মেজর লিগ সকার (MLS) এর ২০২৫ মৌসুমে আবারও নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করলেন লিওনেল মেসি। ইন্টার মায়ামির হয়ে অসাধারণ পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে তিনি জিতলেন বর্ষসেরা MVP পুরস্কার। পুরো মৌসুমে মেসির রেকর্ড ভাঙা পারফরম্যান্স ৩৫ গোল ও ২৮ অ্যাসিস্ট তাঁকে শুধু লিগের সেরা খেলোয়াড়ই করেনি, বরং ইন্টার মায়ামিকে ইতিহাসের প্রথম MLS শিরোপা এনে দিয়েছে। মেসির নেতৃত্বে ইন্টার মায়ামির রূপান্তর ছিল চোখে পড়ার মতো। আগের বছর মাঝারি মানের দল হিসেবে বিবেচিত হলেও, এ মৌসুমে তারা আক্রমণভাগে দাপট দেখিয়ে একের পর এক ম্যাচ জিতেছে। গুরুত্বপূর্ণ নকআউট ম্যাচে মেসির সৃজনশীলতা ও অভিজ্ঞতা দলকে জয়ের পথে এগিয়ে নেয়। পুরস্কার গ্রহণ করে মেসি বলেন, এটি শুধু ব্যক্তিগত অর্জন নয়, পুরো দলের কঠোর পরিশ্রমের ফল। ইন্টার মায়ামির হয়ে এমন ইতিহাস গড়তে পেরে আমি গর্বিত। MLS কর্তৃপক্ষও স্বীকার করেছে, মেসির উপস্থিতি শুধু দল নয়, পুরো লিগকেই নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে দর্শক সংখ্যা বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক জনপ্রিয়তা, এবং টেকনিক্যাল মান সবদিকেই তাঁর প্রভাব স্পষ্ট। ২০২৫ মৌসুম তাই মেসি ও মায়ামির জন্য এক অবিস্মরণীয় অধ্যায় হয়ে রইল।
বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে লিওনেল মেসি (Lionel Messi) এক চিরন্তন কিংবদন্তির নাম। ফুটবল মাঠে তাঁর গতি, ড্রিবলিং এবং সৃষ্টিশীলতা—সবই এক শিল্পীর তুলির আঁচড়ের মতো। ইউরোপীয় ফুটবল জয়, ৮টি ব্যালন ডি’অর, বিশ্বকাপ এবং কোপা আমেরিকার মুকুট মাথায় তোলার পরও যখন তিনি মেজর লীগ সকার (MLS)-এ পা রাখেন, তখন প্রশ্ন ছিল, প্রায় ৪০ বছর বয়সে তিনি কি আমেরিকার নতুন চ্যালেঞ্জে নিজের জাদু দেখাতে পারবেন? ২০২৫ সালের এমএলএস মৌসুমের শেষে সেই সব প্রশ্নের উত্তর এল এক নতুন, অভূতপূর্ব সাফল্যের মোড়কে।
২০২৫ এমএলএস মৌসুম ছিল নিছকই ফুটবল প্রতিযোগিতা নয়; এটি ছিল একজন ফুটবল সম্রাটের একক আধিপত্যের উপাখ্যান। ৩৫টি গোল এবং ২৮টি অ্যাসিস্ট—এমএলএস ইতিহাসে একক মৌসুমে ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সের এমন সম্মিলিত প্রভাব বিরল। এই অবিশ্বাস্য পরিসংখ্যানের হাত ধরে মেসি শুধু নিজেকেই নতুন করে প্রতিষ্ঠা করেননি, বরং তাঁর নেতৃত্বে ইন্টার মায়ামি (Inter Miami CF) প্রথমবারের মতো এমএলএস চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা জিতেছে। এই দ্বিমুখী সাফল্যের ফলস্বরূপ, তিনি ২০২৫ সালের এমএলএস মোস্ট ভ্যালুয়েবল প্লেয়ার (MVP) নির্বাচিত হয়েছেন। মেসির এই অর্জন আমেরিকান ফুটবলে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে এবং প্রমাণ করেছে, তাঁর শ্রেষ্ঠত্বের কোনো ভৌগোলিক বা সময়ের সীমাবদ্ধতা নেই।
