পুজোর আগে শহরের একাধিক বেসরকারি হাসপাতালে হঠাৎ অভিযান চালাল দমকল বিভাগ। ফায়ার অডিট ও অগ্নি নির্বাপণ ব্যবস্থা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বেলভিউ, রুবি, সিএমআরআই, কোঠারি, ডিসান-সহ একাধিক হাসপাতালে চলছে এই পরিদর্শন
দুর্গাপুজোর বোধন শুরু হতে আর মাত্র কয়েকদিন। শহরের মalls, মার্কেট, রেস্তোরাঁগুলো ইতিমধ্যেই দমকল বিভাগের অগ্নি নিরাপত্তা পরিদর্শনের আওতায় এসেছে। এবার সেই তালিকায় যুক্ত হলো শহরের বেসরকারি হাসপাতালগুলো। পুজোর ভিড়ে যাতে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে, আর দুর্ঘটনা ঘটলেও যাতে প্রাথমিক পর্যায়েই আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে এবং কোনো প্রাণহানি না হয়—এই লক্ষ্যেই শুক্রবার (২ অক্টোবর) থেকে কলকাতার একাধিক বেসরকারি হাসপাতালে অভিযান শুরু করেছে রাজ্য দমকল ও জরুরি পরিষেবা বিভাগ।
এই অভিযান কেবল কাগজপত্র পরীক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দমকল আধিকারিকরা সরেজমিনে হাসপাতালের একেকটি তলা ঘুরে ফায়ার অ্যালার্ম, স্মোক ডিটেক্টর, স্প্রিংক্লার, হাইড্রেন্ট, ফায়ার কন্ট্রোল প্যানেল—সবকিছু পরীক্ষা করছেন। আগুন জ্বালিয়ে বাস্তব পরীক্ষাও করা হচ্ছে। উদ্দেশ্য একটাই—বিপদের মুহূর্তে এই ব্যবস্থাগুলো সত্যিই কাজ করবে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া।
শুক্রবার সকাল থেকেই শহরের একের পর এক বেসরকারি হাসপাতালে পৌঁছন দমকলের দক্ষিণ বিভাগীয় আধিকারিকরা। প্রথম দিনেই পরিদর্শন করা হয় মানিপাল হাসপাতাল (ধাকুরিয়া), রুবি জেনারেল হাসপাতাল, বেলভিউ ক্লিনিক এবং উডল্যান্ডস হাসপাতাল।
শনিবার (৩ অক্টোবর) অভিযান আরও বিস্তৃত হয়। এই দিন দমকলের দল পরিদর্শন করে বি এম বিড়লা হার্ট রিসার্চ সেন্টার, সিএমআরআই, ডিসান হাসপাতাল এবং ফোর্টিস হাসপাতাল। এছাড়াও কোঠারি হাসপাতাল, এবং শহরের অন্যান্য বড় বেসরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানেও চলছে এই ফায়ার চেক।
দমকল সূত্রে জানা গেছে, শুধু বেসরকারি নয়—সরকারি হাসপাতালগুলোও এই অডিটের আওতায় আসবে। ধাপে ধাপে রাজ্যের সব স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানেই এই পরিদর্শন চালানো হবে।
দমকল আধিকারিকরা হাসপাতালে ঢুকেই প্রথমে যান বেসমেন্টে। সেখানে অবস্থিত ফায়ার ফাইটিং কন্ট্রোল রুম, পাম্প, মোটর এবং অন্যান্য যন্ত্রাংশ সচল রয়েছে কি না, তা পরীক্ষা করা হয়। আগুন লাগলে দ্রুত জল সরবরাহের ব্যবস্থা চালু করা যাবে কি না, মোটর ঠিকমতো কাজ করছে কি না—সেদিকে বিশেষ নজর দেওয়া হচ্ছে।
এরপর হাসপাতালের বিভিন্ন তলায় ঘুরে দেখা হয় ফায়ার অ্যালার্ম এবং স্মোক ডিটেক্টর। কোথাও আগুন বা ধোঁয়া তৈরি হলে অ্যালার্ম সঙ্গে সঙ্গে সক্রিয় হবে কি না, যন্ত্রগুলো ঠিকঠাক কাজ করছে কি না—তা যাচাই করা হচ্ছে। হাসপাতালের বিভিন্ন অংশে রাখা অগ্নি নির্বাপণ যন্ত্রগুলোও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। যন্ত্রের ভেতরে থাকা রাসায়নিকের মেয়াদ রয়েছে কি না, সেগুলো ব্যবহারের উপযুক্ত অবস্থায় আছে কি না—তাও পরীক্ষা করা হচ্ছে।
এছাড়াও পরীক্ষা করা হচ্ছে:
প্রবেশ ও প্রস্থানের পথ (entry and exit routes)
জরুরি সিঁড়ি ও নির্গমন পথ (emergency exits)
স্প্রিংকলার সিস্টেম
