কোয়েল মালিক ফিরছেন মিতিন মাসি রূপে নতুন লুক, রহস্য ও অ্যাকশনে জমজমাট বড়দিনের প্রস্তুতি।চওড়া ফ্রেমের চশমা, খোলা চুল আর রিভলভার কোয়েলের পাওয়ার-প্যাকড লুকে ফিরছে মিতিন মাসির নতুন অভিযান।তিন বাংলা ছবির প্রতিযোগিতার মাঝে উৎসবের হাইলাইট রহস্যভেদে আবারও ঝড় তুলতে আসছে মিতিন, একটি খুনির সন্ধানে
বাংলা চলচ্চিত্রে গোয়েন্দা চরিত্রদের দীর্ঘ ইতিহাসে এক বিশেষ জায়গা দখল করে নিয়েছেন সুচিত্রা ভট্টাচার্যের সৃষ্টি প্রজাপতি বৌদি—অর্থাৎ আমাদের সকলের পরিচিত মিতালি মুখোপাধ্যায় বা মিতিন মাসি। মহিলা গোয়েন্দা হিসেবে তাঁর স্নিগ্ধ উপস্থিতি, ঝকঝকে বুদ্ধি, যুক্তি-তর্কের তীক্ষ্ণতা এবং নিখাদ মানবিকতা তাঁকে বাংলা সাহিত্য ও পর্দায় এক আলাদা মর্যাদা দিয়েছে। সেই চরিত্রটিকেই বারবার নতুন করে জীবন্ত করে তুলছেন কোয়েল মল্লিক। আর এবারের বড়দিনে তেমনই আরেকটি রোমাঞ্চকর অভিযানে দর্শককে নিয়ে যেতে আসছে নতুন ছবি “মিতিন, একটি খুনির সন্ধানে”।
গত কয়েক বছরে বাংলা ছবির বাজারে উৎসবের সময়টা খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। পূজা, দীপাবলি বা বড়দিন—প্রতিটি উৎসবই হয়ে দাঁড়িয়েছে বড় বাজেটের বা জনপ্রিয় চরিত্রভিত্তিক ছবির মুক্তির সেরা সময়। এই প্রতিযোগিতার মাঝেই মিতিন মাসির প্রত্যাবর্তন যেন উৎসবের আবহে বাড়তি উত্তেজনা নিয়ে এসেছে। কারণ, গোয়েন্দা চরিত্রের প্রতি বাঙালির আবেগ অনেক গভীর। সত্যজিৎ রায়ের ফেলুদা, খাদ্যরসিক ব্যোমকেশ বা শবর দাশগুপ্ত—সবাইয়ের পাশে কোনোরকমেই তুচ্ছ নন মিতিন। বরং মহিলা গোয়েন্দা হিসেবে আধুনিক নারীর স্বাধীনতা, বুদ্ধিমত্তা ও সাহসিকতার এক অনন্য প্রতিনিধিত্ব তিনি করে থাকেন।
এই ছবির অন্যতম আকর্ষণ নিঃসন্দেহে কোয়েল মল্লিকের নতুন লুক। চওড়া ফ্রেমের চশমা, মুখে অনড় আত্মবিশ্বাস, খোলা চুলে স্বাভাবিক সৌন্দর্য আর হাতে রিভলভার—সব মিলিয়ে তাঁর এই রূপটি একদিকে যেমন রহস্যময়, তেমনি অন্যদিকে আভিজাত্যে ভরপুর। দীর্ঘদিন ধরেই কোয়েল বাংলা ছবির জনপ্রিয় নায়িকা। কিন্তু তাঁর মিতিন চরিত্রের মধ্যে যে দৃঢ়তা, প্রত্যয় এবং ইস্পাত-শক্তি দেখা যায়, তা নিছক রোমান্টিক চরিত্রের ঊর্ধ্বে। এই কারণেই মিতিনের প্রতিটি রূপায়ণে দর্শক কোয়েলের মধ্যে নতুনত্ব আবিষ্কার করেন।
শুটিং চলাকালীন গত বছর একটি অ্যাকশন দৃশ্য করতে গিয়ে চোট পেয়েছিলেন কোয়েল। কিন্তু কয়েক মাসের বিশ্রাম, পরিশ্রম এবং কঠোর ট্রেনিংয়ের পর তিনি আবার নতুন উদ্যমে শুটিং ফ্লোরে ফিরে আসেন। সেই লাগাতার চেষ্টা যেন তাঁর চরিত্রের সঙ্গে মিলে মিশে গেছে। যেমন মিতিন কখনও পিছিয়ে পড়েন না, তেমনি কোয়েলও নিজেদের সেরাটা দিয়ে আবারও ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়েছেন। পরিচালক এবং ইউনিটের সদস্যদের মতে, চোটের পর কোয়েলের প্রত্যাবর্তন আরও জোরালো ও আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছে।
