মহালয়ার ভোর মানেই বাঙালির মনে দেবীপক্ষের আবাহন, শিউলির গন্ধ আর বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের অমর কণ্ঠে মহিষাসুরমর্দিনী। সময় বদলেছে, বদলেছে প্রজন্মের অভ্যাস, কিন্তু মহালয়ার আবেগ আজও অমলিন। ‘যা দেবী সর্বভূতেষু’ এবং চণ্ডীপাঠের পরিচিত সুর শুনতে মুখিয়ে থাকে জেন জি-র একাংশও। আধুনিক প্রযুক্তির যুগে দাঁড়িয়েও কীভাবে বাঙালির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত থাকছে নতুন প্রজন্ম, মহালয়ার সকাল যেন সেই চিরন্তন বন্ধনেরই স্মারক।
মহালয়া মানেই বাঙালির মনে এক অন্যরকম আবেগ। ভোরের আকাশে আলো ফোটার আগেই ঘুম ভাঙে বহু মানুষের। কোথাও রেডিওতে ভেসে আসে চণ্ডীপাঠ, কোথাও টেলিভিশন কিংবা মোবাইলের পর্দায় শুরু হয় মহালয়ার বিশেষ অনুষ্ঠান। আর সেই আবহের কেন্দ্রে থাকেন একজনই—বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র। তাঁর গম্ভীর, মায়াময় কণ্ঠে ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ শুনতে শুনতেই বাঙালির বহু প্রজন্মের কাছে দুর্গাপুজোর সূচনা হয়েছে। সময়ের সঙ্গে বদলেছে জীবনযাত্রা, বদলেছে বিনোদনের মাধ্যম, কিন্তু এই কণ্ঠের আকর্ষণ আজও অমলিন।
এবারও মহালয়ার সকাল ঘিরে নতুন প্রজন্মের মধ্যে সেই চেনা আবেগের কথা উঠে আসছে। জেন জি-র অনেকেই মুখিয়ে থাকে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠে ‘যা দেবী সর্বভূতেষু’ শোনার জন্য। যে প্রজন্মের দৈনন্দিন জীবন স্মার্টফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ডিজিটাল বিনোদন এবং দ্রুত বদলে যাওয়া প্রযুক্তির সঙ্গে জড়িয়ে, তাদের কাছেও মহালয়ার এই ঐতিহ্য বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। প্রজন্মের ব্যবধান থাকলেও কিছু কিছু অনুভূতি যে একই সুতোয় সবাইকে বেঁধে রাখতে পারে, মহালয়ার ভোর যেন তারই প্রমাণ।
বাঙালির উৎসবের ক্যালেন্ডারে মহালয়ার গুরুত্ব আলাদা। এই দিনটির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে পিতৃপক্ষের অবসান এবং দেবীপক্ষের সূচনার বিশ্বাস। দুর্গাপুজোর আনন্দের দিকে এগিয়ে যাওয়ার পথে মহালয়া যেন এক আবেগময় দরজা খুলে দেয়। পুজোর কেনাকাটা, নতুন পোশাক, মণ্ডপসজ্জা কিংবা আলোর রোশনাই শুরু হওয়ার আগেই মহালয়ার ভোর বাঙালিকে মানসিকভাবে উৎসবের জগতে পৌঁছে দেয়।
ভোরের নিস্তব্ধতা, জানলার বাইরে হালকা আলো, শিউলি ফুলের গন্ধ এবং দূর থেকে ভেসে আসা চণ্ডীপাঠ—এই সবকিছু মিলিয়ে মহালয়ার সকাল তৈরি করে এক অনন্য পরিবেশ। বহু পরিবারে আজও এই দিনটি শুরু হয় খুব ভোরে উঠে ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ শোনার মধ্য দিয়ে। কোথাও বাবা-মায়ের সঙ্গে বসে অনুষ্ঠান শোনে সন্তানরা, কোথাও আবার পরিবারের প্রবীণ সদস্যদের কাছ থেকে নতুন প্রজন্ম জানতে পারে মহালয়ার পুরনো দিনের গল্প।
