Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

কালো কফি না গ্রিন টি? মেদ কমানো থেকে ডায়াবিটিস নিয়ন্ত্রণে কোন পানীয় বেশি উপকারী

কালো কফি নাকি গ্রিন টি—স্বাস্থ্যের জন্য কোনটি বেশি উপকারী, তা নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই। ওজন নিয়ন্ত্রণ থেকে শুরু করে ডায়াবিটিস, দুই পানীয়েরই রয়েছে কিছু সম্ভাব্য উপকারিতা। তবে কোনটি আপনার জন্য উপযুক্ত, তা নির্ভর করে আপনার স্বাস্থ্য ও পান করার অভ্যাসের উপর।

সকালের শুরুতে এক কাপ গরম পানীয় অনেকেরই নিত্যসঙ্গী। কেউ দিনের প্রথম ভাগটা শুরু করেন গরম কালো কফি দিয়ে, আবার কেউ পছন্দ করেন হালকা গ্রিন টি। দু’টি পানীয় নিয়েই স্বাস্থ্যসচেতন মানুষের মধ্যে দীর্ঘদিনের আলোচনা—কোনটি বেশি উপকারী, কোনটি ওজন নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে এবং ডায়াবিটিসের ঝুঁকি কমাতে কোনটির ভূমিকা বেশি?

আসলে কালো কফি এবং গ্রিন টি—দুটিরই নিজস্ব কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে। দু’টিই তুলনামূলক কম ক্যালোরিযুক্ত, বিশেষ করে যদি চিনি, সিরাপ, ক্রিম বা দুধের অতিরিক্ত ব্যবহার না থাকে। একই সঙ্গে দু’টিতেই বিভিন্ন জৈব সক্রিয় উপাদান ও অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট রয়েছে। তবে কোনও পানীয়ই একা ওজন কমানো বা ডায়াবিটিস নিয়ন্ত্রণের ‘জাদুকরী সমাধান’ নয়। স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম, পর্যাপ্ত ঘুম এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা—সবকিছুরই ভূমিকা রয়েছে।

কালো কফির কী কী গুণ রয়েছে?

কালো কফির অন্যতম প্রধান সক্রিয় উপাদান হল ক্যাফিন। ক্যাফিন সাময়িক ভাবে সতর্কতা, মনোযোগ এবং মানসিক কর্মক্ষমতা বাড়াতে পারে। এই কারণেই ঘুমঘুম ভাব কাটাতে বা কাজের সময় মনোযোগ ধরে রাখতে অনেকেই কফির উপর নির্ভর করেন।

কফিতে ক্যাফিন ছাড়াও বিভিন্ন উদ্ভিজ্জ যৌগ রয়েছে। কফির অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট ও অন্যান্য বায়োঅ্যাকটিভ উপাদান শরীরের অক্সিডেটিভ স্ট্রেস এবং প্রদাহের সঙ্গে সম্পর্কিত প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এই প্রভাবকে কোনও নির্দিষ্ট রোগের চিকিৎসা হিসেবে দেখা ঠিক নয়।

ক্যাফিন বিপাকীয় হার সাময়িক ভাবে বাড়াতে পারে এবং শারীরিক কর্মক্ষমতার উপরও প্রভাব ফেলতে পারে। এ কারণেই শরীরচর্চার আগে অনেকেই কফি পান করেন। তবে কফি খেলে সরাসরি শরীরের জমে থাকা চর্বি গলে যাবে—এমন দাবি বৈজ্ঞানিক ভাবে অতিরঞ্জিত। ওজন কমানোর মূল বিষয় হল দীর্ঘমেয়াদি ক্যালোরি ভারসাম্য, খাদ্যাভ্যাস এবং শারীরিক সক্রিয়তা।

