বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণায় প্রমাণিত, দৈনন্দিন জীবনে মাত্র পাঁচটি অভ্যাসে বদল আনলেই রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। পুষ্টিবিদের মতে, এই অভ্যাসগুলি একসঙ্গে মানলে এইচবিএ১সি-র মাত্রা উল্লেখযোগ্য ভাবে কমতে পারে
রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখা আজকের দিনে শুধু ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য নয়, বরং যাঁরা প্রি-ডায়াবেটিসের ঝুঁকিতে রয়েছেন বা ভবিষ্যতে এই রোগ এড়াতে চান, তাঁদের সকলের কাছেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আধুনিক জীবনযাত্রা, অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা এবং মানসিক চাপের কারণে রক্তে শর্করার সমস্যা ক্রমেই বাড়ছে। তবে সুখের কথা হল, এই সমস্যা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সব সময় জটিল ডায়েট চার্ট বা কঠোর নিয়ম মেনে চলার প্রয়োজন নেই।
বেঙ্গালুরুর খ্যাতনামা পুষ্টিবিদ রায়ান ফার্নান্ডো জানাচ্ছেন, বিজ্ঞানসম্মত পাঁচটি দৈনন্দিন অভ্যাসে বদল আনলেই এইচবিএ১সি (HbA1c)-র মাত্রা উল্লেখযোগ্য ভাবে কমানো সম্ভব। এইচবিএ১সি মূলত গত ২-৩ মাসে রক্তে গড় শর্করার মাত্রা বোঝায়, যা ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূচক। রায়ানের মতে, এই পাঁচটি অভ্যাস একত্রে অনুসরণ করলে ইনসুলিন সেনসিটিভিটি বৃদ্ধি পায়, শরীরে অতিরিক্ত শর্করা জমে থাকার প্রবণতা কমে এবং খাওয়ার পর হঠাৎ করে রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে যাওয়ার সমস্যাও অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আসে।
অনেকেই মনে করেন, ডায়াবেটিস বা রক্তে শর্করার সমস্যা মানেই আজীবন ওষুধের উপর নির্ভরশীল হয়ে থাকা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, জীবনযাপনের ছোট কিন্তু ধারাবাহিক পরিবর্তন শরীরের বিপাকক্রিয়ায় (metabolism) গভীর প্রভাব ফেলে। ইনসুলিন কী ভাবে কাজ করবে, লিভার কতটা গ্লুকোজ তৈরি করবে, পেশি কতটা শর্করা ব্যবহার করবে—এই সবকিছুই নির্ভর করে দৈনন্দিন অভ্যাসের উপর।
রায়ান ফার্নান্ডোর মতে, “শরীরকে যদি সঠিক সংকেত দেওয়া যায়, তবে শরীর নিজেই অনেক সমস্যার সমাধান করতে পারে। সমস্যা হয় তখনই, যখন আমরা শরীরের প্রাকৃতিক ছন্দের বিরুদ্ধে গিয়ে কাজ করি।”
চলুন, জেনে নেওয়া যাক সেই পাঁচটি বিজ্ঞানসম্মত অভ্যাস সম্পর্কে, যা রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে।
শরীরের সবচেয়ে বড় অঙ্গ হল পেশি (muscle)। অনেকেই জানেন না যে, এই পেশিই শরীরে সবচেয়ে বেশি গ্লুকোজ জমিয়ে রাখতে এবং ব্যবহার করতে পারে। পেশি যত বেশি সক্রিয় থাকবে, রক্তে শর্করার মাত্রা তত বেশি নিয়ন্ত্রণে থাকবে।
রায়ান ফার্নান্ডোর মতে, শুধুমাত্র হাঁটাচলা করলেই হবে না, শরীরচর্চার ধরনেও বৈচিত্র আনতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন—