এই ছবির গল্পও সাজানো হয়েছে এক টানটান উত্তেজনা দিয়ে। নাম থেকেই বোঝা যায়—একজন খুনির খোঁজে নামতে চলেছেন মিতালি। সাধারণত মিতিনের কাজের ধরন শান্ত, যুক্তিনিষ্ঠ এবং পর্যবেক্ষণ নির্ভর। কিন্তু এই ছবিতে তাঁকে উপজীব্য করতে হবে এমন এক রহস্যকে, যেখানে ভর করে আছে অন্ধকার, প্রতিশোধ, ষড়যন্ত্র আর মৃত্যুর ছায়া। ছবির চিত্রনাট্যকার জানিয়েছেন, এবার গল্পটি পূর্বের তুলনায় আরও দ্রুতগতির, অ্যাকশন ও থ্রিল মিশ্রিত। দর্শকদের চেয়ারে বসিয়ে রাখতে চাইলে রহস্যের দড়িটা একটু শক্ত করতেই হয়, আর সেই ব্যবস্থাই দেখা যাবে ছবিতে।
টলিউডের পরিচিত মুখ যেমন শুভ্রজিৎ দত্ত, লেখা চট্টোপাধ্যায়, সাহেব চট্টোপাধ্যায়, অনসূয়া মজুমদার এবং দুলাল লাহিড়ি—তাঁরাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় যুক্ত হয়েছেন। তাঁদের অভিনয় ছবিকে দিয়েছে আরও বাস্তবতা ও ঘনত্ব। শুভ্রজিৎ দত্ত এই ছবিতে একজন গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা বিভাগের সদস্যের ভূমিকায়। লেখা চট্টোপাধ্যায়কে দেখা যাবে এক রহস্যময় চরিত্রে, যিনি গল্পের মোড় ঘোরাতে বিশেষ ভূমিকা রাখবেন। অনসূয়া মজুমদারের দৃঢ় অভিনয় ছবির আবেগী দিকটি আরও শক্তিশালী করবে বলে আশা। আর দুলাল লাহিড়ি বরাবরের মতোই নিজের অভিনয়ের জাদুতে দর্শককে আলাদা করে আকর্ষণ করবেন।
বাংলা চলচ্চিত্রে নারীকেন্দ্রিক কাজ বেশ খানিকটা বাড়লেও, গোয়েন্দা চরিত্রে মহিলাদের স্থান এখনও কম। মিতিন মাসি সেই কম সংখ্যার মধ্যেই এক উজ্জ্বল উদাহরণ। তাঁর চরিত্র দর্শককে মনে করিয়ে দেয়, যুক্তি, বিশ্লেষণ এবং পর্যবেক্ষণের ক্ষমতা কোনও নির্দিষ্ট লিঙ্গের অধিকারভুক্ত নয়। বরং সাহসিকতা ও মানবিকতা—এই দুটো গুণই যেকোনও গোয়েন্দার জন্য জরুরি। মিতিন সেই দুই দিকেই সমান দক্ষ। বছরের পর বছর বাংলা সাহিত্যপ্রেমীরা যেভাবে তাঁকে ভালোবেসে এসেছেন, ঠিক সেভাবেই চলচ্চিত্র সংস্করণেও তিনি জায়গা করে নিয়েছেন।
এবারের ছবিতে মিতিনকে আরও বাইরে বেরোতে হবে, আরও ঝুঁকির মুখোমুখি দাঁড়াতে হবে। শহুরে প্রেক্ষাপটে যেমন জটিল ঘটনা ঘটে, তেমনই তার সঙ্গে যুক্ত মধ্যবিত্ত জীবনের সূক্ষ্ম সমস্যা, সমাজের অন্ধকার দিক, অপরাধচক্রের বিস্তার—সবই মিতিনের তদন্তকে কঠিন করে তুলবে।
