ময়নাপুরের দেওয়ানবাড়িতে ৩৭১ বছর ধরে চলে আসছে দুর্গাপুজো। প্রাচীন ঐতিহ্য মেনে এই পুজোয় দেবী দুর্গা পূজিতা হন দ্বিভুজা অভয়ারূপে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা এই পুজো আজও বহন করে চলেছে ইতিহাস, ঐতিহ্য ও পারিবারিক সংস্কৃতির স্বাক্ষর।
ময়নাপুরের দেওয়ানবাড়ির দুর্গাপুজো শুধু একটি ধর্মীয় আয়োজন নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস, পারিবারিক ঐতিহ্য এবং কয়েক শতাব্দীর সংস্কৃতির উত্তরাধিকার। প্রায় ৩৭১ বছর ধরে এই বাড়িতে নিষ্ঠা ও প্রাচীন রীতিনীতি মেনে হয়ে আসছে দেবী দুর্গার আরাধনা। সময় বদলেছে, বদলেছে মানুষের জীবনযাত্রা, বদলেছে পুজোর পরিবেশও। কিন্তু দেওয়ানবাড়ির দুর্গাপুজোর ঐতিহ্যে এখনও রয়ে গিয়েছে সেই পুরনো দিনের ছাপ।
এই পুজোর অন্যতম বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল, এখানে দেবী দুর্গা সাধারণ প্রচলিত দশভুজা রূপে নন, বরং দ্বিভুজা অভয়ারূপে পূজিতা হন। দেবীর এই ব্যতিক্রমী রূপই দেওয়ানবাড়ির পুজোকে অন্য অনেক বনেদি বাড়ির পুজো থেকে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে। দেবীর এই রূপের মধ্যে যেমন রয়েছে প্রাচীন ধর্মীয় ভাবনা, তেমনই রয়েছে ঐতিহ্য ও বিশ্বাসের গভীর যোগসূত্র।
ময়নাপুরের দেওয়ানবাড়ির পুজোকে ঘিরে স্থানীয় মানুষের মধ্যেও রয়েছে বিশেষ আগ্রহ। বছরের পর বছর ধরে এই পুজো দেখতে বহু মানুষ বাড়িতে আসেন। বনেদি বাড়ির পুজোর সেই পুরনো আবহ, পারিবারিক রীতিনীতি এবং দেবীর ব্যতিক্রমী মূর্তি দর্শনার্থীদের কাছে বাড়তি আকর্ষণের বিষয় হয়ে ওঠে।
দুর্গাপুজো বাঙালির অন্যতম শ্রেষ্ঠ উৎসব। শহরের বড় বড় থিমের পুজো কিংবা আধুনিক আলোকসজ্জার পুজোর পাশাপাশি বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা বনেদি বাড়ির পুজোগুলিও বহন করে চলেছে বহু বছরের ইতিহাস। কোথাও কয়েকশো বছরের পুরনো রীতি, কোথাও বিশেষ ধরনের প্রতিমা, কোথাও আবার নির্দিষ্ট পারিবারিক আচার—প্রতিটি বনেদি বাড়ির পুজোর নিজস্ব বৈশিষ্ট্য রয়েছে। ময়নাপুরের দেওয়ানবাড়ির পুজোও সেই ঐতিহ্যেরই একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।
৩৭১ বছরের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে আজও এই পুজো টিকে রয়েছে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে পরিবারের সদস্যরা পুজোর সঙ্গে যুক্ত থেকেছেন। সময়ের সঙ্গে পরিবারের পরিধি বদলালেও দেবীর আরাধনার ধারাবাহিকতা বজায় রয়েছে। পুরনো ঐতিহ্যকে ধরে রেখে বর্তমান প্রজন্মও পুজোর সঙ্গে নিজেদের যুক্ত রাখছেন।
দেওয়ানবাড়ির পুজোর সবচেয়ে বড় আকর্ষণ নিঃসন্দেহে দেবীর দ্বিভুজা অভয়ারূপ। সাধারণত দুর্গাপুজোর প্রতিমায় দেবীকে দশভুজা রূপে দেখা যায়। কিন্তু এই বাড়ির পুজোয় দেবী দুর্গার রূপ সম্পূর্ণ আলাদা। এখানে দেবী পূজিতা হন দুই হাতের অভয়ারূপে। সেই বিশেষ রূপের মধ্যেই রয়েছে এই পুজোর স্বাতন্ত্র্য।
