Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

স্বামীর মৃত্যুর পরও থামেনি পথচলা, ভ্যানের চাকাতেই জীবনযুদ্ধ অশোকনগরের ‘দুর্গা’ রেখার

স্বামীর মৃত্যুর পর সংসারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছেন রেখা। প্রতিদিন ভ্যান নিয়ে বাড়ি বাড়ি ঘুরে আবর্জনা সংগ্রহ করেন তিনি। ভ্যানের চাকাতেই চলছে তাঁর জীবনযুদ্ধ, আর সেই লড়াইয়ের মধ্যেই হয়ে উঠেছেন এলাকার অনেকের কাছে ‘দুর্গা’

সকাল হলেই হাতে ভ্যানের হ্যান্ডেল। তারপর এক বাড়ি থেকে অন্য বাড়ি। কোথাও আবর্জনা সংগ্রহ, কোথাও বাসিন্দাদের সঙ্গে দু’দণ্ড কথা। দিনের পর দিন একইভাবে নিজের দায়িত্ব পালন করে চলেছেন তিনি। জীবনের পথে যত বাধাই আসুক, থেমে যাওয়ার সুযোগ নেই। কারণ তাঁর কাঁধেই রয়েছে সংসারের দায়িত্ব।

এ যেন শুধুই একটি কাজ নয়, জীবনকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার এক নিরন্তর লড়াই।

স্বামীর মৃত্যুর পর অনেকের জীবনেই নেমে আসে অন্ধকার। সংসারের দায়িত্ব, আর্থিক অনিশ্চয়তা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা একসঙ্গে এসে দাঁড়ায় সামনে। কিন্তু সেই কঠিন সময়ের কাছে হার মানেননি অশোকনগরের রেখা। স্বামীকে হারানোর পর ভেঙে পড়লেও থেমে থাকেননি। নিজের হাতে তুলে নিয়েছেন কাজের দায়িত্ব। ভ্যানের হ্যান্ডেল ধরেই শুরু করেছেন নতুন করে পথচলা।

আজ সকাল হলেই তাঁকে দেখা যায় ভ্যান নিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে পড়তে। একের পর এক বাড়িতে পৌঁছে সংগ্রহ করেন আবর্জনা। কাজের ফাঁকে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলেন, তাঁদের সুবিধা-অসুবিধার কথা শোনেন। কখনও কারও বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে দু’মিনিট কথা, কখনও আবার ব্যস্ত হাতে নিজের কাজ শেষ করে পরের বাড়ির দিকে এগিয়ে যাওয়া—এইভাবেই কেটে যায় তাঁর প্রতিদিন।

রেখার এই জীবনযাত্রা হয়তো বাইরে থেকে খুব সাধারণ মনে হতে পারে। কিন্তু তাঁর প্রতিটি দিনের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ সংগ্রামের গল্প।

স্বামীকে হারানোর পর বদলে গেল জীবন

একজন মানুষের জীবনে জীবনসঙ্গীকে হারানোর মতো বড় আঘাত খুব কমই আসে। স্বামীর মৃত্যুর পর রেখার জীবনেও বদলে যায় অনেক কিছু। যে সংসারে দু’জন মিলে ভবিষ্যতের পরিকল্পনা করার কথা ছিল, সেখানে হঠাৎ করেই সব দায়িত্ব এসে পড়ে একা তাঁর কাঁধে।

শোক সামলানোর পাশাপাশি তাঁকে ভাবতে হয়েছে সংসারের খরচ কীভাবে চলবে। প্রতিদিনের প্রয়োজন, ঘরের দায়িত্ব, জীবনের ছোট-বড় নানা চাহিদা—সবকিছুর সামনে দাঁড়িয়ে তাঁকে সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে।

সেই সময় হয়তো অনেকেই ভেবেছিলেন, তিনি পারবেন তো?

কিন্তু রেখা থামেননি।

জীবন তাঁকে যে পরিস্থিতির সামনে দাঁড় করিয়েছিল, সেখান থেকেই নিজের রাস্তা তৈরি করে নিয়েছেন তিনি। কান্না, কষ্ট কিংবা অভাবকে পিছনে রেখে হাতে তুলে নিয়েছেন কাজের দায়িত্ব।

ভ্যানের চাকাই এখন তাঁর ভরসা

প্রতিদিনের কাজের সঙ্গী তাঁর ভ্যান। এই ভ্যানই এখন তাঁর জীবিকার অন্যতম ভরসা। সকাল হলেই সেটি নিয়ে বেরিয়ে পড়েন তিনি। রাস্তার পর রাস্তা পেরিয়ে পৌঁছে যান বিভিন্ন বাড়িতে।