২০২৩ সালে যখন মেসি ইন্টার মায়ামিতে যোগ দেন, তখন ইউরোপীয় ফুটবল পণ্ডিত এবং অনেক সমর্থক মনে করেছিলেন যে এটি তাঁর ক্যারিয়ারের 'ডাউনসাইড' বা অস্তগামী অধ্যায়। বয়স এবং নতুন পরিবেশের চ্যালেঞ্জ নিয়ে অনেকেই সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু মেসি তাঁর স্বভাবসুলভ উত্তর মাঠে দিয়েছেন। প্রথম বছরে লিগস কাপ জিতে তিনি শুধু ক্লাবকেই প্রথম শিরোপা দেননি, বরং নতুন লিগে তাঁর আগমনের তাৎপর্য বুঝিয়ে দেন।
২০২৫ মৌসুমে তিনি দেখালেন—ফুটবল মাঠে তিনি একজন নিছক খেলোয়াড় নন, একটি চলমান প্রতিষ্ঠান। প্রায় পরিপূর্ণ এক মৌসুম জুড়ে তাঁর ফিটনেস, খেলার প্রতি মানসিকতা এবং গোল করার তীব্র আকাঙ্ক্ষা—সবকিছুই প্রমাণ করে দিয়েছে, তিনি এখনও বিশ্বের সেরা। তিনি যেন ইউরোপের চাপমুক্ত হয়ে খেলার আরও বেশি স্বাধীনতা খুঁজে পেয়েছেন।
মেসির ২০২৫ সালের পরিসংখ্যান কেবল সংখ্যা নয়; এটি তাঁর একক আধিপত্যের সুস্পষ্ট প্রমাণ:
| পারফরম্যান্স প্যারামিটার | সংখ্যা | তাৎপর্য |
| গোল সংখ্যা | ৩৫টি | একজন মিডফিল্ডার-কাম-ফরোয়ার্ড হিসেবে এমএলএস-এ সর্বোচ্চ গোলদাতার দৌড়ে এগিয়ে থাকা। |
| অ্যাসিস্ট সংখ্যা | ২৮টি | লিগে সেরা প্লেমেকারের ভূমিকা নিশ্চিত করা; তাঁর সৃষ্টিশীলতার অসামান্য স্বাক্ষর। |
| গোল ইনভলভমেন্ট | ৬৩টি | দলের মোট গোলের অর্ধেকেরও বেশি (প্রায় ৬০%) ক্ষেত্রে তাঁর সরাসরি অবদান ছিল, যা এমএলএস ইতিহাসে সর্বোচ্চ ব্যবধান। |
| ক্লাচ পারফরম্যান্স | ফাইনাল, সেমিফাইনালসহ গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে গোল/অ্যাসিস্ট। | চাপের মুখে তাঁর নেতৃত্ব এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাকে তুলে ধরে। |
এই পরিসংখ্যানগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মেসি পুরো লিগটিকে তাঁর খেলার স্টাইল, গতি এবং বুদ্ধিমত্তা দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করেছেন। তিনি একাই যেমন স্কোর করেছেন, তেমনই সতীর্থদের জন্য সুযোগ তৈরি করেছেন, যা ইন্টার মায়ামিকে একটি মাঝারি মানের দল থেকে শিরোপা জয়ী চ্যাম্পিয়নে পরিণত করেছে।
ইন্টার মায়ামি ক্লাবটি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর কখনই শিরোপা জয়ের কাছাকাছি যেতে পারেনি। মেসির আগমন ক্লাবটির ডিএনএ বা মূল চরিত্রকেই বদলে দিয়েছে।
ক. মানসিক বিপ্লব ও আত্মবিশ্বাস:
