জিএসটি চালুর আগে রাজ্যগুলিতে ভ্যাট এবং কেন্দ্রে বিক্রয় করের মতো একাধিক পরোক্ষ কর চালু ছিল। জিএসটি কীভাবে সেই পুরনো করব্যবস্থা থেকে আলাদা এবং এর মূল পরিবর্তন কোথায়, তা জেনে নিন।
জিএসটি ব্যবস্থায় বড় সংস্কারের ইঙ্গিত: গ্রেপ্তারি ক্ষমতা থেকে ITC, কী কী বদল আসতে পারে
ভারতে পণ্য ও পরিষেবা কর বা GST চালুর পর কেটে গিয়েছে প্রায় ন’বছর। ২০১৭ সালের ১ জুলাই থেকে কার্যকর হওয়া এই করব্যবস্থা দেশের পরোক্ষ কর কাঠামোয় বড় পরিবর্তন এনেছিল। একাধিক কেন্দ্রীয় ও রাজ্য করকে এক ছাতার নীচে আনার পাশাপাশি জিএসটি আইনে কর ফাঁকি, জাল ইনভয়েস, প্রতারণা এবং ইচ্ছাকৃতভাবে কর না দেওয়ার মতো বিষয়কে কঠোরভাবে মোকাবিলার জন্য একাধিক বিধান রাখা হয়েছিল। এবার সেই ব্যবস্থারই কিছু গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
৫৭তম GST Council-এর বৈঠকে করব্যবস্থার প্রশাসনিক ও প্রয়োগমূলক কাঠামো নিয়ে একাধিক প্রস্তাব আলোচনায় আসার কথা। বৈঠকটি আগে ৭ অক্টোবর হওয়ার কথা থাকলেও পরে তা পিছিয়ে ৮ অক্টোবর ২০২৬ করা হয়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার একটি হতে পারে GST আধিকারিকদের গ্রেপ্তার করার ক্ষমতা নিয়ে। রিপোর্ট অনুযায়ী, কর আধিকারিকদের সরাসরি গ্রেপ্তার করার ক্ষমতা তুলে দিয়ে কোনও ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করার ক্ষেত্রে আদালতের অনুমোদনের ব্যবস্থা করার প্রস্তাব বিবেচনায় রয়েছে। পাশাপাশি ফৌজদারি মামলা শুরু করার ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট আর্থিক সীমা নির্ধারণের বিষয়ও আলোচনায় রয়েছে।
GST চালুর আগে ভারতে পরোক্ষ করের কাঠামো ছিল অনেক বেশি বিচ্ছিন্ন। কেন্দ্র এবং রাজ্য সরকার আলাদা আলাদা কর আরোপ করত। রাজ্য স্তরে ভ্যালু অ্যাডেড ট্যাক্স বা VAT এবং কেন্দ্রীয় স্তরে Central Sales Tax বা CST-র মতো কর ব্যবস্থার পাশাপাশি আরও একাধিক পরোক্ষ কর চালু ছিল।
GST-এর অন্যতম লক্ষ্য ছিল এই বিচ্ছিন্ন কাঠামোকে একটি সমন্বিত করব্যবস্থায় নিয়ে আসা। পণ্য ও পরিষেবার সরবরাহের উপর একটি অভিন্ন কাঠামো তৈরি হওয়ায় ব্যবসার ক্ষেত্রে একাধিক করের পরিবর্তে GST-কে কেন্দ্র করে হিসাব রাখার ব্যবস্থা তৈরি হয়।
তবে শুধু করের হার বা কর সংগ্রহের পদ্ধতিই নয়, GST আইন কর ফাঁকি এবং প্রতারণার ক্ষেত্রেও তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী প্রয়োগমূলক ব্যবস্থা তৈরি করেছিল।
GST আইনের অধীনে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে গ্রেপ্তারের বিধান রয়েছে। Section 69-এর অধীনে নির্দিষ্ট GST অপরাধের ক্ষেত্রে কমিশনারের কাছে গ্রেপ্তারের ক্ষমতা রয়েছে। Section 132-তে বিভিন্ন ধরনের GST অপরাধ এবং তার জন্য ফৌজদারি শাস্তির বিধান রয়েছে।