এই আবেগের মধ্যে যেমন ধর্মীয় অনুভূতি রয়েছে, তেমনই রয়েছে বাঙালির সাংস্কৃতিক স্মৃতি। অনেকের কাছে মহালয়া কেবল একটি বিশেষ দিন নয়; এটি শৈশব, পরিবার, পুরনো বাড়ি, রেডিওর শব্দ এবং পুজোর আগমনী বার্তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক টুকরো নস্টালজিয়া।
বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের নাম উচ্চারণ করলেই বহু বাঙালির মনে ভেসে ওঠে ‘মহিষাসুরমর্দিনী’র পরিচিত সুর। তাঁর কণ্ঠের গাম্ভীর্য, উচ্চারণের স্বচ্ছতা এবং আবৃত্তির নাটকীয়তা এই অনুষ্ঠানকে এমন এক স্বতন্ত্র পরিচিতি দিয়েছে, যা সময়ের সঙ্গে আরও দৃঢ় হয়েছে।
‘মহিষাসুরমর্দিনী’ একটি বেতারভিত্তিক প্রভাতী অনুষ্ঠান, যেখানে চণ্ডীপাঠ, স্তোত্র, সংগীত এবং বর্ণনার মধ্য দিয়ে দেবী দুর্গার আবাহন তুলে ধরা হয়। এই অনুষ্ঠানের সঙ্গে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠ এমনভাবে জড়িয়ে গিয়েছে যে বহু শ্রোতার কাছে তাঁর কণ্ঠ ছাড়া মহালয়ার সকাল যেন অসম্পূর্ণ।
বিশেষ করে ‘যা দেবী সর্বভূতেষু’ স্তোত্রের পরিচিত আবহ শ্রোতাদের মনে গভীর ছাপ ফেলে। স্তোত্রের শব্দ, সুরের ওঠানামা এবং বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠের গাম্ভীর্য মিলিয়ে তৈরি হয় এক অনন্য শ্রবণ-অভিজ্ঞতা। এই অভিজ্ঞতার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বহু দশকের স্মৃতি।
অনেকেই ছোটবেলায় পরিবারের বড়দের সঙ্গে অনুষ্ঠান শুনেছেন। পরে নিজের সংসার, কর্মজীবন কিংবা ব্যস্ততার মধ্যেও সেই অভ্যাস ধরে রেখেছেন। এখন তাঁদের সন্তান বা নাতি-নাতনিরাও একই অনুষ্ঠান শুনতে আগ্রহী হচ্ছে। এভাবেই একটি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়েছে।
জেনারেশন জেড বা জেন জি-র জীবনযাত্রা আগের প্রজন্মের তুলনায় অনেকটাই আলাদা। ইন্টারনেট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন ভিডিও, স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম এবং ডিজিটাল বিনোদনের বিস্তারের ফলে তাদের সামনে রয়েছে অসংখ্য বিকল্প। মুহূর্তের মধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের গান, অনুষ্ঠান কিংবা খবর দেখা ও শোনা সম্ভব।
কিন্তু প্রযুক্তির এই পরিবর্তন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতি আগ্রহকে পুরোপুরি মুছে দেয়নি। বরং অনেক ক্ষেত্রে নতুন প্রজন্ম পুরনো ঐতিহ্যকে নতুনভাবে আবিষ্কার করছে। পরিবারের সঙ্গে মহালয়া শোনা, ছোটবেলার স্মৃতি ভাগ করে নেওয়া কিংবা সামাজিক মাধ্যমে মহালয়ার শুভেচ্ছা প্রকাশ করার মধ্য দিয়ে তারা এই সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত থাকছে।
বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠের প্রতি আকর্ষণও সেই বৃহত্তর সাংস্কৃতিক সংযোগের অংশ হিসেবে দেখা যেতে পারে। তরুণদের কাছে এই অনুষ্ঠান কখনও পারিবারিক ঐতিহ্য, কখনও বাঙালিয়ানার পরিচয়, আবার কখনও শৈশবের স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত থাকার একটি মাধ্যম।
