Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

অগভীর জলেই শত্রুর ডুবোজাহাজে নিখুঁত আঘাত, নৌসেনার হাতে এল আইএনএল মঙ্গরোল

২০৩৫ সালের মধ্যে ভারতীয় নৌসেনার হাতে ২০০-রও বেশি যুদ্ধজাহাজ ও সাবমেরিন রাখার পরিকল্পনা। চিন ও পাকিস্তানের সম্ভাব্য হামলা মোকাবিলায় নৌবাহিনীর শক্তি বাড়ানোর উদ্যোগ শুরু করেছে প্রতিরক্ষা মন্ত্রক।  

অগভীর জলেই শত্রুর ডুবোজাহাজে নিখুঁত আঘাত, নৌসেনার হাতে এল আইএনএল মঙ্গরোল
current affairs

অগভীর জলে শত্রুর ডুবোজাহাজ ধ্বংসে আরও শক্তিশালী ভারতীয় নৌসেনা, বাহিনীতে যুক্ত হল আইএনএস মঙ্গরোল

ভারতীয় নৌসেনার শক্তি আরও বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ করল প্রতিরক্ষা মন্ত্রক। উপকূলবর্তী এবং অগভীর সমুদ্র অঞ্চলে শত্রুপক্ষের ডুবোজাহাজের গতিবিধির উপর নজরদারি চালানো ও সেগুলিকে ধ্বংস করার ক্ষমতা বাড়াতে নৌসেনার হাতে এল নতুন জলযান আইএনএস মঙ্গরোল। কেরলের কোচি শিপইয়ার্ড লিমিটেডের তৈরি এই জলযানটি আনুষ্ঠানিক ভাবে ভারতীয় নৌসেনায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। অগভীর জলে দ্রুত চলাচল, শত্রুর ডুবোজাহাজ শনাক্ত করা এবং প্রয়োজনে নির্ভুল আঘাত হানার মতো একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতে পারবে এই জলযান। সামুদ্রিক নিরাপত্তা জোরদার করার পাশাপাশি ভারতের উপকূলবর্তী অঞ্চলে নজরদারি ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করে তোলার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে আইএনএস মঙ্গরোল।

ভারতীয় নৌসেনার আধুনিকীকরণের বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ হিসাবেই এই ধরনের জলযানের গুরুত্ব বাড়ছে। বিশেষ করে চিন ও পাকিস্তানের মতো দুই প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে একই সময়ে সম্ভাব্য সামরিক সংঘাতের পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য নৌসেনার হাতে আরও বেশি যুদ্ধজাহাজ, সাবমেরিন এবং আধুনিক সামুদ্রিক যুদ্ধপ্রযুক্তি রাখার উপর জোর দেওয়া হচ্ছে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩৫ সালের মধ্যে ভারতীয় নৌসেনার হাতে ২০০টিরও বেশি যুদ্ধজাহাজ ও সাবমেরিন রাখার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। সেই লক্ষ্যে বড় যুদ্ধজাহাজ নির্মাণের পাশাপাশি ছোট, দ্রুতগামী এবং বিশেষ দায়িত্ব পালনে সক্ষম জলযান তৈরিতেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

কী এই অ্যান্টি-সাবমেরিন ওয়ারফেয়ার শ্যালো ওয়াটার ক্রাফট?

আইএনএস মঙ্গরোল যে শ্রেণির জলযান, সামরিক পরিভাষায় তাকে বলা হয় ‘অ্যান্টি-সাবমেরিন ওয়ারফেয়ার শ্যালো ওয়াটার ক্রাফট’। নাম থেকেই বোঝা যায়, এই ধরনের জলযানের প্রধান কাজ হল অগভীর সমুদ্র অঞ্চলে শত্রুপক্ষের ডুবোজাহাজ শনাক্ত করা, সেগুলির গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা এবং প্রয়োজন হলে সেগুলিকে আক্রমণ করা। উপকূলের কাছাকাছি সমুদ্র এলাকায় বড় যুদ্ধজাহাজের চলাচল অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। জলের গভীরতা কম হওয়া, সমুদ্রতলের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য এবং জলের নিচে থাকা বিভিন্ন বাধার কারণে বড় আকারের রণতরী সব জায়গায় সহজে প্রবেশ করতে পারে না।

