Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

মা আসেন, ঘরে আর ফেরা হয় না! দুর্গাপুজোয় প্রিয়জনদের থেকে দূরে থাকা বাঙালিদের না-ফেরার গল্প

বাঙালির কাছে দুর্গাপুজো মানেই ঘরে ফেরা। কিন্তু কাজ, দায়িত্ব কিংবা হারিয়ে যাওয়া ঠিকানার কারণে বহু মানুষের আর ফেরা হয় না। তাঁদের পুজো কাটে স্মৃতি, ফোনের ওপারে প্রিয়জন আর দূর শহরের একাকিত্বে।

দুর্গাপুজো মানেই বাঙালির কাছে এক অন্যরকম আবেগ। শরতের আকাশ, কাশফুল, ঢাকের বাদ্যি, পুজোর গন্ধ, নতুন জামাকাপড় আর প্রিয়জনদের সঙ্গে একসঙ্গে সময় কাটানোর আনন্দ—সব মিলিয়ে দুর্গাপুজো যেন বাঙালির জীবনের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত কয়েকটি দিন। সারা বছর কাজের ব্যস্ততা, জীবনের নানা টানাপোড়েন এবং দূরত্ব ভুলে এই কয়েকটি দিনের জন্য মানুষ অপেক্ষা করে থাকেন। আর সেই অপেক্ষার সবচেয়ে বড় অংশ জুড়ে থাকে একটাই ইচ্ছে—বাড়ি ফিরব।

কাজের তাগিদে যাঁরা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে কিংবা বিদেশে থাকেন, তাঁদের কাছে দুর্গাপুজো মানেই বাড়ি ফেরার পরিকল্পনা। ট্রেনের টিকিট কাটা, বাসের সময় দেখা, বিমানের ভাড়া খোঁজা—সব শুরু হয়ে যায় অনেক আগে থেকেই। কেউ কয়েক মাস আগে টিকিট কেটে রাখেন, কেউ শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অপেক্ষা করেন। কারণ পুজোর কদিন নিজের শহরে, নিজের বাড়িতে, নিজের মানুষের সঙ্গে কাটানোর আনন্দের সঙ্গে অন্য কোনও কিছুর তুলনা হয় না।

কিন্তু সবার ভাগ্যে সেই ঘরে ফেরা থাকে না।

কারও অফিসে ছুটি মেলে না। কারও দায়িত্ব এমন যে কয়েক দিনের জন্য কাজ ছেড়ে বেরিয়ে আসা সম্ভব নয়। কেউ হাসপাতাল, কারখানা, দোকান, নিরাপত্তা পরিষেবা, পরিবহণ কিংবা জরুরি পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত। তাঁদের কাজ থেমে থাকে না উৎসবের দিনেও। অন্যরা যখন পুজোর আনন্দে মেতে ওঠেন, তখন তাঁদের কাউকে হয়তো কর্মস্থলেই দায়িত্ব পালন করতে হয়।

আবার এমন মানুষও রয়েছেন, যাঁদের বাড়ি ফেরার ইচ্ছা থাকলেও ফেরার মতো সেই পুরনো বাড়িটিই আর নেই। সময়ের সঙ্গে ভেঙে গেছে পুরনো ঘর, বদলে গেছে ঠিকানা, হারিয়ে গিয়েছেন পরিবারের অনেক মানুষ। কারও বাবা-মা নেই, কারও ভাই-বোন ছড়িয়ে পড়েছেন অন্য শহরে। কেউ আবার এমন এক জায়গা ছেড়ে বহু বছর আগে চলে এসেছেন, যেখানে ফিরে গেলেও আর আগের মতো পরিচিত মুখ বা চেনা পরিবেশ খুঁজে পাওয়া যায় না।

তাঁদের কাছে দুর্গাপুজো তাই শুধুই উৎসব নয়। পুজো হয়ে ওঠে স্মৃতির দরজা খুলে দেওয়ার সময়।

