মহালয়ার দিন কলকাতার কুমোরটুলিতে দেখা গেল উপচে পড়া ভিড়। শনিবার সকাল থেকেই দুর্গাপ্রতিমা নিতে আসতে শুরু করেন বিভিন্ন পুজো উদ্যোক্তা, বাড়ির পুজোর সদস্য এবং প্রতিমা সংগ্রহ করতে আসা মানুষজন। বেলা যত গড়িয়েছে, উত্তর কলকাতার এই ঐতিহ্যবাহী পটুয়াপাড়ায় ভিড় ততই বেড়েছে। ইতিমধ্যেই কিছু দুর্গাপ্রতিমা রওনা দিয়েছে বিভিন্ন পুজোমণ্ডপ ও বনেদি বাড়ির উদ্দেশে। অন্যদিকে, প্রতিমা হস্তান্তর, পরিবহণের প্রস্তুতি এবং শেষ মুহূর্তের কাজ সামলাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন মৃৎশিল্পীরা। উৎসবের আনন্দের মধ্যেও অতিরিক্ত ভিড় ও কাজের চাপ তাঁদের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
মহালয়া মানেই বাঙালির মনে দেবীপক্ষের আগমনী সুর। পিতৃপক্ষের অবসান ঘটিয়ে দেবীপক্ষের সূচনা, আকাশে উৎসবের আবহ এবং মণ্ডপে মণ্ডপে দুর্গাপুজোর শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি—সব মিলিয়ে বাঙালির মনে শুরু হয়ে যায় শারদোৎসবের চূড়ান্ত অপেক্ষা। মহালয়ার ভোরে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠে মহিষাসুরমর্দিনী শোনার পাশাপাশি অনেকেই অপেক্ষা করেন দেবী দুর্গার মর্ত্যে আগমনের। আর সেই আবহের মধ্যেই কলকাতার কুমোরটুলিতে দেখা গেল ব্যস্ততার অন্য ছবি। শনিবার মহালয়ার দিন সকাল থেকে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্পীদের পাড়ায় জমতে শুরু করে মানুষের ভিড়।
দুর্গাপুজোর আগে প্রতিমা তৈরির শেষ পর্যায়ের কাজ, রং করা, সাজসজ্জা এবং প্রতিমা হস্তান্তরের ব্যস্ততা কুমোরটুলিতে প্রতি বছরই দেখা যায়। তবে মহালয়ার দিন সেই ব্যস্ততা আরও চোখে পড়ার মতো হয়ে ওঠে। বিভিন্ন পুজো কমিটি, বাড়ির পুজোর উদ্যোক্তা এবং প্রতিমা সংগ্রহ করতে আসা মানুষের আনাগোনায় সরগরম হয়ে ওঠে গোটা এলাকা। কিছু দুর্গাপ্রতিমা ইতিমধ্যেই কুমোরটুলি থেকে রওনা দেয় বিভিন্ন মণ্ডপ ও বাড়ির উদ্দেশে। অন্যদিকে, প্রতিমা নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি, ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং শেষ মুহূর্তের কাজ সামলাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন শিল্পীরা।
উৎসবের আনন্দে যখন শহর মেতে উঠতে শুরু করেছে, তখন কুমোরটুলির শিল্পীদের কাছে এই সময়টা অত্যন্ত পরিশ্রমের। একদিকে প্রতিমার কাজ শেষ করার তাড়া, অন্যদিকে ভিড়ের মধ্যে ক্রেতাদের পরিষেবা দেওয়া এবং প্রতিমা নিরাপদে গাড়িতে তোলার ব্যবস্থা—সব মিলিয়ে সামলাতে হচ্ছে একাধিক দায়িত্ব। ফলে মহালয়ার দিন কুমোরটুলির চেনা পরিবেশে যেমন উৎসবের উচ্ছ্বাস দেখা গিয়েছে, তেমনই ছিল চাপ ও ক্লান্তির ছবিও।
