Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

RBI গোল্ড বন্ড আমার বিনিয়োগ কি সত্যিই ১০ হাজার টাকা বেড়েছে?

RBI এর সোভরেন গোল্ড বন্ড বর্তমানে ভারতের অন্যতম জনপ্রিয় এবং নিরাপদ বিনিয়োগ মাধ্যম হিসেবে দ্রুত পরিচিতি পাচ্ছে। অনেকেই জানেন না যে অল্প টাকায়ও এই বন্ডে বিনিয়োগ করে দীর্ঘমেয়াদে অত্যন্ত লাভজনক রিটার্ন পাওয়া যায়। যেমন, কেউ যদি কয়েক বছর আগে মাত্র ৩ হাজার টাকা বিনিয়োগ করে থাকতেন, আজ সেই বিনিয়োগের মূল্য বেড়ে প্রায় ১৩ হাজার টাকা বা তারও বেশি হতে পারে। এই বৃদ্ধি শুধুমাত্র স্বর্ণের দামের স্বাভাবিক বৃদ্ধি নয়; সঙ্গেই রয়েছে সরকার নির্ধারিত অতিরিক্ত ২.৫% সুদ, যা প্রতি বছর বন্ডধারীদের প্রদান করা হয়। অর্থাৎ, স্বর্ণের বাজারদরের পাশাপাশি সুদের দ্বৈত সুবিধায় বিনিয়োগকারীর সম্পদ বহুগুণে বেড়ে যায়। SGB-এর বিশেষত্ব হলো এটি সম্পূর্ণ সরকার-সমর্থিত একটি স্কিম, তাই কোনো ধরনের নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি নেই। এখানে বাস্তব স্বর্ণ কেনার মতো সংরক্ষণ, চুরি বা বিশুদ্ধতার ঝামেলাও নেই। তাছাড়া এই বন্ডে বিনিয়োগ করলে পুঁজিগত লাভের (Capital Gains) উপর করছাড় পাওয়া যায় যদি বন্ড ৮ বছর পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত ধরে রাখা হয়। অর্থাৎ, স্বর্ণের দাম যতই বৃদ্ধি পাক, তার উপর কোনো কর দিতে হয় না যা সাধারণ স্বর্ণ কেনার ক্ষেত্রে পাওয়া যায় না। বিনিয়োগকারীদের আরেকটি আকর্ষণীয় সুবিধা হলো, এই বন্ড ৫ বছর পর থেকে ব্যাংক বা বাজারের মাধ্যমে বিক্রি করা যায়। ফলে জরুরি সময়ে নগদ টাকার প্রয়োজন হলে বন্ড সহজেই নগদে রূপান্তর করা সম্ভব। দামও নির্ধারিত হয় বাজারের স্বর্ণমূল্যের ভিত্তিতে, তাই তখনও ভালো রিটার্ন পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

ভারতের আর্থিক বাজারে বিনিয়োগের অসংখ্য পথ রয়েছে, কিন্তু এসব পথের মধ্যেও এমন কয়েকটি মাধ্যম আছে যেগুলো দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা, নিরাপত্তা এবং উচ্চ রিটার্ন এই তিনটি সুবিধাই একসঙ্গে দিতে পারে। তেমনই একটি বিনিয়োগ মাধ্যম হলো RBI-এর সোভরেন গোল্ড বন্ড বা সংক্ষেপে SGB। যারা স্বর্ণে বিনিয়োগ করতে চান, কিন্তু বাস্তব স্বর্ণ কেনার ঝামেলা, নিরাপত্তা, বিশুদ্ধতা, সংরক্ষণ বা অতিরিক্ত মেকিং চার্জের মতো খরচে যেতে চান না, তাদের জন্য এই বন্ড একটি অসাধারণ বিকল্প। অনেকেই জানেন না যে মাত্র ৩ হাজার টাকার মতো ছোট একটি বিনিয়োগ সময়ের ব্যবধানে কীভাবে ১০ হাজার টাকা বা তারও বেশি বাড়তি মুনাফা এনে দিতে পারে। বাস্তবতা হলো স্বর্ণের বিশ্ববাজারে দামের নিরবচ্ছিন্ন বৃদ্ধি, সরকারের প্রদত্ত সুদ এবং করছাড় এই তিনটি কারণে SGB বিনিয়োগ ভারতের ইতিহাসে অন্যতম লাভজনক বিনিয়োগ মাধ্যম হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে।

