পুলিশের তদন্তে জানা গিয়েছে, পরিকল্পনা করেই দিল্লিতে এসেছিলেন অভিযুক্ত দম্পতি রামপ্রসাদ দাস ও বনশ্রী। রামপ্রসাদের সঙ্গে থাকা একটি ছোট ব্যাগে ধারালো অস্ত্র ও রেজর উদ্ধার হয়েছে, যা খুনের ছক আগে থেকেই কষা হয়েছিল বলেই ইঙ্গিত দিচ্ছে।
দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপিকা দেবস্মিতা পাল হত্যাকাণ্ড ঘিরে দেশজুড়ে তীব্র চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। প্রথমে এটি একটি সাধারণ খুনের ঘটনা বলে মনে হলেও তদন্ত যত এগোচ্ছে, ততই সামনে আসছে একের পর এক বিস্ময়কর তথ্য। পুলিশি তদন্তে উঠে এসেছে, এই হত্যাকাণ্ড ছিল সম্পূর্ণ পরিকল্পিত এবং পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী ঘটানো হয়েছিল। অভিযুক্ত দম্পতি রামপ্রসাদ দাস ও বনশ্রী দাস বহুদিন ধরেই দেবস্মিতার সম্পত্তি দখলের ছক কষছিলেন বলে তদন্তকারীদের সন্দেহ। সেই পরিকল্পনাকে সফল করতেই প্রায় ১৪০০ কিলোমিটার দূরত্ব অতিক্রম করে পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান থেকে দিল্লিতে পৌঁছেছিলেন তাঁরা।
তদন্তকারী সূত্রে জানা গিয়েছে, ঘটনাদিনে অভিযুক্তরা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে নিজেদের পরিচয় গোপন রাখার চেষ্টা করেছিলেন। সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখে পুলিশ জানতে পেরেছে, রামপ্রসাদের সঙ্গে একটি ছোট লাল রঙের ব্যাগ ছিল। সেই ব্যাগের মধ্যেই লুকিয়ে রাখা হয়েছিল ধারালো অস্ত্র এবং রেজর ব্লেড। আবাসনে প্রবেশের সময় রামপ্রসাদের পরনে ছিল সাদা রঙের জামা এবং তাঁর স্ত্রী বনশ্রীর পরনে ছিল কালো-সাদা সালোয়ার-কামিজ। তাঁদের মুখও মাস্কে ঢাকা ছিল। কিন্তু ঘটনাস্থল থেকে বেরিয়ে আসার সময় তাঁদের পোশাকে স্পষ্ট পরিবর্তন দেখা যায়। রামপ্রসাদের গায়ে তখন লাল রঙের জামা এবং বনশ্রীর পরনে লাল সালোয়ার-কামিজ দেখা যায়। তদন্তকারীদের ধারণা, অপরাধের পর নিজেদের চেহারা ও পরিচয় গোপন করতে পোশাক বদল করেছিলেন তাঁরা।
পুলিশের দাবি, দেবস্মিতা অভিযুক্ত দম্পতিকে দীর্ঘদিন ধরেই চিনতেন। কারণ বর্ধমানে তাঁর উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া বাড়িতে রামপ্রসাদ ও বনশ্রী ভাড়াটে হিসেবে বসবাস করতেন। সেই পরিচিতির সুযোগকেই কাজে লাগানো হয়েছিল। দেবস্মিতার কাছে তাঁদের উপস্থিতি অস্বাভাবিক মনে হয়নি। বরং পরিচিত মানুষ হিসেবে তাঁদের ঘরে ঢুকতে দিয়েছিলেন তিনি। তদন্তে উঠে এসেছে, ফ্ল্যাটে ঢোকার পর অভিযুক্তরা প্রথমে স্বাভাবিক আচরণ করেন। দেবস্মিতার কাছে জল চান। তিনি তাঁদের জল দেন এবং স্বাভাবিক কথাবার্তাও চলতে থাকে। কিন্তু সেই সৌজন্যের আড়ালেই লুকিয়ে ছিল ভয়ঙ্কর ষড়যন্ত্র।
তদন্তকারীদের মতে, কথোপকথনের মাঝেই আচমকা পরিস্থিতির মোড় ঘুরে যায়। অভিযোগ, রামপ্রসাদ তাঁর সঙ্গে থাকা ব্যাগ থেকে ধারালো অস্ত্র বের করে দেবস্মিতার মাথায় আঘাত করেন। আকস্মিক এই হামলায় তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। এরপরও থেমে থাকেননি অভিযুক্তরা। অভিযোগ অনুযায়ী, রামপ্রসাদের স্ত্রী বনশ্রী রেজর ব্লেড দিয়ে দেবস্মিতার হাতের শিরা কেটে দেন। পুলিশ মনে করছে, মৃত্যুকে নিশ্চিত করতেই এই নির্মম পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। ঘটনাস্থলের পরিস্থিতি এবং ময়নাতদন্তের প্রাথমিক রিপোর্ট থেকেও সেই ইঙ্গিত মিলেছে।