কলকাতার উত্তরাংশে অবস্থিত কুমোরটুলি দীর্ঘদিন ধরেই দুর্গাপ্রতিমা তৈরির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। এখানকার মৃৎশিল্পীরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে দেবদেবীর প্রতিমা নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত। দুর্গাপুজোর কয়েক মাস আগে থেকেই শুরু হয় প্রতিমা তৈরির কাজ। কাঠামো নির্মাণ, খড় বাঁধা, মাটির প্রলেপ, শুকনো করা, রং করা এবং অলংকরণ—প্রতিটি ধাপ পেরিয়ে তৈরি হয় দেবী দুর্গার প্রতিমা।
মহালয়ার সময় সেই দীর্ঘ প্রস্তুতি প্রায় শেষ পর্যায়ে পৌঁছয়। অনেক পুজো কমিটি এই সময় প্রতিমা নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করে। কেউ মহালয়ার দিনই প্রতিমা সংগ্রহ করতে চান, কেউ আবার পঞ্চমী বা ষষ্ঠীর আগে নির্দিষ্ট সময়ে প্রতিমা নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করেন। ফলে মহালয়াকে কেন্দ্র করে কুমোরটুলিতে মানুষের আনাগোনা বেড়ে যায়।
শনিবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। সকাল থেকে বিভিন্ন প্রতিমাশিল্পীর কর্মশালায় দেখা যায় ব্যস্ততা। কোথাও প্রতিমার শেষ সাজসজ্জা চলছে, কোথাও প্রতিমা গাড়িতে তোলার প্রস্তুতি, আবার কোথাও ক্রেতারা নিজেদের বুক করা প্রতিমা দেখতে এসেছেন। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভিড় আরও ঘন হয়ে ওঠে বলে জানা গিয়েছে।
কুমোরটুলির সরু রাস্তা ও কর্মশালার সামনে একসঙ্গে বহু মানুষের উপস্থিতি কাজের পরিবেশকে আরও জটিল করে তোলে। প্রতিমা পরিবহণের জন্য বড় গাড়ি বা অন্য যানবাহন ঢোকানো, শ্রমিকদের চলাচল এবং প্রতিমা সরানোর জায়গা তৈরি করা—সব ক্ষেত্রেই প্রয়োজন হয় বাড়তি সতর্কতা। কারণ প্রতিমার সামান্য ক্ষতিও শিল্পীদের কাছে বড় উদ্বেগের বিষয়।
মহালয়ার দিন কুমোরটুলি থেকে কিছু দুর্গাপ্রতিমা বিভিন্ন পুজোমণ্ডপ ও বাড়ির উদ্দেশে রওনা দেয়। দুর্গাপুজোর প্রস্তুতিতে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়। প্রতিমা তৈরি হয়ে গেলেই শিল্পীদের কাজ পুরোপুরি শেষ হয়ে যায় না। প্রতিমা ঠিকভাবে পৌঁছে দেওয়া এবং পরিবহণের সময় কোনও ক্ষতি না হওয়ার বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
একটি দুর্গাপ্রতিমা তৈরি করতে বহু দিনের পরিশ্রম লাগে। প্রতিমার মুখের গড়ন, চোখ আঁকা, হাতের আঙুলের সূক্ষ্ম কাজ, পোশাকের নকশা এবং অলংকারের বিন্যাস—প্রতিটি বিষয়ে শিল্পীদের বিশেষ যত্ন নিতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে প্রতিমার উচ্চতা ও গঠন অনুযায়ী পরিবহণের আলাদা ব্যবস্থা করতে হয়।
প্রতিমা গাড়িতে তোলার সময় শিল্পী ও সহকারীরা সাধারণত বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করেন। প্রতিমার বিভিন্ন অংশ যাতে ধাক্কা না খায়, তার জন্য উপযুক্তভাবে ধরে তোলা এবং প্রয়োজনীয় সুরক্ষার ব্যবস্থা করা জরুরি। বিশেষ করে বড় প্রতিমা সরানোর ক্ষেত্রে একাধিক মানুষের সমন্বয় প্রয়োজন হয়।
