লক্ষ্মীপুজোকে ঘিরে জমজমাট বাজার। ফুল, ফল ও পুজোর সামগ্রীর পাশাপাশি মাটির নানা উপকরণ কিনতে ভিড় জমিয়েছেন ক্রেতারা। তবে মূল্যবৃদ্ধির চাপে মাটির জিনিস তৈরি করেও লাভের মুখ দেখতে পারছেন না শ্যামপুরের কারিগররা। নতুন প্রজন্মও এই পেশায় আসতে আগ্রহী নয়।
নিজস্ব প্রতিবেদন: বাঙালির ঘরে ঘরে লক্ষ্মীপুজো মানেই ফুল, ফল, নৈবেদ্য এবং নানা পুজোর সামগ্রীর আয়োজন। সেই আয়োজনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ মাটির তৈরি বিভিন্ন উপকরণ। দেবীঘট, দ্বারঘট, সরা, জগ, হাঁড়ি থেকে শুরু করে প্রদীপ—লক্ষ্মীপুজোর বাজারে এসব সামগ্রীর চাহিদা থাকে যথেষ্ট। শুধু লক্ষ্মীপুজো নয়, দুর্গাপুজোর পর থেকে কালীপুজো, জগদ্ধাত্রী পুজো ও কার্তিক পুজো পর্যন্ত মাটির তৈরি নানা উপকরণের চাহিদা বাড়ে। আর এই চাহিদা মেটাতে দিনরাত এক করে কাজ করে চলেছেন হাওড়ার শ্যামপুরের বাগান্ডা এলাকার কুমোর পরিবারের সদস্যরা।
কিন্তু উৎসবের মরশুমে কাজের চাপ বাড়লেও সেই অনুপাতে বাড়ছে না তাঁদের লাভ। বরং মাটি কেনার খরচ এবং শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধির কারণে ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে এই পেশায় টিকে থাকা। দীর্ঘদিন ধরে মাটির জিনিস তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করা কারিগরদের অভিযোগ, পরিশ্রমের তুলনায় উপার্জন যথেষ্ট কম। ফলে এই ঐতিহ্যবাহী পেশায় আগ্রহ হারাচ্ছে নতুন প্রজন্মও।
বাগান্ডার কুমোরপাড়ায় শতাধিক পরিবার মাটির বিভিন্ন সামগ্রী তৈরির সঙ্গে যুক্ত। উৎসবের মরশুমে পরিবারের পুরুষ ও মহিলা, সকলেই কাজে হাত লাগান। সংসারের দায়িত্ব সামলানোর পাশাপাশি মাটি মাখা, জিনিস তৈরি, শুকানো এবং আগুনে পুড়িয়ে সেগুলি বাজারজাত করার কাজে ব্যস্ত থাকেন তাঁরা। তবুও কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি ও উৎপাদন খরচের চাপে তাঁদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
রবিবার লক্ষ্মীপুজো। তার আগে শনিবার সকাল থেকেই বাজারে ক্রেতাদের ভিড় চোখে পড়েছে। ফুল, ফল, দশকর্মার সামগ্রীর পাশাপাশি মাটির তৈরি বিভিন্ন উপকরণ কেনার জন্যও দোকানে ভিড় জমিয়েছেন মানুষ।
বাঙালির ঐতিহ্যবাহী পুজো-পার্বণে মাটির সামগ্রীর ব্যবহার দীর্ঘদিনের। পুজোর উপকরণ হিসেবে মাটির ঘট, সরা, হাঁড়ি এবং প্রদীপের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। বাড়িতে লক্ষ্মীপুজোর আয়োজন করতে গিয়ে অনেকেই প্রয়োজন অনুযায়ী এই সামগ্রী কিনে থাকেন। ফলে উৎসবের মরশুমে কুমোরদের তৈরি জিনিসের চাহিদা বেড়ে যায়।
এই চাহিদার কথা মাথায় রেখেই শ্যামপুরের বাগান্ডার কুমোর পরিবারগুলি আগে থেকেই উৎপাদনের প্রস্তুতি শুরু করেন। লক্ষ্মীপুজোর পাশাপাশি পরবর্তী সময়ে কালীপুজো, জগদ্ধাত্রী পুজো এবং কার্তিক পুজোর বাজার ধরতেও তাঁদের প্রচুর সামগ্রী তৈরি করতে হয়।