মানুষের মধ্যে স্বর্ণের প্রতি আকর্ষণ নতুন নয়। প্রাচীনকাল থেকেই স্বর্ণ নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা এবং সম্পদের পরিচয় হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। অর্থনৈতিক সংকটের সময়েও স্বর্ণের মূল্য অটুট থাকে এবং অনেক সময় অন্যান্য সম্পদের তুলনায় দ্রুত ওঠে। ঠিক এই কারণেই স্বর্ণ দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগের জন্য নিরাপদ বলে ধরা হয়। কিন্তু বাস্তব স্বর্ণ কেনার অসুবিধাও কম নয়। গয়না কিনলে মেকিং চার্জ দিতে হয়, যা কখনো কখনো ১৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। বিশুদ্ধতার ঝুঁকি রয়েছে, আবার বাড়িতে রেখে স্বর্ণ নিরাপদ রাখা অনেকের পক্ষে কঠিন। ব্যাংকের লকার নিতে গেলে বছরে ফি দিতে হয়। এগুলো ছাড়াও গয়না বিক্রি করতে গেলে প্রায়ই ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়, কারণ বিক্রির সময় মেকিং চার্জ ফেরত পাওয়া যায় না। এই সব সমস্যা থেকে মুক্তি দিয়েই RBI বাজারে এনেছে সোভরেন গোল্ড বন্ড।

SGB মূলত ডিজিটাল স্বর্ণের একটি রূপ। এখানে কোনো বাস্তব স্বর্ণ কেনা হয় না, বরং সরকার নির্ধারিত বাজারভিত্তিক মূল্যে বন্ড ইস্যু করা হয়। এই বন্ডে বিনিয়োগ করলে আপনি স্বর্ণের দামের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকেন। অর্থাৎ স্বর্ণের দাম বাড়লে আপনার বন্ডের মূল্যও বৃদ্ধি পায়। কিন্তু এর পাশাপাশি আরও একটি বড় সুবিধা রয়েছে, যা বাস্তব স্বর্ণে কখনোই পাওয়া যায় না। তা হলো প্রতি বছর ২.৫ শতাংশ হারে সুদ। কেউ যদি ৩ হাজার টাকা বিনিয়োগ করে থাকেন, তাহলে সেই টাকার ওপর প্রতি বছর সুদ যোগ হয়। যদিও সুদের পরিমাণ তত বড় নয়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এই সুদও আপনার মোট আয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে দাঁড়ায়। আর সুদ প্রতি ছয় মাস অন্তর সরাসরি আপনার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা হয়।

এটি সত্য যে কয়েক বছর আগে যদি কেউ ৩ হাজার টাকার মতো বিনিয়োগ SGB তে করতেন, তাহলে আজ সেই বন্ডের মূল্য বেড়ে ১৩ হাজার বা তার কাছাকাছি হয়ে যেতে পারত। কারণ গত এক দশকে স্বর্ণের দাম ভারতীয় বাজারে গড়ে ৮ থেকে ১২ শতাংশ হারে বেড়েছে, এবং কিছু বছর এমনও গেছে যখন বৃদ্ধি ১৫ শতাংশ ছাড়িয়েছে। এই বৃদ্ধি কোনো এক বছরের ফল নয়, বরং বহু বছরের ধারাবাহিক মূল্যবৃদ্ধির ফল। যখন আপনি SGB কিনে তা ধরে রাখেন, এই মূল্যবৃদ্ধির প্রতিটি ধাপ আপনার বন্ডের মূল্যে যুক্ত হয়। তাই সময় যত বাড়ে, বন্ডের মূল্যও তত বৃদ্ধি পায়।