পুজো মানেই ঘরে ফেরার অপেক্ষা

বাঙালির সংস্কৃতিতে দুর্গাপুজোর সঙ্গে ‘ঘরে ফেরা’ শব্দ দুটি যেন একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে। শহরে থাকা মানুষ গ্রামে ফেরেন, অন্য রাজ্যে থাকা মানুষ নিজের জেলায় ফেরেন, বিদেশে থাকা অনেকেই ছুটি নিয়ে দেশে আসেন। বছরের অন্য সময়ে যে ব্যস্ততা মানুষকে দূরে সরিয়ে রাখে, পুজোর সময় সেই দূরত্ব কমিয়ে আনার চেষ্টা করেন সবাই।

অনেক পরিবারের ক্ষেত্রে পুজোর প্রস্তুতিই শুরু হয় দূরে থাকা সদস্যের ফেরার খবর দিয়ে। মা অপেক্ষা করেন ছেলের জন্য, বাবা অপেক্ষা করেন মেয়ের জন্য, ভাই-বোন অপেক্ষা করেন একসঙ্গে প্যান্ডেল ঘোরার জন্য। নতুন জামা কেনা হয়, ঘর পরিষ্কার করা হয়, প্রিয় খাবারের তালিকা তৈরি হয়। রান্নাঘরে শুরু হয় নানা আয়োজন।

কিন্তু সেই অপেক্ষা যখন শেষ পর্যন্ত অপেক্ষাই থেকে যায়, তখন উৎসবের আনন্দের মধ্যেও তৈরি হয় এক ধরনের শূন্যতা।

ফোনে হয়তো বলা হয়, ‘এবার আর আসতে পারলাম না।’ ওপার থেকে কেউ বলেন, ‘কাজ আছে, ছুটি পেলাম না।’ কেউ আবার বলেন, ‘টিকিট পাইনি।’ কথাগুলি খুব সাধারণ। কিন্তু এই কয়েকটি শব্দের পিছনে লুকিয়ে থাকে অনেকটা অভিমান, অসহায়তা এবং না-পারার কষ্ট।

দূর শহরের পুজো, ফোনের ওপারে নিজের বাড়ি

ভিনরাজ্যে থাকা বহু বাঙালির কাছে পুজোর দিনগুলি কাটে নিজের শহর থেকে বহু দূরে। তাঁরা হয়তো কলকাতা, জেলার পুজোর ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখেন। বন্ধুরা নতুন জামা পরে ছবি পাঠান। পরিবারের সদস্যরা ভিডিও কল করেন। ফোনের ওপার থেকে শোনা যায় ঢাকের শব্দ, শঙ্খধ্বনি কিংবা পুজোমণ্ডপের ভিড়ের আওয়াজ।

কেউ ভিডিও কলে অঞ্জলি দেন। কেউ পরিবারের সঙ্গে ভার্চুয়ালি পুজোর মুহূর্ত ভাগ করে নেন। আবার কেউ পুজোর ছবি দেখতে দেখতে নিজের পুরনো দিনের ছবি খুঁজে বের করেন।

একসময় পুজো মানেই ছিল পাড়ার মণ্ডপে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা। ছিল রাত জেগে ঠাকুর দেখা, ফুচকা খাওয়া, নতুন জামা পরে রাস্তায় বেরিয়ে পড়া। ছিল সপ্তমীর সকাল, অষ্টমীর অঞ্জলি, নবমীর রাত আর দশমীর বিষণ্ণতা। এখন সেই একই মানুষ হয়তো হাজার কিলোমিটার দূরে বসে মোবাইলের স্ক্রিনে নিজের পাড়ার পুজো দেখেন।

প্রযুক্তি দূরত্ব কিছুটা কমিয়েছে ঠিকই, কিন্তু সব দূরত্ব কি সত্যিই কমানো যায়?