তবে বাজারে চাহিদা থাকলেই যে কারিগরদের লাভ বাড়বে, এমনটা হচ্ছে না। উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি এবং শ্রমের খরচ বেড়ে যাওয়ায় ব্যবসার হিসাব মেলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাঁদের।
শ্যামপুরের বাগান্ডা এলাকার কুমোরপাড়ায় মাটির সামগ্রী তৈরি শুধু একটি পেশা নয়, বহু পরিবারের দীর্ঘদিনের জীবিকার মাধ্যম। বংশপরম্পরায় এই কাজের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন অনেকে। উৎসবের মরশুমে তাঁদের কর্মব্যস্ততা কয়েক গুণ বেড়ে যায়।
দুর্গাপুজোর পর থেকেই শুরু হয় লক্ষ্মীপুজো, কালীপুজো, জগদ্ধাত্রী পুজো এবং কার্তিক পুজোর জন্য বিভিন্ন ধরনের মাটির সামগ্রী তৈরির ব্যস্ততা। বাজারে সময়মতো পণ্য পৌঁছে দিতে পরিবারের সদস্যদের একসঙ্গে কাজ করতে হয়।
কেউ মাটি পরিষ্কার করেন, কেউ মাটি মাখেন, কেউ হাতে বা নির্দিষ্ট সরঞ্জামের সাহায্যে সামগ্রীর আকার দেন। আবার কেউ তৈরি জিনিস রোদে শুকানোর ব্যবস্থা করেন। সব শেষে সেগুলি আগুনে পুড়িয়ে বিক্রির উপযোগী করে তোলা হয়।
এই কাজের প্রতিটি ধাপেই সময় ও পরিশ্রম প্রয়োজন। তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে যথাযথভাবে মাটি প্রস্তুত না হলে বা শুকানো ও পোড়ানোর প্রক্রিয়ায় সমস্যা হলে তৈরি সামগ্রী নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই উৎসবের মরশুমে অর্ডার বা চাহিদা সামলানোর পাশাপাশি পণ্যের গুণমান বজায় রাখাও তাঁদের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ।
পরিবারের সদস্যরা নিজেরাই অনেকটা কাজ করেন বলে শ্রমিক নিয়োগের খরচ কিছুটা কমানো সম্ভব হয়। কিন্তু কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ায় সেই সাশ্রয়ও অনেক ক্ষেত্রে যথেষ্ট হচ্ছে না।
কুমোরশিল্পের অন্যতম প্রধান কাঁচামাল মাটি। সেই মাটি সংগ্রহ বা কেনার খরচ বাড়লে সরাসরি প্রভাব পড়ে উৎপাদন ব্যয়ের উপর। বাগান্ডার কুমোরদের ক্ষেত্রেও এখন সেটাই বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এলাকার কুমোরপাড়ার বাসিন্দা নিত্যানন্দ পালের বক্তব্য অনুযায়ী, আগে এক ভক্সেল মাটি কিনতে খরচ হত ২১০ টাকা। বর্তমানে সেই একই পরিমাণ মাটির জন্য দিতে হচ্ছে ৩০০ টাকা।
অর্থাৎ, প্রতি ভক্সেলে মাটির দাম বেড়েছে ৯০ টাকা। আগের দামের তুলনায় এই বৃদ্ধি প্রায় ৪২.৯ শতাংশ। দীর্ঘদিন ধরে যাঁরা মাটির জিনিস তৈরি করছেন, তাঁদের কাছে এই অতিরিক্ত খরচ যথেষ্ট চাপের।
একটি সামগ্রীর চূড়ান্ত উৎপাদন খরচ হিসাব করতে গেলে শুধু মাটির দাম ধরলে চলে না। মাটি পরিষ্কার করা, জল দিয়ে মাখা, জিনিস তৈরি, শুকানো এবং পোড়ানোর জন্যও শ্রম ও অন্যান্য উপকরণ প্রয়োজন হয়। এরপর থাকে পরিবহণ এবং বাজারে বিক্রির খরচ।
কাঁচামালের দাম বেড়ে গেলেও বাজারে সব সময় সেই অনুপাতে পণ্যের দাম বাড়ানো সম্ভব হয় না। কারণ, সাধারণ ক্রেতাদেরও নির্দিষ্ট বাজেট থাকে। আবার অন্য বিক্রেতাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতার বিষয়টিও মাথায় রাখতে হয়।