মহালয়ার দিন একসঙ্গে বহু প্রতিমা নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি থাকলে সেই কাজের চাপ আরও বাড়ে। ক্রেতাদের নির্দিষ্ট সময়ে প্রতিমা পৌঁছে দেওয়ার প্রত্যাশা থাকে। অন্যদিকে, শিল্পীদের নিজেদের কর্মশালায় আরও কাজ বাকি থাকতে পারে। তাই প্রতিমা হস্তান্তর এবং নতুন কাজ শেষ করার মধ্যে ভারসাম্য রাখা সহজ নয়।
কুমোরটুলিতে মহালয়ার দিন সকাল থেকে শুরু হওয়া ব্যস্ততা বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আরও তীব্র হয়ে ওঠে। প্রতিমা সংগ্রহ করতে আসা মানুষজনের পাশাপাশি কর্মশালার সামনে জমে থাকা ভিড় শিল্পীদের কাজের জায়গা সংকুচিত করে দিতে পারে। প্রতিমা দেখা, শেষ মুহূর্তের পরিবর্তন নিয়ে আলোচনা এবং পরিবহণের ব্যবস্থা করতে গিয়ে একসঙ্গে অনেক মানুষের উপস্থিতি তৈরি হয়।
পুজোর আগে প্রতিমা নিয়ে যাওয়ার সময়সীমা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নির্দিষ্ট দিনে মণ্ডপে প্রতিমা পৌঁছতে না পারলে পরবর্তী সাজসজ্জা ও পুজোর প্রস্তুতিতে সমস্যা তৈরি হতে পারে। তাই পুজো উদ্যোক্তারা সময় মেনে প্রতিমা সংগ্রহ করতে চান। একইভাবে শিল্পীরাও প্রতিশ্রুত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করে প্রতিমা হস্তান্তর করতে আগ্রহী।
কিন্তু যখন একসঙ্গে বহু ক্রেতা হাজির হন, তখন প্রতিটি প্রতিমার কাজ পরীক্ষা করা, প্রয়োজনীয় বিষয় নিয়ে কথা বলা এবং পরিবহণের ব্যবস্থা করতে অতিরিক্ত সময় লাগে। ফলে অপেক্ষা বাড়তে পারে। সেই পরিস্থিতিতে ভিড় নিয়ন্ত্রণ এবং কর্মশালার সামনে চলাচলের জায়গা খোলা রাখা বিশেষ জরুরি হয়ে ওঠে।
কুমোরটুলির মতো ঐতিহ্যবাহী শিল্পাঞ্চলে এই সময় শিল্পীদের কাজের পরিবেশ বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ প্রতিমা তৈরির কাজ শুধু ব্যবসা নয়, এটি সূক্ষ্ম শিল্পকর্ম। মনোযোগে সামান্য ব্যাঘাত ঘটলেও শেষ মুহূর্তের কাজে সমস্যা হতে পারে।
দুর্গাপুজোর সময় দর্শনার্থীরা মণ্ডপে গিয়ে সুন্দর প্রতিমা দেখেন। দেবীর সাজ, মুখের অভিব্যক্তি এবং শিল্পীর হাতের কাজ দেখে মুগ্ধ হন। কিন্তু সেই প্রতিমা তৈরি করতে শিল্পীদের কতটা সময়, শ্রম এবং দক্ষতা প্রয়োজন হয়, তা অনেক সময় চোখের আড়ালেই থেকে যায়।
একটি প্রতিমা তৈরির প্রক্রিয়া শুরু হয় কাঠামো তৈরির মাধ্যমে। এরপর খড়ের সাহায্যে শরীরের প্রাথমিক গঠন তৈরি করা হয়। তার উপর ধাপে ধাপে মাটি লাগিয়ে প্রতিমার আকার দেওয়া হয়। মাটি শুকিয়ে গেলে প্রয়োজন অনুযায়ী আবারও প্রলেপ দেওয়া হয়, যাতে গঠন মজবুত হয় এবং সূক্ষ্ম অংশগুলি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