ফোনে পরিবারের মুখ দেখা যায়, কিন্তু মায়ের হাতের রান্নার গন্ধ পাওয়া যায় না। ভিডিও কলে হাসি শোনা যায়, কিন্তু পুজোমণ্ডপে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে ঢাকের শব্দ শোনা যায় না। স্ক্রিনে অঞ্জলি দেখা যায়, কিন্তু নিজের হাতে ফুল নিয়ে মায়ের সামনে দাঁড়ানোর অনুভূতিটা পাওয়া যায় না।

কারও ছুটি নেই, কারও ফেরার সুযোগ নেই

পুজোর সময় ছুটি না পাওয়া মানুষগুলির গল্পও কম নয়। যাঁরা হাসপাতাল, পুলিশ, নিরাপত্তা, পরিবহণ, হোটেল, রেস্তোরাঁ কিংবা বিভিন্ন পরিষেবা ক্ষেত্রে কাজ করেন, তাঁদের অনেকের কাছেই উৎসব মানে আরও বেশি কাজ।

অন্যরা যখন প্যান্ডেলে ঘুরছেন, তখন কেউ হয়তো যাত্রী নিয়ে রাস্তায় রয়েছেন। কেউ হাসপাতালের ওয়ার্ডে রোগীর পাশে দাঁড়িয়ে। কেউ রাতের শিফটে কাজ করছেন। কেউ আবার দোকান বা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে ব্যস্ত।

তাঁদের জন্য পুজো আসে, কিন্তু কাজ থামে না।

কখনও সহকর্মীদের সঙ্গে ছোট্ট করে পুজোর আয়োজন হয়। কখনও কাজের জায়গাতেই নতুন জামা পরে ছবি তোলা হয়। কেউ অফিসের বিরতিতে পরিবারের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন। কেউ আবার সময় পেলেই বাড়িতে ভিডিও কল করেন।

পুজোর আনন্দ তখন হয়ে ওঠে কয়েক মিনিটের। কাজের ফাঁকে মায়ের সঙ্গে কথা বলা, বাবার শরীরের খবর নেওয়া, ভাই-বোনের পুজোর ছবি দেখা—এই ছোট ছোট মুহূর্তেই তাঁরা খুঁজে নেন বাড়ির উষ্ণতা।

হারিয়ে যাওয়া ঠিকানার মানুষ

তবে সবচেয়ে গভীর শূন্যতা হয়তো তাঁদের, যাঁদের আর ফেরার মতো বাড়িই নেই।

শহর বদলে যায়, গ্রাম বদলে যায়, পুরনো বাড়ি ভেঙে যায়। কখনও পরিবারের সদস্যরা অন্যত্র চলে যান। কখনও অর্থনৈতিক কারণে ancestral বাড়ি বিক্রি হয়ে যায়। কখনও জীবনের পরিস্থিতি মানুষকে এমনভাবে ছড়িয়ে দেয় যে ‘বাড়ি’ শব্দটির অর্থটাই বদলে যায়।

একসময় যে বাড়িতে দুর্গাপুজোর দিন সকাল শুরু হতো মায়ের ডাকে, সেখানে এখন হয়তো অন্য কেউ থাকেন। যে উঠোনে ভাই-বোনেরা খেলতেন, সেখানে হয়তো নতুন নির্মাণ হয়েছে। যে বারান্দায় দাঁড়িয়ে পুজোর জামা দেখানো হতো, সেটাও হয়তো আর নেই।

তখন দুর্গাপুজো শুধু উৎসবের স্মৃতি নয়, হয়ে ওঠে হারিয়ে যাওয়া সময়কে মনে করার উপলক্ষ।

পুরনো অ্যালবাম খুললে দেখা যায় ছোটবেলার ছবি। নতুন জামা পরে দাঁড়িয়ে থাকা মুখ। পরিবারের সবাই একসঙ্গে। পিছনে পাড়ার পুজোর মণ্ডপ। সেই ছবির অনেক মানুষ হয়তো আজ আর নেই। কেউ দূরে, কেউ অন্য শহরে, কেউ চিরতরে চলে গিয়েছেন।