অবশ্য সব তরুণের অভ্যাস বা পছন্দ এক নয়। কেউ নিয়ম করে ভোরে উঠে অনুষ্ঠান শোনে, কেউ পরে দিনের অন্য সময়ে রেকর্ডিং শোনে, আবার কেউ সামাজিক মাধ্যমের মাধ্যমে মহালয়ার পরিচিত অংশগুলি উপভোগ করে। কিন্তু মাধ্যম আলাদা হলেও ঐতিহ্যের সঙ্গে সংযোগের আকাঙ্ক্ষা অনেকের কাছেই গুরুত্বপূর্ণ।
মহালয়ার সঙ্গে যে কয়েকটি স্তোত্র ও উচ্চারণ বাঙালির মনে গভীরভাবে জায়গা করে নিয়েছে, তার মধ্যে ‘যা দেবী সর্বভূতেষু’ বিশেষভাবে পরিচিত। দেবীকে বিভিন্ন রূপে স্মরণ করার এই স্তোত্রে শক্তি, জ্ঞান, শান্তি এবং মঙ্গলময়তার ভাব প্রকাশ পায়।
মহালয়ার প্রভাতী অনুষ্ঠানে এই স্তোত্রের পরিচিত আবহ বহু শ্রোতার মনে ভক্তি ও আবেগের অনুভূতি জাগিয়ে তোলে। কারও কাছে এটি দেবীর বন্দনা, কারও কাছে দুর্গাপুজোর আগমনী সংকেত, আবার কারও কাছে এটি ছোটবেলার স্মৃতিতে ফিরে যাওয়ার এক বিশেষ মুহূর্ত।
জেন জি-র মধ্যেও এই পরিচিত সুর নিয়ে আগ্রহের কথা উঠে আসছে। আধুনিক সময়ের তরুণদের কাছে পুরনো দিনের রেকর্ডিং কিংবা বেতার অনুষ্ঠান অনেক সময় নতুন অভিজ্ঞতা হয়ে ওঠে। তাঁরা পরিবারের প্রবীণ সদস্যদের কাছ থেকে জানতে পারেন, একসময় কীভাবে রেডিওর সামনে বসে গোটা পরিবার মহালয়ার অনুষ্ঠান শুনত।
এইভাবে একটি স্তোত্রের পরিচিতি শুধু ধর্মীয় আবহের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা হয়ে ওঠে সাংস্কৃতিক স্মৃতি এবং পারিবারিক বন্ধনের অংশ।
একসময় মহালয়ার ভোরে রেডিও চালানো ছিল বহু বাঙালি পরিবারের পরিচিত অভ্যাস। নির্দিষ্ট সময়ে অনুষ্ঠান শোনার জন্য আগেভাগে উঠে পড়তেন অনেকে। রেডিওর শব্দ ঠিকমতো শোনা যাচ্ছে কি না, পরিবারের সবাই এক জায়গায় বসতে পেরেছেন কি না—এই ছোট ছোট বিষয়ও স্মৃতির অংশ হয়ে রয়েছে।
সময়ের সঙ্গে প্রযুক্তির উন্নতি হয়েছে। রেডিওর পাশাপাশি টেলিভিশন, ক্যাসেট, সিডি, ডিজিটাল রেকর্ডিং এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে অনুষ্ঠান শোনার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এখন অনেকেই মোবাইল ফোনে পুরনো রেকর্ডিং চালিয়ে নিতে পারেন। কেউ বাড়িতে, কেউ যাত্রাপথে, কেউ আবার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বসে সেই অনুষ্ঠান উপভোগ করেন।
এই পরিবর্তনের ফলে অনুষ্ঠান শোনার পদ্ধতি আরও সহজ হয়েছে। নির্দিষ্ট সময়ে রেডিওর সামনে বসে থাকতে না পারলেও পরে অনুষ্ঠান শোনার সুযোগ রয়েছে। ফলে নতুন প্রজন্মের কাছে পুরনো সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য পৌঁছে দেওয়ার পথও বিস্তৃত হয়েছে।
তবে মাধ্যম বদলালেও বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠের সঙ্গে যুক্ত আবেগ অনেকের কাছে একই রকম রয়ে গিয়েছে। এই ধারাবাহিকতাই প্রমাণ করে, প্রযুক্তির পরিবর্তন সবসময় পুরনো ঐতিহ্যকে সরিয়ে দেয় না; অনেক সময় তাকে নতুন শ্রোতার কাছেও পৌঁছে দেয়।
