে।
কমপক্ষে ১–২ ঘণ্টা পরে, যখন বিছানা শুকিয়ে যাবে, তখন গুছিয়ে নিন।
নিয়মিত অন্তত সপ্তাহে একবার গরম জলে চাদর ও বালিশের কাভার ধোয়া উচিত।

স্বাস্থ্যের স্বার্থে সামান্য অগোছালো মেনে নিন

সকালে অগোছালো বিছানা দেখতে ভাল না লাগতেই পারে। কিন্তু সামান্য সময়ের জন্য এই অগোছালো ভাব মেনে নিলে আপনার ত্বক, নাক এবং ফুসফুস দীর্ঘমেয়াদে উপকৃত হবে। পরিচ্ছন্নতা যেমন জরুরি, তেমনই সঠিক সময়ে সঠিক পদ্ধতিতে পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

তাই পরের বার সকালে ঘুম থেকে উঠে তাড়াহুড়ো করে বিছানা গুছিয়ে ফেলার আগে একটু ভাবুন। কয়েক ঘণ্টার অপেক্ষাই হয়তো আপনাকে অজান্তের শ্বাসযন্ত্রজনিত সমস্যা থেকে দূরে রাখতে পারে।

Preview image