Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

ব্রাজিলের জার্সিকে বিদায় জানালেন নেইমার, আবেগে ভাসল ফুটবলপ্রেমীরা

মেটলাইফ স্টেডিয়ামে ব্রাজিলের জার্সিতে শেষ ম্যাচে আবেগে ভেঙে পড়লেন নেইমার। চোখের জলে বিদায়ের মুহূর্ত ছুঁয়ে গেল ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয়।

সেই মেটলাইফ স্টেডিয়াম। বড্ড চেনা, অথচ আজ যেন সবকিছুই অচেনা। আলো ঝলমলে গ্যালারি, হাজার হাজার সমর্থকের গর্জন, সবুজ ঘাসে সাজানো ফুটবলের মহামঞ্চ—সবই ছিল আগের মতো। কিন্তু দিনের শেষে এই স্টেডিয়াম সাক্ষী থাকল এক আবেগঘন বিদায়ের। এখান থেকেই শুরু হয়েছিল নেইমারের আন্তর্জাতিক ফুটবল যাত্রা, আর সেই মেটলাইফেই যেন পূর্ণচ্ছেদ পড়ল ব্রাজিলের হলুদ জার্সিতে তাঁর দীর্ঘ ১৬ বছরের অধ্যায়ের।

নরওয়ের বিরুদ্ধে ১-২ গোলে হার। স্কোরলাইন যতটা সহজে লেখা যায়, ব্রাজিল সমর্থকদের হৃদয়ে তার আঘাত ততটাই গভীর। বিশ্বকাপের মঞ্চে আরও একবার স্বপ্নভঙ্গ হল পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের। কিন্তু এই হারের থেকেও বড় হয়ে উঠল এক মানুষের চোখের জল। খেলা শেষের বাঁশি বাজতেই মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলেন নেইমার। কিছুক্ষণ যেন বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না, এত বছরের পথচলা এভাবেই শেষ হয়ে গেল। তারপর আর আবেগ চেপে রাখতে পারলেন না। চোখের জল গড়িয়ে পড়ল গাল বেয়ে। হাতে থাকা নীল বোতল থেকে মাথায় ও ঘাড়ে জল ঢালতে দেখা গেল তাঁকে। হয়তো ঘাম মুছতে নয়, বরং চোখের জল আড়াল করতেই সেই চেষ্টা।

ফুটবল কখনও কখনও শুধু জয়-পরাজয়ের হিসেব নয়। কিছু মুহূর্ত থাকে, যা স্কোরবোর্ডকে ছাপিয়ে ইতিহাস হয়ে যায়। নেইমারের এই বিদায়ের রাতও তেমনই এক মুহূর্ত। ব্রাজিলের জার্সিতে তিনি এসেছিলেন এক প্রতিশ্রুতি নিয়ে। পায়ের জাদুতে, ড্রিবলিংয়ের ছন্দে, শরীরের মোচড়ে, গোলের পর সাম্বা নাচে তিনি বহু বছর ধরে ফুটবলপ্রেমীদের মুগ্ধ করেছেন। কিন্তু যে ট্রফির জন্য ব্রাজিলের প্রতিটি প্রজন্ম অপেক্ষা করে, যে সোনালি ট্রফি হাতে তুলে নেওয়ার স্বপ্ন নিয়ে নেইমার নিজের কেরিয়ার গড়েছিলেন, সেই ফিফা বিশ্বকাপ তাঁর কাছে অধরাই থেকে গেল।

১৬ বছর আগে এক তরুণ নেইমার যখন আন্তর্জাতিক ফুটবলে পা রেখেছিলেন, তখন অনেকেই তাঁকে ব্রাজিল ফুটবলের ভবিষ্যৎ বলে দেখেছিলেন। পেলে, রোমারিও, রোনাল্ডো, রোনালদিনহোর দেশের নতুন শিল্পী হিসেবে তাঁকে নিয়ে প্রত্যাশা ছিল আকাশছোঁয়া। সেই প্রত্যাশার চাপ কম ছিল না। ব্রাজিল মানেই শুধু ফুটবল দল নয়, ব্রাজিল মানে এক আবেগ, এক সংস্কৃতি, এক ইতিহাস। হলুদ জার্সি গায়ে চাপানো মানেই কোটি কোটি মানুষের স্বপ্ন নিজের কাঁধে তুলে নেওয়া। নেইমার সেই স্বপ্ন বহন করেছিলেন বহু বছর। কখনও চোট, কখনও বিতর্ক, কখনও ব্যর্থতা, আবার কখনও অসাধারণ প্রত্যাবর্তন—সবকিছুর মাঝেও তিনি ছিলেন ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় মুখ।