স্বর্ণের দামের এই ধারাবাহিক বৃদ্ধির পেছনে নানা আন্তর্জাতিক কারণ রয়েছে। বিশ্ববাজারে রাজনৈতিক অস্থিরতা, যুদ্ধ, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, বৈদেশিক মুদ্রার ওঠানামা এসব কিছুর প্রভাব পড়ে স্বর্ণের দামে। যখন বিশ্ব অর্থনীতি সংকটে পড়ে, তখন বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ সম্পদ হিসেবে স্বর্ণের দিকে ঝুঁকে পড়েন। এতে স্বর্ণের চাহিদা বাড়ে এবং দামও বাড়ে। ফলে যারা দীর্ঘমেয়াদে স্বর্ণে বিনিয়োগ করেন, তারা এ ধরনের বৃদ্ধির সুফল পান। বাস্তব গয়নার ক্ষেত্রে এই সুবিধা পুরোপুরি পাওয়া না গেলেও SGB তে বিনিয়োগ করলে বাজারদরের এই বৃদ্ধির পূর্ণ সুবিধা পাওয়া যায়।

SGB এর আরেকটি বড় আকর্ষণ হলো করছাড়। যদি কেউ বন্ডটি ৮ বছর মেয়াদ পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত ধরে রাখেন, তাহলে বন্ড বিক্রির সময় প্রাপ্ত লাভের ওপর কোনো পুঁজি লাভ কর  দিতে হয় না। অর্থাৎ আপনি যদি ৩ হাজার টাকার বন্ড কিনে তা ১৩ হাজার টাকা দামে বিক্রি করেন, তাহলে এই ১০ হাজার টাকার লাভ পুরোটা আপনার নিজের কাছে থাকবে। করছাড়ের এই সুবিধা ভারতের অন্য কোনো বিনিয়োগ স্কিমে নেই। বাস্তব স্বর্ণ বিক্রি করলেও আপনাকে কর দিতে হয়, কিন্তু SGB তে এই করমুক্তির সুবিধা বিনিয়োগকারীদের আরও বেশি আকৃষ্ট করে।

news image
আরও খবর

বিনিয়োগকারীদের অনেকেই মনে করেন বন্ড বলতে হয়তো বাজারের ওঠানামায় টাকা আটকে যাওয়ার ভয় থেকে যাবে। তবে SGBএর ক্ষেত্রে বিষয়টি আলাদা। এই বন্ড ৫ বছর পর থেকে আগাম বিক্রি করা যায়। যদি কারও জরুরি প্রয়োজন দেখা দেয়, তাহলে ব্যাংক বা স্টক এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে বন্ড বিক্রি করা সম্ভব। মূল্য নির্ধারিত হয় বাজারের স্বর্ণমূল্যের ওপর ভিত্তি করে, তাই বিক্রির সময়ও ভালো রিটার্ন পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। আবার কেউ চাইলে বন্ডটি পরিপক্ব হওয়া পর্যন্ত ধরে রাখতে পারেন, যেখানে সরকার মূল অর্থ ফেরত দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শেষ দিনের স্বর্ণের মূল্য অনুযায়ী লাভও দেয়।

ডিজিটাল বিনিয়োগের যুগে SGB আর্থিক স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তার দিক থেকেও অত্যন্ত কার্যকর। এটি পুরোপুরি ভারতের রিজার্ভ ব্যাংক এবং কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনে পরিচালিত হয়, তাই এখানে কোনো ধরনের প্রতারণা বা ঝুঁকির আশঙ্কা নেই। আপনি যত টাকা বিনিয়োগ করেন, তার রেকর্ড সরকারী ব্যবস্থায় সংরক্ষিত থাকে এবং বিনিয়োগের প্রমাণপত্রও ইমেইলের মাধ্যমে হাতে পৌঁছে যায়। ফলে ভবিষ্যতে কোনো বিরোধ বা সমস্যার আশঙ্কা থাকে না।

