Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

বাজেট পেশের দিনেই ধাক্কা বাণিজ্যিক গ্যাসের দাম বাড়ল ৪৯ টাকার বেশি

গৃহস্থের ব্যবহারের ১৪.২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দামে কোনও পরিবর্তন হয়নি। প্রতি সিলিন্ডারের দাম ৮৭৯ টাকাতেই বহাল রয়েছে।

কেন্দ্রীয় বাজেট পেশের দিনই নতুন করে চাপের মুখে পড়লেন ব্যবসায়ীরা। শনিবার বাণিজ্যিক এলপিজি সিলিন্ডারের দামে বড়সড় বৃদ্ধি ঘোষণা করল তেল সংস্থাগুলি। এক লাফে ১৯ কেজির বাণিজ্যিক গ্যাস সিলিন্ডারের দাম বেড়েছে ৪৯ টাকা ৫০ পয়সা। যদিও সাধারণ গৃহস্থদের জন্য ব্যবহৃত ১৪.২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দামে কোনও পরিবর্তন হয়নি। ফলে একদিকে সাধারণ মানুষের স্বস্তি থাকলেও, অন্যদিকে বাজেটের দিনেই অতিরিক্ত খরচের বোঝা বইতে হচ্ছে ব্যবসায়ী মহলকে।

বর্তমানে গৃহস্থালি ব্যবহারের ১৪.২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম সিলিন্ডার প্রতি ৮৭৯ টাকাই বহাল থাকছে। রান্নাঘরের বাজেট নিয়ে যাঁরা উদ্বিগ্ন ছিলেন, তাঁদের জন্য আপাতত এই খবর কিছুটা স্বস্তির। তবে হোটেল, রেস্তরাঁ, ছোট খাবারের দোকান, ক্যান্টিন, মিষ্টির দোকান থেকে শুরু করে শিল্পক্ষেত্রে যাঁরা বাণিজ্যিক গ্যাস ব্যবহার করেন, তাঁদের কপালে চিন্তার ভাঁজ স্পষ্ট।

বাণিজ্যিক গ্যাসে কতটা দাম বাড়ল?

তেল সংস্থার ঘোষিত নতুন দামের তালিকা অনুযায়ী, এতদিন কলকাতায় ১৯ কেজির বাণিজ্যিক এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ছিল ১ হাজার ৮৪৪ টাকা ৫০ পয়সা। বাজেট পেশের দিন থেকেই সেই দাম বেড়ে দাঁড়াল ১ হাজার ৮৯৩ টাকা ৫০ পয়সা। অর্থাৎ এক ধাক্কায় সিলিন্ডার প্রতি খরচ বেড়েছে প্রায় ৫০ টাকা। যাঁদের প্রতিদিন বা নিয়মিত একাধিক সিলিন্ডার ব্যবহার করতে হয়, তাঁদের মাসিক খরচ যে উল্লেখযোগ্য ভাবে বাড়বে, তা বলাই বাহুল্য।

বাজেটের দিনেই কেন এই দাম বৃদ্ধি?

প্রশ্ন উঠছে, কেন্দ্রীয় বাজেট পেশের দিনেই কেন বাণিজ্যিক গ্যাসের দাম বাড়ানো হল? অর্থনীতিবিদদের একাংশের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দামের ওঠানামা, ডলার-রুপির বিনিময় হার এবং পরিবহণ ব্যয়ের বৃদ্ধির প্রভাব পড়ছে গ্যাসের দামে। বাজেট ঘোষণার সঙ্গে সরাসরি যোগ না থাকলেও, অর্থনৈতিক বাস্তবতা মাথায় রেখেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।

তবে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলির অভিযোগ, বাজেটের দিন এমন দাম বৃদ্ধি মানসিক ভাবে আরও বেশি চাপ তৈরি করে। কারণ বাজেটের দিকে তাকিয়ে থাকেন সবাই—কী স্বস্তি মিলবে, কী ভর্তুকি বা করছাড় আসবে। তার মাঝেই যদি খরচ বেড়ে যায়, তাহলে স্বাভাবিক ভাবেই অসন্তোষ তৈরি হয়।