ছবিগুলি তখন হয়ে ওঠে এক ধরনের ঠিকানা।

মায়ের জন্য পুজো, কিন্তু মায়ের কাছে ফেরা হয় না

দুর্গাপুজোর সবচেয়ে বড় আবেগগুলির একটি হলো মা। দেবী দুর্গার আগমনকে ঘিরে বাঙালির মনে যে আনন্দ, তার সঙ্গে মিশে থাকে নিজের মায়ের কাছে ফেরার আকাঙ্ক্ষাও।

অনেকের কাছে পুজোর সবচেয়ে বড় আনন্দ নতুন জামা নয়, মায়ের হাতের রান্না। প্যান্ডেল নয়, বাড়ির বারান্দা। বড় অনুষ্ঠান নয়, পরিবারের সঙ্গে বসে গল্প করা।

তাই দূরে থাকা মানুষদের কাছে পুজোর কষ্টটা আরও বেশি।

দেবী মা আসেন। শহর সাজে। ঢাক বাজে। অঞ্জলি হয়। কিন্তু যে মানুষটির জন্য বছরের পর বছর বাড়ি ফেরার অপেক্ষা, সেই মানুষটি হয়তো আর বাড়ি ফিরতে পারেন না।

এই না-পারা থেকেই জন্ম নেয় পুজোর এক অন্য গল্প।

প্রবাসী বাঙালির পুজো

শুধু দেশের অন্য প্রান্তে নয়, বিদেশেও বহু বাঙালি দুর্গাপুজো উদযাপন করেন। বিভিন্ন শহরে গড়ে ওঠে বাঙালি সংগঠন, কমিউনিটি পুজো। সেখানে হয়তো কয়েকশো মানুষ একত্রিত হন। ঢাক বাজে, অঞ্জলি হয়, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়, খাওয়াদাওয়া হয়।

তবুও বিদেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে অনেকের মনে পড়ে নিজের শহরের পুজো।

কেউ কলকাতার পুজোর ছবি দেখেন। কেউ নিজের জেলার পুজোর খবর রাখেন। কেউ আবার বহু বছর পরেও নিজের পাড়ার মণ্ডপের কথা ভুলতে পারেন না।

প্রবাসের পুজো তাই একদিকে নতুন ঠিকানায় শিকড় খোঁজার চেষ্টা, অন্যদিকে পুরনো ঠিকানাকে মনে রাখার এক মাধ্যম।

সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখা পুজো

বর্তমান সময়ে সোশ্যাল মিডিয়া দূরে থাকা মানুষদের কাছে পুজোর সঙ্গে যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম হয়ে উঠেছে। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম কিংবা বিভিন্ন মেসেজিং প্ল্যাটফর্মে সারাদিন ভেসে আসে পুজোর ছবি ও ভিডিও।

বন্ধুরা নতুন জামার ছবি পোস্ট করেন। পরিবারের সদস্যরা ঠাকুর দেখার ভিডিও পাঠান। পাড়ার পুজোর লাইভ সম্প্রচার দেখা যায়। অষ্টমীর অঞ্জলির ছবি আসে হোয়াটসঅ্যাপে।

দূরে থাকা মানুষও তখন ভার্চুয়ালি সেই আনন্দের অংশ হয়ে ওঠেন।

কিন্তু ছবির আনন্দের মধ্যেও একটা অদৃশ্য শূন্যতা থেকে যায়। কারণ ছবি দেখা যায়, স্মৃতি দেখা যায়, মানুষকে দেখা যায়—কিন্তু সেই মুহূর্তের সঙ্গে পুরোপুরি থাকা যায় না।

পুজোর আনন্দের আড়ালে একাকিত্ব

দুর্গাপুজোকে আমরা সাধারণত আনন্দের উৎসব হিসেবেই দেখি। কিন্তু প্রত্যেক মানুষের কাছে উৎসবের অভিজ্ঞতা একরকম নয়। কারও কাছে পুজো মানে বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে রাতভর আড্ডা, কারও কাছে পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো, আবার কারও কাছে পুজো মানেই পুরনো স্মৃতি এবং একাকিত্ব।