মেটলাইফ স্টেডিয়ামের এই রাত তাই এক অদ্ভুত বৃত্ত সম্পূর্ণ করল। যেখানে শুরু, সেখানেই শেষ। মাঠের প্রতিটি কোণ যেন মনে করিয়ে দিচ্ছিল তাঁর প্রথম দিনের কথা। তখন তিনি ছিলেন তরুণ প্রতিভা, আজ তিনি অভিজ্ঞ তারকা। তখন সামনে ছিল সম্ভাবনার দীর্ঘ পথ, আজ পিছনে পড়ে রইল সাফল্য, অপূর্ণতা, আনন্দ, যন্ত্রণা আর অগণিত স্মৃতি। এমন বিদায় কোনও ফুটবলারের জন্য সহজ নয়, বিশেষ করে নেইমারের মতো আবেগপ্রবণ শিল্পীর জন্য তো নয়ই।

নরওয়ের বিরুদ্ধে ম্যাচে ব্রাজিলের শুরুটা প্রত্যাশামতো ছিল না। প্রতিপক্ষের শারীরিক শক্তি, গতি এবং পরিকল্পিত ফুটবলের সামনে বারবার সমস্যায় পড়তে হয় ব্রাজিলকে। ব্রাজিলের আক্রমণে মাঝেমধ্যে ঝলক দেখা গেলেও সেই পুরনো ধার যেন ছিল না। ভিনিসিয়াস জুনিয়র, এনড্রিক, রদ্রিগোদের নিয়ে নতুন প্রজন্মের ব্রাজিল অনেক আশা জাগালেও শেষ পর্যন্ত প্রয়োজনীয় মুহূর্তে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারেনি। অন্যদিকে নরওয়ে নিজেদের সুযোগ কাজে লাগিয়ে ব্রাজিলকে আরও চাপে ফেলে দেয়।

নেইমার চেষ্টা করেছিলেন। বয়স ৩৪ হলেও বল পায়ে তাঁর উপস্থিতি এখনও আলাদা। প্রতিটি স্পর্শে গ্যালারি থেকে শব্দ উঠছিল। সমর্থকেরা জানতেন, হয়তো এটাই তাঁর শেষ বড় মঞ্চ। তিনি নিজেও হয়তো জানতেন, সময় ফুরিয়ে আসছে। ম্যাচের শেষ দিকে ব্রাজিল যখন মরিয়া, নেইমার তখন নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে দলকে টেনে তুলতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ফুটবল সবসময় ইচ্ছের সঙ্গে মেলে না। কিছু রাত থাকে, যেখানে ভাগ্যও মুখ ফিরিয়ে নেয়।

খেলার শেষ বাঁশি বাজতেই যেন শুধু একটি ম্যাচ শেষ হল না, শেষ হল ব্রাজিল ফুটবলের এক দীর্ঘ আবেগময় অধ্যায়। ভিনিসিয়াস, মার্কুইনহোস, এনড্রিকরা একে একে এগিয়ে এলেন নেইমারের দিকে। কেউ কাঁধে হাত রাখলেন, কেউ জড়িয়ে ধরলেন, কেউ শুধু চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন। কারণ কিছু যন্ত্রণা শব্দ দিয়ে বোঝানো যায় না। সান্ত্বনার ভাষা সেখানে অসহায়। নেইমারের চোখের জলই বলে দিচ্ছিল, ভিতরে কতটা ভেঙে পড়েছেন তিনি।

ব্রাজিলের জার্সিতে নেইমারের অবদান শুধু পরিসংখ্যান দিয়ে মাপা যায় না। গোল, অ্যাসিস্ট, ম্যাচ সংখ্যা—এসব গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু নেইমারের প্রভাব তার থেকেও বড়। তিনি এমন এক প্রজন্মের ফুটবলপ্রেমী তৈরি করেছেন, যারা তাঁর ড্রিবল দেখে ফুটবলকে ভালোবেসেছে। তাঁর পায়ের ফ্লিক, প্রতিপক্ষকে কাটিয়ে ওঠার সহজাত ক্ষমতা, গোলের পর হাসি, কখনও শিশুসুলভ উচ্ছ্বাস—সব মিলিয়ে নেইমার ছিলেন আধুনিক ব্রাজিল ফুটবলের সবচেয়ে রঙিন চরিত্র।

news image
আরও খবর

তবে তাঁর কেরিয়ারের সবচেয়ে বড় অপূর্ণতা থেকে গেল বিশ্বকাপ। ২০১৪ সালে ঘরের মাঠে ব্রাজিলের স্বপ্ন ছিল আকাশছোঁয়া। কিন্তু চোটের জন্য নেইমার ছিটকে যান, আর সেমিফাইনালে জার্মানির কাছে ঐতিহাসিক বিপর্যয় দেখেছিল ফুটবল বিশ্ব। ২০১৮ সালে প্রত্যাশা ছিল, কিন্তু সেখানেও ব্রাজিল থেমে যায়। ২০২২ সালে ক্রোয়েশিয়ার কাছে টাইব্রেকারে হার ভেঙে দেয় আরও এক স্বপ্ন। আর এবার ২০২৬ সালে নরওয়ের কাছে হার যেন সেই অপূর্ণতার শেষ অধ্যায় লিখে দিল।