ফলে উৎপাদন খরচ বাড়লেও বিক্রির দাম তুলনামূলক কম থাকলে লাভের পরিমাণ কমে যায়। কুমোরদের অভিযোগ, এই পরিস্থিতিতে উৎসবের মরশুমে বেশি কাজ করেও প্রত্যাশিত আয় হচ্ছে না।
মাটির তৈরি পণ্য দেখতে সাধারণ মনে হলেও সেগুলি তৈরি করতে একাধিক ধাপ পেরোতে হয়। প্রথমে প্রয়োজনীয় মাটি সংগ্রহ করতে হয়। তারপর সেই মাটি থেকে পাথর, শিকড়, আবর্জনা এবং অন্যান্য অপ্রয়োজনীয় উপাদান সরিয়ে পরিষ্কার করা হয়।
পরিষ্কার করা মাটিতে প্রয়োজন অনুযায়ী জল মিশিয়ে ভালোভাবে মাখতে হয়। বাগান্ডার কারিগরদের বর্ণনা অনুযায়ী, মাটিকে তিনবার জল দিয়ে মেখে প্রস্তুত করা হয়। এর ফলে মাটি দিয়ে প্রয়োজনীয় আকার তৈরি করার উপযোগী নমনীয়তা পাওয়া যায়।
এরপর তৈরি করা হয় দেবীঘট, দ্বারঘট, সরা, জগ, হাঁড়ি, প্রদীপ এবং অন্যান্য সামগ্রী। সামগ্রীর ধরন অনুযায়ী আকার ও গড়নের পার্থক্য থাকে। তাই প্রতিটি জিনিস তৈরিতে কারিগরদের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা প্রয়োজন।
জিনিস তৈরি হয়ে গেলে সেগুলি রোদে শুকাতে দেওয়া হয়। পর্যাপ্তভাবে না শুকালে পোড়ানোর সময় ফেটে যাওয়া বা ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। শুকানোর পরে নির্দিষ্ট ব্যবস্থায় আগুনে পুড়িয়ে সামগ্রীগুলি শক্ত করা হয়। সব শেষে সেগুলি বাজারে বিক্রির জন্য প্রস্তুত করা হয়।
এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় প্রতিটি পর্যায় গুরুত্বপূর্ণ। বৃষ্টি বা প্রতিকূল আবহাওয়া শুকানোর কাজে সমস্যা তৈরি করতে পারে। আবার পোড়ানোর সময় সামগ্রী নষ্ট হলে কাঁচামাল ও শ্রম—দুইয়েরই ক্ষতি হয়।
তাই মাটির সামগ্রীর চূড়ান্ত দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে উৎপাদনের সমস্ত খরচ বিবেচনা করা প্রয়োজন। কিন্তু কারিগরদের অভিযোগ, বাস্তবে তাঁদের পক্ষে সেই সমস্ত খরচের সমানুপাতে বিক্রির দাম বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না।
বাগান্ডার কুমোরপাড়ায় মাটির সামগ্রী তৈরির কাজ শুধু পুরুষদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। পরিবারের মহিলারাও এই কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। সংসারের দৈনন্দিন দায়িত্ব সামলানোর পাশাপাশি তাঁরা মাটির জিনিস তৈরি এবং উৎপাদনের অন্যান্য কাজে সাহায্য করেন।
স্থানীয় বাসিন্দা বৃদ্ধা আরতি পাল জানান, সংসারের কাজ সামলে মাটির সামগ্রী তৈরির কাজ করতে হয়। ঠাকুরের পুজোর উপকরণ ছাড়াও মালসা, কলসি এবং অন্যান্য জিনিস তৈরি করা হয়। কিন্তু কাঁচামালের দাম বাড়ায় আগের মতো লাভ থাকছে না।
পরিবারের সদস্যরা নিজেরাই অনেকটা কাজ করে নেওয়ায় শ্রমিকের খরচ কিছুটা বাঁচে বলে জানান তিনি। তবে এই সাশ্রয় দিয়ে মূল্যবৃদ্ধির সমস্ত চাপ সামলানো যাচ্ছে না।