দেবীর এই রূপ দর্শনের জন্য পুজোর সময় বাড়িতে ভিড় করেন বহু মানুষ। বিশেষ করে বনেদি বাড়ির প্রাচীন পুজোর ইতিহাস ও বৈচিত্র্য যাঁদের আগ্রহের বিষয়, তাঁদের কাছে ময়নাপুরের দেওয়ানবাড়ির পুজো একটি আকর্ষণীয় স্থান। প্রাচীন পুজোর সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন রীতি ও ঐতিহ্য জানার আগ্রহও তৈরি হয় দর্শনার্থীদের মধ্যে।
একটি পুজো যখন শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে টিকে থাকে, তখন সেটি শুধুমাত্র একটি পরিবারের ধর্মীয় অনুষ্ঠান হয়ে থাকে না। তার সঙ্গে জড়িয়ে যায় স্থানীয় সমাজ ও সংস্কৃতির নানা স্মৃতি। বহু প্রজন্মের মানুষ সেই পুজোকে ঘিরে বড় হয়েছেন। তাঁদের শৈশব, কৈশোর কিংবা পারিবারিক স্মৃতির সঙ্গে এই পুজোর সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। ফলে দেওয়ানবাড়ির দুর্গাপুজো স্থানীয় মানুষের কাছেও একটি আবেগের জায়গা।
৩৭১ বছরের ইতিহাসের অর্থ হল, বহু প্রজন্ম এই পুজোর সাক্ষী থেকেছে। একসময় যে রীতিতে পুজো শুরু হয়েছিল, তার অনেকটাই আজও ধরে রাখার চেষ্টা করা হয়। আধুনিক সময়ের পরিবর্তনের মধ্যেও প্রাচীন পুজোর মূল পরিচয় অক্ষুণ্ণ রাখার বিষয়টি তাই বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
দেওয়ানবাড়ির পুজোর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল এর পারিবারিক চরিত্র। বনেদি বাড়ির পুজোগুলিতে পরিবারের সদস্যদের সক্রিয় অংশগ্রহণ একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্য। পুজোর বিভিন্ন আয়োজন থেকে শুরু করে দেবীর আরাধনা—সবকিছুর মধ্যেই পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতি দেখা যায়। পুজোর দিনগুলিতে দূরে থাকা পরিবারের সদস্যরাও অনেক সময় বাড়িতে ফিরে আসেন। ফলে দুর্গাপুজো হয়ে ওঠে পারিবারিক পুনর্মিলনেরও একটি উপলক্ষ।
সময়ের সঙ্গে মানুষের জীবনযাত্রায় নানা পরিবর্তন এসেছে। যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হয়েছে, প্রযুক্তির ব্যবহার বেড়েছে, মানুষের কাজের ধরন বদলেছে। কিন্তু ধর্মীয় ও পারিবারিক ঐতিহ্যের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক এখনও গভীর। দেওয়ানবাড়ির ৩৭১ বছরের পুজো সেই ধারাবাহিকতারই সাক্ষ্য বহন করছে।
দেবীর দ্বিভুজা অভয়ারূপের মধ্যে রয়েছে এক বিশেষ নান্দনিকতা। প্রচলিত দশভুজা রূপের তুলনায় এই রূপ অনেকটাই ভিন্ন। তাই প্রথমবার এই পুজো দেখতে আসা মানুষের কাছেও দেবীর প্রতিমা আলাদা করে নজর কাড়ে। পুজোর ইতিহাস জানার পর দেবীর এই বিশেষ রূপের তাৎপর্য দর্শনার্থীদের আগ্রহ আরও বাড়িয়ে দেয়।