মহালয়ার ভোর অনেক পরিবারের কাছে শুধু একটি অনুষ্ঠান শোনার সময় নয়, বরং একসঙ্গে থাকার মুহূর্ত। ঘুমজড়ানো চোখে উঠে পড়া, চা তৈরি হওয়া, বাড়ির বড়দের সঙ্গে বসে চণ্ডীপাঠ শোনা কিংবা অনুষ্ঠানের পরিচিত অংশের সঙ্গে গলা মেলানো—এই ছোট ছোট অভিজ্ঞতা বহু মানুষের স্মৃতিতে থেকে যায়।
শৈশবে যে অভ্যাসটি বাবা-মা বা দাদু-দিদার হাত ধরে তৈরি হয়েছিল, বড় হওয়ার পর সেটিই ব্যক্তিগত অনুভূতির অংশ হয়ে উঠতে পারে। কেউ পড়াশোনা বা কাজের কারণে অন্য শহরে চলে গেলেও মহালয়ার দিন বাড়িতে ফোন করেন। কেউ আবার দূরে থেকেও অনলাইনে অনুষ্ঠান শুনে পরিবারের স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত থাকার চেষ্টা করেন।
জেন জি-র ক্ষেত্রেও পারিবারিক ঐতিহ্যের এই ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। পরিবারের প্রবীণ সদস্যদের কাছে মহালয়ার গল্প শোনা নতুন প্রজন্মকে শুধু একটি অনুষ্ঠান সম্পর্কে জানায় না, বরং তাদের সাংস্কৃতিক শিকড়ের সঙ্গেও পরিচয় করায়।
প্রজন্মের মধ্যে প্রযুক্তি, ভাষা বা জীবনযাত্রার পার্থক্য থাকলেও মহালয়ার মতো কিছু অভিজ্ঞতা সেই ব্যবধান কমিয়ে দিতে পারে। একই কণ্ঠ শুনে পরিবারের একাধিক প্রজন্মের আবেগতাড়িত হওয়া সেই সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতারই প্রতীক।
দুর্গাপুজো বাঙালির অন্যতম বড় সাংস্কৃতিক উৎসব। শহর থেকে গ্রাম, ছোট পাড়া থেকে বড় সর্বজনীন পুজো—সব জায়গাতেই এই উৎসব ঘিরে তৈরি হয় বিশেষ প্রস্তুতি। মণ্ডপ নির্মাণ, প্রতিমা গড়া, আলোর কাজ, নতুন পোশাক কেনা এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে পরিকল্পনা—সব মিলিয়ে পুজোর আগে তৈরি হয় এক উৎসবমুখর পরিবেশ।
কিন্তু এই প্রস্তুতির মাঝেও মহালয়ার গুরুত্ব আলাদা। মহালয়ার ভোর অনেকের কাছে দুর্গাপুজোর আনুষ্ঠানিক আবহের সূচনা। এই দিনটির পর থেকেই পুজোর দিন গোনা যেন আরও বাস্তব হয়ে ওঠে।
বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠে চণ্ডীপাঠ শোনার সময় বহু মানুষের মনে ভেসে ওঠে দেবীর প্রতিমা, ঢাকের শব্দ, ধুনুচি নাচ, অঞ্জলি এবং পুজোর দিনগুলির নানা স্মৃতি। এই আবেগের সঙ্গে যুক্ত হয় শৈশবের আনন্দ এবং বর্তমানের প্রত্যাশা।
জেন জি-র কাছেও মহালয়া সেই উৎসবের আবহের একটি অংশ। নতুন প্রজন্ম হয়তো পুজোর ছবি তুলবে, সামাজিক মাধ্যমে ভিডিও প্রকাশ করবে কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে মণ্ডপে ঘুরবে। কিন্তু তার আগেই মহালয়ার পরিচিত কণ্ঠ তাদের মনে পুজোর আগমনী অনুভূতি জাগিয়ে তুলতে পারে।
আধুনিক প্রজন্মের সঙ্গে পুরনো সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সম্পর্ক নিয়ে প্রায়ই আলোচনা হয়। অনেক সময় মনে করা হয়, ডিজিটাল যুগে বেড়ে ওঠা তরুণেরা হয়তো অতীতের সাংস্কৃতিক অভ্যাস থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতা সবসময় এত সরল নয়।
একই তরুণ একদিকে আধুনিক গান শুনতে পারে, আন্তর্জাতিক বিনোদন অনুসরণ করতে পারে, আবার অন্যদিকে মহালয়ার ভোরে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের চণ্ডীপাঠও শুনতে পারে। নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের সঙ্গে পুরনো ঐতিহ্যের প্রতি আগ্রহের কোনও অবধারিত বিরোধ নেই।