এই পরিস্থিতিতে ছোট আকারের বিশেষ যুদ্ধজলযান অত্যন্ত কার্যকর হয়ে ওঠে। এগুলি অগভীর জলেও তুলনামূলক সহজে চলাচল করতে পারে এবং উপকূলের কাছাকাছি এলাকায় দ্রুত অভিযান চালাতে সক্ষম। শত্রুপক্ষের ডুবোজাহাজ যদি কোনও গুরুত্বপূর্ণ বন্দর, নৌঘাঁটি বা উপকূলীয় এলাকায় প্রবেশের চেষ্টা করে, তা হলে এই ধরনের জলযান তার গতিবিধি শনাক্ত করতে এবং প্রতিরোধ গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

সাধারণ যুদ্ধজাহাজের তুলনায় এই শ্রেণির জলযানের নকশা এবং পরিচালনব্যবস্থা বিশেষভাবে তৈরি করা হয় অগভীর সমুদ্র অঞ্চলে অভিযানের কথা মাথায় রেখে। ফলে উপকূলবর্তী জলসীমায় নজরদারি, টহল, ডুবোজাহাজ-বিরোধী অভিযান এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তা রক্ষার কাজে এগুলির কার্যকারিতা অনেক বেশি।

মাত্র ২.৭ মিটার ড্রাফট, অগভীর জলেই বড় সুবিধা

আইএনএস মঙ্গরোলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল এর ড্রাফট। কোনও জলযান জলে ভাসমান অবস্থায় তার তলদেশের যে অংশ জলের নিচে থাকে, তাকে ড্রাফট বলা হয়। এই জলযানের ড্রাফট মাত্র ২.৭ মিটার। অর্থাৎ, অগভীর সমুদ্র অঞ্চলে চলাচলের ক্ষেত্রে এটি বিশেষ সুবিধা পেতে পারে।

বড় ফ্রিগেট, ডেস্ট্রয়ার কিংবা অন্যান্য ভারী যুদ্ধজাহাজের ড্রাফট তুলনামূলক বেশি হওয়ায় সেগুলি সব সময় উপকূলের একেবারে কাছাকাছি এলাকায় প্রবেশ করতে পারে না। অন্য দিকে, কম ড্রাফটের জলযান অপেক্ষাকৃত কম গভীর জলেও চলাচল করতে পারে। ফলে বন্দর সংলগ্ন অঞ্চল, উপকূলীয় জলসীমা এবং অগভীর সমুদ্র এলাকায় নজরদারি চালানোর ক্ষেত্রে এ ধরনের জলযান গুরুত্বপূর্ণ।

শত্রুপক্ষের ডুবোজাহাজ শনাক্ত করার কাজও উপকূলবর্তী অঞ্চলে জটিল হয়ে উঠতে পারে। সমুদ্রের গভীরতা, তলদেশের গঠন এবং জলের নিচে শব্দের চলাচলের বৈশিষ্ট্য ডুবোজাহাজ শনাক্ত করার প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে। এই ধরনের পরিস্থিতিতে বিশেষ ভাবে তৈরি অগভীর জলের যুদ্ধজলযান ব্যবহার করে নজরদারি ও প্রতিরোধমূলক অভিযান চালানো যায়।

তবে শুধু কম ড্রাফট থাকলেই কোনও জলযান সব পরিস্থিতিতে একই রকম কার্যকর হবে, এমন নয়। সমুদ্রের অবস্থা, আবহাওয়া, জলের গভীরতা, সেন্সর ও অস্ত্রব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট অভিযানের প্রকৃতির উপরও তার কার্যকারিতা নির্ভর করে। তা সত্ত্বেও, উপকূলীয় প্রতিরক্ষার জন্য আইএনএস মঙ্গরোলের মতো জলযানের প্রয়োজনীয়তা যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ।

শত্রুর ডুবোজাহাজের বিরুদ্ধে কী ভাবে কাজ করবে আইএনএস মঙ্গরোল?

