Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

মনের চাপ কমবে যোগে ধ্যানের চেয়েও সহজ পদ্ধতি শিখে নিন

মন তার আপন গতিতেই ছুটবে। দশ দিকেই তার নজর। এই মনকে ধরেবেঁধে বশে রাখা সহজ নয়। তবে এমন কিছু যোগাসন আছে, যা শরীরের পাশাপাশি মনও ভাল করবে।

মানুষের মন প্রকৃতিগত ভাবেই চঞ্চল। এক মুহূর্তে আনন্দে ভরে ওঠে, আবার পরের মুহূর্তেই দুশ্চিন্তার মেঘে ঢেকে যায়। জীবনের প্রতিটি স্তরে দায়িত্ব, কাজের চাপ, পারিবারিক সমস্যা, আর্থিক উদ্বেগ, সম্পর্কের টানাপড়েন—সব মিলিয়ে আধুনিক মানুষের মন যেন বিশ্রাম নিতে ভুলে গেছে। সারাক্ষণ মাথার ভিতরে ঘুরপাক খায় নানা চিন্তা—কী করা উচিত ছিল, কী করা হয়নি, ভবিষ্যতে কী হবে, কীভাবে সমস্যার সমাধান হবে। এই অবিরাম চিন্তার স্রোত অনেক সময় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং তৈরি করে মানসিক চাপ, উদ্বেগ, অস্থিরতা, ঘুমের সমস্যা এমনকি গুরুতর মানসিক রোগের ঝুঁকি।

মনকে শান্ত রাখা সহজ নয়। কারণ মন কোনও বস্তু নয়, তাকে হাতে ধরে থামিয়ে রাখা যায় না। সে নিজের গতিতে ছুটতে চায়, দশ দিকেই তার নজর, সব কিছুতেই তার আগ্রহ। কিন্তু মন যদি সারাক্ষণ উদ্বিগ্ন থাকে, তাহলে শরীরও তার প্রভাব থেকে মুক্ত থাকতে পারে না। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, হজমের সমস্যা, মাথাব্যথা, হরমোনের ভারসাম্যহীনতা সহ নানা শারীরিক সমস্যার কারণ হতে পারে। তাই মন ও শরীরের সুস্থতার জন্য মানসিক শান্তি বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এই মানসিক শান্তি পাওয়ার একটি প্রাচীন ও কার্যকর পদ্ধতি হল যোগব্যায়াম। যোগ শুধুমাত্র শরীরচর্চা নয়, এটি মন, শরীর ও আত্মার সমন্বয়ের একটি বিজ্ঞান। বহু শতাব্দী ধরে ভারতীয় যোগচর্চা মানুষের জীবনে ভারসাম্য ও স্থিতিশীলতা এনে দিয়েছে। যোগাসনের মধ্যে এমন অনেক আসন আছে, যা শুধু শরীরকে নমনীয় ও শক্তিশালী করে না, বরং মনকেও স্থির ও শান্ত করে। তেমনই একটি গুরুত্বপূর্ণ ও কার্যকর আসন হল সিদ্ধাসন, যা ‘পারফেক্ট পোজ়’ নামেও পরিচিত।

সিদ্ধাসন কী এবং কেন গুরুত্বপূর্ণ

সিদ্ধাসন শব্দটি এসেছে সংস্কৃত ‘সিদ্ধ’ থেকে, যার অর্থ পরিপূর্ণতা বা সিদ্ধি। এই আসনকে ধ্যানের জন্য অন্যতম শ্রেষ্ঠ আসন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। প্রাচীন যোগশাস্ত্রে সিদ্ধাসনের উল্লেখ পাওয়া যায় ধ্যান, প্রণায়াম ও মনঃসংযোগের অন্যতম প্রধান আসন হিসেবে। এই আসনে বসলে শরীর স্বাভাবিকভাবে স্থির থাকে এবং দীর্ঘ সময় বসে থাকা সহজ হয়, যা ধ্যান বা শ্বাস-প্রশ্বাসের অনুশীলনের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।

সিদ্ধাসনের মূল উদ্দেশ্য হল শরীরকে স্থির করে মনকে একাগ্র করা। যখন শরীর স্থির থাকে, তখন মনও ধীরে ধীরে স্থির হতে শুরু করে। এই আসন মেরুদণ্ডকে সোজা রাখে, স্নায়ুতন্ত্রকে শান্ত করে এবং মস্তিষ্কে অক্সিজেন সরবরাহ বাড়াতে সাহায্য করে। ফলে উদ্বেগ কমে, চিন্তার ভার হালকা হয় এবং মন এক ধরনের প্রশান্তিতে পৌঁছায়।

