Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

অতিরিক্ত ধূমপানে কি টাক পড়ে চুল ঝরার সঙ্গে ধূমপানের গভীর সম্পর্ক ব্যাখ্যা করলেন বিজ্ঞানীরা

অতিরিক্ত ধূমপান শরীরে রক্ত সঞ্চালন কমিয়ে দেয় ও চুলের গোড়ার ক্ষতি করে। বিজ্ঞানীদের মতে ধূমপানের সঙ্গে চুল পড়া ও টাকের ঝুঁকির সরাসরি যোগ রয়েছে।

অতিরিক্ত ধূমপান শরীরের জন্য ক্ষতিকর এই কথা প্রায় সবাই জানেন। ফুসফুসের ক্ষতি, হৃদরোগ, ক্যানসার কিংবা শ্বাসকষ্ট ধূমপানের এই ভয়াবহ দিকগুলি নিয়ে বহু আলোচনা হয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলিতে বিজ্ঞানীরা যে বিষয়টির দিকে বিশেষভাবে নজর দিয়েছেন, তা হল ধূমপানের সঙ্গে চুল পড়া এবং টাক পড়ার সরাসরি সম্পর্ক। অনেকেই ভাবেন, টাক পড়া শুধুই বংশগত সমস্যা বা বয়সের স্বাভাবিক ফল। কিন্তু গবেষণা বলছে, অতিরিক্ত ধূমপান এই প্রক্রিয়াকে অনেক গুণ দ্রুত করে দিতে পারে।

চুল মানুষের সৌন্দর্য ও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। অল্প বয়সেই চুল পড়তে শুরু করলে মানসিক চাপ, আত্মসম্মান কমে যাওয়া এবং উদ্বেগ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। বিজ্ঞানীদের মতে, ধূমপান শুধু শরীরের ভিতরের অঙ্গগুলিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে না, এটি চুলের গোড়া বা হেয়ার ফলিকলের উপরও মারাত্মক প্রভাব ফেলে। ফলে চুল দুর্বল হয়ে যায়, পাতলা হতে থাকে এবং একসময় স্থায়ী টাকের দিকে এগিয়ে যায়।

ধূমপানের ধোঁয়ায় থাকা নিকোটিন, কার্বন মনোক্সাইড এবং নানা ধরনের বিষাক্ত রাসায়নিক রক্তনালিকে সংকুচিত করে দেয়। মাথার ত্বকে চুলের গোড়ায় অক্সিজেন ও পুষ্টি পৌঁছানোর জন্য সূক্ষ্ম রক্তনালির প্রয়োজন হয়। কিন্তু ধূমপানের ফলে এই রক্তনালিগুলি সংকুচিত হলে চুলের গোড়ায় পর্যাপ্ত অক্সিজেন ও পুষ্টি পৌঁছায় না। এর ফলে হেয়ার ফলিকল দুর্বল হয়ে পড়ে এবং চুল ঝরে যেতে শুরু করে।

বিজ্ঞানীরা আরও বলছেন, ধূমপানের কারণে শরীরে ফ্রি র‍্যাডিক্যালের পরিমাণ বেড়ে যায়। এই ফ্রি র‍্যাডিক্যালগুলি চুলের কোষের ডিএনএ ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এর ফলে চুলের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয় এবং নতুন চুল গজানোর ক্ষমতা কমে যায়। দীর্ঘদিন ধূমপান করলে এই ক্ষতি ধীরে ধীরে স্থায়ী রূপ নিতে পারে, যার ফল টাক পড়া।

ধূমপানের আরেকটি বড় প্রভাব পড়ে হরমোনের উপর। পুরুষদের ক্ষেত্রে টেস্টোস্টেরন হরমোন থেকে তৈরি হওয়া ডিএইচটি নামক উপাদান চুল পড়ার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে পরিচিত। গবেষণায় দেখা গেছে, ধূমপান শরীরে এই ডিএইচটির কার্যকারিতা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। ফলে যাঁদের বংশগতভাবে টাক পড়ার প্রবণতা রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে ধূমপান সেই ঝুঁকি কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়।