আধুনিক সামুদ্রিক যুদ্ধে ডুবোজাহাজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র। জলের নিচে লুকিয়ে থেকে এগুলি শত্রুপক্ষের যুদ্ধজাহাজ, সামরিক ঘাঁটি এবং গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক যোগাযোগ ব্যবস্থার উপর আঘাত হানতে পারে। বিশেষ করে ডিজ়েল-ইলেকট্রিক সাবমেরিন অগভীর সমুদ্র অঞ্চলে লুকিয়ে থাকার সুযোগ পেতে পারে। তাই উপকূলবর্তী জলসীমায় ডুবোজাহাজের গতিবিধি শনাক্ত করা এবং সেগুলির বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া যে কোনও দেশের নৌসেনার কাছে বড় চ্যালেঞ্জ।

আইএনএস মঙ্গরোলের মতো অ্যান্টি-সাবমেরিন জলযানের দায়িত্ব হল এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা। জলযানগুলির শ্রেণিগত ভূমিকার মধ্যে রয়েছে জলের নিচে থাকা সম্ভাব্য শত্রু ডুবোজাহাজের অবস্থান শনাক্ত করা, সেগুলির গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা এবং প্রয়োজন অনুসারে ডুবোজাহাজ-বিধ্বংসী অস্ত্র ব্যবহার করা। অভিযানের পরিস্থিতি অনুযায়ী অন্যান্য নৌযান এবং সামুদ্রিক নজরদারি ব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বয় করেও কাজ করতে পারে এই ধরনের জলযান।

শত্রুপক্ষের ডুবোজাহাজ কোনও গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথে প্রবেশ করলে কিংবা কোনও নৌঘাঁটির আশপাশে সন্দেহজনক গতিবিধি দেখা গেলে দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানানো অত্যন্ত জরুরি। ছোট ও দ্রুতগামী জলযান এই ক্ষেত্রে সুবিধা দিতে পারে। বড় যুদ্ধজাহাজের তুলনায় এগুলি অগভীর অঞ্চলে বেশি কার্যকর ভাবে টহল দিতে পারে এবং উপকূলের কাছাকাছি এলাকায় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ফাঁকফোকর কমাতে সাহায্য করতে পারে।

তবে ডুবোজাহাজ শনাক্ত করা এবং ধ্বংস করার জন্য শুধু একটি জলযানের উপর নির্ভর করা হয় না। সোনার, যোগাযোগব্যবস্থা, নজরদারি বিমান, হেলিকপ্টার এবং অন্যান্য যুদ্ধজাহাজের সঙ্গে সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ। একটি সমন্বিত সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা যত শক্তিশালী হবে, শত্রুপক্ষের ডুবোজাহাজের পক্ষে গোপনে অভিযান চালানো তত কঠিন হবে।

ডুবোজাহাজের পাশাপাশি আকাশপথের হুমকি মোকাবিলা

আধুনিক নৌযুদ্ধ শুধু সমুদ্রের উপরিভাগ বা জলের নিচে সীমাবদ্ধ নয়। শত্রুপক্ষের বিমান ও হেলিকপ্টার থেকেও যুদ্ধজাহাজ এবং নৌঘাঁটির উপর আক্রমণ চালানো সম্ভব। তাই একটি আধুনিক যুদ্ধজলযানের ক্ষেত্রে আকাশপথ থেকে আসা হুমকি মোকাবিলার ব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ।

আইএনএস মঙ্গরোলের মতো জলযানগুলি যে বৃহত্তর সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অংশ, সেখানে ডুবোজাহাজ-বিরোধী অভিযানের পাশাপাশি অন্যান্য হুমকির বিষয়ে সতর্ক থাকার প্রয়োজন রয়েছে। জলযানের নির্দিষ্ট অস্ত্র, সেন্সর এবং প্রতিরক্ষামূলক সক্ষমতা তার নকশা ও প্রযুক্তিগত বিন্যাসের উপর নির্ভর করে। তাই শত্রুপক্ষের বিমান বা হেলিকপ্টারের বিরুদ্ধে সরাসরি আক্রমণ চালানোর ক্ষমতা সম্পর্কে নির্দিষ্ট দাবি করতে হলে সংশ্লিষ্ট জলযানের অস্ত্রব্যবস্থা ও সরকারি প্রযুক্তিগত বিবরণ জানা জরুরি।

সামগ্রিক ভাবে, সমুদ্রের উপরিভাগ, জলের নিচে এবং আকাশপথ—তিন দিক থেকেই সম্ভাব্য হুমকি মোকাবিলার জন্য ভারতীয় নৌসেনাকে বহুস্তরীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হচ্ছে। অগভীর জলের বিশেষ যুদ্ধজলযান সেই ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে।

চিন ও পাকিস্তানকে মোকাবিলায় কেন বাড়ছে নৌসেনার গুরুত্ব?

