প্রায় ২০০০ বছরের ঐতিহ্য মেনে পুরুলিয়ার কাশীপুরে পঞ্চকোট রাজবংশের দেবীবাড়িতে শুরু হল ষোড়শ কল্পের দুর্গাপুজো। ১৬ দিন ধরে অষ্টধাতুর মূর্তিতে রাজরাজেশ্বরী রূপে পূজিতা হবেন উমা।
পুরুলিয়ার কাশীপুরে পঞ্চকোট রাজবংশের দেবীবাড়িতে শুরু হয়ে গেল ঐতিহ্যবাহী ষোড়শ কল্পের দুর্গাপুজো। প্রায় দুই হাজার বছরের প্রাচীন এই রাজবংশের প্রথা মেনে কৃষ্ণপক্ষের নবমী তিথিতে বোধন করা হয় দেবী রাজরাজেশ্বরীর। অষ্টধাতুর চতুর্ভুজা মূর্তিতে দেবী এখানে পূজিতা হন। রাবণ বধের উদ্দেশ্যে রামচন্দ্র যে ষোড়শ দিনব্যাপী আরাধনা করেছিলেন, সেই ধারা মেনে এই পুজো ১৬ দিন ধরে চলে। এই কারণেই এটি ষোড়শ কল্পের পুজো নামে পরিচিত।
কথিত আছে, আজ থেকে প্রায় দুই হাজার বছর আগে দামোদর শেখর সিং দেও চাকলা পঞ্চকোট রাজত্ব স্থাপন করেন এবং সেই সময় থেকেই এই দুর্গাপুজোর সূত্রপাত। দামোদর শেখরের নাম অনুসারে অধিষ্ঠাত্রী দেবী শেখর বাসিনী নামে পূজিতা হয়ে আসছেন। বিরাচারী তন্ত্র মতে এখানে দেবীর পুজো হয়।
রাজবংশের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বল্লাল সেনের কন্যা সাধনার কাহিনিও। বল্লাল সেনের ইষ্টদেবী ছিলেন শ্যামারূপা। সাধনার বিয়ে হয় পঞ্চকোট রাজ কল্যাণ শেখর সিং দেও-এর সঙ্গে। বিয়ের সময় সাধনা তাঁর বাবার কাছে ইষ্টদেবীকে চেয়ে নেন। সেই দেবীই পরবর্তীতে কল্যাণ শেখর সিং দেও-এর নামানুসারে কল্যাণেশ্বরী নামে পরিচিত হন। তিনিই রাজরাজেশ্বরী হিসেবে পুজো নিতে আসেন এবং প্রমাণ হিসেবে রেখে যান সিঁদুরের পদচিহ্ন। রাজবাড়ির সদস্যদের কথায়, অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি আজও সেই পদচিহ্নের দেখা মেলে।
রাজপরিবারের সদস্য ভগবতী প্রসাদ সিং দেও জানান, প্রায় দুই হাজার বছরের প্রাচীন পঞ্চকোট রাজবংশের দুর্গাপুজো আজ আর আগের মতো জাঁকজমকপূর্ণ না হলেও এখনও বজায় রেখেছে তার রাজকীয় গাম্ভীর্য ও গৌরবময় ঐতিহ্য। ষোড়শ দিন ধরে ষোড়শ রূপে দেবী রাজরাজেশ্বরীকে আরাধনা করা হয় এই পুজোয়।
রাজবংশের সদস্য সোমেশ্বর লাল সিং দেও জানিয়েছেন, জিতাষ্টমীর পরের দিন অর্থাৎ কৃষ্ণপক্ষের নবমী তিথি থেকে এখানে পুজো শুরু হয়। দেবী দুর্গা এখানে রাজরাজেশ্বরী রূপে পূজিতা হন। চতুর্ভুজা অষ্টধাতুর মূর্তির সামনে ঘট স্থাপন করে পুজো করা হয়।
পঞ্চকোট রাজবংশের দুর্গাপুজোয় বলি প্রথার প্রচলন রয়েছে। পুরনো সেই ঐতিহ্য মেনে এখনও বলি দেওয়ার রীতি প্রচলিত। তবে প্রতিদিন বলি দেওয়া হয় না, মোট পাঁচদিন বলি হয়। পুজো শুরুর দিন ছাগ ও আখ বলি দেওয়া হয়। এরপর সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমীতে বলি দেওয়া হয়। দশমীতে ঘট বিসর্জনের মাধ্যমে পুজোর সমাপ্তি ঘটে।
কাশীপুর দেবীবাড়ির পুরোহিত গৌতম চক্রবর্তী জানিয়েছেন, প্রথা অনুযায়ী অষ্টমীর দিন এখানে শ্রীনাদ মন্ত্র পাঠ করা হয়। দশমীতে ঘট বিসর্জনের মধ্যে দিয়ে পঞ্চকোট রাজ পরিবারের পুজো শেষ হয়। উল্লেখ্য, এই মন্দিরে বেলবরণ হয় না এবং মা মন্দিরে সারা বছরই অধিষ্ঠিত থাকেন।