নারীদের ক্ষেত্রেও ধূমপানের প্রভাব কম নয়। অনেকেই মনে করেন, টাক পড়া শুধুমাত্র পুরুষদের সমস্যা। কিন্তু বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, ধূমপানের কারণে নারীদের মধ্যেও চুল পাতলা হয়ে যাওয়া, চুল ভেঙে যাওয়া এবং ধীরে ধীরে চুলের ঘনত্ব কমে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে যাঁরা দীর্ঘদিন ধূমপান করেন, তাঁদের মাথার ত্বকের রক্তসঞ্চালন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

ধূমপান মানসিক চাপও বাড়ায়, যা চুল পড়ার আরেকটি বড় কারণ। নিকোটিন স্নায়ুতন্ত্রকে উত্তেজিত করে, যার ফলে ঘুমের সমস্যা, উদ্বেগ এবং মানসিক অস্থিরতা তৈরি হয়। এই মানসিক চাপ সরাসরি চুল পড়ার সঙ্গে যুক্ত। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, ধূমপানের কারণে সৃষ্ট মানসিক চাপ থেকেই টেলোজেন এফ্লুভিয়াম নামক সমস্যায় হঠাৎ করে প্রচুর চুল পড়তে শুরু করে।

এছাড়াও ধূমপান শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। এর ফলে মাথার ত্বকে সংক্রমণ, খুশকি, স্ক্যাল্প ইনফ্ল্যামেশন এবং বিভিন্ন চর্মরোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়। এই সমস্যাগুলি চুলের গোড়াকে আরও দুর্বল করে তোলে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, সুস্থ স্ক্যাল্প ছাড়া সুস্থ চুল সম্ভব নয়, আর ধূমপান সেই সুস্থ পরিবেশটাই নষ্ট করে দেয়।

একাধিক আন্তর্জাতিক গবেষণায় ধূমপায়ী এবং অধূমপায়ীদের মধ্যে চুল পড়ার প্রবণতা তুলনা করা হয়েছে। দেখা গেছে, যাঁরা নিয়মিত ধূমপান করেন, তাঁদের মধ্যে অল্প বয়সেই চুল পড়া শুরু হওয়ার হার অনেক বেশি। এমনকি দিনে যত বেশি সিগারেট খাওয়া হয়, চুল পড়ার ঝুঁকিও ততটাই বাড়ে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে বিজ্ঞানীরা এটাও স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে ধূমপান একমাত্র কারণ নয়। বংশগতি, হরমোনের ভারসাম্যহীনতা, অপুষ্টি, অতিরিক্ত মানসিক চাপ এবং জীবনযাত্রার অনিয়ম এই সবকিছু মিলিয়েই চুল পড়ার সমস্যা তৈরি হয়। কিন্তু ধূমপান এই সব সমস্যাকে আরও তীব্র করে তোলে এবং টাক পড়ার প্রক্রিয়াকে দ্রুত এগিয়ে দেয়।

ভালো খবর হল, ধূমপান ছেড়ে দিলে অনেক ক্ষেত্রে চুল পড়ার গতি ধীরে আসে। যদিও একবার স্থায়ীভাবে নষ্ট হয়ে যাওয়া হেয়ার ফলিকল পুরোপুরি ফিরে আসে না, তবুও ধূমপান বন্ধ করলে মাথার ত্বকের রক্তসঞ্চালন ধীরে ধীরে উন্নত হয়। এর ফলে অবশিষ্ট সুস্থ চুলগুলো আরও শক্তিশালী হয় এবং নতুন চুল গজানোর পরিবেশ তৈরি হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ধূমপান ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সুষম খাদ্য গ্রহণ, পর্যাপ্ত প্রোটিন, আয়রন, জিঙ্ক ও ভিটামিন গ্রহণ করলে চুলের স্বাস্থ্যের উন্নতি সম্ভব।