SGB এর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এটি সাধারণ মানুষের কাছে স্বর্ণে বিনিয়োগকে আরও সহজ করে তুলেছে। আগে স্বর্ণে বিনিয়োগ মানে ছিল দোকানে গিয়ে গয়না কিনে আনা, লকারে রাখা বা বাড়িতে রেখে চুরি হওয়ার ভয়। কিন্তু এখন মোবাইল থেকেই কয়েকটি ক্লিকের সাহায্যে স্বর্ণে বিনিয়োগ করা যায়। আইসিআইসিআই, এসবিআই, এইচডিএফসি, পেটিএম প্রায় সব ব্যাংক ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মেই SGB কেনা সম্ভব। যাদের কাছে বিনিয়োগের অভিজ্ঞতা কম, তারাও সহজেই এই বন্ড কিনতে পারেন।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য হলো, যারা নিয়মিত স্বর্ণ কেনেন, তারা যদি গয়নার বদলে SGB-তে বিনিয়োগ করতেন, তাহলে একই সময়ে অনেক বেশি রিটার্ন পেতেন। কারণ গয়না বিক্রি করলে মেকিং চার্জ ফেরত পাওয়া যায় না, কিন্তু SGB তে স্বর্ণের দাম বাড়লে পুরো বৃদ্ধির পরিমাণটি বিনিয়োগকারীর হাতে আসে। এমনকি কেউ যদি প্রতি বছর সামান্য করে SGB কিনে রাখতে পারেন, তাহলে কয়েক বছরের মধ্যে একটি বড় পরিমাণ স্বর্ণ সম্পদের মালিক হয়ে যেতে পারেন, যা সহজে নগদে রূপান্তরযোগ্য।

সবচেয়ে বড় বিষয় হলো মানুষ সাধারণত স্বর্ণ কিনে বাড়িতে রেখে দেন, ব্যবহারও খুব কম করেন, আর এর মধ্যে স্বর্ণের দাম যখন বাড়ে তখন তারা লাভের সুযোগ হাতছাড়া করেন। কিন্তু SGB তে বিনিয়োগ করলে স্বর্ণ শুধু থেকে যায় না, বরং সেটি সুদও আয় করে। অর্থাৎ স্বর্ণ ধরা থাকলেই টাকা আসে। বাস্তব স্বর্ণে এই সুবিধা নেই।

সব মিলিয়ে দেখা যায় RBI এর সোভরেন গোল্ড বন্ড সাধারণ বিনিয়োগকারীর জন্য এক অনন্য সুযোগ নিয়ে এসেছে। ৩ হাজার টাকার মতো ছোট একটি বিনিয়োগ সময়ের সঙ্গে বাড়তে বাড়তে ১০ হাজার, ১৫ হাজার কিংবা তারও বেশি হতে পারে। যারা দীর্ঘমেয়াদে আর্থিক নিরাপত্তা চান, সম্পদ তৈরি করতে চান এবং ঝুঁকি ছাড়াই সুদ ও মূল্যবৃদ্ধির সুবিধা পেতে চান, তাদের জন্য SGB সত্যিই একটি বুদ্ধিমান ও লাভজনক সিদ্ধান্ত। সময়ই প্রমাণ করেছে যে যারা আগে এ ধরনের বিনিয়োগ করেছেন, তারা আজ উল্লেখযোগ্য লাভের অংশীদার। তাই অনেকেই এখন নতুন করে ভাবছেন স্বর্ণ কিনলে কেন গয়না? বরং RBI গোল্ড বন্ডেই কেন নয়!

Preview image