ভারতের সামুদ্রিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ভারত মহাসাগর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশের বিপুল পরিমাণ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সমুদ্রপথে পরিবাহিত হয়। জ্বালানি আমদানি, পণ্য পরিবহণ, বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচল এবং গুরুত্বপূর্ণ বন্দরগুলির সুরক্ষার জন্য সমুদ্রপথের উপর নির্ভরতা রয়েছে। ফলে ভারত মহাসাগর অঞ্চলে সামরিক ভারসাম্য বজায় রাখা ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।

চিনের নৌসেনার ক্রমবর্ধমান শক্তি এবং ভারত মহাসাগর অঞ্চলে তার উপস্থিতি নিয়ে দীর্ঘ দিন ধরেই কৌশলগত আলোচনা চলছে। অন্য দিকে, পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের সামুদ্রিক সীমান্ত ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত উদ্বেগও রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ভারতীয় নৌসেনার হাতে পর্যাপ্ত সংখ্যক যুদ্ধজাহাজ, সাবমেরিন এবং আধুনিক নজরদারি ব্যবস্থা থাকা জরুরি।

সমুদ্রে শক্তি বজায় রাখার অর্থ শুধু বড় বিমানবাহী রণতরী বা ক্ষেপণাস্ত্রবাহী ডেস্ট্রয়ার তৈরি করা নয়। উপকূলবর্তী অঞ্চলে নজরদারি, বন্দর রক্ষা, শত্রুর ডুবোজাহাজ শনাক্ত করা, মাইন অপসারণ এবং গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথে টহল দেওয়ার জন্যও বিশেষ ধরনের জলযান প্রয়োজন। বড় যুদ্ধজাহাজগুলি দূরবর্তী সমুদ্রে দীর্ঘ অভিযান চালাতে কার্যকর হলেও অগভীর জলসীমায় ছোট জলযানের ভূমিকা আলাদা।

এই কারণেই ভারতীয় নৌসেনার আধুনিকীকরণ পরিকল্পনায় বড় ও ছোট—দুই ধরনের যুদ্ধজাহাজ নির্মাণের উপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। আইএনএস মঙ্গরোলের অন্তর্ভুক্তি সেই বৃহত্তর পরিকল্পনারই একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

২০৩৫ সালের মধ্যে ২০০টিরও বেশি যুদ্ধজাহাজ ও সাবমেরিনের লক্ষ্য

ভারতীয় নৌসেনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হল ২০৩৫ সালের মধ্যে বাহিনীর যুদ্ধজাহাজ এবং সাবমেরিনের সংখ্যা ২০০-র বেশি করা। প্রতিরক্ষা মন্ত্রক সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য বিভিন্ন ধরনের যুদ্ধজলযান নির্মাণ ও আধুনিকীকরণের উপর জোর দেওয়া হচ্ছে।

বর্তমানে ভারতীয় নৌসেনার হাতে প্রায় ১৪০টি জলযান রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের যুদ্ধজাহাজ, সহায়ক জলযান এবং সাবমেরিন। ভবিষ্যতে সংখ্যার পাশাপাশি জলযানগুলির প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আধুনিক যুদ্ধে শুধু বেশি সংখ্যক যুদ্ধজাহাজ থাকলেই হয় না, সেগুলির নজরদারি, যোগাযোগ, অস্ত্রব্যবস্থা এবং শত্রুর আক্রমণ প্রতিহত করার ক্ষমতাও উন্নত হওয়া প্রয়োজন।

news image
আরও খবর

পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল দেশীয় প্রযুক্তিতে যুদ্ধজাহাজ নির্মাণ। দেশের শিপইয়ার্ডগুলিতে আধুনিক যুদ্ধজাহাজ তৈরি হলে বিদেশি নির্মাতাদের উপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পে কর্মসংস্থান, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং গবেষণার সুযোগ বাড়ে।