আবর্জনা সংগ্রহের কাজ সহজ নয়। রোদ, বৃষ্টি, গরম কিংবা শীত—কোনও কিছুই কাজকে থামিয়ে রাখতে পারে না। প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে বেরোতে হয়। কারণ মানুষের বাড়ির দৈনন্দিন বর্জ্য সংগ্রহের সঙ্গে যুক্ত এই পরিষেবা নিয়মিত না হলে সমস্যায় পড়তে পারেন স্থানীয় বাসিন্দারাও।

তাই নিজের ব্যক্তিগত কষ্ট বা শারীরিক ক্লান্তির কথা ভুলে কাজ করে যেতে হয় রেখাকে।

কখনও হয়তো সকালটা খুব গরম। কখনও আকাশ কালো করে বৃষ্টি নামছে। আবার কখনও শীতের কুয়াশায় রাস্তা ঢেকে যাচ্ছে। তবুও তাঁর ভ্যানের চাকা থামে না।

কাজের মধ্যেই মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক

রেখার কাজ শুধু এক বাড়ি থেকে অন্য বাড়িতে গিয়ে আবর্জনা সংগ্রহ করা নয়। দিনের পর দিন একই এলাকায় কাজ করতে করতে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে তাঁর একটি আত্মিক সম্পর্ক তৈরি হয়েছে।

কোনও বাড়ির মানুষ তাঁকে দেখলেই কথা বলেন। কেউ তাঁর খোঁজ নেন। কেউ হয়তো জিজ্ঞাসা করেন, ‘আজ শরীর কেমন?’ কেউ আবার নিজের বাড়ির ছোটখাটো সমস্যার কথাও তাঁকে জানান।

এই সম্পর্ক তৈরি হয়েছে বছরের পর বছর ধরে।

একটি এলাকায় নিয়মিত কাজ করতে করতে একজন কর্মী আসলে সেই এলাকারই পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন। রেখার ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। তাঁর ভ্যানের শব্দ কিংবা তাঁকে রাস্তা দিয়ে যেতে দেখলেই অনেক বাসিন্দা বুঝতে পারেন—রেখা তাঁর কাজের পথে বেরিয়েছেন।

যে কাজকে অনেকেই ছোট করে দেখেন

আবর্জনা সংগ্রহের কাজ সমাজের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এই কাজের সঙ্গে যুক্ত মানুষদের অনেক সময় যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয় না। অথচ প্রতিদিন তাঁরা যে পরিষেবা দেন, তা ছাড়া একটি শহর বা এলাকার পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা কঠিন।

রেখার মতো কর্মীরা প্রতিদিন মানুষের বাড়ির সামনে থেকে বর্জ্য সংগ্রহ করেন। সেই কাজের কারণে রাস্তা, পাড়া এবং আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার রাখতে সাহায্য হয়।

এই কাজ করতে গিয়ে তাঁদের নানা ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। কখনও আবর্জনা বেশি, কখনও দুর্গন্ধ, কখনও আবার শারীরিক পরিশ্রম। তবুও কাজ থামে না।

রেখার জীবন সেই বাস্তবতাকেই সামনে নিয়ে আসে।

শোককে শক্তিতে বদলে নেওয়ার গল্প

স্বামীকে হারানোর পর অনেকেই হয়তো দীর্ঘদিন শোকের মধ্যে ডুবে থাকেন। সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু জীবন সবসময় কাউকে থেমে থাকার সুযোগ দেয় না। বিশেষ করে সংসারের দায়িত্ব যখন সামনে দাঁড়িয়ে থাকে, তখন ব্যক্তিগত কষ্টের মধ্যেও এগিয়ে যেতে হয়।

রেখাও সেই পথই বেছে নিয়েছেন।

স্বামীর মৃত্যুর শোক নিশ্চয়ই তাঁর জীবনের গভীরে রয়ে গেছে। কিন্তু সেই শোক তাঁকে থামিয়ে দেয়নি। বরং হয়তো জীবনের কঠিন বাস্তবতাই তাঁকে আরও শক্ত করেছে।

প্রতিদিন ভ্যানের হ্যান্ডেলে হাত রাখার সময় তাঁর সামনে হয়তো থাকে সংসারের প্রয়োজন। কিন্তু সেই প্রতিটি যাত্রার মধ্যে রয়েছে এক ধরনের আত্মসম্মানও—কারও কাছে হাত না পেতে নিজের পরিশ্রমে নিজের জীবন চালিয়ে নেওয়ার আত্মবিশ্বাস।

‘দুর্গা’ কেন রেখা?