বাংলার বনেদি বাড়ির দুর্গাপুজোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল—প্রতিটি বাড়ির নিজস্ব ঐতিহ্য। কোনও বাড়িতে নির্দিষ্ট ভোগের রীতি, কোথাও নির্দিষ্ট আচার, কোথাও আবার প্রতিমার গড়নেই রয়েছে বিশেষত্ব। ময়নাপুরের দেওয়ানবাড়ির ক্ষেত্রে সেই বিশেষত্বের কেন্দ্রে রয়েছে দ্বিভুজা অভয়ারূপে দেবী দুর্গার আরাধনা।
এই পুজোকে ঘিরে শুধু ধর্মীয় আবেগ নয়, ইতিহাসের প্রতিও মানুষের আগ্রহ রয়েছে। ৩৭১ বছরের মতো দীর্ঘ সময় ধরে একটি পুজোর ধারাবাহিকতা বজায় রাখা সহজ বিষয় নয়। এর পিছনে রয়েছে বহু প্রজন্মের মানুষের নিষ্ঠা, বিশ্বাস এবং ঐতিহ্যকে ধরে রাখার চেষ্টা।
পুজোর সময় দেওয়ানবাড়ির পরিবেশও হয়ে ওঠে উৎসবমুখর। দেবীর আরাধনা, পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতি এবং দর্শনার্থীদের আনাগোনায় বাড়ির প্রাঙ্গণে তৈরি হয় অন্যরকম আবহ। আধুনিক পুজোর চাকচিক্য থেকে দূরে, প্রাচীন বনেদি বাড়ির পুজোর নিজস্ব যে আবেগ ও পরিবেশ, সেটিই এই পুজোর অন্যতম আকর্ষণ।
বর্তমান সময়ে যখন দুর্গাপুজোর সঙ্গে থিম, আলোকসজ্জা এবং বড় আয়োজনের বিষয়গুলি ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, তখন দেওয়ানবাড়ির মতো পুরনো বাড়ির পুজো মনে করিয়ে দেয় বাংলার দুর্গাপুজোর শিকড়ের কথা। এই ধরনের পুজোর মাধ্যমে শুধু দেবীর আরাধনাই হয় না, সংরক্ষিত থাকে বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের একটি অংশও।
দেওয়ানবাড়ির পুজোর ৩৭১ বছরের যাত্রাপথে নিশ্চয়ই বহু পরিবর্তন এসেছে। সময়ের সঙ্গে পুজোর আয়োজনের কিছু ক্ষেত্রে পরিবর্তন হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু মূল ঐতিহ্যকে ধরে রাখাই এই পুজোর সবচেয়ে বড় সাফল্য। দেবীর দ্বিভুজা অভয়ারূপ এখনও সেই প্রাচীন পুজোর স্বাতন্ত্র্যকে সামনে নিয়ে আসে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছেও এই পুজোর গুরুত্ব অনেক। এলাকার প্রাচীন ইতিহাস ও সংস্কৃতির সঙ্গে দেওয়ানবাড়ির পুজো ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে। পুজোর সময় তাই বাড়িতে শুধু পরিবারের সদস্যদেরই নয়, স্থানীয় মানুষেরও আগ্রহ থাকে। অনেকেই প্রাচীন এই পুজোর প্রতিমা দেখতে আসেন এবং পুরনো ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হন।
দুর্গাপুজোর সময় বাংলার বিভিন্ন বনেদি বাড়িতে ভিড় করার অন্যতম কারণ হল, সেখানে পুজোর মধ্যে ইতিহাসকে খুব কাছ থেকে দেখা যায়। মণ্ডপের চাকচিক্যের বদলে সেখানে পাওয়া যায় পারিবারিক বিশ্বাস ও প্রজন্মের স্মৃতি। দেওয়ানবাড়ির পুজোও সেই ঐতিহ্যের ধারক।
৩৭১ বছর ধরে একটি পুজো টিকে থাকা শুধু একটি সংখ্যা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে শত শত বছরের সামাজিক পরিবর্তন। একাধিক প্রজন্মের জীবনযাত্রা, সমাজব্যবস্থার পরিবর্তন, সময়ের পালাবদল—সবকিছুর মধ্য দিয়েই এই পুজো নিজের অস্তিত্ব ধরে রেখেছে।
