২১ ফেব্রুয়ারির প্রথম প্রহরে ঢাকার শহিদ মিনারে প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির সঙ্গে শ্রদ্ধা জানালেন এক জামায়াত নেতাbপ্রথমবারের এই উপস্থিতি ঘিরে রাজনৈতিক মহলে জোর চর্চা।
২১ ফেব্রুয়ারি ভাষা দিবসের প্রথম প্রহরে ঢাকার কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার আবারও হয়ে উঠল জাতীয় আবেগ ও রাজনৈতিক বার্তার মিলনস্থল। এ বছর সেখানে শ্রদ্ধা জানান সদ্য নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, রাষ্ট্রপতি মহম্মদ সাহাবুদ্দিন এবং বিরোধী দলনেতা শফিকুর রহমান। তবে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন শফিকুর—এই প্রথম জামায়াতের কোনও আমির ভাষা দিবসে শহিদ মিনারে উপস্থিত হয়ে ভাষা শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানালেন। অতীতে এই পুষ্পস্তবক অর্পণের রীতিকে ঘিরে জামায়াতের একাংশের আপত্তির প্রেক্ষিতে তাঁর এই পদক্ষেপ স্বাভাবিকভাবেই রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলে নতুন প্রশ্ন তুলেছে।
রাত পেরিয়ে ২১ ফেব্রুয়ারির সূচনালগ্নে রাষ্ট্রীয় প্রোটোকল অনুযায়ী প্রথমে শ্রদ্ধা জানান রাষ্ট্রপতি। তাঁর পরপরই প্রধানমন্ত্রী পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। তবে এ বছর একটি ব্যতিক্রম নজরে আসে—রাষ্ট্রপতি আগে এসে প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানাননি; বরং নিজে শ্রদ্ধা জানিয়ে চলে যাওয়ার পর গভীর রাতে শহিদ মিনারে পৌঁছন তারেক। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ বার প্রথমবারের মতো ‘দোয়া’ ও ‘মোনাজাত’-এর মতো ধর্মীয় আচারে অংশ নেন তিনি। পরে দলীয় চেয়ারম্যান হিসেবে বিএনপি নেতাদের সঙ্গে আবারও শ্রদ্ধা জানান। তাঁর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন তাঁর স্ত্রী ও কন্যা—যা পুরো ঘটনাকে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক আবহও দেয়।
রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে বেরিয়ে গেলে শহিদ মিনারের দরজা সাধারণ মানুষের জন্য খুলে দেওয়া হয়। হাজারো মানুষ ফুল হাতে ভাষা শহিদদের স্মরণে ভিড় জমান। এই আবহেই, কিছুটা পরে, সেখানে পৌঁছন শফিকুর রহমান। তাঁর সঙ্গে ছিলেন জামায়াতের শীর্ষ নেতারা এবং জোটশরিক জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। বিরোধী দলনেতা হিসেবে তাঁর আগমন আগেই ঘোষণা করা হয়েছিল, তবু বাস্তবে শহিদ মিনারে তাঁর উপস্থিতি তাৎপর্য বহন করে।
শহিদ মিনারে ফুল দেওয়ার পর সাংবাদিকেরা প্রশ্ন তোলেন—যে রীতিকে একসময় জামায়াত নেতাদের কেউ কেউ ‘ইসলাম-বিরোধী’ বলেছিলেন, সেই পুষ্পস্তবক অর্পণেই আজ কেন অংশ নিলেন তিনি? উত্তরে শফিকুর স্পষ্ট করেন, এটি তাঁর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়; ‘রাষ্ট্রীয় আচার’ হিসেবে তিনি সেখানে গিয়েছেন। তাঁর কথায়, বিরোধী দলের নেতা হিসেবে সঙ্গীদের নিয়ে সেখানে উপস্থিত হওয়া তাঁর দায়িত্ব। এ দিনের প্রশ্নের জবাবে তিনি আরও বলেন, ‘‘এ সব প্রশ্ন আজ কেন?’’—যা রাজনৈতিক মহলে ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যার জন্ম দিয়েছে।
সাম্প্রতিক জাতীয় নির্বাচনে জামায়াত ৬৮টি আসন পেয়েছে এবং তাদের জোট পেয়েছে মোট ৭৭টি আসন। ফলে জাতীয় সংসদে প্রধান বিরোধী দলের আসনে বসতে চলেছে দলটি, আর শফিকুর নির্বাচিত হয়েছেন বিরোধীনেতা হিসেবে। এই নতুন সাংবিধানিক অবস্থানই তাঁর শহিদ মিনারে উপস্থিতির পেছনে মূল কারণ—এমনটাই তিনি বোঝাতে চেয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি বিভিন্ন ঐতিহাসিক আন্দোলনের শহিদদের স্মরণ করেন—১৯৪৭-এর প্রেক্ষাপট থেকে শুরু করে ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৯০-এর গণঅভ্যুত্থান এবং সাম্প্রতিক রাজনৈতিক আন্দোলনের নিহতদেরও উল্লেখ করেন। তাঁর বক্তব্যে অতীতের নানা সংগ্রামকে একসূত্রে গেঁথে দেখানোর চেষ্টা লক্ষ করা যায়।
