Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

যাত্রার মঞ্চে ম্লান আলো, সোনালি দিনের স্মৃতিতে প্রবীণ শিল্পীরা

একসময় পুজো মানেই ছিল রাতভর যাত্রার আসর। মঞ্চের সামনে উপচে পড়ত দর্শকের ভিড়, আজ সেই সোনালি দিনের স্মৃতি আঁকড়ে অতীতের কথা মনে করছেন প্রবীণ শিল্পীরা।

সংবাদদাতা, তেহট্ট: একটা সময় ছিল, যখন পুজো মানেই শুধু প্রতিমা দর্শন, মণ্ডপ পরিক্রমা কিংবা ঢাকের বাদ্যি নয়—গ্রামবাংলার মানুষের কাছে পুজোর আনন্দের অন্যতম আকর্ষণ ছিল যাত্রার আসর। সন্ধ্যা নামলেই প্যান্ডেলের চারপাশে জমতে শুরু করত ভিড়। দূর-দূরান্তের গ্রাম থেকে মানুষ হেঁটে, সাইকেলে কিংবা নানা উপায়ে পৌঁছে যেত যাত্রামঞ্চের সামনে। রাত যত গভীর হত, ততই যেন জমে উঠত আসর। মঞ্চের আলো, ঢোল-করতালের শব্দ, হারমোনিয়ামের সুর আর শিল্পীদের সংলাপে মুগ্ধ হয়ে থাকত দর্শক। তেহট্টের প্রবীণ যাত্রাশিল্পীদের স্মৃতিতে আজও সেই সময় যেন জীবন্ত।

একসময় তেহট্টের বিভিন্ন গ্রামে পুজোর দিনগুলিতে যাত্রাপালার আয়োজন ছিল অত্যন্ত পরিচিত ছবি। দুর্গাপুজো কিংবা অন্য কোনও উৎসবকে ঘিরে গ্রামের মানুষের মধ্যে আলাদা উৎসাহ তৈরি হত যাত্রাকে কেন্দ্র করে। পুজোর কয়েক সপ্তাহ আগে থেকেই শুরু হয়ে যেত প্রস্তুতি। কোন দল আসবে, কোন পালা মঞ্চস্থ হবে, কারা অভিনয় করবেন—এসব নিয়ে চায়ের দোকান থেকে পাড়ার আড্ডা, সর্বত্র চলত আলোচনা। যাত্রার দিন এগিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ত উত্তেজনা। মঞ্চ তৈরির কাজ চলত জোরকদমে। বাঁশ, কাপড়, কাঠ আর আলো দিয়ে তৈরি হত অস্থায়ী মঞ্চ। সেই মঞ্চই রাতারাতি হয়ে উঠত হাজার মানুষের বিনোদনের কেন্দ্র।

প্রবীণ শিল্পীদের কথায়, সেই সময় যাত্রা শুধু বিনোদনের মাধ্যম ছিল না। যাত্রাকে ঘিরে তৈরি হত সামাজিক বন্ধনও। একটি পালা দেখতে একই জায়গায় বসতেন গ্রামের প্রবীণ, তরুণ, মহিলা থেকে শুরু করে শিশুরাও। কারও হাতে থাকত চায়ের কাপ, কারও হাতে মুড়ি-চপ কিংবা অন্যান্য খাবার। কেউ আবার দূর থেকে এসে জায়গা ধরে রাখতেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা। রাতভর চলত অভিনয়, গান ও সংলাপ। মঞ্চের সামনে দর্শকদের প্রতিক্রিয়াই ছিল শিল্পীদের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।

বিশেষ করে ‘বিবেক’-এর গান শুরু হলে বদলে যেত গোটা পরিবেশ। এতক্ষণ যাঁরা নিজেদের মধ্যে কথা বলছিলেন, তাঁরাও চুপ করে শুনতেন সেই গান। যাত্রাপালার গল্পের সঙ্গে ‘বিবেক’-এর উপস্থিতি ছিল এক বিশেষ আবেগের জায়গা। কখনও নীতির কথা, কখনও অন্যায়ের বিরুদ্ধে বার্তা, আবার কখনও মানুষের জীবনের বাস্তবতা—গান ও সংলাপের মাধ্যমে দর্শকদের সামনে তুলে ধরা হত নানা সামাজিক বার্তা। অনেক প্রবীণ দর্শকের কাছে সেই গান আজও স্মৃতির গভীরে গেঁথে রয়েছে।

