Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

প্রতিমা নিরঞ্জনে ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ, সামশেরগঞ্জ-জঙ্গিপুরে উপচে পড়ল ভিড়

ঐতিহ্য মেনে প্রতিমা নিরঞ্জনকে কেন্দ্র করে সামশেরগঞ্জ ও জঙ্গিপুরে আয়োজিত হল জমজমাট নৌকা বাইচ। দিনভর গঙ্গার বুকে প্রতিযোগিতা ঘিরে স্থানীয় যুবক-যুবতীদের মধ্যে ছিল প্রবল উন্মাদনা। বাইচ দেখতে নদীর পাড়ে ভিড় জমালেন অসংখ্য মানুষ।

দুর্গাপুজোর শেষ দিনেও উৎসবের আমেজে মাতল সামশেরগঞ্জ ও জঙ্গিপুর। প্রতিমা নিরঞ্জনকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য মেনে আয়োজিত হল নৌকা বাইচ। নদীর বুকে নৌকা বাইচ দেখতে সকাল থেকেই নদীর দুই পাড়ে ভিড় জমাতে শুরু করেন স্থানীয় মানুষ। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সেই ভিড় আরও বাড়তে থাকে। প্রতিযোগীদের উৎসাহ দিতে নদীর পাড়ে উপস্থিত দর্শকদের মধ্যেও দেখা যায় প্রবল উন্মাদনা।

দুর্গাপুজোর আনন্দের সঙ্গে এই অঞ্চলের নৌকা বাইচের ঐতিহ্য বহুদিনের। প্রতিমা নিরঞ্জনের দিন নদীপথে বিসর্জনের পাশাপাশি নৌকা বাইচকে ঘিরে তৈরি হয় আলাদা উৎসবের আবহ। ঢাকের বাদ্য, মানুষের উচ্ছ্বাস এবং নদীর বুকে দ্রুতগতিতে ছুটে চলা নৌকা—সব মিলিয়ে এদিন সামশেরগঞ্জ ও জঙ্গিপুরের নদীপাড় হয়ে ওঠে উৎসবের কেন্দ্রবিন্দু।

দিনভর চলা নৌকা বাইচে স্থানীয় যুবক-যুবতীদের অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো। প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া নৌকার মাঝিদের মধ্যে ছিল জয়ের জন্য তীব্র লড়াই। নদীর স্রোতকে উপেক্ষা করে ছন্দ মিলিয়ে দাঁড় টেনে নৌকাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য উপভোগ করেন দর্শকরা। প্রতিটি নৌকা এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নদীর দুই পাড় থেকে ভেসে আসে হাততালি ও উৎসাহের শব্দ।

স্থানীয়দের কাছে নৌকা বাইচ শুধুমাত্র একটি প্রতিযোগিতা নয়, এটি তাঁদের দীর্ঘদিনের লোকসংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অংশ। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে নদীকেন্দ্রিক এই এলাকায় নৌকা বাইচের সঙ্গে মানুষের আবেগ জড়িয়ে রয়েছে। দুর্গাপুজোর বিসর্জনের সঙ্গে এই আয়োজন যুক্ত হওয়ায় উৎসবের আনন্দ আরও কয়েকগুণ বেড়ে যায়।

এদিন সকাল থেকেই নদীর ঘাট ও আশপাশের এলাকায় মানুষের আনাগোনা শুরু হয়। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে অনেকেই নৌকা বাইচ দেখতে নদীর পাড়ে হাজির হন। শিশু থেকে প্রবীণ—সব বয়সের মানুষের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। অনেকে আবার দূরের এলাকা থেকেও এই ঐতিহ্যবাহী প্রতিযোগিতা দেখতে আসেন।

নদীর পাড়ে দর্শকদের ভিড় সামলাতে স্থানীয়ভাবে বিভিন্ন ব্যবস্থাও করা হয়। প্রতিমা নিরঞ্জনের সময় যাতে কোনও ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে, সেদিকেও নজর রাখা হয়। একই সঙ্গে নদীতে নৌকা চলাচল ও প্রতিযোগিতার সময় নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্ব পায়।