ভাষা দিবসের ঐতিহাসিক তাৎপর্যও এখানে স্মরণযোগ্য। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে আন্দোলনরত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের উপর গুলি চালানো হয়। আবুল বরকত, সালাম, রফিকুদ্দিন, জব্বারসহ বেশ কয়েক জন নিহত হন। তাঁদের আত্মত্যাগের স্মৃতিতে দিনটি বাংলাদেশে শহিদ দিবস হিসেবে পালিত হয়। ১৯৯৯ সালে রাষ্ট্রপুঞ্জ ২১ ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করে, যা ভাষা ও সংস্কৃতির বৈচিত্র্য রক্ষার বৈশ্বিক প্রতীক হয়ে উঠেছে।
গত বছর অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে রীতি বজায় থাকলেও উৎসাহ কম ছিল—এমন মূল্যায়ন করেছিলেন অনেকে। রাষ্ট্রপতির শহিদ মিনারে যাওয়া নিয়েও টানাপড়েন তৈরি হয়েছিল, যদিও শেষ পর্যন্ত তিনি ও সরকারপ্রধান উপস্থিত হয়েছিলেন। তার তুলনায় এ বছরের আয়োজন রাজনৈতিকভাবে বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। বিশেষ করে ক্ষমতার পালাবদলের পর নতুন প্রধানমন্ত্রী ও নতুন বিরোধী নেতৃত্বের প্রথম ভাষা দিবস—এই প্রতীকী মুহূর্তকে ঘিরে জনমনে আগ্রহ ছিল প্রবল।
তবে লক্ষণীয়, এ বছরও জামায়াতের দলীয় কর্মসূচি হিসেবে শহিদ মিনারে শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের কোনও আলাদা আয়োজন ছিল না। দল আগেই জানিয়েছিল, বিরোধী দলনেতা হিসেবে শফিকুর সেখানে যাবেন। ফলে তাঁর উপস্থিতিকে দলীয় মতাদর্শের মৌলিক পরিবর্তন হিসেবে দেখার আগে সাংবিধানিক দায়বদ্ধতার দিকটিও বিবেচনায় রাখতে বলছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। একই সঙ্গে সমাজমাধ্যমে প্রশ্ন উঠেছে—এটি কি বৃহত্তর রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা অর্জনের কৌশল, না কি কেবল প্রোটোকল রক্ষা?
সব মিলিয়ে এ বছরের ২১ ফেব্রুয়ারি কেবল আনুষ্ঠানিক শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের দিন ছিল না; ছিল নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ, প্রতীকী বার্তা এবং অতীত-বর্তমানের সংলাপের দিন। রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলনেতার উপস্থিতি একসঙ্গে ভাষা শহিদদের স্মৃতির সামনে দাঁড়িয়ে জাতীয় ঐক্যের এক চিত্র তুলে ধরলেও, তার আড়ালে রাজনৈতিক ব্যাখ্যা ও বিতর্কও সমানতালে চলেছে। ভাষা আন্দোলনের আত্মত্যাগ আজও বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক
তবে লক্ষণীয়, এ বছরও জামায়াতের দলীয় কর্মসূচি হিসেবে শহিদ মিনারে শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের কোনও আলাদা আয়োজন ছিল না। দল আগেই স্পষ্ট করেছিল, বিরোধী দলনেতা হিসেবে শফিকুর রহমান সেখানে যাবেন। অর্থাৎ এটি দলীয় রাজনৈতিক কর্মসূচি নয়, বরং সাংবিধানিক পদাধিকারবলে তাঁর উপস্থিতি—এই বার্তাটিই সামনে রাখতে চেয়েছে দল। ফলে তাঁর এই পদক্ষেপকে সরাসরি মতাদর্শগত পরিবর্তনের নিদর্শন হিসেবে দেখার আগে রাজনৈতিক বাস্তবতা ও সাংবিধানিক দায়বদ্ধতার প্রশ্নটি বিবেচনায় নেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশ্লেষকেরা।
বাংলাদেশের সংসদীয় ব্যবস্থায় বিরোধী দলনেতা একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদ। রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে তাঁর উপস্থিতি শুধু প্রোটোকলের বিষয় নয়, গণতান্ত্রিক কাঠামোর প্রতীকও বটে। ভাষা দিবসের মতো সংবেদনশীল ও ঐতিহাসিক দিনে শহিদ মিনারে উপস্থিত থাকা মানে রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক স্মরণানুষ্ঠানের অংশ হওয়া। সেই অর্থে শফিকুরের বক্তব্য—‘রাষ্ট্রীয় আচার’ হিসেবে সেখানে যাওয়া তাঁর দায়িত্ব—একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক অবস্থানকেই তুলে ধরে। তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, ব্যক্তিগত বা দলীয় বিশ্বাসের প্রশ্নের ঊর্ধ্বে উঠে একটি সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।