news image
আরও খবর

অতিরিক্ত ধূমপান শুধু ফুসফুস বা হৃদযন্ত্রের ক্ষতি করে না, এটি ধীরে ধীরে শরীরের এমন কিছু অংশকে প্রভাবিত করে যেগুলোর সঙ্গে আমরা অনেক সময় সরাসরি সম্পর্ক খুঁজে পাই না। চুল পড়া এবং টাকের সমস্যাও তার মধ্যে অন্যতম। সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, ধূমপানের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব মাথার ত্বক, চুলের গোড়া এবং হেয়ার ফলিকলের উপর গভীরভাবে পড়ে। ফলে অল্প বয়সেই চুল পাতলা হয়ে যাওয়া, অতিরিক্ত চুল ঝরে পড়া এবং স্থায়ী টাকের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

মানুষের চুলের বৃদ্ধি একটি জটিল জৈবিক প্রক্রিয়া। প্রতিটি চুল একটি নির্দিষ্ট জীবনচক্র অনুসরণ করে অ্যানাজেন বা বৃদ্ধির পর্যায়, ক্যাটাজেন বা পরিবর্তনের পর্যায় এবং টেলোজেন বা বিশ্রামের পর্যায়। এই চক্র স্বাভাবিক থাকলে চুল নিয়মিত ঝরে আবার নতুন চুল গজায়। কিন্তু যখন শরীরে অক্সিজেনের ঘাটতি, পুষ্টির অভাব বা হরমোনের ভারসাম্যহীনতা দেখা দেয়, তখন এই স্বাভাবিক চক্র ব্যাহত হয়। ধূমপান ঠিক এই জায়গাতেই সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে।

সিগারেটের ধোঁয়ায় থাকা নিকোটিন রক্তনালিকে সংকুচিত করে। এর ফলে শরীরের বিভিন্ন অংশে রক্তপ্রবাহ কমে যায়। মাথার ত্বকে চুলের গোড়ায় পৌঁছানোর জন্য অত্যন্ত সূক্ষ্ম রক্তনালির প্রয়োজন হয়। এই রক্তনালিগুলি পর্যাপ্ত অক্সিজেন ও পুষ্টি বহন করে চুলকে সুস্থ রাখে। কিন্তু ধূমপানের কারণে যখন এই রক্তনালিগুলি সংকুচিত হয়ে যায়, তখন চুলের গোড়ায় প্রয়োজনীয় পুষ্টি পৌঁছায় না। ফলস্বরূপ চুল দুর্বল হয়ে পড়ে এবং সহজেই ঝরে যায়।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল অক্সিডেটিভ স্ট্রেস। ধূমপানের ফলে শরীরে ফ্রি র‍্যাডিক্যালের মাত্রা বৃদ্ধি পায়। এই ফ্রি র‍্যাডিক্যালগুলি কোষের ডিএনএ ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। চুলের ফলিকলও এর বাইরে নয়। দীর্ঘদিন ধরে এই ক্ষতি চলতে থাকলে হেয়ার ফলিকল ছোট হয়ে আসে এবং একসময় চুল উৎপাদন বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এটি অ্যান্ড্রোজেনিক অ্যালোপেশিয়া বা সাধারণ টাক পড়ার সমস্যাকে আরও ত্বরান্বিত করতে পারে।

পুরুষদের ক্ষেত্রে টাক পড়ার অন্যতম কারণ ডিএইচটি নামের একটি হরমোন। গবেষণায় দেখা গেছে, ধূমপান এই হরমোনের কার্যকারিতাকে প্রভাবিত করতে পারে। যাঁদের পরিবারে টাক পড়ার ইতিহাস রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে ধূমপান ঝুঁকিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। অর্থাৎ বংশগত প্রবণতা থাকলে ধূমপান সেই প্রক্রিয়াকে আরও দ্রুত করে তোলে।