শহরের ভিড়ের মধ্যেও এমন মানুষ রয়েছেন যাঁরা একা। পুজোর রাতে চারপাশে মানুষের ভিড়, আলো, গান, ঢাকের শব্দ—সবকিছুর মধ্যেও তাঁদের মনে পড়ে নিজের মানুষদের।

news image
আরও খবর

কেউ হয়তো পুজোর রাতে একা ঘরে বসে পরিবারের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন। কেউ পুরনো ছবি দেখেন। কেউ আবার চুপচাপ জানলার বাইরে তাকিয়ে থাকেন।

উৎসব তখন তাঁদের কাছে আনন্দের পাশাপাশি হয়ে ওঠে স্মৃতিরও সময়।

বাড়ি ফেরার টিকিট, কিন্তু সময় নেই

অনেকের গল্প আবার আরও অন্যরকম। তাঁরা বাড়ি ফিরতে চান, টিকিটও কাটেন। কিন্তু শেষ মুহূর্তে কাজের চাপ, জরুরি দায়িত্ব কিংবা অন্য কোনও কারণে সেই যাত্রা বাতিল হয়ে যায়।

স্টেশনে যাওয়ার বদলে তাঁকে যেতে হয় অফিসে।

বাসের বদলে ধরতে হয় কর্মস্থলের গাড়ি।

বাড়ির বদলে কাটাতে হয় আরেকটি রাত দূর শহরের ছোট্ট ঘরে।

এই মানুষগুলির কাছে পুজোর সবচেয়ে কষ্টের মুহূর্ত হয়তো সেই সময়, যখন অন্যরা বাড়ির পথে রওনা হন।

স্টেশনে মানুষের ভিড় দেখে মনে হয়—‘আমিও যদি যেতে পারতাম।’

ট্রেনের কামরায় পরিবার নিয়ে যাওয়া মানুষদের দেখে মনে হয়—‘আমারও তো আজ বাড়িতে থাকার কথা ছিল।’

এই অনুভূতিগুলি বলা যায় না সবসময়। কিন্তু মনের মধ্যে থেকে যায়।

মায়ের আগমন, সন্তানের অনুপস্থিতি

দুর্গাপুজোর পুরাণে দেবী দুর্গা বছরে একবার সন্তানদের নিয়ে বাপের বাড়ি আসেন। বাঙালির আবেগে এই আগমন যেন মেয়ের ঘরে ফেরার প্রতীক। তাই দুর্গাপুজোর সঙ্গে বাঙালির ‘বাপের বাড়ি ফেরা’র আবেগও গভীরভাবে জড়িয়ে আছে।

কিন্তু বাস্তব জীবনে অনেক মানুষই আর সেই ঘরে ফিরতে পারেন না।

দেবী আসেন।

ঢাক বাজে।

অঞ্জলি হয়।

সিঁদুর খেলা হয়।

দশমীর বিসর্জনে চোখে জল আসে।

কিন্তু কারও জন্য এই উৎসবের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন থেকে যায়—‘আগামী বছর কি আর ফিরতে পারব?’

আর কারও ক্ষেত্রে সেই প্রশ্নের উত্তর হয়তো ইতিমধ্যেই জানা—ফেরার মতো আর কোনও ঘর নেই।

পুজোর স্মৃতিই হয়ে ওঠে ঘর

যাঁদের বাড়ি নেই, তাঁদের কাছে স্মৃতিই অনেক সময় ঘর হয়ে ওঠে। ছোটবেলার পুজোর গল্প, মায়ের রান্না, বাবার সঙ্গে ঠাকুর দেখতে যাওয়া, বন্ধুদের সঙ্গে রাত জাগা, পাড়ার মণ্ডপে আড্ডা—এই স্মৃতিগুলিই তাঁদের সঙ্গে থাকে।

বছর পেরিয়ে যায়। শহর বদলায়। মানুষ বদলায়। কিন্তু পুজোর স্মৃতি অনেক সময় একই থাকে।