বরং ডিজিটাল মাধ্যমের কারণে ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং ছড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ বেড়েছে। পুরনো রেকর্ডিং সহজে খুঁজে পাওয়া যায়, ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করা যায়, পরিবারের সদস্যদের স্মৃতি নথিবদ্ধ করা যায় এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্তে থাকা বাঙালিরা একই সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিতে পারেন।
এই প্রেক্ষাপটে মহালয়া হয়ে উঠতে পারে অতীত ও বর্তমানের মধ্যে একটি সেতু। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠ সেই সেতুর পরিচিত প্রতীক, যা দীর্ঘ সময় ধরে বাঙালির সাংস্কৃতিক জীবনে জায়গা ধরে রেখেছে।
বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের পরিচিতি কেবল একজন বাচিকশিল্পী বা ঘোষক হিসেবে সীমাবদ্ধ নয়। ‘মহিষাসুরমর্দিনী’র সঙ্গে তাঁর কণ্ঠের সম্পর্ক তাঁকে বাঙালির সাংস্কৃতিক স্মৃতির এক গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত করেছে।
তাঁর উচ্চারণের ভঙ্গি, কণ্ঠের গাম্ভীর্য এবং চণ্ডীপাঠের নাটকীয় উপস্থাপনা এমন এক আবহ তৈরি করে, যা বহু শ্রোতার কাছে সহজেই চেনা। বহু বছর ধরে অনুষ্ঠানটি শোনা মানুষের কাছে সেই কণ্ঠ যেন মহালয়ার অবিচ্ছেদ্য পরিচয়।
এই উত্তরাধিকার টিকে থাকার অন্যতম কারণ হল প্রজন্মান্তরে অনুষ্ঠানটির প্রচলন। প্রবীণরা নতুন প্রজন্মকে অনুষ্ঠানটির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন, আবার তরুণেরা ডিজিটাল মাধ্যমে তা অন্যদের কাছে পৌঁছে দেন। ফলে সাংস্কৃতিক স্মৃতি কোনও একটি বয়সের মানুষের মধ্যে আটকে থাকে না।
জেন জি-র কাছে এই কণ্ঠের আকর্ষণ সেই ধারাবাহিকতার একটি দিক। তাঁরা হয়তো অনুষ্ঠানটির ইতিহাস ও প্রেক্ষাপট আরও জানতে চাইবেন, এর সঙ্গে জড়িত সংগীতশিল্পীদের পরিচয় খুঁজবেন কিংবা পরিবারের সদস্যদের কাছে পুরনো দিনের অভিজ্ঞতা শুনবেন। এই আগ্রহই ঐতিহ্যকে জীবন্ত রাখতে সাহায্য করতে পারে।
কিছু সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা সময়ের সঙ্গে ব্যক্তিগত স্মৃতির বাইরে গিয়ে সমষ্টিগত পরিচয়ের অংশ হয়ে ওঠে। মহালয়ার ভোর এবং ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ তেমনই এক অভিজ্ঞতা। বহু মানুষের কাছে এই অনুষ্ঠান শুনলেই মনে পড়ে যায় ছোটবেলার বাড়ি, পরিবারের মানুষ, শরতের আকাশ এবং দুর্গাপুজোর আগমনী দিনগুলি।
এই স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে অনুভূতির ধারাবাহিকতা। যে শিশু একসময় বাবা-মায়ের পাশে বসে অনুষ্ঠান শুনেছিল, সে বড় হয়ে নিজের সন্তানকে সেই অনুষ্ঠানের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে পারে। ফলে একই কণ্ঠ বিভিন্ন প্রজন্মের জীবনে আলাদা আলাদা অর্থ নিয়ে ফিরে আসে।