নৌকা বাইচের সময় প্রতিযোগীদের মধ্যে দেখা যায় অসাধারণ সমন্বয়। একসঙ্গে দাঁড় টানার ছন্দই নৌকার গতি বাড়িয়ে দেয়। নৌকার মাঝিদের একাগ্রতা এবং পরিশ্রম দর্শকদের বিশেষভাবে আকর্ষণ করে। প্রতিযোগিতা যত এগোয়, ততই বাড়তে থাকে উত্তেজনা। কোনও নৌকা সামান্য এগিয়ে গেলে তার সমর্থকদের মধ্যে শুরু হয় উচ্ছ্বাস, আবার অন্য নৌকা এগিয়ে এলে বদলে যায় নদীর পাড়ের পরিবেশ।

দুর্গাপুজোর বিসর্জনকে কেন্দ্র করে এমন লোকজ আয়োজন বাংলার গ্রামীণ ও নদীকেন্দ্রিক সংস্কৃতির অন্যতম পরিচয়। আধুনিক সময়ে নানা ধরনের বিনোদনের মাধ্যম তৈরি হলেও ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচের জনপ্রিয়তা এখনও কমেনি। বরং উৎসবের সঙ্গে এই ধরনের স্থানীয় সংস্কৃতিকে যুক্ত করার ফলে নতুন প্রজন্মও ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে।

সামশেরগঞ্জ ও জঙ্গিপুরের মানুষের কাছে এই আয়োজন তাই শুধু প্রতিমা বিসর্জনের আনুষ্ঠানিকতা নয়। এটি এক ধরনের সামাজিক মিলনমেলাও। বিভিন্ন এলাকার মানুষ একই জায়গায় এসে নৌকা বাইচ উপভোগ করেন। পরিচিত-পরিজনদের সঙ্গে দেখা হয়, স্থানীয় ব্যবসায়ীদেরও বাড়তি ব্যস্ততা দেখা যায়। নদীর পাড়ে বিভিন্ন অস্থায়ী দোকান বসায় ছোট ব্যবসায়ীরাও উৎসবের সময়ে বিক্রির সুযোগ পান।

নৌকা বাইচকে কেন্দ্র করে স্থানীয় যুব সমাজের উৎসাহও ছিল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার পাশাপাশি অনেকেই সংগঠনের কাজে যুক্ত হন। নৌকা প্রস্তুত করা, প্রতিযোগীদের অনুশীলন, নদীর ঘাটে দর্শকদের জন্য ব্যবস্থা করা—বিভিন্ন কাজেই স্থানীয়দের অংশগ্রহণ দেখা যায়।

এই ধরনের আয়োজনের অন্যতম বড় দিক হল দলগত সহযোগিতা। একটি নৌকা সফলভাবে প্রতিযোগিতা শেষ করতে মাঝিদের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া ও সমন্বয় প্রয়োজন। ফলে নৌকা বাইচ শুধুমাত্র শারীরিক দক্ষতার পরীক্ষা নয়, একই সঙ্গে দলগত ঐক্য ও সহযোগিতারও প্রতীক।

প্রতিমা নিরঞ্জনের সময় নদীর ঘাটে ভক্তদের ভিড়ও ছিল চোখে পড়ার মতো। পুজোর কয়েক দিনের আনন্দ শেষে দেবীকে বিদায় জানানোর আবেগঘন মুহূর্তের সঙ্গে নৌকা বাইচের উচ্ছ্বাস মিশে যায়। একদিকে বিসর্জনের বিষণ্ণতা, অন্যদিকে নৌকা বাইচের প্রতিযোগিতামূলক উত্তেজনা—দুইয়ের মিশেলে তৈরি হয় এক অনন্য পরিবেশ।

স্থানীয়দের মতে, এই ঐতিহ্য ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও ধরে রাখা প্রয়োজন। নৌকা বাইচের মতো লোকজ সংস্কৃতি হারিয়ে গেলে একটি এলাকার ইতিহাস ও সামাজিক স্মৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশও হারিয়ে যেতে পারে। তাই উৎসবের সঙ্গে ঐতিহ্যবাহী এই আয়োজনকে যুক্ত রাখার প্রয়োজনীয়তার কথাও উঠে আসে।

দর্শকদের অনেকেই মোবাইল ফোনে নৌকা বাইচের ছবি ও ভিডিও ধারণ করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়ে নদীর বুকে প্রতিযোগিতার বিভিন্ন মুহূর্ত। ফলে স্থানীয় গণ্ডি পেরিয়ে এই ঐতিহ্যবাহী আয়োজন আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে যায়।

সামশেরগঞ্জ ও জঙ্গিপুরের এই নৌকা বাইচ আবারও প্রমাণ করল, বাংলার উৎসব শুধু পুজোর আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। স্থানীয় ইতিহাস, লোকসংস্কৃতি, নদী এবং মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে উৎসবের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। সেই সম্পর্কেরই একটি উজ্জ্বল উদাহরণ এই ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ।