ছবির পরিচালক শুটিংয়ের সময় অভিনেতাদের সঙ্গে অনেক ওয়ার্কশপ করেছেন। বিশেষত কোয়েলের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা এবং চরিত্রের আদানপ্রদানের মধ্য দিয়ে তৈরি হয়েছে এই নতুন লুক। রিভলভার ব্যবহারের প্রশিক্ষণ, অ্যাকশন দৃশ্যে দেহের ভারসাম্য ধরে রাখা, দ্রুতগতিতে চলাফেরার দক্ষতা—এসবই কোয়েলকে কয়েক সপ্তাহ ধরে অনুশীলন করতে হয়েছে। পাশাপাশি মিতিনের স্বভাব অনুযায়ী শান্ত কিন্তু দৃঢ় শরীরী ভাষা বজায় রাখাই ছিল প্রধান চ্যালেঞ্জ। কোয়েলের মতে, “মিতিন চরিত্রটি যতটা শক্তিশালী, ততটাই সংবেদনশীল। তাঁকে ফুটিয়ে তুলতে গেলে ভারসাম্য বজায় রাখা খুব গুরুত্বপূর্ণ।”
শুভ্রজিৎ দত্ত জানিয়েছেন, কোয়েলের সঙ্গে কাজ করা সব সময়ই স্বস্তিদায়ক। তিনি বলেন, “কোয়েল সেটে যেভাবে চরিত্রকে ধরে রাখেন, সেটা সত্যিই অনুপ্রেরণাদায়ক। তিনি সবসময় প্রস্তুত থাকেন, যে কোনও দৃশ্যে আস্থার সঙ্গে ঢুকে যান। মিতিন মাসির মতো চরিত্রকে বিশ্বাসযোগ্য করতে গেলে অভিনেতার ভেতরেও সেই দৃঢ়তার ছোঁয়া থাকা জরুরি। কোয়েলের মধ্যে সেটা স্পষ্ট।”
এই বড়দিনে একসঙ্গে মুক্তি পাচ্ছে তিনটি বহুল প্রতীক্ষিত বাংলা ছবি। তাই প্রতিযোগিতা থাকবে তুঙ্গে—এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। উৎসবের মরসুমে সাধারণত সিনেমা হলগুলোতে দর্শকের ভিড় বাড়ে। বিশেষত পরিবারকেন্দ্রিক বা থ্রিলার ঘরানার ছবি হলে দর্শক আকর্ষণের সম্ভাবনা আরও বেশি। ঠিক এই জায়গাতেই মিতিন মাসির প্রত্যাবর্তন বড় সুবিধা এনে দিতে পারে। কারণ গোয়েন্দা গল্প এমন এক жанর, যা বয়স নির্বিশেষে সকলের কাছে উপভোগ্য।
বড়দিনে আলোর সাজ, রঙিন উৎসব, খাবারদাবার, ছুটি—সব মিলিয়ে বছরের এই সময়টাকে কেন্দ্র করেই ছবি মুক্তির এক বিশেষ ঐতিহ্য তৈরি হয়েছে। প্রতিটি প্রযোজকই চান উৎসবের ভিড়ে তাঁদের ছবিই যেন দর্শকের মন জয় করে নেয়। তবে মিতিন মাসির মতো জনপ্রিয় চরিত্রের জন্য দর্শকের আগ্রহ আলাদা। বিগত ছবির সাফল্য সেই প্রত্যাশাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
ছবির ট্রেলার থেকেই বোঝা যাচ্ছে, এবার রহস্যের পাশাপাশি অ্যাকশনও বাড়তি গুরুত্ব পেয়েছে। মিতিনকে শুধু তদন্ত করতেই দেখা যাবে না, প্রয়োজন হলে প্রতিপক্ষের মুখোমুখি দাঁড়াতে—শরীরী লড়াইয়েও তাকে পিছিয়ে থাকতে হবে না। তাঁর হাতে রিভলভার, চোখে ইস্পাতের কঠোরতা—এই দৃশ্যগুলো ইতিমধ্যেই দর্শকের মধ্যে আলোড়ন ফেলেছে।
তবে ছবির নির্মাতারা জোর দিয়েছেন যে অ্যাকশন বাড়লেও, মূল চরিত্রের আবেগ ও মানবিকতা ঠিক আগের মতোই রয়ে গেছে। কারণ মিতিন শুধু অপরাধী ধরার জন্যই কাজ করেন না—তিনি অপরাধের মূল, সামাজিক প্রেক্ষাপট এবং মানবিক জটিলতাকেও বোঝেন। এই দুটি দিক মিলে তাঁকে করে তোলে বাংলা সাহিত্যের অন্যতম বাস্তবসম্মত গোয়েন্দা।