কফি এবং টাইপ-২ ডায়াবিটিস নিয়েও বেশ কিছু গবেষণা হয়েছে। পর্যবেক্ষণভিত্তিক গবেষণার বিভিন্ন বিশ্লেষণে নিয়মিত কফি পান এবং টাইপ-২ ডায়াবিটিসের তুলনামূলক কম ঝুঁকির মধ্যে সম্পর্ক পাওয়া গেছে। এমনকি ক্যাফিনযুক্ত ও ডিক্যাফিনেটেড কফি—দু’টির ক্ষেত্রেই এই সম্পর্ক দেখা গেছে, যা থেকে বোঝা যায় যে কফির উপকারের সঙ্গে শুধু ক্যাফিন নয়, অন্য উপাদানগুলিও জড়িত থাকতে পারে।

তবে কফি পান করলেই ডায়াবিটিস প্রতিরোধ হবে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায় না। কারণ এই ধরনের গবেষণার বড় অংশই পর্যবেক্ষণভিত্তিক এবং ব্যক্তির খাদ্যাভ্যাস, জীবনযাপন ও অন্যান্য স্বাস্থ্যগত বিষয় ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে।

গ্রিন টি কেন এত জনপ্রিয়?

গ্রিন টি-র জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ হল এতে থাকা ক্যাটেকিন নামের অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট। এর মধ্যে EGCG বা epigallocatechin gallate বিশেষ ভাবে আলোচিত। এই ধরনের যৌগ শরীরের বিভিন্ন জৈব প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখতে পারে এবং অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট কার্যকলাপের সঙ্গে যুক্ত।

গ্রিন টি-তে ক্যাফিনও থাকে, তবে সাধারণত কফির তুলনায় কম। এর পাশাপাশি L-theanine নামে একটি অ্যামিনো অ্যাসিড রয়েছে। ক্যাফিন ও L-theanine-এর সম্মিলিত প্রভাব মনোযোগ ও সতর্কতার উপর প্রভাব ফেলতে পারে।

ওজন নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রেও গ্রিন টি নিয়ে বহু গবেষণা হয়েছে। গ্রিন টি-র ক্যাটেকিন এবং ক্যাফিন বিপাকীয় প্রক্রিয়ায় সামান্য প্রভাব ফেলতে পারে। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে—গ্রিন টি পান করলেই শরীরের অতিরিক্ত মেদ দ্রুত গলে যাবে, এমন শক্ত প্রমাণ নেই।

Cochrane-এর একটি systematic review-এ গ্রিন টি-র ওজন কমানোর প্রভাব বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, প্রভাব খুবই ছোট এবং ক্লিনিক্যালি গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার সম্ভাবনা কম। NIH-এর তথ্যেও বলা হয়েছে, গ্রিন টি ক্যাটেকিন ও ক্যাফিন একসঙ্গে থাকলে সামান্য ওজন কমার প্রভাব দেখা যেতে পারে, কিন্তু সেই প্রভাব সাধারণত ছোট।

অর্থাৎ, গ্রিন টি স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের একটি অংশ হতে পারে, কিন্তু এটিকে ওজন কমানোর প্রধান উপায় হিসেবে ভাবা ঠিক নয়।

ডায়াবিটিসের ক্ষেত্রে কালো কফি নাকি গ্রিন টি?

ডায়াবিটিসের প্রসঙ্গে দু’টি পানীয়েরই কিছু সম্ভাব্য উপকারের কথা গবেষণায় উঠে এসেছে। কফি নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণায় নিয়মিত কফি পান এবং টাইপ-২ ডায়াবিটিসের কম ঝুঁকির মধ্যে সম্পর্ক পাওয়া গেছে। অন্যদিকে গ্রিন টি নিয়ে কিছু clinical trial ও meta-analysis-এ রক্তে শর্করা ও insulin resistance-এর উপর সামান্য উপকারী প্রভাবের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

তবে দুই পানীয়ের ক্ষেত্রেই প্রমাণের ধরন এবং গবেষণার ফল এক নয়। একটি systematic review-এ গ্রিন টি fasting blood glucose সামান্য কমাতে পারে বলে moderate-quality evidence পাওয়া গেলেও HbA1c-এর ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য প্রভাব পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ গ্রিন টি পান করলেই ডায়াবিটিস নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে—এমন কথা বলা যায় না।