তবে ২০০টিরও বেশি যুদ্ধজাহাজ ও সাবমেরিনের লক্ষ্য অর্জন করতে হলে ধারাবাহিক নির্মাণ, সময়মতো সরবরাহ, প্রযুক্তিগত পরীক্ষা, কর্মী প্রশিক্ষণ এবং রক্ষণাবেক্ষণের মতো বিষয়গুলিতেও গুরুত্ব দিতে হবে। একটি যুদ্ধজাহাজ তৈরি করলেই সেটি সঙ্গে সঙ্গে সম্পূর্ণ যুদ্ধক্ষম হয়ে ওঠে না। বিভিন্ন পরীক্ষার মাধ্যমে তার প্রযুক্তি, সেন্সর, অস্ত্র ও যোগাযোগব্যবস্থার কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে হয়।

স্টেলথ প্রযুক্তি, ফ্রিগেট ও ডেস্ট্রয়ার নির্মাণে জোর

ভারতীয় নৌসেনার আধুনিকীকরণ পরিকল্পনায় স্টেলথ প্রযুক্তির ব্যবহারও গুরুত্বপূর্ণ। স্টেলথ প্রযুক্তির মূল উদ্দেশ্য হল শত্রুপক্ষের রাডার এবং অন্যান্য শনাক্তকরণ ব্যবস্থায় কোনও যুদ্ধজাহাজকে শনাক্ত করা কঠিন করে তোলা। এর জন্য জলযানের বাইরের নকশা, বিশেষ উপাদান এবং বিভিন্ন প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা ব্যবহার করা হতে পারে।

আধুনিক ফ্রিগেট ও ডেস্ট্রয়ারে এই ধরনের প্রযুক্তির গুরুত্ব ক্রমশ বাড়ছে। ফ্রিগেট সাধারণত বহুমুখী দায়িত্ব পালন করে। ডুবোজাহাজ-বিরোধী অভিযান, আকাশপথের হুমকি মোকাবিলা এবং অন্যান্য যুদ্ধজাহাজকে সুরক্ষা দেওয়ার মতো কাজে এগুলি ব্যবহার করা হয়। ডেস্ট্রয়ার সাধারণত আরও শক্তিশালী অস্ত্র ও সেন্সর বহন করতে পারে এবং বহরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়।

অন্য দিকে, কর্ভেট তুলনামূলক ছোট যুদ্ধজাহাজ। উপকূলবর্তী অঞ্চলে টহল, দ্রুত অভিযান এবং নির্দিষ্ট সামরিক দায়িত্ব পালনে এই ধরনের জলযান কার্যকর। ছোট জলযান নির্মাণের গুরুত্ব এখানেই। বিভিন্ন আকার ও ক্ষমতার জলযান একসঙ্গে ব্যবহার করে নৌসেনা তার দায়িত্ব ভাগ করে নিতে পারে।

এ ছাড়া, ‘মাইন কাউন্টার মেজার ভেসেল’ বা মাইন প্রতিরোধী জলযানেরও প্রয়োজন রয়েছে। সমুদ্রের নিচে পাতা মাইন বাণিজ্যিক জাহাজ, যুদ্ধজাহাজ এবং বন্দরগুলির জন্য বড় বিপদ হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ ধরনের এই জলযানগুলির কাজ হল সমুদ্রের নিচে থাকা মাইন শনাক্ত করা এবং সেগুলির বিপদ দূর করতে সাহায্য করা।

ফলে ভারতীয় নৌসেনার আধুনিকীকরণ শুধু যুদ্ধজাহাজের সংখ্যা বাড়ানোর পরিকল্পনা নয়। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে বিভিন্ন ধরনের বিশেষ জলযান, আধুনিক প্রযুক্তি এবং সামুদ্রিক প্রতিরক্ষার পরিকাঠামো উন্নত করা।

সাবমেরিন বহর আধুনিকীকরণও বড় চ্যালেঞ্জ

ভারতীয় নৌসেনার শক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল সাবমেরিন বহর। জলের নিচে দীর্ঘ সময় গোপনে অবস্থান করতে পারার কারণে ডুবোজাহাজ সামুদ্রিক যুদ্ধে বিশেষ কৌশলগত সুবিধা দেয়। শত্রুপক্ষের যুদ্ধজাহাজের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ, সমুদ্রপথে প্রতিরোধ গড়ে তোলা এবং নির্দিষ্ট সামরিক অভিযান চালানোর ক্ষেত্রে সাবমেরিনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