যাত্রার মঞ্চে চরিত্রেরও ছিল নিজস্ব জৌলুস। রাজা-রানির সাজে শিল্পীরা যখন মঞ্চে উঠতেন, তখন দর্শকদের মধ্যে তৈরি হত অন্যরকম উত্তেজনা। রাজদরবারের দৃশ্য, সেনাপতির তর্জন-গর্জন, যুদ্ধের সংলাপ কিংবা নায়িকার আবেগঘন অভিনয়—সব মিলিয়ে মঞ্চ যেন হয়ে উঠত এক অন্য জগৎ। অল্প কিছু সাজসজ্জা, সীমিত আলো এবং হাতে গোনা কয়েকটি উপকরণের মধ্যেই শিল্পীরা নিজেদের অভিনয় দিয়ে তৈরি করে দিতেন বিশাল এক কল্পনার জগৎ।

প্রবীণ যাত্রাশিল্পীদের স্মৃতিতে সেই সময়ের মঞ্চের প্রস্তুতির ছবিও অত্যন্ত উজ্জ্বল। এখনকার মতো উন্নত আলো, শব্দব্যবস্থা কিংবা আধুনিক প্রযুক্তি তখন ছিল না। তবু অভিনয়ের প্রতি নিষ্ঠা এবং দর্শকদের ভালোবাসাই ছিল শিল্পীদের সবচেয়ে বড় শক্তি। অনেক সময় দীর্ঘ পথ পেরিয়ে কোনও গ্রামে পৌঁছতে হত শিল্পীদের। মঞ্চে ওঠার আগে চলত শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। পোশাক, মেকআপ, সংলাপ—সবকিছু ঠিকঠাক আছে কি না, তা খতিয়ে দেখতেন তাঁরা। তারপর মঞ্চে উঠেই চরিত্রের মধ্যে ঢুকে যেতেন।

যাত্রাশিল্পীদের কাছে দর্শকের ভালোবাসাই ছিল সবচেয়ে বড় পুরস্কার। কোনও সংলাপ শুনে দর্শকদের হাততালি, কোনও গানের শেষে উচ্ছ্বাস, কিংবা আবেগঘন দৃশ্যে চারপাশ নিস্তব্ধ হয়ে যাওয়া—এই প্রতিক্রিয়াগুলিই শিল্পীদের অভিনয়ের উৎসাহ জোগাত। অনেক শিল্পী এখনও মনে করেন, মঞ্চের সামনে বসে থাকা মানুষের সেই আন্তরিকতা কোনও আধুনিক বিনোদন মাধ্যমের সঙ্গে তুলনা করা যায় না।

তবে সময় বদলেছে। বদলে গিয়েছে মানুষের বিনোদনের ধরনও। একসময় যে যাত্রামঞ্চকে ঘিরে রাতভর মানুষের ভিড় জমত, এখন সেই মঞ্চ অনেক জায়গাতেই আর আগের মতো দেখা যায় না। টেলিভিশন, সিনেমা, মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট এবং নানা ধরনের ডিজিটাল বিনোদনের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে যাত্রার জনপ্রিয়তাও ধীরে ধীরে কমেছে। পুজোর রাতে মানুষ এখন ঘরে বসেই নানা অনুষ্ঠান দেখতে পারেন। হাতের মুঠোয় থাকা মোবাইল ফোনেই পৌঁছে যাচ্ছে নানা ধরনের বিনোদন। ফলে গ্রামের মাটিতে রাতভর যাত্রা দেখার সেই পুরনো অভ্যাস অনেকটাই বদলে গিয়েছে।

এর সঙ্গে বদলেছে মানুষের জীবনযাত্রাও। আগে পুজোর কয়েকটি রাত গ্রামের মানুষের কাছে ছিল একসঙ্গে আনন্দ করার সময়। এখন কাজের চাপ, ব্যস্ততা এবং আধুনিক জীবনযাপনের কারণে সেই দীর্ঘ রাতের আসরে বসে থাকার সুযোগ কমেছে। যাত্রা আয়োজনের খরচও অনেক ক্ষেত্রে বেড়েছে। শিল্পী, মঞ্চ, আলো, শব্দ, যাতায়াত—সব মিলিয়ে একটি যাত্রাপালা আয়োজন করা আগের তুলনায় কঠিন হয়ে উঠেছে। ফলে অনেক জায়গাতেই যাত্রার আয়োজন কমেছে।