রেখাকে এলাকার অনেকেই ‘দুর্গা’ বলে ডাকেন। এই নামের মধ্যে হয়তো রয়েছে তাঁর লড়াইয়ের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা।

দুর্গা মানে শক্তি। প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে লড়াই করার প্রতীক। একজন নারী যখন জীবনের কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে একাই সংসারের দায়িত্ব সামলান, প্রতিদিন কাজ করেন এবং নিজের পথ নিজেই তৈরি করেন, তখন তাঁকে শক্তির প্রতীক হিসেবে দেখা খুব স্বাভাবিক।

রেখার ক্ষেত্রেও সেই কারণেই ‘দুর্গা’ নামটি যেন বিশেষ অর্থ বহন করে।

তিনি কোনও পুরাণের চরিত্র নন। তিনি বাস্তব জীবনের একজন সাধারণ মানুষ। তাঁর হাতে কোনও অস্ত্র নেই। তাঁর শক্তি তাঁর পরিশ্রম। তাঁর সংগ্রামের হাতিয়ার তাঁর ভ্যানের হ্যান্ডেল। তাঁর যুদ্ধক্ষেত্র প্রতিদিনের রাস্তা। আর তাঁর জয়—প্রতিদিনের কাজ শেষে ঘরে ফিরে নিজের জীবনটাকে আরেকটি দিন এগিয়ে নিয়ে যাওয়া।

প্রতিদিনের লড়াই, প্রতিদিনের জয়

জীবনের বড় জয় সবসময় বড় কোনও ঘটনার মাধ্যমে আসে না। কখনও কখনও প্রতিদিন সকালে উঠে কাজের জন্য বেরিয়ে পড়াটাই সবচেয়ে বড় জয়।

রেখার জীবনেও হয়তো সেই ছোট ছোট জয় রয়েছে।

সকালে সময়মতো কাজে বেরিয়ে পড়া।

একটির পর একটি বাড়িতে আবর্জনা সংগ্রহ করা।

কাজ শেষ করে নিরাপদে বাড়ি ফেরা।

সংসারের প্রয়োজন মেটানো।

পরের দিনের জন্য আবার প্রস্তুত হওয়া।

এই ছোট ছোট কাজগুলিই তাঁর জীবনের বড় লড়াইয়ের অংশ।

পুজোর শহরে তাঁর মতো মানুষের গল্প

বাঙালির কাছে দুর্গাপুজো আনন্দের উৎসব। পাড়ায় পাড়ায় আলো, মণ্ডপ, নতুন জামাকাপড়, খাওয়াদাওয়া এবং উৎসবের আমেজ। কিন্তু সেই আনন্দের শহরকে পরিষ্কার রাখার দায়িত্ব যাঁরা পালন করেন, তাঁদের গল্প অনেক সময় আলোচনার বাইরে থেকে যায়।

পুজোর সময় মানুষের ভিড় বাড়ে। বাড়ে আবর্জনার পরিমাণও। প্যান্ডেল, বাজার, রাস্তা—সব জায়গাতেই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার প্রয়োজন আরও বেশি হয়।

সেই সময় রেখার মতো কর্মীদের কাজ আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

মানুষ যখন উৎসবের আনন্দে ব্যস্ত, তখন কেউ একজন হয়তো রাস্তায় বেরিয়ে পড়েছেন পরিষ্কার রাখার দায়িত্ব নিয়ে। তাঁর নিজের জীবনে হয়তো আনন্দের চেয়ে দায়িত্বই বড়। তবুও তিনি কাজ করে চলেছেন।

ভ্যানের চাকায় ঘোরে সংসারের চাকা

রেখার গল্পকে এক কথায় বলা যায়—ভ্যানের চাকায় ঘোরে সংসারের চাকা।

ভ্যানটি শুধু একটি যান নয়। এটি তাঁর জীবিকার মাধ্যম। এই ভ্যানের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে তাঁর প্রতিদিনের রুটি-রুজি, আত্মসম্মান এবং ভবিষ্যতের আশা।

ভ্যান যত দূর এগোয়, তাঁর জীবনও যেন ততটা এগিয়ে যায়।

কখনও রাস্তা মসৃণ, কখনও খানাখন্দে ভরা। কখনও কাজের চাপ বেশি, কখনও তুলনামূলক কম। কিন্তু যাত্রা থামে না।

