Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

কালীগঞ্জের রায়চৌধুরী বাড়ির ভুবনেশ্বরী পুজোয় আজও অটুট ঐতিহ্য, দশমীতে দেবীর ভোগে পান্তাভাত!

প্রাসাদের মতো পুরনো বাড়ি, দেওয়ালে ইতিহাসের ছাপ। কালীগঞ্জের রায়চৌধুরী বাড়ির ভুবনেশ্বরী পুজোয় আজও ধরে রাখা হয়েছে বহু বছরের ঐতিহ্য। দশমীর দিনে দেবীকে নিবেদন করা হয় পান্তাভাতের ভোগ।

প্রাসাদের মতো বিশাল বাড়ি। কোথাও দেওয়ালের গায়ে বয়সের ছাপ, কোথাও আবার সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নতুন করে মেরামতির চিহ্ন। পুরনো স্থাপত্যের সেই আবহের মধ্যেই আজও নিষ্ঠা ও ঐতিহ্যের সঙ্গে পালিত হয়ে আসছে কালীগঞ্জের রায়চৌধুরী বাড়ির ভুবনেশ্বরী পুজো। সময় বদলেছে, বদলেছে পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি, কিন্তু বদলায়নি পরিবারের বহু বছরের ধর্মীয় রীতি ও পরম্পরা। বিশেষ করে দশমীর দিনের একটি রীতি এই পুজোকে আরও আলাদা করে তোলে—দেবী ভুবনেশ্বরীকে দেওয়া হয় পান্তাভাতের ভোগ।

বাংলার বনেদি বাড়ির দুর্গাপুজো বা পারিবারিক দেবদেবীর পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে নানা ধরনের লোকাচার, পারিবারিক বিশ্বাস এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা বিশেষ রীতি। কালীগঞ্জের রায়চৌধুরী বাড়ির ভুবনেশ্বরী পুজোও তার ব্যতিক্রম নয়। এখানে পুজো শুধুমাত্র কয়েক দিনের ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বরং পরিবারের ইতিহাস, স্মৃতি এবং উত্তরাধিকারের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা একটি পরম্পরা।

পুরনো বাড়িটির দিকে তাকালেই যেন সেই অতীতের ছবি চোখের সামনে ভেসে ওঠে। প্রাসাদের মতো বাড়ির বিস্তীর্ণ পরিসর, পুরনো দেওয়াল, স্থাপত্যের নানা চিহ্ন—সবকিছুতেই রয়েছে বহু বছরের ইতিহাসের ছাপ। সময়ের প্রভাবে বাড়িটির বিভিন্ন অংশে বয়সের ছাপ পড়েছে। কোথাও প্লাস্টারের আস্তরণ ক্ষয়ে গিয়েছে, কোথাও পুরনো দেওয়ালের গায়ে দেখা যায় মেরামতির চিহ্ন। তবু সেই পুরনো আবহ আজও ধরে রেখেছে বাড়িটির নিজস্ব চরিত্র।

এই ঐতিহ্যবাহী পরিবেশেই অনুষ্ঠিত হয় ভুবনেশ্বরী পুজো। পরিবারের সদস্যদের কাছে এই পুজোর গুরুত্ব শুধুমাত্র ধর্মীয় বিশ্বাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে পারিবারিক আবেগ এবং পূর্বপুরুষদের স্মৃতি। প্রজন্ম বদলালেও পুজোর নানা নিয়মকানুন যতটা সম্ভব একইভাবে পালন করার চেষ্টা করা হয়। পুরনো রীতিকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়াও পরিবারের কাছে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে।

দশমীর পান্তাভাতের ভোগ

এই পুজোর অন্যতম আকর্ষণ দশমীর দিনের ভোগ। সাধারণত পুজোর ভোগ বলতেই অনেকের মনে আসে খিচুড়ি, নানা রকম ভাজা, তরকারি, পায়েস কিংবা মিষ্টির কথা। কিন্তু কালীগঞ্জের রায়চৌধুরী বাড়ির ভুবনেশ্বরীর ক্ষেত্রে দশমীর ভোগে রয়েছে একেবারেই আলাদা রীতি। দেবীকে নিবেদন করা হয় পান্তাভাত।