নেইমারের প্রতিভা নিয়ে কখনও প্রশ্ন ছিল না। তিনি বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সেরা শিল্পী। কিন্তু তাঁর কেরিয়ার বারবার আটকে গেছে চোট, সময় এবং ভাগ্যের অদ্ভুত বাঁকে। ফুটবল তাঁকে দিয়েছে খ্যাতি, অর্থ, ক্লাব সাফল্য, বিশ্বজোড়া জনপ্রিয়তা। কিন্তু ব্রাজিলের হয়ে বিশ্বকাপ না জেতার আক্ষেপ তাঁর নামের পাশে হয়তো দীর্ঘদিন থাকবে। তবু এই অপূর্ণতা তাঁর প্রতিভাকে ছোট করে না। বরং তাঁকে আরও মানবিক করে তোলে। কারণ সব শিল্পীর গল্প নিখুঁত সমাপ্তি পায় না।

মাঠ ছাড়ার সময় নেইমারের গাল বেয়ে নেমে আসা জল যেন শুধু একজন ফুটবলারের ব্যক্তিগত দুঃখ নয়, তা ছিল লক্ষ লক্ষ ব্রাজিল সমর্থকের ভাঙা স্বপ্নের প্রতীক। যাঁরা ভেবেছিলেন, এইবার হয়তো নেইমার শেষবারের মতো জাদু দেখাবেন। যাঁরা ভেবেছিলেন, ইতিহাস হয়তো তাঁকে একবার সুযোগ দেবে। কিন্তু ফুটবল কখনও নির্মম, কখনও নিষ্ঠুর। শেষ পর্যন্ত সব গল্প রূপকথা হয় না।

হাতে বাঁধা ক্রেপ ব্যান্ডেজ খুলে সাইড বেঞ্চের দিকে ছুড়ে ফেললেন নেইমার। মুখে বিড়বিড় করে কিছু বলতে দেখা গেল তাঁকে। হয়তো ভাগ্যকে দুষলেন, হয়তো নিজেকে প্রশ্ন করলেন, হয়তো শুধু বলতে চাইলেন—আর পারলাম না। দর্শকরা উঠে দাঁড়িয়ে তাঁকে সম্মান জানালেন। প্রতিপক্ষ ফুটবলাররাও এগিয়ে এসে হাত মেলালেন। কারণ প্রতিদ্বন্দ্বিতা মাঠের ৯০ মিনিটে শেষ হয়ে যায়, কিন্তু একজন শিল্পীর প্রতি সম্মান থেকে যায় চিরকাল।

নেইমারের বিদায় ব্রাজিলের জন্যও এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। কারণ এতদিন ধরে ব্রাজিলের আক্রমণভাগের আবেগ, নেতৃত্ব এবং সৃজনশীলতার কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন তিনি। এখন দায়িত্ব যাবে নতুন প্রজন্মের হাতে। ভিনিসিয়াস, রদ্রিগো, এনড্রিকদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ—শুধু ম্যাচ জেতা নয়, ব্রাজিল ফুটবলের হারানো আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনা। নেইমারের ছায়া থেকে বেরিয়ে তাঁদের নিজস্ব যুগ তৈরি করতে হবে।

ব্রাজিল ফুটবল সবসময় নতুন তারকা জন্ম দিয়েছে। ইতিহাস বলে, এক প্রজন্ম চলে গেলে আরেক প্রজন্ম উঠে আসে। কিন্তু নেইমারের মতো চরিত্রের অভাব সহজে পূরণ হয় না। তিনি ছিলেন বিতর্কিত, আবেগপ্রবণ, কখনও সমালোচিত, কখনও পূজিত। কিন্তু সবকিছুর ঊর্ধ্বে তিনি ছিলেন বিনোদনের প্রতিশ্রুতি। মাঠে নেইমার মানে কিছু একটা ঘটতেই পারে—এই বিশ্বাসটাই তাঁকে আলাদা করেছিল।

নেইমারের শেষ রাত তাই শুধু বিদায়ের রাত নয়, স্মৃতিচারণের রাত। সান্তোসের সেই কিশোর, বার্সেলোনার ঝলমলে দিন, পিএসজির তারকাখচিত অধ্যায়, ব্রাজিলের হয়ে অসংখ্য গোল, অলিম্পিক সোনা, কনফেডারেশনস কাপের উল্লাস—সব যেন একসঙ্গে ভিড় করছিল মেটলাইফের সবুজ ঘাসে। সেই স্মৃতির মাঝেই দাঁড়িয়ে ছিলেন এক ক্লান্ত, কাঁদতে থাকা মানুষ, যিনি হয়তো জীবনের সবচেয়ে কঠিন সিদ্ধান্তের সামনে।

 

Preview image