দেবীর দ্বিভুজা অভয়ারূপ যেন সেই দীর্ঘ ঐতিহ্যেরই একটি প্রতীক। দেবীর রূপে যেমন রয়েছে স্বাতন্ত্র্য, তেমনই রয়েছে প্রাচীনতার ছাপ। তাই এই পুজো শুধু ধর্মীয় দিক থেকে নয়, সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ।
বাঙালির দুর্গাপুজো মানেই আবেগ। বনেদি বাড়ির পুজো সেই আবেগকে আরও গভীর করে। বহু বছরের পুরনো বাড়ির পরিবেশ, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা পুজোর রীতি এবং পরিবারের সকলের মিলিত অংশগ্রহণ—সব মিলিয়ে এই ধরনের পুজো হয়ে ওঠে স্মৃতির উৎসব।
ময়নাপুরের দেওয়ানবাড়ির ৩৭১ বছরের পুজো সেই স্মৃতিরই একটি দীর্ঘ অধ্যায়। প্রাচীন ঐতিহ্যের সঙ্গে বর্তমান প্রজন্মের সংযোগ তৈরি করে চলেছে এই পুজো। নতুন প্রজন্মের কাছে এই পুজো শুধুমাত্র দেবীর আরাধনা নয়, পূর্বপুরুষদের রেখে যাওয়া ঐতিহ্যকে জানারও একটি সুযোগ।
আজকের দিনে ঐতিহ্যবাহী পুজোগুলির গুরুত্ব আরও বেড়েছে। কারণ দ্রুত পরিবর্তনশীল সময়ের মধ্যে পুরনো সংস্কৃতি ও রীতিনীতির অনেক কিছুই হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। সেই জায়গায় শতাব্দীপ্রাচীন পুজোগুলি ইতিহাসের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
দেওয়ানবাড়ির পুজোও সেই ধারার অংশ। ৩৭১ বছর ধরে দেবী দুর্গার আরাধনা হয়ে আসা নিজেই একটি উল্লেখযোগ্য ঐতিহাসিক ঘটনা। তার সঙ্গে যখন যুক্ত হয় দ্বিভুজা অভয়ারূপে দেবীর প্রতিমা, তখন এই পুজোর স্বাতন্ত্র্য আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
পুজোর দিনগুলিতে তাই ময়নাপুরের দেওয়ানবাড়ি হয়ে ওঠে এক বিশেষ আকর্ষণের কেন্দ্র। প্রাচীন ঐতিহ্য দেখতে আগ্রহী মানুষ থেকে শুরু করে স্থানীয় বাসিন্দা—সকলের কাছেই এই পুজোর গুরুত্ব রয়েছে। দেবীর সামনে প্রার্থনা, পুজোর পরিবেশ এবং প্রাচীন বাড়ির আবহ মিলিয়ে তৈরি হয় এক অনন্য অনুভূতি।
আধুনিকতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে চলার পাশাপাশি নিজের শিকড়কে ধরে রাখার যে প্রয়োজন, দেওয়ানবাড়ির দুর্গাপুজো তার একটি সুন্দর উদাহরণ। সময়ের পরিবর্তনকে স্বীকার করেও প্রাচীন ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব—এই পুজো যেন সেই বার্তাই বহন করে।
৩৭১ বছর আগে যে পুজোর সূচনা হয়েছিল, তা আজও একই ধারায় মানুষের বিশ্বাস ও আবেগের সঙ্গে যুক্ত। দেবী দুর্গার দ্বিভুজা অভয়ারূপ এই পুজোর অন্যতম পরিচয় হয়ে উঠেছে। প্রজন্ম বদলেছে, সময় বদলেছে, কিন্তু দেবীর আরাধনা এবং পুজোর ঐতিহ্য এখনও একইভাবে মানুষের মনে জায়গা করে রয়েছে।
সব মিলিয়ে ময়নাপুরের দেওয়ানবাড়ির দুর্গাপুজো বাংলার বনেদি বাড়ির পুজোর ঐতিহ্যের এক উজ্জ্বল উদাহরণ। ৩৭১ বছরের ইতিহাস, প্রজন্মের পর প্রজন্মের বিশ্বাস এবং দ্বিভুজা অভয়ারূপে দেবী দুর্গার আরাধনা—এই তিনের মেলবন্ধনেই তৈরি হয়েছে এই পুজোর নিজস্ব পরিচয়। আধুনিক পুজোর ভিড়ের মধ্যেও তাই দেওয়ানবাড়ির এই প্রাচীন পুজো আজও আলাদা করে মানুষের নজর কাড়ে।