ইয়ার্ড হাইড্রেন্ট ও স্ট্যাটিক ওয়াটার স্টোরেজ
হাউস পাইপ ও হোজ পাইপ
ফায়ার ডোর ও এক্সহস্ট সিস্টেম
বেলভিউ ক্লিনিকের সিইও প্রদীপ টন্ডন জানান, “দমকল বিভাগের দল সকাল ১১টা নাগাদ আমাদের হাসপাতালে আসে। এটি ছিল পুরো চত্বরের একটি আকস্মিক পরিদর্শন। তারা ভবনগুলো ঘুরে স্মোক ডিটেক্টর, স্প্রিংকলার এবং হাইড্রেন্ট সিস্টেমের কার্যকারিতা পরীক্ষা করেন। ফায়ার ডোর আছে কি না এবং এক্সহস্ট সিস্টেম ঠিকমতো কাজ করছে কি না, তাও যাচাই করেন।” তিনি আরও জানান, জরুরি অবস্থায় অতিরিক্ত জল সরবরাহের ব্যবস্থা নিয়েও তারা জানতে চান এবং পুজোর প্রস্তুতি সম্পর্কেও খোঁজ নেন।
সাধারণ বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে হাসপাতালের তুলনা করা যায় না। একটি মলে বা রেস্তোরাঁয় আগুন লাগলে মানুষ দ্রুত বেরিয়ে যেতে পারেন। কিন্তু হাসপাতালে অনেক রোগী শয্যাশায়ী। আইসিইউ, ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিট, অপারেশন ওয়ার্ড এবং লাইফ সাপোর্ট সিস্টেমে থাকা রোগীরা স্বাভাবিক অবস্থাতেও অন্যের সাহায্য ছাড়া নড়াচড়া করতে পারেন না। আগুন লাগলে তাদের সরিয়ে আনা আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
২০১১ সালের ৯ ডিসেম্বর ধাকুরিয়ার আমরি হাসপাতালে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের কথা এখনও বাঙালির মনে তাজা। সেই ঘটনায় ৯১ জনের মৃত্যু হয়েছিল। বেশিরভাগই ছিলেন রোগী, যারা ধোঁয়ায় শ্বাসরোধ হয়ে মারা যান—নিজে বেরিয়ে আসার ক্ষমতা তাদের ছিল না। সেই ট্র্যাজেডির পর বেসরকারি হাসপাতালগুলো অগ্নি নিরাপত্তা নিয়ে অনেক বেশি সচেতন হয়েছে। নিয়মিত ফায়ার অডিট, ড্রিল ও মক ড্রিল এখন অনেক হাসপাতালের প্রস্তুতির অংশ হয়ে উঠেছে।
তবে শুধু যন্ত্রপাতি থাকলেই অগ্নিকাণ্ড সামলানো যায় না। সেই কারণেই এবার হাসপাতালের নিরাপত্তারক্ষী এবং কর্মীদের ভূমিকার উপর বিশেষ জোর দিচ্ছে দমকল। আগুন লাগলে প্রথমে কী করতে হবে, কাকে খবর দিতে হবে, কীভাবে নির্বাসন শুরু করতে হবে, এবং যারা নিজে বিছানা ছাড়তে পারেন না তাদের কীভাবে সরাতে হবে—এই বিষয়ে কর্মীরা প্রশিক্ষিত কি না, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
সিএমআরআই-এর জোনাল হেড সম্বরতা রায় জানান, তাদের হাসপাতালে একটি লাইভ ড্রিল করা হয়েছে, যাতে প্রতিক্রিয়ার সময় (response time) পরিমাপ করা যায়।
পরিদর্শনের পর দমকল আধিকারিকরা জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত যেসব হাসপাতাল পরিদর্শন করা হয়েছে, সেগুলো “ভালোভাবে প্রস্তুত” বলে মনে হয়েছে। দমকল বিভাগের এক ঊর্ধ্বতন আধিকারিক বলেন, পরিদর্শনকালে যে ব্যবস্থা দেখা গেছে তাতে তারা সন্তুষ্ট, এবং জরুরি অবস্থায় হাসপাতালগুলো সাড়া দিতে সক্ষম হবে বলে আস্থা প্রকাশ করেছেন।
দক্ষিণ বিভাগীয় স্টেশন অফিসার নিহার রঞ্জন রায় জানান, পুজোর সময় বিশেষ অভিযান হিসেবে বেসরকারি হাসপাতালগুলো পরিদর্শন করা হচ্ছে। সম্পূর্ণ পরীক্ষার পর তারা সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তবে কিছু পরামর্শ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
