Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

জ্ঞানেশের বিরুদ্ধে মামলা শুনে সুপ্রিম কোর্টের কড়া বার্তা, ‘আইন না মেনে কমিশনের সিদ্ধান্ত হলে বাতিল করব’

মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে সাসপেন্ড করার আবেদন জানিয়ে সুপ্রিম কোর্টে দায়ের হয়েছে মামলা। সোমবার প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চে মামলাটির শুনানি হয়।

জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে মামলা: কেন্দ্র ও নির্বাচন কমিশনকে নোটিস সুপ্রিম কোর্টের, ‘আইন না মানলে সিদ্ধান্ত বাতিল করব’

মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলায় এ বার কেন্দ্রীয় সরকার এবং নির্বাচন কমিশনকে নোটিস পাঠাল সুপ্রিম কোর্ট। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে এই মামলায় নিজেদের অবস্থান জানিয়ে জবাব দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে শীর্ষ আদালত। সোমবার প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চে মামলাটির শুনানি হয়। শুনানিতে কমিশনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণও করেছে আদালত।

সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট জানিয়েছে, নির্বাচন কমিশন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হলেও তাদের নেওয়া কোনও সিদ্ধান্ত যদি আইন ও সংবিধানের বিধি মেনে না হয়, তা হলে সেই সিদ্ধান্তকে আদালত বাতিল করতে পারে। প্রধান বিচারপতির বেঞ্চের বক্তব্য, কমিশন আইন মেনেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে—এমনটাই আপাতত ধরে নিচ্ছে আদালত। তবে পরবর্তী শুনানিতে যদি দেখা যায় কোনও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে আইন মানা হয়নি, সে ক্ষেত্রে আদালত প্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপ করতে পারে।

মামলাকারীদের অভিযোগ, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের নেতৃত্বে নির্বাচন কমিশন সাম্প্রতিক সময়ে যে ভাবে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেই সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি নিয়েই প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষ করে এসআইআর বা স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন সংক্রান্ত বিভিন্ন সিদ্ধান্ত এবং তার বাস্তবায়ন নিয়ে আপত্তি তুলে সুপ্রিম কোর্টে মামলা দায়ের হয়েছে।

এই মামলাগুলির নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে সাসপেন্ড করার আবেদনও জানানো হয়েছে। সেই দাবিকে সামনে রেখে একটি জনস্বার্থ মামলা দায়ের হয়। সোমবার সেই মামলাগুলিও একসঙ্গে শুনানির জন্য ওঠে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি মোহনার বেঞ্চে।

শুনানির শুরুতেই আদালতের তরফে কেন্দ্র এবং নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য জানতে চাওয়া হয়। এরপরই সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলিকে নোটিস জারি করার নির্দেশ দেয় বেঞ্চ। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে কেন্দ্র এবং নির্বাচন কমিশনকে জবাব দিতে বলা হয়েছে। পরবর্তী শুনানিতে সেই জবাব খতিয়ে দেখে আদালত প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

এই মামলার সঙ্গে এসআইআর সংক্রান্ত বিতর্কও সরাসরি জড়িয়ে রয়েছে। সম্প্রতি ভোটার তালিকা সংশোধন এবং বিশেষ নিবিড় পুনর্বিবেচনা বা এসআইআর প্রক্রিয়া নিয়ে দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক মহলে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিরোধী দলগুলির একাংশের অভিযোগ, কমিশনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে যথাযথ স্বচ্ছতা বজায় রাখা হয়নি। কমিশনের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বিভিন্ন রাজ্যেও।

এরই মধ্যে ইংরেজি দৈনিক ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এ প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, দুই নির্বাচন কমিশনারের আপত্তি উপেক্ষা করে এসআইআর সংক্রান্ত একাধিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। ওই প্রতিবেদনের পর রাজনৈতিক মহলে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়। বিরোধী দলগুলি বিষয়টি নিয়ে সরব হয়েছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভও হয়েছে।

তবে সোমবারের শুনানিতে সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট করে দিয়েছে, শুধুমাত্র সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত কোনও প্রতিবেদনের ভিত্তিতে আদালত কোনও নির্দেশ দিতে পারে না। আদালতের পর্যবেক্ষণ, সংবাদপত্রে প্রকাশিত কোনও খবর সম্পূর্ণ সত্য হতে পারে, আংশিক সত্য হতে পারে অথবা ভুলও হতে পারে। তাই সেই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সরাসরি কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছনো সম্ভব নয়।

প্রধান বিচারপতির বেঞ্চের বক্তব্য, সংবাদপত্রের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে নির্দেশ দেওয়ার পরিবর্তে আদালত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকেই জবাব চাইবে। কমিশনের কাছ থেকে পাওয়া জবাব এবং মামলার নথিপত্র খতিয়ে দেখার পরই আদালত সিদ্ধান্ত নেবে, কোনও ক্ষেত্রে আইন লঙ্ঘন হয়েছে কি না।

শুনানিতে আদালত কার্যত জানিয়েছে, যদি প্রমাণিত হয় যে নির্বাচন কমিশন কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় আইন মেনে চলেনি, তা হলে সেই সিদ্ধান্ত বাতিল করার ক্ষমতা আদালতের রয়েছে। প্রধান বিচারপতির বেঞ্চের পর্যবেক্ষণ, কমিশনের সিদ্ধান্তকে আপাতত আইনসম্মত বলেই ধরে নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু সেই অনুমান চূড়ান্ত নয়। প্রয়োজন হলে আদালত সিদ্ধান্তের বৈধতা পরীক্ষা করতে পারে।