হাঁটা, জগিং, সাইক্লিং, সাঁতার বা নাচ—এই ধরনের ব্যায়ামকে অ্যারোবিক ব্যায়াম বলা হয়। রায়ান বলছেন, সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট অ্যারোবিক ব্যায়াম করা উচিত। প্রতিদিন ৩০ মিনিট করে পাঁচ দিন হাঁটা বা সমমানের ব্যায়াম করলে এই লক্ষ্য পূরণ করা সম্ভব।
অ্যারোবিক ব্যায়াম সরাসরি রক্তে থাকা গ্লুকোজ ব্যবহার করতে সাহায্য করে, ফলে খাওয়ার পর শর্করা হঠাৎ বেড়ে যাওয়ার প্রবণতা কমে।
এর সঙ্গে সপ্তাহে ২-৩ দিন শক্তিবৃদ্ধির ব্যায়াম করাও জরুরি। ডাম্বেল, রেজিস্ট্যান্স ব্যান্ড, স্কোয়াট, লাঞ্জ বা পুশ-আপের মতো ব্যায়াম পেশির গঠন মজবুত করে।
পেশির পরিমাণ যত বাড়ে, শরীর তত বেশি গ্লুকোজ জমিয়ে রাখতে পারে। এর ফলে ইনসুলিনের উপর চাপ কমে এবং ইনসুলিন সেনসিটিভিটি বাড়ে।
অনেকেই ভাবেন, রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে অনেকটা ওজন কমাতে হবে। কিন্তু রায়ান ফার্নান্ডোর মতে, দেহের মোট ওজনের মাত্র ৭–১০ শতাংশ হ্রাস করলেই উল্লেখযোগ্য উপকার পাওয়া যায়।
উদাহরণস্বরূপ, কারও ওজন যদি ৮০ কেজি হয়, তাহলে মাত্র ৬–৮ কেজি ওজন কমালেই শরীরের ইনসুলিন ব্যবহারের ক্ষমতা অনেকটাই উন্নত হয়।
অতিরিক্ত মেদ, বিশেষ করে পেটের চারপাশে জমে থাকা চর্বি, ইনসুলিনের কাজের পথে বাধা সৃষ্টি করে। ওজন কমলে—
ইনসুলিনের সংকেত প্রেরণের ক্ষমতা বাড়ে
লিভারে গ্লুকোজ উৎপাদনের উপর নিয়ন্ত্রণ আসে
লিভারে রক্ত সরবরাহ উন্নত হয়
শরীরের কোষগুলো ইনসুলিনকে ভালোভাবে গ্রহণ করতে পারে
এই সব মিলিয়ে রক্তে শর্করার মাত্রা অনেকটাই স্থিতিশীল থাকে।
শুধু কী খাচ্ছেন, সেটাই নয়—কখন খাচ্ছেন, সেটাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। রায়ান ফার্নান্ডো বলছেন, দিনের সব খাবার ১০–১২ ঘণ্টার মধ্যে সম্পন্ন করার অভ্যাস করতে হবে।
এই পদ্ধতিকে অনেক সময় টাইম-রেস্ট্রিক্টেড ইটিং বলা হয়। এতে শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ, বিশেষ করে অগ্ন্যাশয় (pancreas), কিছুটা বিশ্রাম পায়।
অগ্ন্যাশয়ই ইনসুলিন তৈরি করে। যদি সারাদিন বা গভীর রাত পর্যন্ত খাওয়ার প্রবণতা থাকে, তবে এই অঙ্গটির উপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে।
রায়ানের মতে, মধ্যরাতে খাওয়ার অভ্যাস রক্তে শর্করার জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকর। রাতে খেলে—
সারা রাত ধরে রক্তে শর্করার মাত্রা ওঠানামা করে
ইনসুলিন নিঃসরণে ভারসাম্য নষ্ট হয়
ঘুমের গুণগত মান খারাপ হয়, যা আবার শর্করা নিয়ন্ত্রণে বাধা সৃষ্টি করে
তাই রাতের খাবার তুলনামূলক ভাবে হালকা এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শেষ করার পরামর্শ দিচ্ছেন তিনি।
রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে খাদ্যাভ্যাসের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। তবে রায়ান ফার্নান্ডো জোর দিচ্ছেন এমন ডায়েটের উপর, যা দীর্ঘদিন মেনে চলা সম্ভব।
তিনি মূলত দুটি ডায়েটের কথা বলছেন—
কম কার্বোহাইড্রেটযুক্ত খাদ্যাভ্যাস
মেডিটেরেনিয়ান ডায়েট
এই দুই ক্ষেত্রেই মূল লক্ষ্য হল পরিশোধিত কার্বোহাইড্রেট কমিয়ে দেওয়া।
উচ্চ ফাইবারযুক্ত সবজি
চর্বিহীন প্রোটিন (ডাল, ডিম, মুরগি, মাছ)
বাদাম ও বীজ