উল্লেখিত তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয় নৌসেনার ডিজ়েল-ইলেকট্রিক সাবমেরিনগুলির মধ্যে ১১টি পুরনো। পুরনো সাবমেরিনগুলির ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত আধুনিকীকরণ, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং ভবিষ্যতে বিকল্প সাবমেরিন অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। কারণ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সাবমেরিনের সেন্সর, যোগাযোগব্যবস্থা, অস্ত্র এবং অন্যান্য প্রযুক্তির উন্নতি ঘটে। নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মেলাতে না পারলে পুরনো প্ল্যাটফর্মের কার্যকারিতা কমে যেতে পারে।

এ ছাড়া, ভারতীয় নৌসেনার হাতে রয়েছে পরমাণু শক্তিচালিত এবং পরমাণু অস্ত্রবাহী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র বহনে সক্ষম এসএসবিএন শ্রেণির সাবমেরিন। এই ধরনের ডুবোজাহাজ দেশের কৌশলগত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তবে ডিজ়েল-ইলেকট্রিক সাবমেরিন এবং এসএসবিএন-এর দায়িত্ব এক নয়। প্রথমটি মূলত প্রচলিত সামুদ্রিক অভিযান ও ডুবোজাহাজ-বিরোধী যুদ্ধের বিভিন্ন কাজে ব্যবহৃত হতে পারে, অন্য দিকে এসএসবিএন কৌশলগত পরমাণু প্রতিরোধ ব্যবস্থার অংশ।

তাই ভবিষ্যতে ভারতীয় নৌসেনার সাবমেরিন বহরকে আরও শক্তিশালী করতে নতুন সাবমেরিন নির্মাণ, পুরনো সাবমেরিনের আধুনিকীকরণ এবং দেশীয় প্রযুক্তির উন্নয়ন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

বিমানবাহী রণতরী ও সামুদ্রিক বিমানশক্তি

ভারতীয় নৌসেনার হাতে থাকা বিমানবাহী রণতরীগুলিও সামুদ্রিক শক্তির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিমানবাহী রণতরী থেকে যুদ্ধবিমান পরিচালনা করা যায়। ফলে স্থলভিত্তিক বিমানঘাঁটি থেকে দূরে সমুদ্রের উপরেও আকাশপথে নজরদারি ও সামরিক অভিযান চালানোর সুযোগ তৈরি হয়।

ভারতীয় নৌসেনার হাতে দুটি বিমানবাহী রণতরী রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ধরনের রণতরী শুধু আক্রমণ চালানোর জন্য নয়, বহরের অন্যান্য যুদ্ধজাহাজকে আকাশপথ থেকে সুরক্ষা দেওয়া এবং দূরবর্তী অঞ্চলে ভারতের সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ।

এ ছাড়া, নৌসেনার হাতে ২৫০টিরও বেশি বিমান ও হেলিকপ্টার রয়েছে বলে জানানো হয়েছে। সামুদ্রিক নজরদারি, ডুবোজাহাজ শনাক্ত করা, অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযান এবং যুদ্ধজাহাজকে সহায়তা করার ক্ষেত্রে এই বিমানশক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

সমুদ্রের উপরিভাগে যুদ্ধজাহাজের উপস্থিতি যেমন প্রয়োজন, তেমনই জলের নিচে কী ঘটছে তা বোঝার জন্য আধুনিক সেন্সর ও নজরদারি ব্যবস্থাও অপরিহার্য। বিমান, হেলিকপ্টার, সাবমেরিন এবং পৃষ্ঠদেশে চলাচলকারী যুদ্ধজাহাজের মধ্যে সমন্বয় তৈরি করা গেলে নৌসেনার সামগ্রিক সক্ষমতা আরও বাড়তে পারে।

আগামী দশকে ৬০ শতাংশ শক্তিবৃদ্ধির পরিকল্পনা

উল্লেখিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী এক দশকে ভারতীয় নৌসেনার জলযান ও আকাশযানের সংখ্যা প্রায় ৬০ শতাংশ বাড়ানোর লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে। এই লক্ষ্য বাস্তবায়িত হলে বাহিনীর সামুদ্রিক নজরদারি, দূরবর্তী সমুদ্রে উপস্থিতি এবং উপকূলীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।