মেসির উপস্থিতি ইন্টার মায়ামির খেলোয়াড়দের মধ্যে এক অভূতপূর্ব মানসিক পরিবর্তন এনেছে। লকার রুমের সংস্কৃতি বদলেছে; তরুণ খেলোয়াড়রা এখন বিশ্বসেরা তারকার সঙ্গে খেলার অনুপ্রেরণায় আরও উন্নত খেলার চেষ্টা করছেন। দলের সামগ্রিক আত্মবিশ্বাস কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ায় তারা এখন বিশ্বাস করে যে, যেকোনো ম্যাচই জেতা সম্ভব—যতক্ষণ মেসি মাঠে আছেন।
খ. পজিশনাল প্লে-র পুনর্জন্ম:
মেসি এবং তাঁর পুরোনো সতীর্থ সার্জিও বুসকেটসের সঙ্গে মিলিত হয়ে ইন্টার মায়ামির পাসিং গেমকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। তাঁদের পজিশনাল প্লে এবং 'টিকি-টাকা'-র ছায়া আমেরিকান ফুটবলে নতুন করে দেখা গেছে। মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ এবং দ্রুত পাসিংয়ের মাধ্যমে তাঁরা প্রতিপক্ষকে নিজেদের ছন্দে খেলতে দেননি।
গ. বড় ম্যাচের প্রভাব (The Clutch Factor):
মেসি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে তাঁর সেরা খেলাটা ধরে রেখেছেন। ডার্বি, কনফারেন্স ফাইনাল বা প্লে-অফের চাপের মুখে তিনি হয় নিজে গোল করেছেন বা অ্যাসিস্টের মাধ্যমে দলের জয় নিশ্চিত করেছেন। এই 'ক্লাচ পারফরম্যান্স'ই প্রমাণ করে যে, তিনি কেবল পরিসংখ্যানের জন্য খেলেন না, তিনি দলের জয়ের জন্য খেলেন।
মেসির আগমন এমএলএস এবং ইন্টার মায়ামির অর্থনৈতিক এবং বিশ্বব্যাপী ব্র্যান্ড ভ্যালুকে আকাশচুম্বী করেছে।
অর্থনৈতিক প্রভাব: টিকিট বিক্রি, ক্লাব জার্সি এবং মার্চেন্ডাইজ বিক্রির ক্ষেত্রে রেকর্ড তৈরি হয়েছে। ইন্টার মায়ামি রাতারাতি বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় ফুটবল ক্লাবে পরিণত হয়েছে।
বিশ্বব্যাপী দর্শক সংখ্যা: এমএলএসের বিশ্বব্যাপী সম্প্রচার এবং দর্শক সংখ্যায় চরম উল্লম্ফন ঘটেছে। মেসি আমেরিকার ফুটবলকে আন্তর্জাতিক মানচিত্রে একটি নতুন এবং শক্তিশালী অবস্থান এনে দিয়েছেন।
ফুটবলের সংস্কৃতি: আমেরিকায় ফুটবলের জনপ্রিয়তা নতুন করে বেড়েছে। মেসিকে ঘিরে তৈরি হওয়া উন্মাদনা দেশটিতে ফুটবলকে মূল ক্রীড়াগুলোর মধ্যে আরও দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে সাহায্য করেছে। এটি ফুটবলের ইতিহাসে একজন খেলোয়াড়ের প্রভাবের এক বিরল দৃষ্টান্ত।
মেসির ক্যারিয়ারে ব্যালন ডি’অর, গোল্ডেন বুটসহ অজস্র ব্যক্তিগত পুরস্কার রয়েছে। কিন্তু এমএলএস MVP জেতা তাঁর জন্য বিশেষ তাৎপর্য বহন করে:
ইতিহাস সৃষ্টি: তিনি ইউরোপের বাইরে এসেও দেখালেন, তাঁর ব্যক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব এবং খেলার মান কোথাও কমেনি। এটি আমেরিকান ফুটবলের ইতিহাসে অন্যতম স্মরণীয় MVP বিজয়।