সামুদ্রিক মাছ (ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড সমৃদ্ধ)
সাদা চাল, সাদা পাউরুটি
চিনি ও মিষ্টিজাত খাবার
অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার
এই ধরনের খাদ্যাভ্যাস খাওয়ার পর হঠাৎ করে রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে যাওয়ার প্রবণতা কমায় এবং ইনসুলিন সেনসিটিভিটি উন্নত করে।
অনেকেই ভাবেন, জিমে না গেলে বা দীর্ঘক্ষণ ব্যায়াম না করলে শরীরচর্চা হয় না। কিন্তু রায়ান ফার্নান্ডোর মতে, ছোট পরিসরে অথচ ঘন ঘন শরীরকে সক্রিয় রাখা রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে অত্যন্ত কার্যকর।
লিফটের বদলে সিঁড়ি ব্যবহার
কাছাকাছি দূরত্বে হেঁটে যাতায়াত
খাওয়ার পর অন্তত ১০ মিনিট হেঁটে নেওয়া
বিশেষ করে খাওয়ার পর হালকা হাঁটাচলা করলে রক্তে থাকা অতিরিক্ত গ্লুকোজ দ্রুত পেশিতে পৌঁছে যায় এবং রক্তে শর্করার মাত্রা স্থিতিশীল থাকে।
রক্তে শর্করার সমস্যা মানেই আতঙ্ক নয়। বেঙ্গালুরুর পুষ্টিবিদ রায়ান ফার্নান্ডোর মতে, ওষুধের পাশাপাশি বা অনেক ক্ষেত্রে ওষুধ ছাড়াও, জীবনযাপনের পাঁচটি বিজ্ঞানসম্মত অভ্যাসে বদল আনলে এইচবিএ১সি-র মাত্রা উল্লেখযোগ্য ভাবে কমানো সম্ভব।
নিয়মিত শরীরচর্চা, সামান্য ওজন হ্রাস, সময় বেঁধে খাওয়া, সুষম খাদ্যাভ্যাস এবং দৈনন্দিন জীবনে শরীরকে সক্রিয় রাখার মতো ছোট পরিবর্তনই দীর্ঘমেয়াদে বড় ফল দিতে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল—এই অভ্যাসগুলি ধারাবাহিক ভাবে মেনে চলা। তাতেই রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে থাকবে, আর সুস্থ থাকবে শরীর ও মন।
এই অভ্যাসগুলির সবচেয়ে বড় সুবিধা হল, এগুলি খুব সহজে দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া যায় এবং দীর্ঘদিন ধরে পালন করা সম্ভব। অনেক সময় দেখা যায়, কঠোর ডায়েট বা অতিরিক্ত ব্যায়ামের চাপ কিছু দিনের মধ্যেই আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। কিন্তু ধীরে ধীরে জীবনযাপনে এই ছোট পরিবর্তনগুলি আনলে শরীর তার সঙ্গে মানিয়ে নিতে শেখে এবং ইতিবাচক ফলও টেকসই হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে রাখতে মানসিক স্বাস্থ্যের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অতিরিক্ত মানসিক চাপ, অনিদ্রা এবং অনিয়মিত জীবনযাপন ইনসুলিনের কার্যকারিতাকে প্রভাবিত করে। তাই পর্যাপ্ত ঘুম, নিয়মিত বিশ্রাম এবং মানসিক চাপ কমানোর জন্য যোগাভ্যাস, ধ্যান বা শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়ামও উপকারী হতে পারে।
এ ছাড়া নিজের শরীরের সংকেতগুলি বোঝা জরুরি। কী ধরনের খাবার খেলে শর্করা দ্রুত বাড়ছে, কোন সময় শরীর বেশি ক্লান্ত লাগে—এই বিষয়গুলির দিকে নজর রাখলে খাদ্যাভ্যাস ও ব্যায়ামের পরিকল্পনা আরও কার্যকর করা সম্ভব। প্রয়োজনে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নিয়ে নিয়মিত রক্ত পরীক্ষা করানোও দরকার। সব মিলিয়ে বলা যায়, সচেতনতা, নিয়মিত অভ্যাস এবং ধৈর্য—এই তিনটি বিষয়ই রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণের মূল চাবিকাঠি।