নারীদের ক্ষেত্রেও সমস্যা কম নয়। অনেক নারী ভাবেন, ধূমপান মূলত পুরুষদের চুলে প্রভাব ফেলে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, ধূমপায়ী নারীদের মধ্যে চুল পাতলা হয়ে যাওয়া, চুলের ঘনত্ব কমে যাওয়া এবং স্ক্যাল্পের বিভিন্ন সমস্যা বেশি দেখা যায়। কারণ নারীদের ক্ষেত্রেও ধূমপান রক্তসঞ্চালন ও হরমোনের ভারসাম্যকে ব্যাহত করে।

ধূমপান শরীরে প্রদাহ সৃষ্টি করে। এই প্রদাহ মাথার ত্বকে প্রভাব ফেলতে পারে এবং ফলিকলের চারপাশে ক্ষতিকর পরিবেশ তৈরি করতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহ চুলের বৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করে। পাশাপাশি ধূমপান শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়, ফলে স্ক্যাল্প ইনফেকশন বা ফাঙ্গাল সমস্যার ঝুঁকি বাড়ে। এই ধরনের সংক্রমণ চুল পড়াকে আরও ত্বরান্বিত করে।

মনস্তাত্ত্বিক দিকটিও গুরুত্বপূর্ণ। ধূমপান অনেক সময় মানসিক চাপের সঙ্গে জড়িত। কেউ কেউ স্ট্রেস কমানোর জন্য ধূমপান করেন, কিন্তু বাস্তবে নিকোটিন স্নায়ুতন্ত্রকে উত্তেজিত করে এবং দীর্ঘমেয়াদে উদ্বেগ বাড়াতে পারে। মানসিক চাপ নিজেই চুল পড়ার একটি বড় কারণ। টেলোজেন এফ্লুভিয়াম নামে একটি অবস্থায় হঠাৎ করেই প্রচুর চুল ঝরে যেতে পারে, যা অনেক সময় স্ট্রেসের ফল।

পুষ্টির দিক থেকেও ধূমপান ক্ষতিকর। ধূমপায়ীদের শরীরে ভিটামিন সি, ই এবং বিভিন্ন অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের মাত্রা কমে যেতে পারে। এই পুষ্টি উপাদানগুলি চুলের স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। এগুলির ঘাটতি চুলকে ভঙ্গুর করে তোলে এবং সহজে ভেঙে যায়।

গবেষণায় দেখা গেছে, যারা দীর্ঘদিন ধরে দিনে বহু সিগারেট খান, তাঁদের মধ্যে টাক পড়ার হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। এমনকি বয়স, বংশগতি এবং অন্যান্য কারণ বিবেচনা করেও ধূমপান একটি স্বাধীন ঝুঁকির কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। অর্থাৎ অন্যান্য কারণ না থাকলেও ধূমপান নিজেই চুল পড়ার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

তবে সব ক্ষেত্রে ক্ষতি স্থায়ী হয় না। ধূমপান বন্ধ করলে শরীর ধীরে ধীরে নিজেকে পুনরুদ্ধার করার চেষ্টা করে। রক্তসঞ্চালন উন্নত হয়, অক্সিজেনের মাত্রা স্বাভাবিক হতে শুরু করে। যদিও সম্পূর্ণভাবে নষ্ট হয়ে যাওয়া ফলিকল ফিরে আসে না, কিন্তু যেগুলি এখনো সক্রিয় আছে, সেগুলির কার্যকারিতা উন্নত হতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দেন, ধূমপান ছাড়ার পাশাপাশি সুষম খাদ্য গ্রহণ করা উচিত। প্রোটিন, আয়রন, জিঙ্ক, বায়োটিন এবং ওমেগা থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড চুলের জন্য উপকারী। পর্যাপ্ত জল পান করা, নিয়মিত ব্যায়াম এবং পর্যাপ্ত ঘুমও চুলের স্বাস্থ্যের উন্নতিতে সাহায্য করে। স্ক্যাল্প পরিষ্কার রাখা এবং প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।

Preview image