এরপর আসে রং ও সাজসজ্জার কাজ। দেবীর মুখের রং, চোখের রেখা, ঠোঁটের গড়ন এবং হাত-পায়ের সূক্ষ্ম অংশে বিশেষ মনোযোগ দিতে হয়। প্রতিমার সঙ্গে থাকা অন্যান্য দেবদেবী, অসুর ও বাহনের কাজও সম্পূর্ণ করতে হয়। প্রতিটি ধাপে দক্ষতা ও ধৈর্য প্রয়োজন।
মহালয়ার সময় এসে শিল্পীদের হাতে সময় কম থাকে। কারণ প্রতিমা সংগ্রহ করতে আসা পুজো উদ্যোক্তাদের পাশাপাশি অন্য প্রতিমার কাজও শেষ করতে হয়। তাই এই সময়ের চাপ শুধু মানুষের ভিড়ের কারণে নয়; বরং দীর্ঘদিনের কাজ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সম্পূর্ণ করার দায় থেকেও তৈরি হয়।
কুমোরটুলি শুধু কলকাতার একটি পরিচিত এলাকা নয়, এটি বাংলার প্রতিমাশিল্পের এক গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্যবাহী কেন্দ্র। বহু প্রজন্ম ধরে এখানে মৃৎশিল্পীরা দেবদেবীর প্রতিমা তৈরি করে আসছেন। দুর্গাপুজো ছাড়াও বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও উৎসবের জন্য প্রতিমা নির্মাণ করা হয় এই শিল্পাঞ্চলে।
কুমোরটুলির শিল্পীদের কাজের মধ্যে রয়েছে ঐতিহ্য এবং নতুনত্বের মিশেল। একদিকে রয়েছে প্রাচীন প্রতিমা নির্মাণের কৌশল, অন্যদিকে সময়ের সঙ্গে বদলে যাওয়া নকশা, রং ও অলংকরণের ধরন। বিভিন্ন পুজো কমিটির চাহিদা অনুযায়ী প্রতিমার রূপে বৈচিত্র্য দেখা যায়।
কোনও পুজো কমিটি ঐতিহ্যবাহী একচালার প্রতিমা পছন্দ করে, কোথাও আবার আধুনিক শিল্পভাবনার প্রভাব দেখা যায়। প্রতিমার মুখের গড়ন, দেবীর অবস্থান, চালচিত্র এবং অলংকারে নানা রকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়। তবুও প্রতিটি প্রতিমার কেন্দ্রে থাকে শিল্পীর দক্ষতা ও দীর্ঘ অভিজ্ঞতা।
এই শিল্পাঞ্চলের গুরুত্ব শুধু দুর্গাপুজোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। কুমোরটুলির কাজের সঙ্গে যুক্ত বহু পরিবারের জীবিকা নির্ভর করে প্রতিমা নির্মাণের উপর। শিল্পী, সহকারী, সাজশিল্পী, রংমিস্ত্রি এবং পরিবহণের সঙ্গে যুক্ত মানুষেরাও এই কাজের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত।
দুর্গাপুজোর আগে কাজের চাপ বাড়লে তাই তার প্রভাব পড়ে গোটা কর্মপরিবেশে। প্রতিমা তৈরির কাজ যত এগোয়, ততই সময়ের গুরুত্ব বাড়ে। মহালয়ার দিন সেই চাপের সঙ্গে যুক্ত হয় ক্রেতা ও দর্শনার্থীদের ভিড়।
মহালয়া বাঙালির কাছে দেবীপক্ষের সূচনার প্রতীক। এই দিন থেকেই অনেকের মনে দুর্গাপুজোর আবহ আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পুজো উদ্যোক্তাদের কাছেও মহালয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়, কারণ তার পরেই পুজোর প্রস্তুতি আরও দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যেতে হয়।