গ্রামীণ কুটিরশিল্পে পরিবারের সদস্যদের সম্মিলিত শ্রমের গুরুত্ব অনেক। অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের একাধিক সদস্য কাজ করলেও সেই শ্রমের পৃথক মূল্য হিসাব করা হয় না। ফলে পণ্যের বিক্রিমূল্য থেকে প্রকৃত লাভ কতটা হচ্ছে, তা নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
এই পরিস্থিতিতে উৎপাদনের প্রকৃত খরচ হিসাব করা এবং সেই অনুযায়ী পণ্যের ন্যায্য মূল্য পাওয়া কুমোর পরিবারগুলির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কুমোরদের বর্তমান পরিস্থিতির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হল, পুজোর মরশুমে মাটির সামগ্রীর চাহিদা থাকলেও তাঁদের লাভ কমছে। এর পিছনে রয়েছে উৎপাদন খরচ এবং বিক্রিমূল্যের মধ্যে ভারসাম্যহীনতা।
মাটির দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি শ্রমিকের মজুরি বেড়ে যাওয়ায় প্রতিটি সামগ্রী তৈরির খরচ বাড়ছে। এর সঙ্গে রয়েছে উৎপাদনে লাগা সময়, পোড়ানোর খরচ এবং বাজারে পণ্য পৌঁছে দেওয়ার ব্যয়।
অন্যদিকে, ক্রেতারা সাধারণত পুজোর সামগ্রী কেনার সময় দামও বিবেচনা করেন। বিক্রেতাদের পক্ষে সব ক্ষেত্রে বেশি দাম নেওয়া সম্ভব হয় না। ফলে বাড়তি উৎপাদন খরচের চাপ অনেকটাই বহন করতে হয় কারিগরদের।
উৎসবের মরশুমে কাজের পরিমাণ বাড়লেও সেই অতিরিক্ত কাজের আর্থিক সুবিধা সব সময় সমানভাবে পাওয়া যায় না। বিশেষ করে পরিবারের সদস্যদের দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করতে হলে তাঁদের শ্রমের যথাযথ মূল্য হিসাব করা জরুরি।
কুমোরদের অভিযোগ, পরিশ্রমের তুলনায় আয় কম হওয়ায় এই পেশা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে উঠছে। দীর্ঘমেয়াদে পরিস্থিতির উন্নতি না হলে ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত পরিবারগুলির জীবিকা আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে।
বাগান্ডার কুমোরদের আর একটি বড় উদ্বেগ হল, নতুন প্রজন্মের অনেকেই এই পেশায় আসতে চাইছে না। দীর্ঘ সময় ধরে পরিশ্রম করার পরও যদি পর্যাপ্ত আয় না হয়, তাহলে তরুণদের কাছে অন্য পেশা বেছে নেওয়ার প্রবণতা বাড়তে পারে।
মৃৎশিল্পে দক্ষতা অর্জন করতে সময় লাগে। মাটি চেনা, সঠিকভাবে মাটি মাখা, বিভিন্ন সামগ্রীর আকার তৈরি এবং পোড়ানোর প্রক্রিয়া সম্পর্কে বাস্তব অভিজ্ঞতা প্রয়োজন। এই জ্ঞান অনেক ক্ষেত্রেই পরিবার থেকে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছয়।
কিন্তু নতুন প্রজন্ম যদি এই কাজ থেকে সরে যায়, তাহলে শুধু একটি পরিবারের পেশাই বদলাবে না; ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে পারে বহুদিনের অভিজ্ঞতা ও কারিগরি দক্ষতাও।
ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে কারিগরদের ন্যায্য আয় নিশ্চিত করার পাশাপাশি উৎপাদনের খরচ কমানোর সুযোগ, বাজারের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ এবং নতুন প্রজন্মের কাছে এই পেশাকে আকর্ষণীয় করে তোলার প্রয়োজন রয়েছে।