গ্রামবাংলার খাদ্যসংস্কৃতির সঙ্গে পান্তাভাতের সম্পর্ক বহু পুরনো। ভাত জল দিয়ে ভিজিয়ে রেখে তৈরি করা এই খাবার একসময় বাংলার সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। গরমের দিনে শরীর ঠান্ডা রাখা থেকে শুরু করে সহজপাচ্য খাবার হিসেবে পান্তাভাতের জনপ্রিয়তা ছিল যথেষ্ট। সেই সাধারণ বাঙালি খাবারই যখন দেবীর ভোগের অংশ হয়ে ওঠে, তখন তার সঙ্গে যুক্ত হয় ধর্মীয় বিশ্বাস এবং পারিবারিক ঐতিহ্যের আলাদা মাত্রা।

দশমীর দিনে দেবীকে পান্তাভাত নিবেদনের এই রীতিই রায়চৌধুরী বাড়ির পুজোকে স্বতন্ত্র করে তুলেছে। বহু পুরনো এই রীতি আজও পরিবারের সদস্যরা নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেন। সময়ের সঙ্গে মানুষের খাদ্যাভ্যাস বদলেছে, জীবনযাত্রা বদলেছে, কিন্তু এই বিশেষ ভোগের রীতি এখনও টিকে রয়েছে।

ঐতিহ্যের সঙ্গে বর্তমানের মেলবন্ধন

বনেদি বাড়ির পুজোর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হল ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা। অনেক পুরনো বাড়ি সময়ের সঙ্গে হারিয়ে গিয়েছে, বহু পরিবারে বন্ধ হয়ে গিয়েছে পারিবারিক পুজোও। কোথাও আবার পুরনো রীতির জায়গা নিয়েছে নতুন নিয়ম। কিন্তু এখনও কিছু বাড়িতে পূর্বপুরুষদের রেখে যাওয়া পরম্পরাকে ধরে রাখার চেষ্টা দেখা যায়।

রায়চৌধুরী বাড়ির ভুবনেশ্বরী পুজোও সেই ধারাবাহিকতার একটি উদাহরণ। পুরনো বাড়ির দেওয়ালে সময়ের ছাপ থাকলেও পুজোর ক্ষেত্রে ঐতিহ্যের ছাপ এখনও স্পষ্ট। বাড়ির সংস্কার হয়েছে, প্রয়োজন অনুযায়ী কিছু অংশ মেরামত করা হয়েছে, কিন্তু দেবীর পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা পুরনো রীতিগুলিকে বদলে দেওয়া হয়নি।

এখানেই এই পুজোর বিশেষত্ব। কারণ কোনও ঐতিহ্য শুধু একটি পুরনো স্থাপত্যকে ধরে রাখার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মানুষের বিশ্বাস, পারিবারিক আচার, খাবারের রীতি, পুজোর নিয়ম এবং প্রজন্মের স্মৃতির মধ্য দিয়েই একটি ঐতিহ্য বেঁচে থাকে।

প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে পুজো

একটি পারিবারিক পুজো টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন পরবর্তী প্রজন্মের অংশগ্রহণ। প্রবীণরা যেমন পুরনো নিয়মের কথা জানেন, তেমনই নতুন প্রজন্মের দায়িত্ব সেই নিয়মগুলিকে জানা এবং পরবর্তী সময়ে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। রায়চৌধুরী বাড়ির ভুবনেশ্বরী পুজোর ক্ষেত্রেও সেই প্রজন্মান্তরের যোগসূত্র গুরুত্বপূর্ণ।

পরিবারের ছোটরা যখন পুজোর নানা আচার কাছ থেকে দেখে বড় হয়, তখন সেই পুজো তাদের কাছে শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান থাকে না। সেটি হয়ে ওঠে শিকড়ের সঙ্গে যোগাযোগের একটি মাধ্যম। বাড়ির পুরনো দেওয়াল, পুজোর স্থান, দেবীর মূর্তি, ভোগের আয়োজন—প্রতিটি বিষয়ই তাদের কাছে পারিবারিক ইতিহাসের অংশ হয়ে ওঠে।