মণ্ডপ তৈরির কাজ, আলোকসজ্জা, মণ্ডপের ভিতরের সাজ, প্রতিমা স্থাপন এবং পুজোর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা—সবকিছু নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সম্পূর্ণ করতে হয়। প্রতিমা পৌঁছনোর পর সেটি সঠিকভাবে স্থাপন করার প্রস্তুতিও থাকে।
কিছু পুজো কমিটি মহালয়ার দিনই প্রতিমা নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এতে মণ্ডপে প্রতিমা স্থাপন ও পরবর্তী কাজের জন্য বাড়তি সময় পাওয়া যেতে পারে। তবে এই সিদ্ধান্ত নির্ভর করে প্রতিমার আকার, মণ্ডপের প্রস্তুতি, পরিবহণের ব্যবস্থা এবং পুজো কমিটির পরিকল্পনার উপর।
কুমোরটুলি থেকে প্রতিমা নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে শিল্পী ও উদ্যোক্তাদের মধ্যে সমন্বয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিমা তৈরির কাজ কখন শেষ হবে, কখন গাড়ি আসবে এবং কীভাবে প্রতিমা তোলা হবে—এসব বিষয়ে আগে থেকে আলোচনা থাকলে ভিড়ের মধ্যেও কাজ কিছুটা সহজ হতে পারে।
দুর্গাপ্রতিমা পরিবহণ সাধারণ পণ্য পরিবহণের মতো নয়। প্রতিমার গঠন, উচ্চতা, ওজন এবং বিভিন্ন অংশের সূক্ষ্ম কাজের কারণে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন। বড় প্রতিমার ক্ষেত্রে গাড়িতে তোলা থেকে শুরু করে নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে নামানো পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে দক্ষ শ্রমিকদের ভূমিকা থাকে।
কুমোরটুলির সরু রাস্তা ও কর্মশালার ঘন অবস্থানের কারণে ব্যস্ত সময়ে পরিবহণের পরিকল্পনা করা কঠিন হতে পারে। একসঙ্গে একাধিক গাড়ি ঢুকলে চলাচলে সমস্যা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তার উপর দর্শনার্থী ও ক্রেতাদের ভিড় থাকলে প্রতিমা সরানোর জন্য প্রয়োজনীয় জায়গা পাওয়া কঠিন হতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে প্রতিমা বহনের আগে গাড়ির অবস্থান ঠিক করা, কর্মশালার সামনে জায়গা খালি রাখা এবং প্রয়োজনীয় শ্রমিকদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা জরুরি। প্রতিমার কোনও অংশ যাতে ধাক্কা না খায়, সে বিষয়েও সতর্ক থাকতে হয়।
পুজোর আগে সময়ের চাপ থাকলেও নিরাপত্তার সঙ্গে আপস করা যায় না। কারণ একটি প্রতিমার পিছনে শিল্পীর দীর্ঘ পরিশ্রম জড়িয়ে থাকে। প্রতিমা ক্ষতিগ্রস্ত হলে আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি শিল্পীর মানসিক কষ্টও তৈরি হতে পারে।
মহালয়ার দিন প্রতিমা নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি চললেও অনেক কর্মশালায় শেষ মুহূর্তের কাজ বাকি থাকতে পারে। কোথাও রংয়ের শেষ প্রলেপ দেওয়া হচ্ছে, কোথাও অলংকার বসানো হচ্ছে, আবার কোথাও প্রতিমার কোনও অংশ পরীক্ষা করে প্রয়োজনীয় সংশোধন করা হচ্ছে।