খুনের পর অভিযুক্তরা অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় ফ্ল্যাট ছেড়ে বেরিয়ে যান বলে অভিযোগ। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গিয়েছে, বেরিয়ে আসার সময় রামপ্রসাদের মুখ ঢাকা থাকলেও বনশ্রী এবং তাঁদের নাবালক সন্তানের মুখে কোনও মাস্ক ছিল না। এই ফুটেজই তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হয়ে ওঠে। কারণ মুখ স্পষ্টভাবে ধরা পড়ায় তাঁদের পরিচয় শনাক্ত করতে সুবিধা হয় পুলিশের। তদন্তকারীরা এখন সেই ফুটেজের প্রতিটি ফ্রেম বিশ্লেষণ করে খুনের আগে ও পরে অভিযুক্তদের গতিবিধি পুনর্গঠন করার চেষ্টা করছেন।
ঘটনার তদন্তে নেমে দিল্লি পুলিশ খুব দ্রুত বিভিন্ন সূত্র জুড়ে একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র তৈরি করতে সক্ষম হয়। খুনের মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান থেকে অভিযুক্ত দম্পতিকে গ্রেফতার করা হয়। তাঁদের নিজেদের হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেছে পুলিশ। তদন্তকারীরা জানতে চাইছেন, খুনের পরিকল্পনা কতদিন ধরে চলছিল, কারও সাহায্য নেওয়া হয়েছিল কি না এবং সম্পত্তি দখলের উদ্দেশ্যে আর কোনও নথি বা জালিয়াতির পরিকল্পনা ছিল কি না।
পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে, বর্ধমানের বাড়ি নিয়ে দেবস্মিতা এবং অভিযুক্তদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই বিরোধ চলছিল। দেবস্মিতা ওই বাড়ি খালি করার জন্য ভাড়াটেদের উপর চাপ দিচ্ছিলেন বলে জানা গিয়েছে। অন্যদিকে অভিযুক্তরা সেই বাড়ি ছাড়তে চাইছিলেন না। তদন্তকারীদের ধারণা, এই বিরোধই ধীরে ধীরে গভীর ক্ষোভ এবং লোভের জন্ম দেয়। শেষ পর্যন্ত সম্পত্তি দখলের উদ্দেশ্যে তাঁরা চরম পথ বেছে নেন।
এই ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল দেবস্মিতার ব্যক্তিগত জীবন। জানা গিয়েছে, তিনি দিল্লিতে একাই থাকতেন এবং দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন শিবাজি কলেজে অধ্যাপনা করতেন। অত্যন্ত মেধাবী ও কর্মনিষ্ঠ শিক্ষিকা হিসেবে সহকর্মী এবং ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে তাঁর সুনাম ছিল। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে গেলেও নিজের পেশাগত দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে গিয়েছেন।
তদন্তকারীরা আরও জানতে পেরেছেন, দেবস্মিতার বিয়ের পাঁচ বছর পর তাঁর বৈবাহিক সম্পর্কে ভাঙন দেখা দেয়। ২০২২ সালে স্বামীর সঙ্গে তাঁর বিচ্ছেদ হয় এবং সেই সংক্রান্ত আইনি প্রক্রিয়াও চলছিল। তাঁর স্বামী বর্তমানে বেঙ্গালুরুতে থাকেন। যদিও এই পারিবারিক বিষয়টির সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের সরাসরি কোনও যোগসূত্র এখনও পাওয়া যায়নি, তবুও তদন্তের স্বার্থে সবদিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
গত বৃহস্পতিবার পূর্ব দিল্লির বসুধারা এনক্লেভের সত্যম অ্যাপার্টমেন্টে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনা সামনে আসে। দেবস্মিতার দিদি দেবারতি বারবার ফোন করেও বোনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পেরে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। পরে তিনি ফ্ল্যাটে পৌঁছে দেখেন দরজা বাইরে থেকে বন্ধ। সন্দেহ হওয়ায় দরজা ভেঙে ভিতরে প্রবেশ করেন তিনি। ঘরে ঢুকেই মেঝেতে পড়ে থাকা দেবস্মিতার রক্তাক্ত দেহ দেখতে পান। তাঁর মাথায় গুরুতর আঘাতের চিহ্ন ছিল এবং হাতের শিরাও কাটা অবস্থায় পাওয়া যায়। সঙ্গে সঙ্গে পুলিশকে খবর দেওয়া হয়।
পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে তদন্ত শুরু করে। ফরেনসিক দল নমুনা সংগ্রহ করে এবং আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখতে শুরু করে। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তদন্তকারীরা অভিযুক্তদের গতিবিধির গুরুত্বপূর্ণ সূত্র পেয়ে যান। সেই সূত্র ধরেই বর্ধমানে অভিযান চালিয়ে রামপ্রসাদ ও বনশ্রীকে গ্রেফতার করা হয়।
এই হত্যাকাণ্ড শুধু একটি অপরাধমূলক ঘটনা নয়, বরং বিশ্বাসভঙ্গ এবং সম্পত্তির লোভের ভয়াবহ উদাহরণ হিসেবেও সামনে এসেছে। যাঁদের উপর একজন মানুষ ভরসা করেছিলেন, যাঁদের নিজের সম্পত্তিতে থাকার সুযোগ দিয়েছিলেন, তাঁদের বিরুদ্ধেই এমন ভয়ঙ্কর অভিযোগ উঠেছে। তদন্তকারীরা মনে করছেন, ঘটনাটি ছিল সুপরিকল্পিত এবং অভিযুক্তরা আগেই সমস্ত প্রস্তুতি নিয়ে দিল্লিতে এসেছিলেন। সঙ্গে অস্ত্র, পোশাক পরিবর্তনের ব্যবস্থা এবং পরিচয় গোপনের কৌশল—সবই সেই পরিকল্পনার অংশ ছিল বলে অনুমান।
বর্তমানে দিল্লি পুলিশ এই মামলার প্রতিটি দিক খতিয়ে দেখছে। অভিযুক্তদের মোবাইল ফোন, যাতায়াতের তথ্য, আর্থিক লেনদেন এবং সম্পত্তি সংক্রান্ত নথিপত্র পরীক্ষা করা হচ্ছে। পাশাপাশি খতিয়ে দেখা হচ্ছে, এই অপরাধে অন্য কারও ভূমিকা ছিল কি না। তদন্তকারীদের আশা, জেরার মাধ্যমে আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে আসবে এবং এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পূর্ণাঙ্গ রহস্য উন্মোচিত হবে।
দেবস্মিতা পালের মৃত্যু শিক্ষাজগৎ এবং সমাজের কাছে এক গভীর শোকের ঘটনা। একজন শিক্ষিকা, গবেষক এবং স্বাধীনভাবে জীবনযাপন করা নারীর এই মর্মান্তিক পরিণতি নিরাপত্তা ও সম্পত্তি-সংক্রান্ত বিরোধ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত অনেক প্রশ্নের উত্তর বাকি থাকলেও, ইতিমধ্যেই স্পষ্ট হয়েছে যে এই হত্যাকাণ্ড ছিল অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় এবং পরিকল্পনা করে সংঘটিত এক ভয়াবহ অপরাধ।তদন্তের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে আরও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে আসছে। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, দিল্লিতে পৌঁছানোর পর অভিযুক্ত দম্পতি নিজেদের গতিবিধি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পরিচালনা করেছিলেন। তাঁরা কোথায় ছিলেন, কার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন এবং ঘটনার আগে-পরে কী কী পদক্ষেপ নিয়েছিলেন, তার পূর্ণাঙ্গ তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা চলছে। তদন্তকারীরা সিসিটিভি ফুটেজ, মোবাইল ফোনের কল রেকর্ড, লোকেশন ডেটা এবং ডিজিটাল প্রমাণ খতিয়ে দেখছেন। একই সঙ্গে সম্পত্তি সংক্রান্ত নথিপত্রও পরীক্ষা করা হচ্ছে। পুলিশ মনে করছে, অভিযুক্তদের দীর্ঘদিনের পরিকল্পনার ফলেই এই ঘটনা ঘটেছে। জেরায় নতুন তথ্য মিললে হত্যার উদ্দেশ্য, পরিকল্পনার পরিধি এবং সম্ভাব্য সহযোগীদের সম্পর্কেও আরও স্পষ্ট ছবি সামনে আসতে পারে।