সিদ্ধাসন করার সঠিক পদ্ধতি

সিদ্ধাসন করতে হলে কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চলা জরুরি, যাতে আসনটি থেকে সর্বাধিক উপকার পাওয়া যায় এবং কোনও শারীরিক ক্ষতি না হয়।

প্রথমে একটি সমতল জায়গায় যোগা ম্যাট বা নরম কাপড় বিছিয়ে নিন। সোজা হয়ে বসুন। মেরুদণ্ড টানটান রাখুন, বুক সামান্য প্রসারিত রাখুন এবং কাঁধ শিথিল রাখুন। মাথা যেন সামনে বা পিছনে ঝুঁকে না যায়, বরং স্বাভাবিক অবস্থায় থাকে।

এরপর বাঁ পা ভাঁজ করে বাঁ পায়ের গোড়ালি শরীরের কাছে নিয়ে আসুন এবং ডান পায়ের কাফ মাসলের নিচে রাখুন। এরপর ডান পা ভাঁজ করে ডান পায়ের গোড়ালি বাঁ পায়ের কাফ মাসলের উপর রাখুন। হাঁটু দুটি যেন মাটিতে বা ম্যাটের কাছাকাছি থাকে। এই অবস্থায় শরীর ভারসাম্যপূর্ণ ও স্থির থাকবে।

এরপর দুই হাত হাঁটুর উপর রাখুন। চাইলে জ্ঞান মুদ্রা করতে পারেন। জ্ঞান মুদ্রা করার জন্য তর্জনী ও বুড়ো আঙুল স্পর্শ করাতে হবে এবং বাকি তিনটি আঙুল সোজা রাখতে হবে। এই মুদ্রা মনঃসংযোগ বাড়াতে সাহায্য করে বলে বিশ্বাস করা হয়।

চোখ বন্ধ করে ধীরে ধীরে শ্বাস নিন এবং ছাড়ুন। শ্বাস-প্রশ্বাসের উপর মনোযোগ দিন। চেষ্টা করুন, যেন শ্বাস গভীর ও ধীর হয়। কোনও চিন্তা এলে তাকে জোর করে দূরে সরাবেন না, বরং তাকে আসতে দিন এবং আবার শ্বাসের উপর মনোযোগ ফিরিয়ে আনুন।

সিদ্ধাসনের উপকারিতা

সিদ্ধাসন নিয়মিত অভ্যাস করলে শরীর ও মনের উপর বহুমুখী ইতিবাচক প্রভাব পড়ে।

মানসিক উপকারিতা:
সিদ্ধাসন ধ্যানের জন্য আদর্শ একটি আসন। এই আসনে বসলে মন ধীরে ধীরে শান্ত হয় এবং একাগ্রতা বাড়ে। নিয়মিত অনুশীলনে উদ্বেগ, মানসিক চাপ, অস্থিরতা এবং নেতিবাচক চিন্তা কমতে পারে। এটি মস্তিষ্কের কার্যকারিতা উন্নত করে এবং স্মৃতিশক্তি ও মনোযোগ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে।

news image
আরও খবর

শারীরিক উপকারিতা:
এই আসন মেরুদণ্ডকে সোজা রাখে, ফলে পিঠের পেশি শক্তিশালী হয় এবং পিঠব্যথার সমস্যা কমতে পারে। এটি হজম প্রক্রিয়া উন্নত করতে সাহায্য করে এবং শ্রোণী অঞ্চলের পেশি সক্রিয় রাখে। দীর্ঘ সময় বসে কাজ করা মানুষের জন্য এই আসন বিশেষভাবে উপকারী, কারণ এটি শরীরের ভঙ্গি বা পোস্টার ঠিক রাখতে সাহায্য করে।

স্নায়ুতন্ত্র ও হরমোনের উপর প্রভাব:
সিদ্ধাসন স্নায়ুতন্ত্রকে শান্ত করে এবং প্যারাসিমপ্যাথেটিক নার্ভাস সিস্টেমকে সক্রিয় করে, যা শরীরকে বিশ্রাম ও পুনরুদ্ধারের অবস্থায় নিয়ে যায়। ফলে হৃদস্পন্দন ধীর হয়, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রিত থাকে এবং শরীরে স্ট্রেস হরমোনের মাত্রা কমে।

আধুনিক জীবনে সিদ্ধাসনের প্রাসঙ্গিকতা

আজকের দিনে মানুষ প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত হয়ে সারাক্ষণ ব্যস্ত। স্মার্টফোন, সোশ্যাল মিডিয়া, কাজের চাপ, প্রতিযোগিতা—সব মিলিয়ে মন যেন সর্বদা উত্তেজিত অবস্থায় থাকে। ফলে ঘুমের সমস্যা, উদ্বেগ, বিষণ্ণতা এবং মানসিক ক্লান্তি ক্রমশ বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে প্রতিদিন কিছু সময় যোগব্যায়াম ও ধ্যানের জন্য বরাদ্দ করা অত্যন্ত প্রয়োজন।