আর কফির ক্ষেত্রেও বিষয়টি একই। কফি নিয়মিত খাওয়ার সঙ্গে টাইপ-২ ডায়াবিটিসের কম ঝুঁকির সম্পর্ক পাওয়া গেলেও এটি ডায়াবিটিসের চিকিৎসা নয়। উপরন্তু ক্যাফিন কিছু মানুষের ক্ষেত্রে অল্প সময়ের জন্য রক্তে শর্করার মাত্রায় প্রভাব ফেলতে পারে। তাই যাঁদের ডায়াবিটিস রয়েছে, তাঁরা নিজের শরীরে কফি বা ক্যাফিনের প্রভাব কী হচ্ছে তা লক্ষ্য করবেন এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী খাদ্যাভ্যাস ঠিক করবেন।

ওজন কমানোর ক্ষেত্রে কোনটি বেশি কার্যকর?

ওজন কমানোর প্রসঙ্গে কালো কফি ও গ্রিন টি—দু’টিই নিয়ে অনেক দাবি শোনা যায়। কফির ক্যাফিন সাময়িক ভাবে বিপাকীয় হার এবং শারীরিক কর্মক্ষমতায় প্রভাব ফেলতে পারে। অন্যদিকে গ্রিন টি-র ক্যাটেকিন ও ক্যাফিনের সমন্বয় নিয়েও গবেষণা হয়েছে।

news image
আরও খবর

কিন্তু বাস্তবিক অর্থে কোনওটিই এমন পানীয় নয় যা একা উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ওজন কমিয়ে দিতে পারে। NIH-এর তথ্য অনুযায়ী, গ্রিন টি ক্যাটেকিন ও ক্যাফিনের সম্মিলিত প্রভাবে ওজন ও কোমরের মাপে সামান্য পরিবর্তন দেখা গেলেও প্রভাবটি ছোট এবং তা ক্লিনিক্যালি গুরুত্বপূর্ণ নাও হতে পারে।

তাই ওজন কমানোর লক্ষ্য থাকলে শুধু সকালে গ্রিন টি বা কালো কফি খাওয়ার উপর নির্ভর না করে মোট খাদ্যাভ্যাসের দিকে নজর দেওয়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অতিরিক্ত চিনি, মিষ্টি পানীয়, উচ্চ-ক্যালোরির স্ন্যাকস কমানো এবং নিয়মিত হাঁটা বা ব্যায়াম অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

চিনি ছাড়া পান করাই গুরুত্বপূর্ণ

কালো কফি বা গ্রিন টি—যে পানীয়ই বেছে নিন, তার সঙ্গে কতটা চিনি বা উচ্চ-ক্যালোরির উপাদান যোগ করছেন, সেটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এক কাপ কালো কফিতে অতিরিক্ত চিনি, flavoured syrup, cream বা sweetened milk যোগ করলে পানীয়টির মোট ক্যালোরি অনেকটাই বেড়ে যেতে পারে। একইভাবে গ্রিন টি-তে অতিরিক্ত চিনি বা মিষ্টি উপাদান যোগ করলেও স্বাস্থ্যকর পানীয় হিসেবে এর সুবিধা কমে যেতে পারে।

বিশেষ করে ডায়াবিটিসের ঝুঁকি বা রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে চিনি-মেশানো পানীয়ের ব্যাপারে সতর্ক থাকা জরুরি। বৃহৎ গবেষণা-পর্যালোচনায় sugar-sweetened beverages-এর বেশি intake এবং টাইপ-২ ডায়াবিটিসের বেশি ঝুঁকির মধ্যে সম্পর্ক পাওয়া গেছে।

তাই কফি বা গ্রিন টি বেছে নেওয়ার পাশাপাশি কী ভাবে সেটি পান করছেন, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

শরীরচর্চার আগে কফি কি উপকারী?