প্রথা মেনে আজও মন্দির চত্বরে একসঙ্গে সম্মিলিত হয়ে মায়ের প্রসাদ গ্রহণ করেন রাজ পরিবারের সদস্যরা। এই কয়েকটা দিন রাজ পরিবারের সদস্যরা একসঙ্গে হন এবং স্থানীয়রাও পুজোয় সামিল হন। ১৬ দিন ধরে জমজমাট হয়ে ওঠে কাশীপুর।
রাজবাড়ির পুজো ঘিরে সাধারণ মানুষের উৎসাহও কম নয়। কাশীপুর পঞ্চকোট রাজবাড়ি স্থানীয়দের কাছে ঐতিহাসিক গুরুত্বের কেন্দ্রবিন্দু। দুর্গাপুজোর দিনগুলিতে রাজবাড়ি সর্বসাধারণের জন্য খুলে দেওয়া হয়। অষ্টমী ও নবমীর দুপুরে ভিড় থাকে চরমে। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসেন এই ঐতিহাসিক রাজবাড়ির পুজো দেখতে।
যুগের পরিবর্তনে উৎসবের জাঁকজমক কিছুটা ম্লান হলেও রাজবাড়ির সাবেকিয়ানা ও ঐতিহ্যের দীপ্তি আজও অটুট। রাজপরিবারের সদস্যদের উপস্থিতিতে বোধন অনুষ্ঠিত হয়। অষ্টধাতুর মূর্তির সামনে ঘট স্থাপন করে মন্ত্রোচ্চারণ ও প্রাচীন আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দেবীকে আহ্বান জানানো হয়।
এই পুজো শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, এটি একটি ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতির সাক্ষাৎ মেলবন্ধন। কালের প্রবাহে বহু কিছু বদলালেও পঞ্চকোট রাজবংশের এই দুর্গাপুজো আজও তার রাজকীয় গাম্ভীর্য ও শ্রদ্ধা নিয়ে পালন হয়ে চলেছে। পঞ্চকোট রাজের রাজ্য যেখানে যেখানে স্থানান্তরিত হয়েছে, সেখানে সেখানেই এই পুজোও স্থানান্তরিত হয়েছে—এই ঐতিহ্য আজও অমলিন।
| বিষয় | খবরে উল্লিখিত | অনুসন্ধান ফলাফলে নিশ্চিত |
|---|---|---|
| পূজার সময়কাল | ১৬ দিন | ✅ একাধিক সূত্রে নিশ্চিত (16 দিনের পূজা) |
| দেবীর নাম | রাজরাজেশ্বরী | ✅ নিশ্চিত |
| মূর্তি | অষ্টধাতু, চতুর্ভুজা | ✅ নিশ্চিত |
| পূজার শুরু | কৃষ্ণপক্ষের নবমী (জীতাষ্টমীর পরের দিন) | ✅ নিশ্চিত |
| পূজার স্থান | কাশীপুর, পুরুলিয়া | ✅ নিশ্চিত |
| “ষোড়শ কল্পের পূজা” | রাবণ বধের উদ্দেশ্যে রামচন্দ্রের ১৬ দিনের আরাধনার ঐতিহ্য | ✅ নিশ্চিত |
| রাজবংশ | পঞ্চকোট রাজবংশ | ✅ নিশ্চিত |
| বোধন | বোধনের দিন শুরু | ✅ নিশ্চিত |
পঞ্চকোট রাজবংশ পুরুলিয়ার একটি প্রাচীন রাজবংশ, যার ইতিহাস প্রায় ১,৯০০ বছরের পুরানো । এই রাজবংশের উৎপত্তি মধ্যপ্রদেশের ধার রাজ্য থেকে বলে মনে করা হয় । দামোদর শেখর সিং দেও এই রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে পরিচিত, যিনি চাকলা পঞ্চকোট রাজত্ব স্থাপন করেন ।
পঞ্চকোট রাজবংশের দুর্গাপূজা প্রায় দুই হাজার বছরের প্রাচীন বলে বিশ্বাস করা হয় । কথিত আছে, রাবণ বধের উদ্দেশ্যে শ্রীরামচন্দ্র ১৬ দিন ধরে দেবীর আরাধনা করেছিলেন, সেই প্রথা অনুসরণ করেই এখানে ১৬ দিন ধরে পূজা হয়ে আসছে । এই কারণেই এটি “ষোড়শ কল্পের পূজা” নামে পরিচিত।