সিদ্ধাসন এমন একটি সহজ আসন, যা যে কোনও বয়সের মানুষ করতে পারেন। বাড়িতে, অফিসে, এমনকি ভ্রমণের সময়ও এই আসন করা সম্ভব। মাত্র ১০–১৫ মিনিট নিয়মিত অনুশীলন করলেই ধীরে ধীরে মানসিক পরিবর্তন অনুভব করা যায়।

সিদ্ধাসন করার সময় সতর্কতা

যদিও সিদ্ধাসন একটি সহজ ও নিরাপদ যোগাসন, তবুও কিছু সতর্কতা মেনে চলা প্রয়োজন।

যাদের হাঁটু, গোড়ালি বা কোমরে গুরুতর ব্যথা আছে, তাদের জন্য এই আসন প্রথমে অস্বস্তিকর হতে পারে। এমন ক্ষেত্রে ধীরে ধীরে সময় বাড়াতে হবে এবং প্রয়োজনে কুশন বা বালিশ ব্যবহার করা যেতে পারে। গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে যোগাসন করা উচিত। দীর্ঘ সময় বসে থাকলে যদি পায়ে ঝিনঝিন বা অবশ ভাব আসে, তাহলে আসন পরিবর্তন করা উচিত।

সিদ্ধাসন ও ধ্যানের সম্পর্ক

সিদ্ধাসন মূলত ধ্যানের আসন হিসেবে পরিচিত। এই আসনে বসে প্রণায়াম, মন্ত্র জপ, মাইন্ডফুলনেস মেডিটেশন বা শ্বাস-প্রশ্বাসের অনুশীলন করা যেতে পারে। নিয়মিত ধ্যান করলে মস্তিষ্কের গঠনগত পরিবর্তন হয় বলে আধুনিক গবেষণায় প্রমাণ পাওয়া গেছে। ধ্যান মনকে বর্তমান মুহূর্তে স্থির রাখতে শেখায়, ফলে অতীতের আফসোস ও ভবিষ্যতের উদ্বেগ কমে যায়।

নিয়মিত অনুশীলনের গুরুত্ব

যেকোনো যোগাসনের মতো সিদ্ধাসন থেকেও প্রকৃত উপকার পেতে হলে নিয়মিত অনুশীলন জরুরি। প্রথমে ৫ মিনিট দিয়ে শুরু করা যেতে পারে, তারপর ধীরে ধীরে সময় বাড়িয়ে ১৫–২০ মিনিট বা তার বেশি করা সম্ভব। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল ধারাবাহিকতা। প্রতিদিন একই সময়ে অনুশীলন করলে শরীর ও মন দ্রুত অভ্যস্ত হয়ে যায়।

উপসংহার

মন মানুষের জীবনের অন্যতম শক্তিশালী অংশ। এই মন যদি অস্থির থাকে, তাহলে জীবনের কোনও দিকেই প্রকৃত শান্তি পাওয়া সম্ভব নয়। আধুনিক জীবনের চাপে মানসিক শান্তি আজ বিলাসিতার মতো হয়ে উঠেছে। কিন্তু যোগব্যায়াম, বিশেষ করে সিদ্ধাসনের মতো সহজ আসনের মাধ্যমে মনকে আবার শান্ত ও স্থির করা সম্ভব।

সিদ্ধাসন শুধুমাত্র একটি শরীরচর্চা নয়, এটি আত্মসমীক্ষার একটি পথ। এই আসনে বসে মানুষ নিজের ভিতরের চিন্তা, অনুভূতি ও আবেগের সঙ্গে পরিচিত হতে পারে। নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে উদ্বেগ কমে, মনোযোগ বাড়ে, আত্মবিশ্বাস তৈরি হয় এবং জীবনের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি আরও ইতিবাচক হয়ে ওঠে।

শরীর সুস্থ রাখতে যেমন খাদ্য ও ব্যায়াম প্রয়োজন, তেমনই মন সুস্থ রাখতে প্রয়োজন সচেতন অনুশীলন। সিদ্ধাসন সেই অনুশীলনের একটি সহজ, নিরাপদ ও কার্যকর উপায়। প্রতিদিন কয়েক মিনিট নিজের জন্য সময় বের করে এই আসনে বসে শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করলে ধীরে ধীরে মন ফিরে পাবে তার স্বাভাবিক প্রশান্তি ও ভারসাম্য।

Preview image