পুরনো কোনও গান শুনলে মনে পড়ে যায় সেই পুজোর কথা। ঢাকের আওয়াজ শুনলে চোখের সামনে ভেসে ওঠে পুরনো পাড়ার মণ্ডপ। নতুন জামার গন্ধে মনে পড়ে যায় ছোটবেলার দিন।

তখন বোঝা যায়, ‘বাড়ি’ শুধু একটি জায়গার নাম নয়। বাড়ি আসলে কিছু মানুষ, কিছু সম্পর্ক, কিছু গন্ধ, কিছু শব্দ এবং অসংখ্য স্মৃতির সমষ্টি।

পুজো তাই সবার জন্য একই রকম নয়

কেউ পুজোয় বাড়ি ফেরেন আনন্দ নিয়ে।

কেউ ফেরেন বহুদিন পর পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে।

কেউ ফিরতে পারেন না কাজের কারণে।

কেউ ফিরতে চান, কিন্তু টিকিট পান না।

কেউ ফিরতে পারেন, কিন্তু আগের মতো কাউকে আর পান না।

আর কেউ এমনও রয়েছেন, যাঁদের জন্য ‘বাড়ি ফেরা’ এখন শুধুই একটি স্মৃতি।

তবুও দুর্গাপুজো তাঁদের জীবন থেকে হারিয়ে যায় না। বরং এই কয়েকটি দিনেই তাঁরা আরও বেশি করে নিজের শিকড়ের কথা মনে করেন।

দূরে থেকেও তাঁরা অঞ্জলি দেন। ফোনে পরিবারের সঙ্গে কথা বলেন। অনলাইনে পুজোর ছবি দেখেন। হয়তো একা ঘরে বসেই নতুন জামা পরেন। হয়তো নিজের মতো করে একটু মিষ্টি কিনে আনেন।

এই ছোট ছোট আয়োজনের মধ্যেই তাঁরা খুঁজে নেন হারিয়ে যাওয়া বাড়ির ছায়া।

‘মা আসেন, ঘরে আর ফেরা হয় না’

দুর্গাপুজোর সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হয়তো এখানেই—এটি শুধু আনন্দের উৎসব নয়, এটি মানুষকে নিজের শিকড়ের কথা মনে করিয়ে দেয়।

যাঁরা বাড়ি ফিরতে পারেন, তাঁদের জন্য পুজো আনন্দের।

যাঁরা ফিরতে পারেন না, তাঁদের জন্য পুজো অপেক্ষার।

আর যাঁদের ফেরার মতো বাড়িই নেই, তাঁদের জন্য পুজো স্মৃতির।

দেবী দুর্গা প্রতি বছর আসেন। তাঁর আগমনে চারপাশে উৎসবের আলো জ্বলে ওঠে। কিন্তু সেই আলোর মধ্যেও কিছু মানুষের জীবনে থেকে যায় অন্ধকারের ছোট্ট একটি অংশ—বাড়ি ফিরতে না পারার কষ্ট, প্রিয়জনকে কাছে না পাওয়ার অভিমান এবং হারিয়ে যাওয়া সময়ের স্মৃতি।

তবুও তাঁরা পুজোকে ভালোবাসেন। কারণ দুর্গাপুজো তাঁদের মনে করিয়ে দেয়, কোথাও না কোথাও তাঁদের জন্যও একটি জায়গা ছিল। একটি উঠোন ছিল। একটি বারান্দা ছিল। কেউ অপেক্ষা করতেন। কেউ দরজার দিকে তাকিয়ে থাকতেন।

হয়তো সেই দরজা আজ আর নেই। হয়তো সেই মানুষটিও নেই। কিন্তু স্মৃতির দরজা এখনও খোলা।

আর সেই দরজার ওপারেই বাঙালির চিরচেনা দুর্গাপুজো।

মা আসেন। চারপাশ আলোয় ভরে ওঠে। ঢাক বাজে। অঞ্জলি হয়। উৎসব হয়। শুধু কিছু মানুষের আর ঘরে ফেরা হয় না।

Preview image