রাজবংশের সদস্য সোমেশ্বর লাল সিং দেও জানান, জীতাষ্টমীর পরের দিন অর্থাৎ কৃষ্ণপক্ষের নবমী তিথি থেকে এখানে পূজা শুরু হয় । দেবী দুর্গা এখানে রাজরাজেশ্বরী রূপে পূজিতা হন এবং অষ্টধাতুর চতুর্ভুজা মূর্তির সামনে ঘট স্থাপন করে পূজা করা হয় ।
কথিত আছে, বল্লাল সেনের কন্যা সাধনার বিয়ে হয় পঞ্চকোট রাজ কল্যাণ শেখর সিং দেও-এর সঙ্গে । বিয়ের সময় সাধনা তাঁর বাবার কাছে ইষ্টদেবীকে চেয়ে নেন। সেই দেবীই পরবর্তীতে কল্যাণ শেখর সিং দেও-এর নামানুসারে দেবী কল্যাণেশ্বরী নামে পরিচিত হন এবং তিনিই রাজরাজেশ্বরী হিসেবে পূজা নিতে আসেন । প্রমাণ হিসেবে তিনি সিঁদুরের পদচিহ্ন রেখে যান, যা আজও দেখা যায় বলে রাজবাড়ির সদস্যরা জানান।
পঞ্চকোট রাজবংশের দুর্গাপূজায় বলি প্রথার প্রচলন রয়েছে । পুরনো সেই ঐতিহ্য মেনে এখনও বলি দেওয়ার রীতি প্রচলিত। তবে প্রতিদিন বলি দেওয়া হয় না, মোট পাঁচদিন বলি হয় । পূজা শুরুর দিন ছাগ ও আখ বলি দেওয়া হয়, এরপর সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমীতে বলি দেওয়া হয় । দশমীতে ঘট বিসর্জনের মাধ্যমে পূজার সমাপ্তি ঘটে ।
অষ্টমীর দিন মন্দিরে পাঠ করা হয় ‘শ্রীনাদ মন্ত্র’, যা অত্যন্ত গুপ্ত বলে মনে করা হয় । পুরোহিত গৌতম চক্রবর্তী জানান, এই মন্ত্র ভূর্জপত্রে লেখা আছে এবং স্বপ্নাদেশে পাওয়া এই মন্ত্র দিয়েই দেবীর পূজা হয় ।
এই মন্দিরে বেলবরণ হয় না এবং মা মন্দিরে সারা বছরই অধিষ্ঠিত থাকেন । দেবীবাড়িতে রাজবংশের কুলদেবী চতুর্ভুজা রাজরাজেশ্বরী বিরাজ করেন, যিনি পাঁচ দিনের দেবী নন, সারা বছরই পূজিতা হন ।
রাজবংশের সদস্যরা জানান, প্রথা মেনে আজও মন্দির চত্বরে একসঙ্গে সম্মিলিত হয়ে মায়ের প্রসাদ গ্রহণ করেন রাজ পরিবারের সদস্যরা । এই কয়েকটা দিন রাজ পরিবারের সদস্যরা একসঙ্গে হন এবং স্থানীয়রাও পূজায় সামিল হন।
কাশীপুর পঞ্চকোট রাজবাড়ি স্থানীয়দের কাছে ঐতিহাসিক গুরুত্বের কেন্দ্রবিন্দু । দুর্গাপূজার দিনগুলিতে রাজবাড়ি সর্বসাধারণের জন্য খুলে দেওয়া হয় । অষ্টমী ও নবমীর দুপুরে ভিড় থাকে চরমে । দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসেন এই ঐতিহাসিক রাজবাড়ির পূজা দেখতে।
রাজপ্রাসাদটি ১৯১৬ সালে তৈরি হয়েছিল জ্যোতিপ্রসাদ সিং দেও-এর আমলে । ২১ বিঘা জমির উপরে টানা ১২ বছর ধরে তৈরি হয়েছিল এই প্রাসাদ, যেখানে চিন থেকে মিস্ত্রি আনা হয়েছিল ।
যুগের পরিবর্তনে উৎসবের জাঁকজমক কিছুটা ম্লান হলেও রাজবাড়ির সাবেকিয়ানা ও ঐতিহ্যের দীপ্তি আজও অটুট । পঞ্চকোট রাজের রাজ্য যেখানে যেখানে স্থানান্তরিত হয়েছে, সেখানে সেখানেই এই পূজাও স্থানান্তরিত হয়েছে । এই পূজা শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, এটি একটি ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতির সাক্ষাৎ মেলবন্ধন।