একটি বেসরকারি হাসপাতালের কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন, পুজোর সময়ে তাদের সমস্ত জরুরি বিভাগ প্রস্তুত রাখা হচ্ছে। চিকিৎসক থেকে শুরু করে চিকিৎসা কর্মীদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। জরুরি পরিষেবা ২৪×৭ চালু থাকবে। অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা সচল রয়েছে এবং কোনো ঘাটতি নেই বলে জানিয়েছেন হাসপাতালের সিইও।
দমকল সূত্রে জানা গেছে, এই অডিট অভিযান চলবে। রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তের হাসপাতালেও দল পাঠানো হবে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের পরিদর্শনের ভিত্তিতে রিপোর্ট তৈরি করা হবে। কোনো ঘাটতি বা প্রয়োজনীয়তা থাকলে সরাসরি সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে।
এর আগে এই সপ্তাহেই শহরের প্রায় সব বড় শপিং মলে ফায়ার অডিট চালিয়েছে দমকল বিভাগ। সেই ধারাবাহিকতায় হাসপাতালগুলোও এখন পরিদর্শনের আওতায় এসেছে। পুজোর ভিড়ে শহরের যে কোনো বড় প্রতিষ্ঠানে যাতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা না ঘটে, সেদিকে কড়া নজর রাখছে দমকল।
দুর্গাপুজো বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব। এই আনন্দের মুহূর্তে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা কেউই চায় না। দমকল বিভাগের এই অভিযান সেই দিকেই এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। হাসপাতালে রোগীরা অনেকটাই অসহায়—তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সবার দায়িত্ব। আমরি হাসপাতালের ট্র্যাজেডি থেকে শিক্ষা নিয়ে এখন বেসরকারি হাসপাতালগুলো অনেক বেশি প্রস্তুত। কিন্তু প্রস্তুতি কখনোই শেষ কথা নয়। নিয়মিত অডিট, ড্রিল এবং কর্মীদের প্রশিক্ষণ—এই তিনটি একসঙ্গে চললেই সত্যিকারের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। পুজোর আগে দমকলের এই অভিযান সেই বার্তাই বহন করে।
দমকল সূত্রে জানা গেছে, এই অডিট অভিযান চলবে। রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তের হাসপাতালেও দল পাঠানো হবে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের পরিদর্শনের ভিত্তিতে রিপোর্ট তৈরি করা হবে। কোনো ঘাটতি বা প্রয়োজনীয়তা থাকলে সরাসরি সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে।
এর আগে এই সপ্তাহেই শহরের প্রায় সব বড় শপিং মলে ফায়ার অডিট চালিয়েছে দমকল বিভাগ। সেই ধারাবাহিকতায় হাসপাতালগুলোও এখন পরিদর্শনের আওতায় এসেছে। পুজোর ভিড়ে শহরের যে কোনো বড় প্রতিষ্ঠানে যাতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা না ঘটে, সেদিকে কড়া নজর রাখছে দমকল। দুর্গাপুজো বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব। এই আনন্দের মুহূর্তে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা কেউই চায় না। দমকল বিভাগের এই অভিযান সেই দিকেই এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। হাসপাতালে রোগীরা অনেকটাই অসহায়—তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সবার দায়িত্ব। আমরি হাসপাতালের ট্র্যাজেডি থেকে শিক্ষা নিয়ে এখন বেসরকারি হাসপাতালগুলো অনেক বেশি প্রস্তুত। কিন্তু প্রস্তুতি কখনোই শেষ কথা নয়। নিয়মিত অডিট, ড্রিল এবং কর্মীদের প্রশিক্ষণ—এই তিনটি একসঙ্গে চললেই সত্যিকারের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। পুজোর আগে দমকলের এই অভিযান সেই বার্তাই বহন করে।