Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

কোয়েল মল্লিকের অভিনয়যাত্রা: বাণিজ্যিক থেকে অন্য ধারার ছবিতে অভিব্যক্তির সাফল্য

কোয়েল মল্লিকের অভিনয় দক্ষতা বাণিজ্যিক ছবিতে জনপ্রিয় হলেও কোয়েল চায় অন্যান্য ধারার ছবিতেও নিজেকে প্রমাণ করতে।বাংলা ইন্ডাস্ট্রির বাস্তবতা অন্য ধারার ছবিতে কাজ করলে বাণিজ্যিক ছবির সুযোগ সীমিত, যা কোয়েল প্রকাশ করেছেন।স্বার্থপর-এর সাফল্য মুক্তির মাত্র ১৩ দিনে বক্স অফিসে ১.১২ কোটি টাকা আয়ের রেকর্ড।ভবিষ্যতের পরিকল্পনা মিতিন মাসি ফ্র্যাঞ্চাইজির তৃতীয় ছবিতে দেখা যাবে, ওয়েব সিরিজেও সুযোগ পেলে কাজ করতে ইচ্ছুক।বাণিজ্যিক ও মানসম্পন্ন ছবির সমন্বয় কোয়েল মল্লিকের লক্ষ্য দুই ধারার ছবিতে সমান দক্ষতা প্রদর্শন।

টলিপাড়ার মিষ্টি ও নম্র অভিনেত্রী কোয়েল মল্লিক বাংলা সিনেমা জগতে এক দীর্ঘ ও বহুমুখী যাত্রা পেরিয়েছেন। বাণিজ্যিক ছবিতে উজ্জ্বল সফলতার পরেও তিনি সবসময় চেয়েছেন নিজেকে নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে প্রকাশ করতে। তিনি শুধু ‘হিট’ সিনেমার মুখ হয়ে সীমাবদ্ধ থাকেননি; বরং গুণগত ছবি, চরিত্রচর্চা এবং গল্পভিত্তিক অভিনয়েও নিজের দক্ষতা প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন। এই দৃষ্টিভঙ্গি তাকে বাংলার চলচ্চিত্র প্রেক্ষাপটে এক বিশেষ অবস্থানে বসিয়েছে।

কোয়েল মল্লিকের অভিনয় জীবন শুরু হয় বাণিজ্যিক ছবিতে। তাঁর ‘নাটের গুরু’, ‘শুধু তুমি’, ‘বন্ধন’, ‘প্রেমী নং ১’, ‘নবাব নন্দিনী’, ‘মানিক’, ‘পাগলু’ এবং ‘১০০% লাভ’–এর মতো সিনেমা দর্শক এবং ব্যবসায়ী উভয়ের কাছেই গ্রহণযোগ্যতা পায়। এই ছবিগুলো তাঁর পরিচিতি নিশ্চিত করে, এবং বক্স অফিসে সফলতা অর্জনের মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেছেন যে বাণিজ্যিক ছবি বানানো এবং হিট করা সম্ভব।

তবে, কোয়েলের কাছে শুধুমাত্র বাণিজ্যিক ছবি করাই যথেষ্ট ছিল না। তিনি সবসময়ই চাইতেন অভিনয় দক্ষতার গভীরতা উন্মোচন করতে। এজন্য তিনি অন্যান্য ধারার সিনেমাতেও কাজ করেছেন, যেমন ‘চার’, ‘ঘরে বাইরে’, ‘মিতিন মাসী’, ‘ছায়া ও ছবি’, ‘রক্ত রহস্য’ এবং ‘বনি’। এই ছবিগুলোতে তিনি দর্শকের কাছে এক নতুনভাবে নিজেকে উপস্থাপন করেছেন। বিশেষ করে সম্প্রতি মুক্তিপ্রাপ্ত ‘স্বার্থপর’ ছবিতে কোয়েলের অভিনয় দর্শকদের মন ছুঁয়ে গেছে। অপর্ণা চরিত্রে তিনি এমনভাবে অভিনয় করেছেন যা পূর্বে তার বাণিজ্যিক ছবির ভিন্ন রূপের পরিচিতি থেকে অনেকটা আলাদা।

কোয়েল সম্প্রতি এক সংবাদমাধ্যমের সাক্ষাৎকারে বাংলা ইন্ডাস্ট্রির প্রসঙ্গ নিয়ে নিজের মনের ভাব প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছিলেন, “যেটা বম্বে ইন্ডাস্ট্রিতে হয় না, সেটা কলকাতা ইন্ডাস্ট্রিতে কেন হয় আমি জানি না। বম্বে ইন্ডাস্ট্রিতে কর্মাশিয়াল ছবির অভিনেতা-অভিনেত্রীদের নিয়েও অন্য ধারার সিনেমা করা হয়, যা আমরা চিরকাল দেখেছি।” এই মন্তব্যে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন যে, অন্য চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রির তুলনায় বাংলার চলচ্চিত্র জগতে এখনও একটি বিভাজন বিদ্যমান। বাণিজ্যিক ছবি ও গুণগত সিনেমার মধ্যে যেন একটি অদৃশ্য সীমারেখা চলে আসে।