তবে বিতর্কের সূত্র এখানেই। অতীতে জামায়াতের একাংশ শহিদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণের রীতিকে ‘অনুচিত’ বা ‘ধর্মীয়ভাবে প্রশ্নসাপেক্ষ’ বলে মন্তব্য করেছিল—এমন স্মৃতি সমাজমাধ্যমে নতুন করে উত্থাপিত হয়েছে। তাই অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, এই উপস্থিতি কি কেবল প্রোটোকল রক্ষা, না কি বৃহত্তর রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা অর্জনের কৌশল? বিশেষত সাম্প্রতিক নির্বাচনে দলটি উল্লেখযোগ্য আসন পাওয়ার পর জাতীয় রাজনীতির মূল স্রোতে নিজেদের অবস্থান আরও দৃঢ় করতে চায় কি না, তা নিয়েও জল্পনা চলছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা বলছেন, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিরোধী দলের ভূমিকা কেবল সরকারের সমালোচনায় সীমাবদ্ধ নয়; জাতীয় ঐক্যের প্রশ্নে তারা রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে অংশ নেয়। ভাষা দিবস সেই অর্থে দলীয় বিভাজনের ঊর্ধ্বে থাকা একটি দিন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন কেবল একটি রাজনৈতিক আন্দোলন ছিল না; তা ছিল সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের সংগ্রাম। তাই শহিদ মিনারে উপস্থিত হওয়া মানে ভাষা শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো যেমন, তেমনি রাষ্ট্রের মৌলিক মূল্যবোধের প্রতি আনুগত্যের প্রকাশও বটে।
এ বছরের আয়োজনেও প্রতীকী দিকটি ছিল স্পষ্ট। রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী আগে শ্রদ্ধা জানান, পরে বিরোধী দলনেতা। তারপর সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত হয় শহিদ মিনার। এই ক্রমধারা রাষ্ট্রের ধারাবাহিকতাকে তুলে ধরে। সেখানে বিরোধী নেতৃত্বের উপস্থিতি গণতন্ত্রের বহুমাত্রিকতাকেই চিহ্নিত করে। যদিও রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকে, তবু ভাষা শহিদদের স্মৃতির সামনে দাঁড়িয়ে সেই বিভাজন সাময়িকভাবে মুছে যায়—এই চিত্রই ফুটে উঠেছে।
অন্যদিকে সমাজমাধ্যমে চলা বিতর্ক দেখাচ্ছে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রতীকী পদক্ষেপের গুরুত্ব কতটা বেশি। একটি ফুল দেওয়া, একটি নির্দিষ্ট আচারে অংশ নেওয়া—এসবই হয়ে উঠতে পারে রাজনৈতিক বার্তার বাহক। কেউ দেখছেন এটি সময়ের দাবি মেনে নেওয়া বাস্তববাদী পদক্ষেপ হিসেবে; কেউ আবার দেখছেন ভাবমূর্তি পরিবর্তনের কৌশল হিসেবে। রাজনৈতিক দলগুলির জন্য জনমতের প্রতিক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ, তাই এমন প্রতীকী মুহূর্তগুলি ভবিষ্যৎ কৌশল নির্ধারণেও প্রভাব ফেলতে পারে।
সব মিলিয়ে এ বছরের ২১ ফেব্রুয়ারি কেবল আনুষ্ঠানিক শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের দিন ছিল না; ছিল নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ, প্রতীকী বার্তা এবং অতীত-বর্তমানের সংলাপের দিন। রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলনেতার উপস্থিতি একসঙ্গে ভাষা শহিদদের স্মৃতির সামনে দাঁড়িয়ে জাতীয় ঐক্যের এক চিত্র তুলে ধরেছে। একই সঙ্গে তা মনে করিয়ে দিয়েছে—ভাষা আন্দোলনের আত্মত্যাগ আজও বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক চেতনাকে সংজ্ঞায়িত করে। শহিদ মিনারের বেদিতে রাখা প্রতিটি পুষ্পস্তবক তাই শুধু ফুল নয়; তা ইতিহাসের প্রতি অঙ্গীকার, বর্তমানের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং ভবিষ্যতের প্রতি এক নীরব প্রতিশ্রুতি।
চেতনাকে সংজ্ঞায়িত করে—আর সেই স্মৃতির সামনে দাঁড়িয়ে দেওয়া প্রতিটি পদক্ষেপই তাই হয়ে ওঠে সময়ের গুরুত্বপূর্ণ বার্তা