এই ব্যবস্থার উদ্দেশ্য ছিল বড় ধরনের কর ফাঁকি, ভুয়ো ইনভয়েস তৈরি, প্রতারণামূলকভাবে ইনপুট ট্যাক্স ক্রেডিট নেওয়া এবং ইচ্ছাকৃত করচুরির মতো ঘটনাকে কঠোরভাবে দমন করা।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ব্যবসায়ী মহলের একাংশের কাছ থেকে অভিযোগ উঠেছে, GST-এর মতো একটি বাণিজ্যিক করব্যবস্থায় প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহারের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে করের ব্যাখ্যা বা হিসাব সংক্রান্ত বিরোধ এবং প্রকৃত প্রতারণার মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য থাকা প্রয়োজন বলে মত উঠেছে।
এই কারণেই এবার গ্রেপ্তারির ক্ষমতা সীমিত করা এবং গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রেই ফৌজদারি ব্যবস্থা রাখার প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।
বর্তমান আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল GST আধিকারিকদের গ্রেপ্তারি ক্ষমতা। প্রস্তাবটি কার্যকর হলে কর আধিকারিকরা নিজেরাই সরাসরি কাউকে গ্রেপ্তার করার পরিবর্তে আদালতের মাধ্যমে সেই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করবেন।
অর্থাৎ কর ফাঁকি বা প্রতারণার অভিযোগ উঠলেই প্রশাসনিক পর্যায়ে গ্রেপ্তারের বদলে বিচারবিভাগীয় নজরদারি বাড়তে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে গুরুতর GST প্রতারণার ক্ষেত্রে ফৌজদারি ব্যবস্থা পুরোপুরি উঠে যাচ্ছে।
রিপোর্ট অনুযায়ী, গুরুতর ও ইচ্ছাকৃত কর ফাঁকি বা প্রতারণার ক্ষেত্রে আদালতের মাধ্যমে prosecution চালিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা থাকতে পারে।
এছাড়া ফৌজদারি মামলা শুরু করার জন্য প্রায় ₹৫ কোটি পর্যন্ত একটি prosecution threshold আনার প্রস্তাবও আলোচনায় রয়েছে বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ ছোটখাটো কর সংক্রান্ত বিরোধকে ফৌজদারি মামলার পর্যায়ে না নিয়ে গিয়ে বড় ধরনের করচুরি ও প্রতারণার উপর নজর দেওয়ার চেষ্টা হতে পারে।
এই প্রশ্নটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। প্রস্তাবিত পরিবর্তনের মূল লক্ষ্য বলে যে বিষয়টি সামনে আসছে, তা হল GST-এর enforcement-কে আরও proportionate বা অপরাধের মাত্রার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা।
ছোটখাটো কর সংক্রান্ত ভুল, হিসাবের সমস্যা বা ব্যাখ্যা নিয়ে বিরোধের ক্ষেত্রে সরাসরি ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে আর্থিক জরিমানা বা দেওয়ানি প্রকৃতির ব্যবস্থার উপর জোর দেওয়া হতে পারে।
তবে ইচ্ছাকৃত বড় কর ফাঁকি, জালিয়াতি বা সংগঠিত প্রতারণার ক্ষেত্রে ফৌজদারি ব্যবস্থা পুরোপুরি বাতিল হবে কি না, তা GST Council-এর চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের উপর নির্ভর করবে। তাই প্রস্তাবগুলিকে এখনই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।
GST Council-এর আলোচনায় শুধু enforcement নয়, ব্যবসায়ীদের Input Tax Credit বা ITC ব্যবস্থার বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