তবে প্রবীণ যাত্রাশিল্পীদের কাছে যাত্রা শুধুই অতীতের কোনও বিনোদন মাধ্যম নয়। তাঁদের কাছে এটি জীবনের একটি বড় অধ্যায়। মঞ্চের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে তাঁদের যৌবন, পরিশ্রম, বন্ধুত্ব, সাফল্য, ব্যর্থতা এবং অসংখ্য স্মৃতি। আজ বয়সের ভারে অনেকেই আর মঞ্চে নিয়মিত অভিনয় করতে পারেন না। কেউ হয়তো একেবারেই অভিনয় থেকে সরে গিয়েছেন। কিন্তু যাত্রার কথা উঠলেই তাঁদের চোখেমুখে ফুটে ওঠে অন্যরকম আলো।

news image
আরও খবর

স্মৃতির পাতায় ফিরে আসে একের পর এক পালার নাম, সহশিল্পীদের মুখ, মঞ্চের ঘটনা এবং দর্শকদের প্রতিক্রিয়া। কেউ মনে করেন সেই রাতের কথা, যখন প্রবল বৃষ্টির মধ্যেও দর্শকরা মঞ্চ ছাড়েননি। কেউ মনে করেন কোনও একটি সংলাপে কীভাবে গোটা আসর হাততালিতে ফেটে পড়েছিল। আবার কারও মনে পড়ে যায় প্রথমবার মঞ্চে ওঠার সেই উত্তেজনার কথা। এসব স্মৃতি শুধু ব্যক্তিগত নয়, তেহট্টের সাংস্কৃতিক ইতিহাসেরও অংশ।

একসময় যাত্রাশিল্পীদের ঘিরে ছিল আলাদা সামাজিক মর্যাদা। গ্রামের মানুষ তাঁদের চিনতেন, তাঁদের অভিনয়ের অপেক্ষায় থাকতেন। কোনও শিল্পী একটি চরিত্রে জনপ্রিয় হয়ে উঠলে পরের বছর তাঁকে আবার মঞ্চে দেখার দাবি উঠত। নায়ক, নায়িকা, রাজা, রানী, সেনাপতি কিংবা ‘বিবেক’—প্রতিটি চরিত্রের অভিনয়শৈলী দর্শকের মনে আলাদা জায়গা তৈরি করত। সংলাপ মুখস্থ করার পাশাপাশি শিল্পীদের কণ্ঠস্বর, অঙ্গভঙ্গি, হাঁটাচলা এবং আবেগ প্রকাশের ওপরও দিতে হত বিশেষ গুরুত্ব।

বিশেষ করে ‘বিবেক’ চরিত্রের শিল্পীদের আলাদা করে মনে রেখেছেন বহু প্রবীণ দর্শক। যাত্রার গল্পের মধ্যে যখন ‘বিবেক’ গান ধরতেন, তখন সেটি যেন নাটকের ভিতর থেকে বাস্তব জীবনের দিকে একটি জানালা খুলে দিত। সমাজের নানা অসঙ্গতি, মানুষের লোভ, অন্যায়, নীতি ও নৈতিকতার প্রশ্ন উঠে আসত সেই গান ও সংলাপে। দর্শক শুধু বিনোদন পেতেন না, অনেক সময় ভাবার মতো কিছু নিয়েও বাড়ি ফিরতেন।

তেহট্টের যাত্রার সঙ্গে তাই মিশে আছে এক ধরনের সামাজিক ইতিহাসও। গ্রামবাংলার মানুষের জীবনযাত্রা, তাঁদের আনন্দ-বেদনা, সামাজিক মূল্যবোধ এবং উৎসবের সংস্কৃতির অনেকটাই প্রতিফলিত হত যাত্রাপালায়। সাধারণ মানুষের ভাষায় গল্প বলা এবং গান-সংলাপের মাধ্যমে নানা বিষয় তুলে ধরার ক্ষমতাই যাত্রাকে একসময় এত জনপ্রিয় করে তুলেছিল।