অনেকে workout-এর আগে কালো কফি পান করেন। এর মূল কারণ ক্যাফিন। ক্যাফিন সতর্কতা ও শারীরিক কর্মক্ষমতার উপর প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে কিছু মানুষের ক্ষেত্রে workout-এর সময় সক্রিয়তা বা effort-এর অনুভূতিতে পরিবর্তন আসতে পারে।

তবে সবার শরীর ক্যাফিনকে একই ভাবে গ্রহণ করে না। কারও ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ক্যাফিন অস্থিরতা, ঘুমের সমস্যা, বুক ধড়ফড় বা অস্বস্তি তৈরি করতে পারে। তাই বেশি কফি খেলেই বেশি উপকার হবে—এমন ধারণা ঠিক নয়।

গ্রিন টি কখন বেছে নিতে পারেন?

যাঁরা অপেক্ষাকৃত কম ক্যাফিনযুক্ত গরম পানীয় চান, তাঁদের জন্য গ্রিন টি একটি বিকল্প হতে পারে। খাবারের সঙ্গে অতিরিক্ত চিনি না দিয়ে গ্রিন টি পান করা যেতে পারে। এতে ক্যাটেকিনসহ বিভিন্ন উদ্ভিজ্জ যৌগ রয়েছে।

তবে “ক্যাফিন ছাড়াই ফ্যাট গলানো” কথাটিও ঠিক নয়, কারণ সাধারণ গ্রিন টি-তেও ক্যাফিন থাকে। আর ওজন কমানোর ক্ষেত্রে গ্রিন টি-র প্রভাব থাকলেও সেটি সীমিত। তাই গ্রিন টি-কে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের একটি অংশ হিসেবে দেখা উচিত, ওজন কমানোর একমাত্র অস্ত্র হিসেবে নয়।

তাহলে শেষ পর্যন্ত কোনটি খাবেন?

কালো কফি এবং গ্রিন টি—দু’টির মধ্যে সবার জন্য একটিকে ‘সেরা’ বলা কঠিন। আপনার পছন্দ নির্ভর করবে আপনার ক্যাফিন সহ্যক্ষমতা, স্বাস্থ্যের অবস্থা, পান করার সময় এবং সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাসের উপর।

যদি সকালে সতর্কতা ও কর্মক্ষমতা বাড়ানোর জন্য ক্যাফিন চান, তবে চিনি ছাড়া কালো কফি একটি বিকল্প হতে পারে। আর যদি তুলনামূলক কম ক্যাফিনের সঙ্গে চা-জাতীয় পানীয় পছন্দ করেন, তবে গ্রিন টি বেছে নিতে পারেন।

ডায়াবিটিসের ক্ষেত্রে দু’টি পানীয়েরই কিছু সম্ভাব্য উপকারের ইঙ্গিত রয়েছে, কিন্তু কোনওটিকেই চিকিৎসার বিকল্প হিসেবে ধরা উচিত নয়। একই ভাবে ওজন কমানোর ক্ষেত্রেও দু’টি পানীয়ের প্রভাব সীমিত। নিয়মিত শরীরচর্চা, পরিমিত ক্যালোরি গ্রহণ, পর্যাপ্ত ঘুম এবং পুষ্টিকর খাবারের অভ্যাসই দীর্ঘমেয়াদে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল—পানীয়ের সঙ্গে অতিরিক্ত চিনি বা উচ্চ-ক্যালোরির উপাদান না যোগ করা। কারণ স্বাস্থ্যকর বলে পরিচিত একটি পানীয়ও অতিরিক্ত চিনি ও ক্যালোরির কারণে দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাসের ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে।

অতএব, কালো কফি বনাম গ্রিন টি-র লড়াইয়ে কোনও একটিকে সবার জন্য বিজয়ী বলা যায় না। দু’টিরই কিছু সম্ভাব্য সুবিধা রয়েছে, আবার সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। নিজের স্বাস্থ্যগত প্রয়োজন এবং ক্যাফিনের প্রতি সংবেদনশীলতা বিবেচনা করে, পরিমিত পরিমাণে এবং চিনি ছাড়া পান করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

Preview image