বর্তমানে বহু সংস্থা কর্মীদের জন্য group health বা life insurance policy নেয়। এই ধরনের বিমার premium-এর উপর GST দিতে হয়। নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে সেই GST-র Input Tax Credit পাওয়া যায় না বলে ব্যবসার জন্য সেটি অতিরিক্ত খরচ হয়ে দাঁড়ায়।
এবার কর্মীদের group health ও life insurance-এর premium-এর উপর দেওয়া GST-র ITC দেওয়ার প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হতে পারে। রিপোর্ট অনুযায়ী, এই পরিবর্তন কার্যকর হলে সংস্থাগুলির করের বোঝা কমতে পারে এবং কর্মীদের জন্য বিমা সুবিধা দেওয়ার ক্ষেত্রেও উৎসাহ বাড়তে পারে।
বিশেষ করে MSME-সহ বিভিন্ন সংস্থার জন্য এই পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কারণ কর্মীদের বিমার খরচের একটি অংশ যদি ITC-এর মাধ্যমে সমন্বয় করা যায়, তাহলে সংস্থার সামগ্রিক compliance cost কমতে পারে।
স্বাস্থ্যক্ষেত্রেও কিছু পরিবর্তনের সম্ভাবনা রয়েছে। একাধিক বিরল রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত ওষুধ অত্যন্ত ব্যয়বহুল। এই ধরনের ওষুধের উপর GST কমানো বা সম্পূর্ণ ছাড় দেওয়ার দাবি দীর্ঘদিন ধরেই রয়েছে।
এবার আরও কিছু rare disease drugs-এর উপর GST ছাড় দেওয়ার প্রস্তাব আলোচনায় আসতে পারে। এমন সিদ্ধান্ত হলে বিরল রোগে আক্রান্ত রোগীদের পরিবারের উপর চিকিৎসা ব্যয়ের চাপ কিছুটা কমতে পারে।
তবে কোন কোন ওষুধ এই ছাড়ের আওতায় আসবে এবং GST-এর হার কত হবে, তা Council-এর সিদ্ধান্তের পরই স্পষ্ট হবে।
ডিজিটাল পেমেন্ট এখন ব্যবসার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কার্ড বা অন্যান্য ডিজিটাল পেমেন্টের ক্ষেত্রে merchant discount rate বা MDR নামে একটি চার্জ থাকে।
ছোট ব্যবসার ক্ষেত্রে GST-এর আওতার বাইরে থাকা এবং Input Tax Credit-এর সুবিধা না পাওয়া সংস্থাগুলির জন্য এই খরচের উপর GST আরোপের বিষয়টি আলাদা বোঝা তৈরি করতে পারে।
তাই এমন ব্যবসার ক্ষেত্রে digital transactions-এর MDR-এর উপর GST ছাড় দেওয়ার প্রস্তাবও আলোচনায় থাকতে পারে।
এর ফলে ছোট ব্যবসায়ীদের ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবহারে উৎসাহ বাড়তে পারে এবং ডিজিটাল লেনদেনের খরচ কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
কৃষিক্ষেত্রের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত আরেকটি প্রস্তাব হল ট্রাক্টরের GST হার কমানো। কৃষিকাজে ট্রাক্টর গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্র। ফলে এর উপর করের হার কমানো হলে কৃষি যন্ত্রপাতি কেনার খরচে প্রভাব পড়তে পারে।
তবে GST Council-এর বৈঠকে প্রস্তাবটি নিয়ে আলোচনা হলেও শেষ পর্যন্ত হার কতটা কমবে বা আদৌ কমবে কি না, তা Council-এর সিদ্ধান্তের পরেই জানা যাবে।
২০১৭ সালে GST চালুর সময় মূল লক্ষ্য ছিল ভারতের পরোক্ষ করব্যবস্থাকে সরল, একীভূত এবং প্রযুক্তিনির্ভর করা। প্রায় এক দশকের অভিজ্ঞতার পরে সরকার ও ব্যবসায়িক মহল এখন GST-এর প্রশাসনিক কাঠামোর দ্বিতীয় পর্যায়ের সংস্কারের দিকে তাকাচ্ছে।