দিনভর প্রতিযোগিতা, নদীর দুই পাড়ে মানুষের ভিড়, প্রতিযোগীদের উৎসাহ এবং প্রতিমা নিরঞ্জনের আবেগ—সব মিলিয়ে সামশেরগঞ্জ ও জঙ্গিপুরে এদিন তৈরি হয়েছিল এক অন্যরকম উৎসবের পরিবেশ। দুর্গাপুজোর শেষ মুহূর্তেও তাই উৎসবের রেশ কাটেনি। বরং ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচকে ঘিরে নতুন করে প্রাণ ফিরে পেয়েছিল নদীপাড়ের জনজীবন।

সব মিলিয়ে, প্রতিমা নিরঞ্জনকে কেন্দ্র করে সামশেরগঞ্জ ও জঙ্গিপুরের এই নৌকা বাইচ শুধু একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়, বরং স্থানীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বছরের পর বছর ধরে চলে আসা এই আয়োজন ভবিষ্যতেও একইভাবে মানুষের উৎসাহ ও অংশগ্রহণে আরও সমৃদ্ধ হবে—এমনটাই প্রত্যাশা স্থানীয়দের।

সামশেরগঞ্জ ও জঙ্গিপুরের নৌকা বাইচের এই আয়োজনকে ঘিরে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা স্থানীয় জীবনযাত্রা। মুর্শিদাবাদের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের মানুষের সঙ্গে নদীর সম্পর্ক বহু পুরনো। নদী তাঁদের জীবিকার উৎস, যাতায়াতের পথ এবং সামাজিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সেই নদীকে ঘিরেই বছরের বিশেষ সময়ে যখন ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচের আয়োজন করা হয়, তখন তা স্থানীয় মানুষের কাছে এক আবেগঘন অভিজ্ঞতা হয়ে ওঠে।

news image
আরও খবর

দুর্গাপুজোর বিসর্জনের দিন নৌকা বাইচের আয়োজন হওয়ায় এই উৎসবের গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। পুজোর কয়েক দিনের আনন্দ, মণ্ডপে মণ্ডপে ঘোরাঘুরি, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপভোগ করার পর বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় শারদোৎসবের আনুষ্ঠানিক পর্ব। কিন্তু সামশেরগঞ্জ ও জঙ্গিপুরের মতো এলাকায় নৌকা বাইচের আয়োজন সেই বিদায়ের দিনটিকেও বিশেষ আকর্ষণীয় করে তোলে।

অনেকের কাছে এই দিনটি শুধু প্রতিমা নিরঞ্জন দেখার দিন নয়, বরং প্রতিবছরের পরিচিত একটি ঐতিহ্যের সঙ্গে আবারও যুক্ত হওয়ার উপলক্ষ। যাঁরা ছোটবেলা থেকে নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে নৌকা বাইচ দেখে বড় হয়েছেন, তাঁদের কাছে এই আয়োজনের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বহু স্মৃতি। সময়ের সঙ্গে মানুষের জীবনযাত্রা বদলালেও এই ধরনের স্থানীয় উৎসবের প্রতি টান এখনও অটুট।

বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের অংশগ্রহণ এই ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। নৌকা বাইচে অংশ নেওয়া থেকে শুরু করে আয়োজনের বিভিন্ন কাজে সহযোগিতা করা—সব ক্ষেত্রেই স্থানীয় যুবকদের উৎসাহ এই সংস্কৃতিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করে। তাঁদের অংশগ্রহণের ফলে প্রবীণদের কাছ থেকে পাওয়া অভিজ্ঞতা ও ঐতিহ্য পরবর্তী প্রজন্মের কাছেও পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হয়।

নৌকা বাইচের প্রতিযোগিতায় শুধু দ্রুতগতিতে নৌকা চালালেই হয় না, প্রয়োজন সঠিক ছন্দ, শারীরিক সক্ষমতা এবং দলগত সমন্বয়। মাঝিদের একসঙ্গে দাঁড় টানতে হয়। সামান্য অসামঞ্জস্যও নৌকার গতিতে প্রভাব ফেলতে পারে। তাই প্রতিযোগিতার প্রস্তুতির ক্ষেত্রেও অনুশীলন ও পারস্পরিক বোঝাপড়ার গুরুত্ব রয়েছে। নদীর বুকে নৌকার গতির সঙ্গে সঙ্গে দর্শকেরা এই দলগত দক্ষতারও সাক্ষী হন।