দশমীর পান্তাভাতের ভোগও তাই কেবল একটি খাবার নয়। এর মধ্যে রয়েছে স্মৃতি, বিশ্বাস এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা একটি রীতির ধারাবাহিকতা।

পুরনো বাড়ির স্থাপত্যেও ইতিহাস

রায়চৌধুরী বাড়ির প্রাসাদোপম চেহারাও এই পুজোর আবহকে আরও বিশেষ করে তোলে। পুরনো বাড়ির দেওয়াল যেন সময়ের সাক্ষী। বছরের পর বছর ধরে কত মানুষ এই বাড়িতে এসেছেন, কত উৎসব দেখেছে এই বাড়ি, কত প্রজন্মের পরিবর্তনের সাক্ষী হয়েছে—সবকিছুরই যেন নীরব সাক্ষ্য বহন করছে বাড়ির স্থাপত্য।

news image
আরও খবর

দেওয়ালের কোথাও বয়সের ছাপ, কোথাও সংস্কারের চিহ্ন—এই দুইয়ের সহাবস্থানেই তৈরি হয়েছে বর্তমান বাড়িটির চেহারা। একদিকে ইতিহাসকে ধরে রাখার চেষ্টা, অন্যদিকে সময়ের প্রয়োজন মেনে বাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ—দুইয়ের মধ্যে একটি ভারসাম্য দেখা যায়।

এই ধরনের পুরনো বনেদি বাড়ি বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। শুধু স্থাপত্যের জন্য নয়, সেই বাড়িকে ঘিরে থাকা পুজো, উৎসব, পারিবারিক রীতি এবং স্থানীয় মানুষের স্মৃতির কারণেও এগুলির গুরুত্ব রয়েছে।

পুজো মানেই স্মৃতি

বাঙালির কাছে পুজো মানেই শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়। পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে বাড়ি ফেরার আনন্দ, পরিবারের সঙ্গে দেখা হওয়া, পুরনো স্মৃতি ফিরে দেখা এবং প্রজন্মের মধ্যে সম্পর্ক আরও দৃঢ় হওয়া। বনেদি বাড়ির পুজোর ক্ষেত্রে এই আবেগ আরও গভীর।

রায়চৌধুরী বাড়ির ভুবনেশ্বরী পুজোও সেই আবেগের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে। বছরের অন্য সময় বাড়িটি যেমনই থাকুক না কেন, পুজোর সময় সেখানে ফিরে আসে উৎসবের আবহ। পুরনো দেওয়াল, ঐতিহ্যবাহী পুজোর স্থান এবং পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতি মিলিয়ে বাড়িটি যেন আবার পুরনো দিনের স্মৃতিকে জীবন্ত করে তোলে।

বিশেষ করে দশমীর দিন যখন দেবীর উদ্দেশে পান্তাভাতের ভোগ নিবেদন করা হয়, তখন সেই মুহূর্তে যেন বহু বছরের পুরনো একটি রীতি আবারও বর্তমানের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়।

কেন আলাদা এই পুজো?

বাংলার বিভিন্ন বনেদি বাড়িতে পুজোর নিজস্ব কিছু রীতি রয়েছে। কোথাও বিশেষ কোনও ফল বা মিষ্টি দেবীর ভোগে দেওয়া হয়, কোথাও নির্দিষ্ট দিনে বিশেষ রান্না হয়, আবার কোথাও পুজোর আচারে রয়েছে একেবারে স্থানীয় কোনও প্রথা। রায়চৌধুরী বাড়ির পুজোর ক্ষেত্রেও দশমীর পান্তাভাত সেই নিজস্বতার পরিচয় বহন করে।