২০২৫ সালে GST rate rationalisation-এর পর এবার প্রশাসনিক এবং process reforms-এর দিকে নজর দেওয়া হচ্ছে। সাম্প্রতিক আলোচনায় registration, return, refund, ITC এবং dispute resolution-এর মতো ক্ষেত্রেও পরিবর্তনের কথা উঠে এসেছে।
সরকারের লক্ষ্য হিসেবে যে বিষয়গুলি সামনে আসছে, তার মধ্যে রয়েছে compliance সহজ করা, ব্যবসার খরচ কমানো, করদাতাদের জন্য আরও পূর্বানুমানযোগ্য ব্যবস্থা তৈরি করা এবং প্রযুক্তি ও তথ্যের মাধ্যমে কর ফাঁকি শনাক্ত করা।
GST চালুর প্রথম দিকে কর ফাঁকি রুখতে কঠোর enforcement-এর উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু প্রায় ন’বছরের অভিজ্ঞতার পরে এখন আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে enforcement-এর ভারসাম্য।
একদিকে বড় ধরনের করচুরি ও জালিয়াতি আটকাতে শক্তিশালী ব্যবস্থা প্রয়োজন। অন্যদিকে সাধারণ ব্যবসায়িক ভুল বা কর সংক্রান্ত ব্যাখ্যার বিরোধ যেন সরাসরি ফৌজদারি মামলায় না গড়ায়, সেই ব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ।
এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য তৈরিই হতে পারে GST-এর পরবর্তী সংস্কারের অন্যতম লক্ষ্য।
Indian Express-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, আগামী সংস্কার পর্বে arrest powers এবং prosecution threshold-এর মতো বিষয়কে পুনর্বিবেচনা করার পাশাপাশি GST প্রশাসনকে আরও predictable করার লক্ষ্য রয়েছে।
GST Council-এর সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে ভারতের GST ব্যবস্থায় একটি নতুন পর্যায় শুরু হতে পারে। কর ফাঁকির ক্ষেত্রে আরও নির্দিষ্ট ও লক্ষ্যভিত্তিক enforcement, ব্যবসার জন্য সহজ compliance এবং ITC ব্যবস্থায় কিছুটা নমনীয়তা—এই তিনটি বিষয় আগামী দিনের GST কাঠামোয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
তবে সব প্রস্তাবই যে বৈঠকে অনুমোদিত হবে, এমন নয়। GST Council-এ কেন্দ্রের পাশাপাশি রাজ্যগুলির প্রতিনিধিরাও থাকেন এবং GST সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ক্ষেত্রে তাদের মতামত গুরুত্বপূর্ণ।
ফলে ৮ অক্টোবরের বৈঠকের পরই স্পষ্ট হবে কোন কোন প্রস্তাব বাস্তবে এগোচ্ছে এবং কোনগুলি আরও আলোচনার জন্য রেখে দেওয়া হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, GST চালুর প্রায় ন’বছর পরে করব্যবস্থার হার বা কাঠামোর পাশাপাশি তার enforcement mechanism-এও বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। আধিকারিকদের গ্রেপ্তারি ক্ষমতা সীমিত করা, গুরুতর অপরাধের জন্য prosecution threshold বাড়ানো, কর্মীদের বিমায় ITC, বিরল রোগের ওষুধে করছাড়, ছোট ব্যবসার ডিজিটাল লেনদেনে MDR সংক্রান্ত GST সুবিধা এবং ট্রাক্টরের কর কমানোর মতো একাধিক প্রস্তাব সামনে রয়েছে।
চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের পরেই বোঝা যাবে, ২০১৭ সালে তৈরি হওয়া GST ব্যবস্থার কোন কোন কঠোর বিধান বদলাচ্ছে এবং আগামী দিনে ভারতের পরোক্ষ করব্যবস্থা ঠিক কোন পথে এগোচ্ছে।