উদ্দেশ্যের প্রমাণ: তাঁর ক্লাব পরিবর্তনের উদ্দেশ্য ছিল শুধু অবসর নেওয়া নয়, বরং একটি নতুন লিগে আধিপত্য বিস্তার করা এবং ক্লাবকে প্রথম চ্যাম্পিয়ন করা—এই MVP তারই চূড়ান্ত প্রমাণ।
অনন্ত শ্রেষ্ঠত্ব: এই অর্জন তাঁর সেই চিরন্তন ধারণাকেই আরও শক্তিশালী করেছে: "যেখানেই তিনি খেলুন না কেন, তিনি ফুটবলের শ্রেষ্ঠত্বের প্রতীক হয়ে থাকবেন।"
২০২৫ সালে মেসির বয়স ৩৮ বছর। এই বয়সে যখন অধিকাংশ ফুটবলার কেরিয়ারের শেষ প্রান্তে চলে যান বা অবসর নেন, সেখানে মেসির ধারাবাহিকতা বিস্ময়কর।
শারীরিক ও মানসিক ফিটনেস: তাঁর ফিটনেস ধরে রাখার ক্ষমতা এবং খেলার প্রতি তাঁর অদম্য ক্ষুধা তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করে। গতিময়তা হয়তো কিছুটা কমেছে, কিন্তু তাঁর সৃষ্টিশীলতা, ম্যাচের রিডিং ক্ষমতা এবং ড্রিবলিং স্কিল এখনও বিশ্বমানের।
ফুটবল শিল্পী: বিশ্বের নানা ফুটবল বিশেষজ্ঞ এবং কোচরা একমত—মেসি শুধু একজন খেলোয়াড় নন, তিনি একজন 'ফুটবল শিল্পী'। তাঁর খেলা কৌশল এবং বুদ্ধিমত্তার এমন এক মিশ্রণ, যা বয়সের সঙ্গে সঙ্গে আরও গভীর হয়েছে।
২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হবে আমেরিকা, কানাডা এবং মেক্সিকোতে। এমএলএসে মেসির এই অভূতপূর্ব পারফরম্যান্স ফুটবল বিশ্বে নতুন জল্পনার জন্ম দিয়েছে।
বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ? এমএলএসে তাঁর ফিটনেস এবং ছন্দের ধারাবাহিকতা দেখে অনেকেই এখন মনে করছেন, মেসি ২০২৬ বিশ্বকাপেও আর্জেন্টিনার হয়ে খেলতে পারেন। এই টুর্নামেন্টে তাঁর উপস্থিতি কেবল আর্জেন্টিনার জন্য নয়, বিশ্ব ফুটবলের জন্য আরও একটি স্বর্ণময় মুহূর্ত হতে পারে।
ক্লাবের লক্ষ্য: ইন্টার মায়ামি এখন মেসির নেতৃত্বে কনকাকাফ চ্যাম্পিয়ন্স লিগসহ আরও বড় আন্তর্জাতিক ক্লাব টুর্নামেন্ট জয়ের স্বপ্ন দেখছে।
২০২৫ এমএলএস মৌসুম ছিল এক মহাকাব্যিক অধ্যায়—রঙিন, রোমাঞ্চকর, শিল্পসুলভ, এবং পুরোপুরি মেসিময়।
এমএলএস MVP জেতা কেবল একটি ব্যক্তিগত পুরস্কার নয়; এটি একটি বিপ্লবের স্বীকৃতি। ইন্টার মায়ামিকে প্রথম শিরোপা এনে দেওয়া, ৩৫ গোল ও ২৮ অ্যাসিস্টের ঐন্দ্রজালিক পারফরম্যান্স—এ সবকিছু মিলে মেসি আবারও প্রমাণ করলেন:
লিওনেল মেসি ফুটবলের ইতিহাসে সবচেয়ে প্রভাবশালী, অনুপ্রেরণামূলক এবং অদম্য খেলোয়াড়। তাঁর জাদুকরী উপস্থিতি আমেরিকান ফুটবলে এক নতুন, স্বর্ণালী যুগের সূচনা করেছে, যার রেশ আগামী প্রজন্ম ধরে রাখবে। ফুটবলের ইতিহাসে তাঁর এই অধ্যায়টি চিরকাল এক অনন্ত মহিমা এবং শ্রেষ্ঠত্বের প্রতীক হয়ে থাকবে।