এ ধরনের রীতিই একটি পুজোকে অন্য পুজো থেকে আলাদা করে। কারণ একই দেবীর আরাধনা হলেও প্রতিটি পরিবারের পুজোর ইতিহাস আলাদা। কোথাও শতবর্ষের স্মৃতি, কোথাও কোনও বিশেষ ঘটনা, আবার কোথাও কোনও পূর্বপুরুষের চালু করা রীতি—এসব মিলিয়েই তৈরি হয় বনেদি বাড়ির পুজোর নিজস্ব পরিচয়।

হারিয়ে যাওয়া রীতির মধ্যে টিকে থাকা এক ঐতিহ্য

বর্তমান সময়ে দ্রুত বদলে যাচ্ছে মানুষের জীবনযাত্রা। শহর ও শহরতলির বাড়িগুলির চেহারা বদলেছে। অনেক পুরনো বাড়ি ভেঙে তৈরি হয়েছে নতুন বহুতল। পারিবারিক কাঠামোও আগের মতো নেই। ফলে বহু পুরনো রীতিনীতি হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে কোনও পরিবারের পুজোর সঙ্গে যুক্ত বিশেষ রীতি যদি এখনও টিকে থাকে, তাহলে তার সাংস্কৃতিক মূল্য অনেকটাই বেড়ে যায়। রায়চৌধুরী বাড়ির দশমীর পান্তাভাতের ভোগ সেই অর্থে শুধু একটি পারিবারিক প্রথা নয়, বরং বাংলার লোকাচার ও পারিবারিক সংস্কৃতির একটি স্মারকও বলা যায়।

পুজোর দিন দেবীর সামনে নিবেদিত সেই সাধারণ পান্তাভাত তাই অসাধারণ হয়ে ওঠে তার ঐতিহ্যের কারণে। এটি মনে করিয়ে দেয়, ধর্মীয় আচার অনেক সময় মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে কতটা গভীরভাবে যুক্ত।

ঐতিহ্য বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব

পুরনো বাড়ি সংরক্ষণ যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই গুরুত্বপূর্ণ সেই বাড়ির সঙ্গে যুক্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখা। একটি বাড়ি মেরামত করা যায়, দেওয়ালের ক্ষয় মেরামত করা যায়, কিন্তু একটি হারিয়ে যাওয়া রীতি ফিরিয়ে আনা অনেক কঠিন। তাই প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা এই ধরনের রীতিকে ধরে রাখার দায়িত্বও কম নয়।

রায়চৌধুরী বাড়ির ভুবনেশ্বরী পুজোর ক্ষেত্রে সেই ঐতিহ্য এখনও জীবন্ত। বাড়ির গায়ে বয়সের ছাপ পড়লেও পুজোর রীতিতে এখনও রয়েছে অতীতের ছোঁয়া। দশমীর পান্তাভাতের ভোগ সেই অতীতকে বর্তমানের সঙ্গে যুক্ত করে রেখেছে।

কালীগঞ্জের এই পুজো তাই শুধু একটি পরিবারের ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়। এর মধ্যে রয়েছে বাংলার বনেদি বাড়ির সংস্কৃতি, পুরনো স্থাপত্য, পারিবারিক ঐতিহ্য, স্থানীয় লোকাচার এবং প্রজন্মান্তরের স্মৃতির মেলবন্ধন। সময়ের স্রোতে অনেক কিছু বদলে গেলেও কিছু রীতি মানুষের বিশ্বাসে এমনভাবে জায়গা করে নেয় যে, সেগুলি সহজে হারিয়ে যায় না।

রায়চৌধুরী বাড়ির ভুবনেশ্বরীর পুজোয় দশমীর পান্তাভাতের ভোগ তেমনই এক ঐতিহ্যের গল্প বলে। প্রাসাদের মতো পুরনো বাড়ির দেওয়ালে সময়ের চিহ্ন যতই স্পষ্ট হোক, সেই বাড়ির পুজোকে ঘিরে থাকা বিশ্বাস এবং পরম্পরা এখনও জীবন্ত। আর সেই কারণেই কালীগঞ্জের এই পুজো বাংলার বনেদি বাড়ির পুজোর তালিকায় আলাদা করে নজর কাড়ে।

Preview image