ব্যবসায়ীদের প্রতিক্রিয়া

কলকাতার বিভিন্ন বাজার, হোটেল ও রেস্তরাঁ মালিক সংগঠনের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যেই ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়েছে। অনেকেই জানিয়েছেন, কাঁচামালের দাম, বিদ্যুৎ বিল, কর্মচারীদের বেতন—সব মিলিয়ে এমনিতেই খরচ বেড়েছে। তার উপর গ্যাসের দাম বাড়লে শেষ পর্যন্ত তার প্রভাব পড়বে খাবারের দামে। ফলে সাধারণ গ্রাহকরাও পরোক্ষ ভাবে এর প্রভাব থেকে রেহাই পাবেন না।

এক রেস্তরাঁ মালিকের কথায়, “একটি বড় রেস্তরাঁয় দিনে একাধিক বাণিজ্যিক সিলিন্ডার লাগে। মাসে হিসেব করলে হাজার হাজার টাকা অতিরিক্ত খরচ হবে। এই অবস্থায় দাম না বাড়িয়ে ব্যবসা চালানো কঠিন।”

গৃহস্থালি গ্যাসে স্বস্তি, কিন্তু কতদিন?

এই মুহূর্তে গৃহস্থালি ১৪.২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম অপরিবর্তিত থাকলেও, ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। বাজেট ঘোষণার পর গ্যাসের ভর্তুকি নিয়ে নতুন কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় কি না, সেদিকে তাকিয়ে রয়েছেন সাধারণ মানুষ। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী উজ্জ্বলা যোজনার আওতায় থাকা উপভোক্তারা জানতে চান, ভর্তুকির অঙ্ক বাড়বে নাকি কমবে, অথবা নতুন কোনও সুবিধা যুক্ত হবে কি না।

উল্লেখ্য, উজ্জ্বলা যোজনার মাধ্যমে বহু দরিদ্র পরিবার প্রথমবারের মতো রান্নাঘরে এলপিজি গ্যাসের সুবিধা পেয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে ভর্তুকি কমানো ও পুনর্বিন্যাসের ফলে অনেক উপভোক্তার উপর আর্থিক চাপ বেড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তাই বাজেট ঘোষণার দিকে বিশেষ নজর রয়েছে এই শ্রেণির মানুষের।

কলকাতার জন্য কার্যকর নতুন দাম

তেল সংস্থাগুলির তরফে জানানো হয়েছে, এই নতুন দাম কলকাতার জন্য প্রযোজ্য। তবে অন্যান্য মহানগর ও শহরগুলিতেও অনুরূপ হারে দাম বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে। শহরভেদে কর ও পরিবহণ খরচের তারতম্যের কারণে দামে কিছুটা হেরফের হতে পারে।

মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়বে কোথায় কোথায়?

বাণিজ্যিক গ্যাসের দাম বাড়ার সরাসরি প্রভাব পড়বে—

এই সব ক্ষেত্রেই গ্যাস একটি অপরিহার্য জ্বালানি। ফলে খরচ বাড়লে পণ্যের দাম বা পরিষেবার মূল্য বাড়ানোর চাপ তৈরি হবে।

সাধারণ মানুষের উপর পরোক্ষ প্রভাব

যদিও গৃহস্থালি গ্যাসের দাম এই মুহূর্তে অপরিবর্তিত, তবু বাণিজ্যিক গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায়ও পড়তে পারে। রেস্তরাঁর খাবার, ক্যাটারিং পরিষেবা বা বাজারের তৈরি খাবারের দাম বাড়লে তা ভোক্তাদের পকেটেই চাপ ফেলবে।

বাজেট ঘোষণার দিকে তাকিয়ে দেশ

সব মিলিয়ে বাজেট পেশের দিনে এই মূল্যবৃদ্ধি অর্থনৈতিক বাস্তবতার এক কঠিন দিক তুলে ধরছে। একদিকে সরকার রাজকোষের ভারসাম্য রক্ষা করতে চাইছে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীরা চাইছেন কিছুটা স্বস্তি। গৃহস্থালি গ্যাসে ভর্তুকি, উজ্জ্বলা যোজনা কিংবা জ্বালানি নীতিতে কোনও নতুন ঘোষণা আসে কি না, সেটাই এখন দেখার।