জীবনের সঙ্গেও যেন এই পথের একটা মিল রয়েছে।

কিছু রাস্তা সহজ, কিছু কঠিন। কিছু দিন ভালো, কিছু দিন খারাপ। কিন্তু থেমে গেলে চলবে না—এটাই যেন রেখার জীবনের শিক্ষা।

একজন নারী, একাধিক দায়িত্ব

একজন পুরুষ পরিবারের দায়িত্ব নিলে সেটিকে সমাজে অনেক সময় স্বাভাবিক হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু একজন নারী যখন একা সংসারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন, তখন সেই লড়াইয়ের গুরুত্ব অনেক বেশি।

রেখার ক্ষেত্রেও বিষয়টি তেমনই।

স্বামীর মৃত্যুর পর তাঁকে শুধু নিজের জীবন নয়, পরিবারের প্রয়োজনের কথাও ভাবতে হয়েছে। কাজ করতে হয়েছে নিয়মিত। নিজের কষ্টকে পাশে সরিয়ে রেখে দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে।

news image
আরও খবর

এই দায়িত্ব পালনের পথ সবসময় সহজ নয়।

শরীর খারাপ হলেও কাজ করতে হয়।

মন খারাপ হলেও কাজ করতে হয়।

ব্যক্তিগত সমস্যা থাকলেও কাজ থামানো যায় না।

কারণ তাঁর অনুপস্থিতি মানেই হয়তো পরিবারের জীবনে আরও একটি সমস্যা তৈরি হওয়া।

সমাজের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা

রেখার গল্প শুধু একজন মহিলার ব্যক্তিগত সংগ্রামের গল্প নয়। এটি সমাজের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে।

কাজের কোনও ছোট-বড় নেই। একজন মানুষ নিজের শ্রম দিয়ে সম্মানের সঙ্গে জীবিকা অর্জন করছেন—এটাই সবচেয়ে বড় বিষয়।

আবর্জনা সংগ্রহের মতো কাজ হয়তো অনেকের কাছে সাধারণ বা অগুরুত্বপূর্ণ মনে হতে পারে। কিন্তু শহরের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বজায় রাখতে এই কাজ অপরিহার্য।

যে মানুষ প্রতিদিন আমাদের বাড়ির আবর্জনা নিয়ে যান, তাঁর জীবনেও রয়েছে স্বপ্ন, দুঃখ, অভাব, আনন্দ এবং আশা।

তাঁরও হয়তো পরিবার রয়েছে।

তাঁরও হয়তো পুজোয় নতুন জামা পরার ইচ্ছে হয়।

তাঁরও হয়তো বিশ্রাম দরকার।

তাঁরও হয়তো নিজের জীবনের গল্প বলার মতো অনেক কথা রয়েছে।

‘দুর্গা’ হয়ে ওঠার গল্প

রেখাকে ‘দুর্গা’ বলা শুধু একটি নাম নয়। এটি তাঁর জীবনের সংগ্রামের প্রতি মানুষের স্বীকৃতি।

স্বামীর মৃত্যুর পর যখন অনেক কিছুই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল, তখন তিনি নিজেকে নতুন করে গড়ে নিয়েছেন। নিজের হাতে কাজ নিয়েছেন। প্রতিদিন মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে পরিষেবা দিয়েছেন।

তিনি হয়তো নিজেকে কোনওদিন নায়িকা ভাবেননি। তাঁর কাছে এটি শুধুই কাজ, শুধুই দায়িত্ব।

কিন্তু বাইরে থেকে দেখলে তাঁর জীবনযুদ্ধের মধ্যে যে সাহস রয়েছে, তা সত্যিই অনুপ্রেরণার।

কারণ নায়ক বা নায়িকা হওয়ার জন্য সবসময় বড় মঞ্চ প্রয়োজন হয় না।

কখনও কখনও রাস্তার পাশে একটি ভ্যানই হয়ে ওঠে সংগ্রামের মঞ্চ।

তাঁর পথচলা থামেনি

স্বামীর মৃত্যুর পর জীবনে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, তা হয়তো কোনওদিন পূরণ হবে না। প্রিয় মানুষকে হারানোর কষ্ট মানুষের সঙ্গে থেকেই যায়।

কিন্তু সেই কষ্টের মধ্যেও জীবন এগিয়ে যায়।

রেখাও এগিয়ে চলেছেন।

প্রতিদিনের মতো হয়তো আগামীকালও সকাল হবে। তিনি ভ্যান নিয়ে বেরিয়ে পড়বেন। এক বাড়ি থেকে অন্য বাড়ি যাবেন। আবর্জনা সংগ্রহ করবেন। বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলবেন। দিনের শেষে আবার ফিরবেন নিজের ঘরে।