কোয়েল উদাহরণ দিয়ে বলেন, বম্বে ইন্ডাস্ট্রিতে একজন অভিনেত্রী যেমন আলিয়া ভাট ‘স্টুডেন্টস অফ দ্য ইয়ার’, ‘উড়তা পঞ্জাব’ এবং ‘হাইওয়ে’–এর মতো ছবিতে অভিনয় করেছেন। সেখানে অন্যান্য ধারার ছবিতেও সুযোগ তৈরি হয়েছে, এবং যারা বাণিজ্যিক ছবি করেছেন, তারা মানসম্পন্ন ছবিতেও কাজ করতে পারেন। কিন্তু বাংলায় বিষয়টি একেবারেই ভিন্ন। এখানে যারা অন্য ধারার সিনেমায় অভিনয় করেন, তাদের কাছে বলা হয়, “এবার তুমি আর বাণিজ্যিক ছবি করতে পারবে না।” এই সঙ্কোচক মনোভাব কোয়েলের মতো অভিনেত্রীদের জন্য সীমাবদ্ধতার জন্ম দেয়।

কোয়েল মল্লিক মনে করেন, বাণিজ্যিক ছবিই এই ইন্ডাস্ট্রির মেরুদণ্ড। সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন পেট চালানোর জন্য বাণিজ্যিক ছবি অপরিহার্য। অন্য ধারার ছবিতেও বিনিয়োগ করা হয়, কিন্তু সেই ছবিতে অভিনয় করলে অভিনেত্রীকে সেই ছবির মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখার প্রবণতা থাকে। কোয়েল নিজেও বাণিজ্যিক ছবি ও অন্যান্য ধারার ছবির মধ্যে ভারসাম্য রাখার চেষ্টা করেছেন। তাঁর বক্তব্য স্পষ্ট করে বোঝায় যে, একজন অভিনেত্রীর জন্য দুই ধরনের ছবি করার সুযোগ থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

news image
আরও খবর

‘স্বার্থপর’ ছবিটি মুক্তির মাত্র ১৩ দিনে দেশের বক্স অফিসে ১.১২ কোটি টাকা আয় করেছে। এটি প্রমাণ করে, কোয়েলের অভিনয় শুধু গুণগত নয়, বাণিজ্যিকভাবে সফলও। এই সাফল্য তাঁর জন্য এক প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে, কারণ তিনি দেখেছেন দর্শক তাঁর অভিনয়কে উভয় দিকেই গ্রহণ করছেন।

কোয়েল মল্লিকের ভবিষ্যতের পরিকল্পনাও বেশ গতিশীল। তিনি ‘মিতিন মাসি’ ফ্র্যাঞ্চাইজির তৃতীয় ছবিতে কাজ করবেন। এই ফ্র্যাঞ্চাইজির মাধ্যমে তিনি আবারও নিজের চরিত্রচর্চার ক্ষমতা প্রদর্শন করবেন। এছাড়া ওয়েব সিরিজেও কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন, তবে সেটি হবে শুধুমাত্র মানসম্পন্ন চরিত্র এবং সুযোগ পেলে। কোয়েলের এই দৃষ্টিভঙ্গি দেখায় যে, তিনি মানসম্পন্ন গল্পের প্রতি কতটা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

বাংলা ইন্ডাস্ট্রিতে এই দুই ধারা—বাণিজ্যিক এবং গুণগত—মেলাতে হলে শুধু অভিনেত্রীর দক্ষতা নয়, পরিচালক ও প্রযোজকের মানসিকতাও পরিবর্তন হতে হবে। কোয়েল মল্লিক তার অভিনয় ও বক্তব্যের মাধ্যমে এই বার্তাটি দিচ্ছেন। তিনি দেখিয়েছেন যে, একজন অভিনেত্রী উভয় ধারার সিনেমায় কাজ করে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে এবং দর্শকও তা গ্রহণ করতে প্রস্তুত।

কোয়েলের এই দৃষ্টিভঙ্গি নতুন প্রজন্মের অভিনেত্রীদের জন্য এক অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করছে। বাণিজ্যিক ছবির জনপ্রিয়তা ও মানসম্পন্ন ছবির গভীরতা মিলিয়ে একজন শিল্পী তার ক্যারিয়ারের পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারে। বাংলার চলচ্চিত্র জগতে এই ধারা আরও বিস্তার লাভ করলে, ভবিষ্যতে আরও বেশি অভিনেত্রী ও অভিনেতা বাণিজ্যিক এবং গুণগত ছবিতে সমানভাবে দক্ষতা প্রদর্শন করতে পারবেন।

সর্বশেষে, কোয়েল মল্লিকের যাত্রা কেবল বাণিজ্যিক বা গুণগত ছবির সীমাবদ্ধতায় আটকে নেই। তিনি চাইছেন অভিনয়ের মাধ্যমে দর্শকের হৃদয় ছুঁতে, শিল্পের মান বৃদ্ধি করতে এবং বাংলা চলচ্চিত্রকে এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিতে। এই দৃষ্টিভঙ্গি এবং দৃঢ় সংকল্পই কোয়েলকে বাংলা সিনেমার অন্যতম সফল ও বহুমুখী অভিনেত্রী হিসেবে গড়ে তুলেছে।
কোয়েল মল্লিকের জীবন ও ক্যারিয়ার বাংলা সিনেমার জন্য এক প্রেরণার উৎস। বাণিজ্যিক ছবি ও মানসম্পন্ন চলচ্চিত্রের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে তিনি প্রমাণ করেছেন, একজন অভিনেত্রী উভয় ধারাতেই সফল হতে পারে। ‘স্বার্থপর’-এর মতো সাফল্য, ‘মিতিন মাসি’ ফ্র্যাঞ্চাইজির প্রত্যাশা, এবং ভবিষ্যতের ওয়েব সিরিজের সম্ভাবনা সবই দেখাচ্ছে যে, কোয়েল মল্লিক শুধু বাংলা সিনেমার একটি মুখ নয়, তিনি তার মান ও শিল্পচেতনার প্রতীকও।

Preview image