মিতিন মাসির যাত্রা সাহিত্য থেকে শুরু করে ওয়েব সিরিজ, টেলিভিশন এবং বড় পর্দা—সব জায়গায় তাঁর বিশেষ উপস্থিতি রয়েছে। প্রতিটি মাধ্যমের সঙ্গে মানিয়ে নিয়েই চরিত্রটি বিবর্তিত হয়েছে সময়ের সঙ্গে। আজকের দিনে যেখানে অপরাধ আরও প্রযুক্তিনির্ভর, সেখানে মিতিনও নতুন প্রযুক্তি কাজে লাগাতে শিখেছেন। মোবাইল ট্র্যাকিং, সিসিটিভি বিশ্লেষণ, ডিজিটাল ক্লু—সবই তাঁর তদন্তের অংশ। তবে আধুনিকতার পাশাপাশি তাঁর পুরোনো অভ্যাস—নোটবুকে তথ্য লেখা, নিজের পর্যবেক্ষণ যুক্ত করা—এই টাচও ছবিকে আলাদা করে তুলবে।
গত কয়েক বছরে বাংলা ছবির দর্শক বেড়েছে গল্পের মান, অভিনয় এবং নির্মাণশৈলীর উন্নতির কারণে। সোশ্যাল মিডিয়া, ইউটিউব ট্রেলার, প্রমোশন—সব মিলিয়ে দর্শকের উত্তেজনাও বৃদ্ধি পেয়েছে। কোয়েলের নতুন লুক দেখে ভক্তরা ইতিমধ্যেই সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রশংসার ঢেউ তুলেছেন। অনেকেই বলছেন, “এটাই কোয়েলের সবচেয়ে শক্তিশালী চরিত্রগুলোর একটি।” আবার কেউ লিখছেন, “এবারের বড়দিনে পরিবার নিয়ে দেখা যাবে জমজমাট রহস্য।”
তাই নির্মাতাদের আশা, মিতিন মাসির এই প্রত্যাবর্তন একদিকে যেমন পুরোনো পাঠক-দর্শকদের আনন্দ দেবে, তেমনি নতুন প্রজন্মের মধ্যেও গোয়েন্দা গল্পের প্রতি আগ্রহ বাড়াবে।
গত কয়েক বছরে বিশ্বজুড়েই নারী-চরিত্রকেন্দ্রিক থ্রিলার ছবির জনপ্রিয়তা বাড়ছে। বাংলা সিনেমাও সেই পথেই হাঁটছে। মিতিন মাসির মতো চরিত্র বাংলা চলচ্চিত্রে নারীর শক্তিকে এক নতুন চেহারা দিয়েছে। তিনি নন-গ্ল্যামারাস হলেও প্রভাবশালী, কোমল হৃদয়ের হলেও কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম। এই বৈপরীত্যই তাঁকে বাস্তব জগতের কাছাকাছি এনে দেয়।
নির্মাতাদের মতে, ভবিষ্যতে বাংলা সিনেমায় আরও নারী-গোয়েন্দা বা নারী-নেতৃত্বাধীন গল্প দেখা যাবে। কারণ আজকের দর্শক চরিত্রের গভীরতা এবং বৈচিত্র্য খোঁজেন। সেই জায়গা থেকে দেখলে মিতিন মাসির মতো চরিত্র বাংলা চলচ্চিত্রের এক মূল্যবান সম্পদ।
সব মিলিয়ে, বড়দিনে মুক্তি পাওয়া “মিতিন, একটি খুনির সন্ধানে” শুধু একটি রহস্যগল্প-ভিত্তিক সিনেমা নয়—এটি বাংলা ছবির এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ও বটে। এখানে আছে কোয়েল মল্লিকের অভিনয়ের নতুন মাত্রা, আধুনিক অ্যাকশন, দারুন গল্প, দক্ষ অভিনয়শিল্পীদের সংলগ্নতা এবং উৎসবের আনন্দ। টলিউডের প্রতিযোগিতামূলক বাজারে এই ছবিটি যে আলাদা করে দর্শকের মনোযোগ কাড়বে, তা এখনই স্পষ্ট।
রহস্য, অ্যাকশন, আবেগ এবং উৎসব—সব মিলিয়ে বড়দিনের সেরা আকর্ষণ হয়ে উঠতে পারে নতুন মিতিন মাসির অভিযান।