নদীর দুই পাড়ে দর্শকদের উপস্থিতি এই আয়োজনকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে। কেউ পরিবারের সদস্যদের নিয়ে আসেন, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে প্রতিযোগিতা উপভোগ করেন। অনেকেই নদীর পাড়ে পরিচিতদের সঙ্গে দেখা করেন। ফলে নৌকা বাইচের দিনটি স্থানীয় মানুষের সামাজিক যোগাযোগ ও মিলনমেলার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ হয়ে ওঠে।

এই ধরনের আয়োজন স্থানীয় অর্থনীতির ক্ষেত্রেও কিছুটা ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। দর্শকদের আনাগোনা বাড়লে আশপাশের দোকান, খাবারের স্টল এবং ছোট ব্যবসায়ীদের কাছে অতিরিক্ত ক্রেতা আসার সুযোগ তৈরি হয়। তবে প্রকৃত আর্থিক প্রভাব কতটা, তা নির্দিষ্ট তথ্য ছাড়া বলা সম্ভব নয়। তবুও উৎসবকে কেন্দ্র করে মানুষের সমাগম স্থানীয় বাজারে বাড়তি ব্যস্ততা তৈরি করতে পারে।

ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচের সঙ্গে স্থানীয় পর্যটনের সম্ভাবনাও জড়িয়ে রয়েছে। বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে নদীকেন্দ্রিক উৎসব ও লোকজ ক্রীড়ার প্রতি মানুষের আগ্রহ রয়েছে। সঠিক প্রচার, নিরাপদ দর্শনব্যবস্থা এবং ঐতিহ্যের পরিচিতি তুলে ধরার মাধ্যমে ভবিষ্যতে এই ধরনের আয়োজন আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছতে পারে। তবে সে ক্ষেত্রে স্থানীয় সংস্কৃতির নিজস্ব বৈশিষ্ট্য বজায় রাখা জরুরি।

মুর্শিদাবাদ ঐতিহাসিক স্থাপত্য, প্রাচীন জনপদ এবং সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের জন্য পরিচিত। জেলার বিভিন্ন এলাকার নিজস্ব উৎসব ও সামাজিক প্রথা রয়েছে। সামশেরগঞ্জ ও জঙ্গিপুরের নৌকা বাইচ সেই স্থানীয় সংস্কৃতির একটি উল্লেখযোগ্য দিক হিসেবে মানুষের আগ্রহ আকর্ষণ করে। এমন আয়োজনের মাধ্যমে জেলার সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য সম্পর্কে নতুন প্রজন্ম এবং বাইরের এলাকার মানুষ আরও বেশি জানতে পারেন।

তবে বিপুল জনসমাগমের ক্ষেত্রে নিরাপত্তার বিষয়টি কখনও অবহেলা করা যায় না। নদীর পাড়ে দর্শকদের ভিড়, নৌকার চলাচল এবং প্রতিমা নিরঞ্জনের সময় বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন। দর্শকদের নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখা, নদীতে নামার ক্ষেত্রে নিয়ম মেনে চলা এবং আয়োজকদের নির্দেশ অনুসরণ করা জরুরি। নৌকা বাইচের মতো জলকেন্দ্রিক অনুষ্ঠানে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তার ব্যবস্থা থাকলে মানুষ আরও নিশ্চিন্তে উৎসব উপভোগ করতে পারেন।

পরিবেশ রক্ষার বিষয়টিও এই ধরনের আয়োজনের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণভাবে যুক্ত। নদীকে কেন্দ্র করে উৎসব পালিত হলে নদীর জল ও আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার রাখার দায়িত্ব সকলের। প্রতিমা নিরঞ্জনের পর বর্জ্য সংগ্রহ, প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো এবং নদীর পাড় পরিষ্কার রাখার মতো উদ্যোগ ভবিষ্যতে এই ঐতিহ্যকে আরও পরিবেশবান্ধব করে তুলতে পারে।

সামশেরগঞ্জ ও জঙ্গিপুরের ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচের মূল আকর্ষণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ। কোনও আয়োজনের জনপ্রিয়তা শুধু দর্শকের সংখ্যায় সীমাবদ্ধ থাকে না; তার সঙ্গে মানুষের আবেগ, স্থানীয় পরিচিতি এবং দীর্ঘদিনের অভ্যাসও জড়িয়ে থাকে। প্রতিমা নিরঞ্জনের দিনে নৌকা বাইচ দেখতে মানুষের ভিড় সেই সাংস্কৃতিক টানেরই পরিচয় বহন করে।