এই ধরনের কাজের জন্য নিরিবিলি পরিবেশ ও মনোযোগ প্রয়োজন। প্রতিমার মুখে রং করা বা চোখ আঁকার মতো কাজ অত্যন্ত সূক্ষ্ম। সামান্য ভুল সংশোধন করতেও সময় লাগতে পারে। তাই কাজের জায়গায় অপ্রয়োজনীয় ভিড় থাকলে শিল্পীদের অসুবিধা হওয়া স্বাভাবিক।
একই সঙ্গে ক্রেতাদেরও নিজেদের প্রতিমা দেখার এবং কাজের অগ্রগতি সম্পর্কে জানার আগ্রহ থাকে। তাঁদের সঙ্গে কথা বলা, পছন্দ অনুযায়ী শেষ মুহূর্তের বিষয়গুলি মেলানো এবং প্রতিমা হস্তান্তরের ব্যবস্থা করা শিল্পীদের দায়িত্বের অংশ।
এই দুই ধরনের কাজ একসঙ্গে সামলাতে গিয়ে মহালয়ার দিন ব্যস্ততা চরমে পৌঁছতে পারে। ফলে কর্মশালার ভিতরে কাজের জায়গা বজায় রাখা এবং বাইরে মানুষের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা বিশেষ প্রয়োজন।
কুমোরটুলির প্রতিমাশিল্প কেবল সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য নয়, বহু পরিবারের জীবিকার গুরুত্বপূর্ণ উৎস। প্রতিমা তৈরির কাজের সঙ্গে যুক্ত শিল্পীদের বছরের একটি বড় অংশ কাটে প্রস্তুতি ও নির্মাণে। দুর্গাপুজোর আগে তাঁদের কাজের চাপ সবচেয়ে বেশি অনুভূত হয়।
প্রতিমা তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় মাটি, খড়, কাঠামো, রং এবং অন্যান্য উপকরণ সংগ্রহ করতে হয়। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে শ্রমিকের খরচ, কর্মশালার ব্যয় এবং পরিবহণের ব্যবস্থা। প্রতিমার ধরন ও আকার অনুযায়ী খরচের পরিমাণও বদলে যায়।
একটি প্রতিমা তৈরির সময় শিল্পীরা শুধু হাতের কাজ করেন না; তাঁরা ক্রেতার পছন্দ, প্রতিমার নকশা এবং নির্ধারিত সময়ের বিষয়টিও মাথায় রাখেন। ফলে এই কাজের জন্য শিল্পদক্ষতার পাশাপাশি পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনাও প্রয়োজন।
মহালয়ার দিনে যখন বিভিন্ন প্রতিমা কর্মশালা থেকে বেরিয়ে যায়, তখন শিল্পীদের দীর্ঘদিনের পরিশ্রমের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় সম্পূর্ণ হয়। প্রতিমা মণ্ডপে পৌঁছনোর পর পুজো উদ্যোক্তাদের প্রস্তুতি আরও এগিয়ে যায়। তবে যেসব প্রতিমার কাজ এখনও বাকি, সেগুলি সম্পূর্ণ করার জন্য শিল্পীদের কাজ চলতে থাকে।
কুমোরটুলি দুর্গাপুজোর আগে অনেকের কাছে আকর্ষণীয় জায়গা। প্রতিমা তৈরির কাজ কাছ থেকে দেখা, শিল্পীদের দক্ষতা প্রত্যক্ষ করা এবং পুজোর প্রস্তুতির পরিবেশ অনুভব করতে বহু মানুষ এখানে আসেন। তবে কর্মশালাগুলি একই সঙ্গে শিল্পীদের কাজের জায়গা। তাই দর্শনার্থীদের দায়িত্বশীল আচরণ করা প্রয়োজন।
ভিড়ের মধ্যে কর্মশালার প্রবেশপথ আটকে না রাখা, প্রতিমা সরানোর সময় নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখা এবং শিল্পীদের কাজে অযথা বাধা না দেওয়া জরুরি। ছবি তোলার সময়ও প্রতিমার ক্ষতি হতে পারে, এমন কোনও আচরণ এড়িয়ে চলা উচিত।