এখানেই মামলাটির গুরুত্ব আরও বেড়ে যাচ্ছে। কারণ নির্বাচন কমিশন দেশের একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। নির্বাচনী প্রক্রিয়া পরিচালনা, ভোটার তালিকা প্রস্তুত ও সংশোধন এবং নির্বাচন সংক্রান্ত একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কমিশনের ভূমিকা রয়েছে। ফলে কমিশনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তার সাংবিধানিক বৈধতা এবং আইনানুগ প্রক্রিয়া নিয়ে বিতর্ক তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক।

news image
আরও খবর

মামলাকারীদের তরফে মূলত অভিযোগ তোলা হয়েছে, কমিশনের কয়েকটি সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়নি। সেই সিদ্ধান্তগুলির বৈধতা নিয়েই আদালতের হস্তক্ষেপ চাওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে মামলাকারীদের একাংশের দাবি, বিষয়টির নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

তবে সুপ্রিম কোর্ট সোমবারের শুনানিতে সরাসরি জ্ঞানেশ কুমারকে সাসপেন্ড করার বিষয়ে কোনও নির্দেশ দেয়নি। বরং কেন্দ্র এবং নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য জানতে চেয়ে নোটিস জারি করেছে। অর্থাৎ আপাতত আদালত মামলাটির সমস্ত দিক খতিয়ে দেখার দিকেই এগোচ্ছে।

আদালতের এই অবস্থান থেকে স্পষ্ট, সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত অভিযোগকে সরাসরি সত্য ধরে নিয়ে কোনও সিদ্ধান্ত নিতে চাইছে না শীর্ষ আদালত। বরং সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য, সরকারি নথি এবং আইনগত অবস্থান পর্যালোচনা করেই পরবর্তী পদক্ষেপ করতে চাইছে বেঞ্চ।

এসআইআর নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই এই মামলার শুনানি হওয়ায় বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। রাজনৈতিক দলগুলির একাংশ ইতিমধ্যেই নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। অন্য দিকে কমিশনের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন একাধিক মামলাকারী। ফলে আগামী দিনে সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ এবং কেন্দ্র ও নির্বাচন কমিশনের জবাবের দিকে নজর থাকবে রাজনৈতিক ও আইনজীবী মহলের।

এখন মূল প্রশ্ন হল, নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তগুলি আইন ও সাংবিধানিক বিধি মেনে নেওয়া হয়েছিল কি না। কেন্দ্র এবং কমিশনের জবাব পাওয়ার পরই সেই বিষয়ে আদালতের অবস্থান আরও স্পষ্ট হতে পারে। যদি আদালত মনে করে কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে আইনানুগ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি, সে ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত বাতিল করার পথ খোলা থাকবে।

তবে আপাতত আদালত কমিশনের সিদ্ধান্তকে বেআইনি বলে ধরে নেয়নি। বরং প্রধান বিচারপতির বেঞ্চ স্পষ্ট করেছে, তারা ধরে নিচ্ছে কমিশন আইন মেনেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। একই সঙ্গে আদালত এ-ও জানিয়ে দিয়েছে, সেই সিদ্ধান্তের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে এবং আইন লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেলে আদালত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করতে পিছপা হবে না।

ফলে সোমবারের শুনানিতে এক দিকে যেমন কেন্দ্র এবং নির্বাচন কমিশনকে নোটিস জারি করে তাদের বক্তব্য জানতে চেয়েছে সুপ্রিম কোর্ট, অন্য দিকে তেমনই কমিশনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি বার্তাও দিয়েছে। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে কেন্দ্র ও নির্বাচন কমিশনের জবাব জমা পড়ার পর মামলাটির পরবর্তী গতিপথ অনেকটাই স্পষ্ট হবে।

এই মামলার পরবর্তী শুনানিতে আদালত মূলত দেখতে চাইবে, এসআইআর-সহ বিতর্কিত সিদ্ধান্তগুলি কী ভাবে নেওয়া হয়েছিল, সেই সিদ্ধান্তের পিছনে কী আইনি ভিত্তি রয়েছে এবং কমিশন তার সাংবিধানিক ও আইনগত ক্ষমতার সীমার মধ্যে থেকেই পদক্ষেপ করেছে কি না। সেই উত্তরগুলির উপরই নির্ভর করবে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ।

সোমবারের শুনানি তাই শুধু জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের জন্য নয়, নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের সাংবিধানিক সীমা এবং সেই সিদ্ধান্তের বিচারবিভাগীয় পর্যালোচনার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এখন নজর আগামী শুনানির দিকে।

তাই আপাতত নজর আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে কেন্দ্র এবং নির্বাচন কমিশনের জবাবের দিকে। সেই জবাব পাওয়ার পরই বোঝা যাবে, জ্ঞানেশ কুমারের নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ নিয়ে সুপ্রিম কোর্ট কী অবস্থান নেয় এবং মামলাটি শেষ পর্যন্ত কোন পথে এগোয়।

সোমবারের শুনানি অবশ্য একটি বিষয় পরিষ্কার করে দিয়েছে—নির্বাচন কমিশন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হলেও তার সিদ্ধান্ত আইনের ঊর্ধ্বে নয়। আইন মেনে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে কি না, সেই প্রশ্নে প্রয়োজনে আদালত হস্তক্ষেপ করতে পারে। একই সঙ্গে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত অভিযোগের ভিত্তিতে সরাসরি সিদ্ধান্ত না নিয়ে আদালত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে জবাব নিয়েই পরবর্তী পদক্ষেপ করবে। ফলে এই মামলার পরবর্তী শুনানি এখন যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

Preview image