জেন জি-র ক্ষেত্রেও ঐতিহ্যের এই আকর্ষণ গুরুত্বপূর্ণ। কোনও অনুষ্ঠানকে ভালো লাগার জন্য শুধু তার ঐতিহাসিক গুরুত্ব জানাই যথেষ্ট নয়; ব্যক্তিগত স্মৃতি, পারিবারিক অভ্যাস এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
মহালয়ার ভোর তাই শুধু অতীতের স্মৃতি মনে করিয়ে দেয় না, ভবিষ্যতের প্রজন্মের কাছে সেই স্মৃতি পৌঁছে দেওয়ার সুযোগও তৈরি করে।
বর্তমান সময়ে উৎসব পালনের ধরন আরও বৈচিত্র্যময় হয়েছে। কেউ পুজোর আগে ভ্রমণের পরিকল্পনা করেন, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটান, কেউ ছবি ও ভিডিওর মাধ্যমে উৎসবের স্মৃতি ধরে রাখেন। আবার অনেকেই পুরনো অভ্যাস মেনে মহালয়ার ভোরে চণ্ডীপাঠ শুনে দিন শুরু করেন।
এই বিভিন্ন অভ্যাসের মধ্যে কোনও একটি অন্যটির বিরোধী নয়। বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয় একাধিক অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে। মহালয়া সেই পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যা ধর্মীয় অনুভূতি, সাহিত্য, সংগীত, বাচিকশিল্প এবং পারিবারিক স্মৃতিকে একসঙ্গে যুক্ত করে।
বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠে ‘যা দেবী সর্বভূতেষু’ শোনার আগ্রহ তাই নতুন প্রজন্মের কাছে শুধু একটি পুরনো রেকর্ডিং শোনার বিষয় নয়। এটি নিজের সাংস্কৃতিক পরিবেশকে চেনা, পরিবারের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করা এবং দুর্গাপুজোর আবহ অনুভব করারও একটি উপায় হতে পারে।
সময়ের সঙ্গে মানুষের জীবনযাত্রা বদলেছে। রেডিওর জায়গায় এসেছে স্মার্টফোন, নির্দিষ্ট সম্প্রচারের পাশাপাশি বেড়েছে অনলাইনে অনুষ্ঠান শোনার সুযোগ। কিন্তু মহালয়ার ভোরে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠ শোনার যে ঐতিহ্য, তা বহু বাঙালির কাছে এখনও বিশেষ আবেগের।
জেন জি-র একাংশের আগ্রহও মনে করিয়ে দেয়, পুরনো সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখতে সবসময় নতুন প্রজন্মকে অতীতের জীবনযাত্রায় ফিরিয়ে নেওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং তাদের বর্তমান অভ্যাসের সঙ্গে ঐতিহ্যের পরিচয় ঘটানোই গুরুত্বপূর্ণ।
‘যা দেবী সর্বভূতেষু’ স্তোত্রের পরিচিত আবহ, চণ্ডীপাঠের গাম্ভীর্য এবং মহালয়ার ভোরের নীরবতা মিলিয়ে তৈরি হয় এমন এক অভিজ্ঞতা, যা বহু মানুষের কাছে বছরের অন্য দিনগুলির থেকে আলাদা। এই অভিজ্ঞতা কারও কাছে ভক্তির, কারও কাছে নস্টালজিয়ার, আবার কারও কাছে বাঙালিয়ানার পরিচয়।
মহালয়ার ভোরে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠ তাই কেবল অতীতের স্মৃতি নয়, বর্তমানেরও এক জীবন্ত সাংস্কৃতিক অনুষঙ্গ। প্রজন্ম বদলালেও সেই কণ্ঠের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা আবেগ নতুন করে ফিরে আসে। আর সেই আবেগের মধ্য দিয়েই মহালয়া বাঙালির মনে প্রতি বছর নতুন করে দেবীপক্ষের আগমনী বার্তা নিয়ে আসে।