বিশেষ করে বড় প্রতিমা পরিবহণের সময় রাস্তা ও কর্মশালার সামনে পর্যাপ্ত জায়গা থাকা প্রয়োজন। দর্শনার্থীরা সহযোগিতা করলে শিল্পী ও শ্রমিকদের কাজ সহজ হয় এবং প্রতিমা নিরাপদে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়।
উৎসবের আনন্দ সবার। তাই পুজোর প্রস্তুতি দেখতে গিয়ে সেই প্রস্তুতির সঙ্গে যুক্ত মানুষের পরিশ্রম ও প্রয়োজনীয়তাকেও সম্মান করা দরকার।
মহালয়ার পর দুর্গাপুজোর দিন যত এগিয়ে আসে, শহরের বিভিন্ন এলাকায় প্রস্তুতি আরও দ্রুত এগোতে থাকে। মণ্ডপে মণ্ডপে সাজসজ্জা, আলোর কাজ, প্রতিমা স্থাপন এবং নিরাপত্তার ব্যবস্থা নিয়ে ব্যস্ততা বাড়ে। পুজো কমিটির সদস্যদের পাশাপাশি বহু কর্মী এই প্রস্তুতির সঙ্গে যুক্ত থাকেন।
কুমোরটুলি থেকে প্রতিমা পৌঁছনো সেই প্রস্তুতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। প্রতিমা মণ্ডপে পৌঁছলে তার স্থাপন, সাজসজ্জা এবং পুজোর বাকি আয়োজন সম্পূর্ণ করার কাজ শুরু হয়। ফলে মহালয়ার দিন প্রতিমা সংগ্রহের ব্যস্ততা শুধু শিল্পীদের কর্মশালার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায় পুজোর সামগ্রিক প্রস্তুতিও।
এই সময় শহরের রাস্তায় প্রতিমা বহনকারী গাড়ি দেখা যায়। কোথাও প্রতিমা কাপড়ে ঢেকে নিয়ে যাওয়া হয়, কোথাও শ্রমিকেরা সাবধানে ধরে প্রতিমা গাড়িতে তোলেন। প্রতিটি দৃশ্যই জানান দেয়, দুর্গাপুজো আর বেশি দূরে নেই।
মহালয়ার দিন কলকাতার কুমোরটুলিতে উপচে পড়া ভিড় আবারও সামনে নিয়ে এল দুর্গাপুজোর প্রস্তুতির চেনা ছবি। শনিবার সকাল থেকে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের আনাগোনা বাড়ে। কিছু দুর্গাপ্রতিমা রওনা দেয় বিভিন্ন মণ্ডপ ও বাড়ির উদ্দেশে। অন্যদিকে, প্রতিমা হস্তান্তর, পরিবহণ এবং শেষ মুহূর্তের কাজ সামলাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন মৃৎশিল্পীরা।
বাঙালির কাছে মহালয়া দেবীপক্ষের সূচনার আবেগময় দিন। কিন্তু কুমোরটুলির শিল্পীদের কাছে এই সময় দীর্ঘ পরিশ্রমের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়। প্রতিমা তৈরির প্রতিটি ধাপে তাঁদের দক্ষতা, ধৈর্য ও যত্নের প্রয়োজন হয়। তাই উৎসবের আনন্দের পাশাপাশি তাঁদের কাজের পরিবেশ বজায় রাখা এবং ভিড়ের মধ্যে সহযোগিতা করাও গুরুত্বপূর্ণ।
দুর্গাপুজোর প্রতিটি সুন্দর প্রতিমার পিছনে রয়েছে বহু মানুষের পরিশ্রম। কুমোরটুলির শিল্পীদের হাত ধরেই সেই প্রতিমা পৌঁছে যায় শহর ও শহরতলির বিভিন্ন মণ্ডপে। মহালয়ার দিনে প্রতিমা নিয়ে যাওয়ার ব্যস্ততা তাই শুধু উৎসবের আগমনী বার্তা নয়, বাংলার মৃৎশিল্পের দীর্ঘ ঐতিহ্য ও শিল্পীদের নিরলস পরিশ্রমেরও পরিচয় বহন করে।