এই উৎসব নতুন প্রজন্মকে স্থানীয় ইতিহাসের সঙ্গে পরিচিত করারও একটি সুযোগ। পরিবারের প্রবীণ সদস্যরা যখন তাঁদের ছোটবেলার নৌকা বাইচের স্মৃতি ভাগ করে নেন, তখন পরবর্তী প্রজন্মের কাছে ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা স্পষ্ট হয়। স্কুল-কলেজের পড়ুয়া এবং স্থানীয় সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলিও চাইলে এমন লোকজ ক্রীড়ার ইতিহাস নথিবদ্ধ করার উদ্যোগ নিতে পারে। এতে ভবিষ্যতের জন্য স্থানীয় সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংরক্ষিত থাকবে।

দুর্গাপুজোর বিসর্জন বাংলার মানুষের কাছে আবেগের মুহূর্ত। কয়েক দিনের আনন্দ শেষে দেবীকে বিদায় জানানোর মধ্যে যেমন বিষাদের ছোঁয়া থাকে, তেমনই থাকে আগামী বছরের জন্য অপেক্ষা। সামশেরগঞ্জ ও জঙ্গিপুরে সেই আবেগের সঙ্গে নৌকা বাইচের উত্তেজনা মিশে গিয়ে একটি স্বতন্ত্র পরিবেশ তৈরি করে। নদীর বুকে প্রতিযোগিতা এবং নদীর পাড়ে মানুষের সমাগম—দুই মিলিয়ে বিসর্জনের দিনটি হয়ে ওঠে স্মরণীয়।

স্থানীয় ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখতে নিয়মিত আয়োজনের পাশাপাশি তার ইতিহাস সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোও প্রয়োজন। নৌকা বাইচ কবে থেকে এই অঞ্চলে প্রচলিত, কীভাবে প্রতিযোগিতার আয়োজন হয় এবং স্থানীয় মানুষের জীবনে এর ভূমিকা কী—এসব তথ্য নির্ভরযোগ্যভাবে সংগ্রহ করা গেলে ভবিষ্যতে এই উৎসব নিয়ে আরও বিস্তারিত প্রতিবেদন তৈরি করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি প্রবীণ মাঝি ও স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিজ্ঞতা নথিবদ্ধ করলেও লোকসংস্কৃতির মূল্যবান উপাদান সংরক্ষিত থাকবে।

সব মিলিয়ে, সামশেরগঞ্জ ও জঙ্গিপুরে প্রতিমা নিরঞ্জনকে কেন্দ্র করে ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ শুধু একটি প্রতিযোগিতা নয়। এটি নদীকেন্দ্রিক জীবনযাত্রা, সামাজিক সম্প্রীতি, লোকসংস্কৃতি এবং উৎসবের সম্মিলিত প্রকাশ। দিনভর নৌকা বাইচ ঘিরে মানুষের উন্মাদনা ও নদীর দুই পাড়ে উপচে পড়া ভিড় প্রমাণ করে, আধুনিক বিনোদনের যুগেও স্থানীয় ঐতিহ্যের আকর্ষণ অটুট রয়েছে।

দুর্গাপুজোর বিসর্জন পর্ব শেষ হলেও এই আয়োজনের স্মৃতি স্থানীয় মানুষের মনে থেকে যায়। আগামী বছরও একইভাবে মানুষ নদীর পাড়ে জড়ো হবেন, নৌকা বাইচ দেখবেন এবং নিজেদের ঐতিহ্যের সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হবেন—এমন প্রত্যাশাই স্বাভাবিক। সামশেরগঞ্জ ও জঙ্গিপুরের এই নৌকা বাইচ তাই বাংলার লোকজ সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।

উৎসবের আনন্দের পাশাপাশি ঐতিহ্য, পরিবেশ ও নিরাপত্তার দিকে নজর রেখে এই ধরনের আয়োজন চালিয়ে যাওয়া গেলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মও তার স্বাদ পাবে। নদীর সঙ্গে মানুষের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক এবং দুর্গাপুজোর আবেগকে একসূত্রে বেঁধে রাখার এই প্রচেষ্টা বাংলার সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে আরও সমৃদ্ধ করতে পারে।

Preview image