শেষ পর্যন্ত বলা যায়, বাজেটের দিন বাণিজ্যিক গ্যাসের দাম বৃদ্ধি শুধু একটি অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং তার প্রভাব ছড়িয়ে পড়বে সমাজের বিভিন্ন স্তরে। গৃহস্থদের জন্য আপাতত স্বস্তি থাকলেও, ব্যবসায়ী ও পরিষেবা খাতের উপর যে নতুন চাপ তৈরি হল, তা আগামী দিনে বাজারে কী প্রভাব ফেলে—সেদিকেই এখন নজর।

এই পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছেন, বাণিজ্যিক গ্যাসের দাম বাড়ার প্রভাব ধাপে ধাপে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন খরচে ছাপ ফেলতে শুরু করবে। শহরের রেস্তরাঁ বা ক্যাফেতে খাওয়ার খরচ যেমন বাড়তে পারে, তেমনই বিয়েবাড়ি, সামাজিক অনুষ্ঠান কিংবা অফিসের ক্যাটারিং পরিষেবার খরচও বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ইতিমধ্যেই বহু ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, তাঁরা আপাতত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন, তবে দীর্ঘমেয়াদে দাম না বাড়িয়ে পরিষেবা দেওয়া কার্যত অসম্ভব হয়ে উঠবে।

বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা এই মূল্যবৃদ্ধিতে বেশি সমস্যায় পড়তে পারেন। বড় রেস্তরাঁ বা চেন আউটলেটের তুলনায় ছোট খাবারের দোকান বা স্থানীয় হোটেলগুলির মুনাফার পরিমাণ অনেক কম। সেখানে সিলিন্ডার পিছু প্রায় ৫০ টাকা অতিরিক্ত খরচ মানে মাস শেষে কয়েক হাজার টাকা বাড়তি ব্যয়। এই অতিরিক্ত খরচ সামলাতে না পেরে অনেকেই হয় খাবারের পরিমাণ কমাতে পারেন, নয়তো দাম বাড়ানোর পথে হাঁটতে বাধ্য হতে পারেন।

অন্যদিকে, অর্থনীতিবিদদের মতে, সরকার বর্তমানে একাধিক দিক সামলানোর চাপে রয়েছে। একদিকে রাজকোষের ঘাটতি নিয়ন্ত্রণ, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারের ওঠানামা—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। জ্বালানি তেলের দাম দীর্ঘদিন ধরে দেশের অর্থনীতির উপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। এলপিজির মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় জ্বালানির ক্ষেত্রে তাই সরকারকে অত্যন্ত সতর্ক সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে।

এই আবহেই গৃহস্থালি গ্যাসে ভর্তুকি ও প্রধানমন্ত্রী উজ্জ্বলা যোজনা নিয়ে প্রত্যাশা বাড়ছে। বহু সাধারণ মানুষ আশা করছেন, বাজেট ঘোষণায় অন্তত ভর্তুকি কাঠামোয় কোনও স্বস্তিদায়ক পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলতে পারে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য রান্নাঘরের খরচ নিয়ন্ত্রণে রাখা আজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। গ্যাসের দাম স্থিতিশীল থাকলেও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি ইতিমধ্যেই সংসারের বাজেট টালমাটাল করে দিয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, যদি ভবিষ্যতে বাণিজ্যিক গ্যাসের দাম আরও বাড়ে, তাহলে তার প্রভাব শুধু খাবারের বাজারেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। বিভিন্ন পরিষেবা খাত, ক্ষুদ্র শিল্প এবং উৎপাদন ক্ষেত্রেও তার ঢেউ লাগতে পারে। ফলে সামগ্রিকভাবে মূল্যস্ফীতির উপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

সব মিলিয়ে বলা যায়, বাজেট পেশের দিনে বাণিজ্যিক গ্যাসের দাম বৃদ্ধি দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতার একটি স্পষ্ট ছবি তুলে ধরেছে। গৃহস্থালি গ্যাসে আপাতত স্বস্তি থাকলেও, এই সিদ্ধান্তের পরোক্ষ প্রভাব কতটা গভীর হবে, তা আগামী দিনগুলিতেই স্পষ্ট হবে। সরকার বাজেটে কী বার্তা দেয়, কী পদক্ষেপ নেয় এবং সাধারণ মানুষের প্রত্যাশার কতটা প্রতিফলন ঘটে—সেদিকেই এখন তাকিয়ে রয়েছে গোটা দেশ।

Preview image