যুবসমাজের কাছে মৃৎশিল্পকে জীবিকার সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হিসেবে তুলে ধরতে আধুনিক বিপণন, নতুন নকশা এবং বিভিন্ন ধরনের মাটির পণ্যের বাজার সম্প্রসারণের বিষয়টিও বিবেচনা করা যেতে পারে।
শ্যামপুরের বাগান্ডার কুমোর পরিবারগুলির সমস্যা স্থানীয় হলেও তা বাংলার ঐতিহ্যবাহী কুটিরশিল্পের বৃহত্তর চ্যালেঞ্জের প্রতিফলন। উৎসবের সময় এই শিল্পের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়ে উঠলেও সারা বছর ধরে কারিগরদের আয় কতটা স্থিতিশীল থাকে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
মাটির পণ্যের উৎপাদন খরচ ও বিক্রিমূল্যের মধ্যে সামঞ্জস্য বজায় রাখতে পারলে কারিগরদের আর্থিক নিরাপত্তা বাড়তে পারে। পাশাপাশি সরাসরি ক্রেতাদের কাছে পণ্য বিক্রি, স্থানীয় মেলা ও বাজারে অংশগ্রহণ এবং অনলাইন বিপণনের সুযোগ কাজে লাগানোর মাধ্যমে নতুন ক্রেতাদের কাছে পৌঁছনো সম্ভব হতে পারে।
তবে এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন উপযুক্ত সহায়তা, প্রশিক্ষণ এবং বাজারের সঙ্গে সংযোগ। একই সঙ্গে কারিগরদের উৎপাদন খরচ, পণ্যের ধরন এবং ক্রেতাদের চাহিদা বিবেচনা করে পরিকল্পনা করা জরুরি।
মাটির প্রদীপ, ঘট, সরা, হাঁড়ি, কলসি কিংবা মালসা—এই পণ্যগুলি শুধু পুজোর উপকরণ নয়, বাংলার গ্রামীণ জীবন ও সংস্কৃতিরও অংশ। তাই এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত পরিবারগুলির জীবিকা সুরক্ষিত রাখা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ।
লক্ষ্মীপুজো থেকে শুরু করে কালীপুজো, জগদ্ধাত্রী পুজো ও কার্তিক পুজো—উৎসবের মরশুমে মাটির তৈরি বিভিন্ন সামগ্রীর চাহিদা থাকে। সেই চাহিদা পূরণ করতে শ্যামপুরের বাগান্ডার শতাধিক পরিবার দিনরাত পরিশ্রম করছেন।
কিন্তু মাটির দাম ২১০ টাকা থেকে বেড়ে ৩০০ টাকা হওয়া এবং শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধির ফলে তাঁদের উৎপাদন খরচ বেড়েছে। অথচ সেই অনুপাতে লাভ বাড়ছে না বলে অভিযোগ কারিগরদের। সংসারের দায়িত্ব সামলে কাজ করা প্রবীণ ও মহিলা কারিগরদের কাছেও এই পরিস্থিতি যথেষ্ট কঠিন হয়ে উঠছে।
সবচেয়ে বড় আশঙ্কা, এই পেশায় পর্যাপ্ত আয় না থাকায় নতুন প্রজন্ম আগ্রহ হারাচ্ছে। ফলে দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
উৎসবের বাজারে মাটির সামগ্রীর চাহিদা থাকলেও সেই চাহিদা থেকে কারিগরদের আর্থিক লাভ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। ন্যায্য দাম, উৎপাদন খরচ সামলানোর সুযোগ এবং বাজারের প্রসার ঘটানো গেলে শ্যামপুরের কুমোর পরিবারগুলি উপকৃত হতে পারেন। একই সঙ্গে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব বাংলার ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্পকেও।