তবে এই ধরনের সম্প্রসারণের জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। নতুন যুদ্ধজাহাজ ও সাবমেরিন তৈরি করতে বিপুল অর্থ, উন্নত প্রযুক্তি, দক্ষ কর্মী এবং আধুনিক উৎপাদন পরিকাঠামো প্রয়োজন। একই সঙ্গে নতুন জলযান পরিচালনার জন্য নৌসেনার কর্মীদের প্রশিক্ষণ দিতে হয়। অস্ত্র ও সেন্সর ব্যবস্থার নিয়মিত পরীক্ষা এবং রক্ষণাবেক্ষণও অপরিহার্য।

দেশীয় শিপইয়ার্ডগুলির ভূমিকা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোচি শিপইয়ার্ড লিমিটেডের মতো সংস্থাগুলি যুদ্ধজাহাজ ও অন্যান্য সামুদ্রিক প্ল্যাটফর্ম নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। দেশীয় নির্মাণক্ষমতা বাড়লে নতুন জলযান সরবরাহের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করা সহজ হতে পারে। পাশাপাশি প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও প্রতিরক্ষা উৎপাদন ব্যবস্থার বিকাশেও সুবিধা পাওয়া যায়।

কেন গুরুত্বপূর্ণ আইএনএস মঙ্গরোলের অন্তর্ভুক্তি?

আইএনএস মঙ্গরোলের অন্তর্ভুক্তিকে ভারতীয় নৌসেনার সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হিসেবে দেখা যেতে পারে। কারণ, উপকূলবর্তী এবং অগভীর সমুদ্র অঞ্চলে শত্রুর ডুবোজাহাজ শনাক্ত করা বড় যুদ্ধজাহাজের পক্ষে সব সময় সহজ নয়। বিশেষ ভাবে তৈরি ছোট জলযান এই ধরনের এলাকায় নজরদারি ও অভিযান চালাতে সুবিধা দেয়।

ভারতের দীর্ঘ উপকূলরেখা, গুরুত্বপূর্ণ বন্দর এবং ভারত মহাসাগর অঞ্চলে কৌশলগত স্বার্থ রক্ষার জন্য বিভিন্ন ধরনের সামরিক সক্ষমতা প্রয়োজন। এক দিকে বিমানবাহী রণতরী ও ডেস্ট্রয়ারের মতো বড় যুদ্ধজাহাজ দূরবর্তী সমুদ্রে শক্তি প্রদর্শন করতে পারে। অন্য দিকে, অগভীর জলের যুদ্ধজলযান উপকূলের কাছাকাছি এলাকায় নজরদারি এবং ডুবোজাহাজ-বিরোধী অভিযানে সহায়তা করতে পারে।

একই সঙ্গে সাবমেরিন বহর আধুনিকীকরণ, স্টেলথ প্রযুক্তিযুক্ত যুদ্ধজাহাজ নির্মাণ, মাইন প্রতিরোধী জলযান তৈরি এবং নৌবাহিনীর বিমানশক্তি বাড়ানোর পরিকল্পনাও ভারতের সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও সুসংহত করার লক্ষ্যেই নেওয়া হচ্ছে।

সব মিলিয়ে, আইএনএস মঙ্গরোলের অন্তর্ভুক্তি শুধু একটি নতুন জলযান নৌসেনায় যোগ হওয়ার ঘটনা নয়। এটি ভারতের উপকূলীয় প্রতিরক্ষা, ডুবোজাহাজ-বিরোধী সক্ষমতা এবং বৃহত্তর নৌসেনা আধুনিকীকরণ পরিকল্পনার গুরুত্বকে সামনে নিয়ে এসেছে। ২০৩৫ সালের মধ্যে ২০০টিরও বেশি যুদ্ধজাহাজ ও সাবমেরিনের লক্ষ্য অর্জন করতে হলে বড় যুদ্ধজাহাজের পাশাপাশি ছোট, দ্রুতগামী ও বিশেষ দায়িত্ব পালনে সক্ষম জলযানেরও প্রয়োজন হবে। সেই বৃহত্তর পরিকল্পনায় আইএনএস মঙ্গরোলের মতো জলযান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

Preview image