আজকের দিনে দাঁড়িয়ে সেই জনপ্রিয়তা ফিরিয়ে আনা সহজ নয়। তবে প্রবীণ শিল্পীদের স্মৃতি এবং অভিজ্ঞতা সংরক্ষণ করা গেলে বাংলার যাত্রাশিল্পের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। যাত্রার পুরনো পালা, গান, সংলাপ, শিল্পীদের জীবনের অভিজ্ঞতা এবং মঞ্চের ছবি সংরক্ষণ করা যেতে পারে। স্থানীয় সাংস্কৃতিক সংগঠন কিংবা প্রশাসনের উদ্যোগে যাত্রা নিয়ে স্মরণ অনুষ্ঠান, কর্মশালা বা ছোট আকারের মঞ্চায়নের আয়োজনও হতে পারে।

কারণ, কোনও একটি শিল্পমাধ্যমের জনপ্রিয়তা কমে গেলেই তার ঐতিহাসিক গুরুত্ব শেষ হয়ে যায় না। তেহট্টের প্রবীণ যাত্রাশিল্পীদের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সেই মঞ্চ, সেই রাত, সেই দর্শক এবং সেই গান বাংলার লোকসংস্কৃতির একটি মূল্যবান অংশ। আধুনিক বিনোদনের ভিড়ে হয়তো সেই মঞ্চের আলো আজ অনেকটাই ম্লান। কিন্তু যাঁরা সেই আলোয় দাঁড়িয়ে অভিনয় করেছেন, তাঁদের কণ্ঠে এখনও বেঁচে রয়েছে সেই দিনের গল্প।

পুজোর রাতে একসময় যে গ্রাম জেগে থাকত যাত্রার অপেক্ষায়, আজ সেখানে হয়তো সেই পুরনো উন্মাদনা নেই। নেই রাতভর দর্শকের ভিড়, নেই মঞ্চের সামনে জায়গা পাওয়ার লড়াই। কিন্তু স্মৃতির মঞ্চে এখনও পর্দা নামেনি। প্রবীণ শিল্পীদের কথায় ফিরে আসে সেই সময়—যখন একটি গানেই নিস্তব্ধ হয়ে যেত হাজার মানুষের আসর, একটি সংলাপে উঠত হাততালি, আর একজন শিল্পীর অভিনয়েই দর্শক ভুলে যেত চারপাশের বাস্তবতা।

তাই তেহট্টের যাত্রার গল্প আসলে শুধু একটি হারিয়ে যাওয়া বিনোদন মাধ্যমের গল্প নয়। এটি এক প্রজন্মের আবেগ, একটি সময়ের সামাজিক জীবন এবং গ্রামবাংলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের গল্প। মঞ্চের আলো নিভে যেতে পারে, দর্শকের ভিড় কমে যেতে পারে, বদলে যেতে পারে বিনোদনের মাধ্যম। কিন্তু মানুষের স্মৃতিতে বেঁচে থাকা শিল্প কখনও পুরোপুরি হারিয়ে যায় না। তেহট্টের প্রবীণ যাত্রাশিল্পীদের কণ্ঠে আজও তাই শোনা যায় সেই পুরনো সুর—যে সুর একসময় পুজোর রাতকে জাগিয়ে রাখত, গ্রামকে এক জায়গায় এনে দাঁড় করাত এবং মঞ্চের কয়েক ঘণ্টার জন্য মানুষকে নিয়ে যেত অন্য এক জগতে।

সেই সোনালি দিনের যাত্রা হয়তো আজ অতীত। কিন্তু তেহট্টের প্রবীণ শিল্পীদের স্মৃতিতে তার রং এখনও ফিকে হয়নি। তাঁদের চোখে-মুখে, কথায়-কথায় এবং পুরনো দিনের গান-সংলাপে আজও জীবন্ত হয়ে ওঠে সেই মঞ্চ। সময়ের স্রোতে যাত্রার আলো যতই ম্লান হোক, সেই স্মৃতির আলোয় বাংলার এক সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক অধ্যায় এখনও উজ্জ্বল।

Preview image