পরের দিন আবার একই পথ।

এই পুনরাবৃত্তির মধ্যেই রয়েছে তাঁর অসাধারণ শক্তি।

এই লড়াইয়ের কোনও ছুটি নেই

উৎসব আসে, উৎসব চলে যায়। ঋতু বদলায়। বছর বদলায়। কিন্তু জীবনের দায়িত্ব থেকে ছুটি মেলে না।

রেখার ক্ষেত্রেও তাই।

দুর্গাপুজো হোক কিংবা অন্য কোনও দিন, তাঁকে কাজে বেরোতেই হয়। শহর পরিষ্কার রাখতে তাঁর মতো কর্মীদের প্রয়োজন প্রতিদিন।

কাজের দিন আর ছুটির দিনের পার্থক্য তাঁর জীবনে হয়তো অনেকটাই কম।

তবুও উৎসবের সময় মানুষের আনন্দ দেখে হয়তো তিনিও খুশি হন। কারণ তিনি জানেন, তাঁর কাজেরও সেই আনন্দের সঙ্গে একটা যোগ রয়েছে। পরিষ্কার রাস্তা, পরিষ্কার এলাকা এবং সুস্থ পরিবেশ তৈরিতে তাঁর শ্রমও রয়েছে।

সাধারণ জীবনের অসাধারণ গল্প

রেখার গল্পে কোনও সিনেমার চমক নেই। নেই বড় কোনও পুরস্কার, মঞ্চ কিংবা প্রচারের আলো। আছে শুধু প্রতিদিনের বাস্তবতা।

একজন নারী।

একটি ভ্যান।

একটি কঠিন অতীত।

একটি সংসারের দায়িত্ব।

আর সামনে এগিয়ে যাওয়ার অদম্য ইচ্ছা।

এই সাধারণ উপাদানগুলিই তাঁর জীবনকে অসাধারণ করে তুলেছে।

তিনি হয়তো প্রতিদিন হাজার মানুষের নজরে পড়েন না। কিন্তু তাঁর ভ্যান যখন কোনও রাস্তা দিয়ে যায়, তখন সেই রাস্তার মানুষ জানেন—এই মহিলা নিজের দায়িত্ব পালন করতে বেরিয়েছেন।

জীবন থামেনি

স্বামীর মৃত্যুর পর জীবন থমকে যেতে পারত। কিন্তু রেখা থামতে দেননি।

তিনি জানেন, অতীত বদলানো সম্ভব নয়। হারিয়ে যাওয়া মানুষকে ফিরিয়ে আনা যায় না। কিন্তু সামনে এগিয়ে যাওয়া যায়।

সেই পথেই হাঁটছেন তিনি।

ভ্যানের চাকায় চাকায় এগিয়ে যাচ্ছে তাঁর জীবন।

প্রতিদিনের ঘাম, পরিশ্রম আর দায়িত্বের মধ্যেই তিনি খুঁজে নিচ্ছেন আগামী দিনের আশা।

তাঁর গল্প হয়তো আমাদের মনে করিয়ে দেয়—জীবন সবসময় সহজ রাস্তা দেয় না। কখনও কখনও খুব কঠিন পথ বেছে নিতে হয়। কিন্তু সেই পথেই যদি সাহস নিয়ে হাঁটা যায়, তবে একদিন সেই সংগ্রামই হয়ে ওঠে পরিচয়।

অশোকনগরের রেখা তাই শুধু একজন ভ্যানচালক বা আবর্জনা সংগ্রহকারী কর্মী নন। তিনি এমন এক নারীর প্রতিচ্ছবি, যিনি জীবনের কঠিন আঘাতের পরেও নিজেকে থামতে দেননি।

স্বামী নেই। জীবনের অনেক স্বপ্ন হয়তো অপূর্ণ। তবুও সকাল হলে ভ্যানের হ্যান্ডেলে হাত রাখেন তিনি।

চাকা ঘোরে।

রাস্তা এগোয়।

আর সেই পথের সঙ্গে এগিয়ে চলে রেখার জীবনও।

স্বামীর মৃত্যুর পর থেমে যায়নি তাঁর পথচলা। ভ্যানের চাকায় আজও ঘুরছে তাঁর সংসার, তাঁর আত্মসম্মান, তাঁর স্বপ্ন। তাই অশোকনগরের মানুষের কাছে তিনি শুধু রেখা নন—জীবনযুদ্ধের এক বাস্তব ‘দুর্গা’।

Preview image