Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

দীর্ঘদিন জ্বরের সঙ্গে মারাত্মক পেটব্যথা, নতুন সংক্রমণ কি আতঙ্ক বাড়াচ্ছে

গরম পড়তেই ভাইরাল সংক্রমণ ও দূষিত জল খাবারের কারণে জ্বর বমি ও ডায়রিয়ার মতো সমস্যা বাড়ছে। তাপমাত্রা বেশি থাকায় শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে ফলে রোগ সহজে সারতেও সময় লাগছে।

গরম পড়ার শুরু মানেই শুধু তাপমাত্রা বৃদ্ধি নয়, সঙ্গে নিয়ে আসে একের পর এক শারীরিক সমস্যা। প্রতি বছরই ঋতু পরিবর্তনের সময় কিছু সাধারণ অসুখবিসুখ দেখা যায়, তবে এ বছরের পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন এবং চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। শহর থেকে গ্রাম—প্রায় প্রতিটি ঘরেই এখন জ্বর, বমি, পেটের ব্যথা ও ডায়রিয়ার মতো সমস্যায় ভুগছেন মানুষ। শুধু শিশু নয়, প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যেও এই সমস্যা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সমস্যার মূল কারণ হল আবহাওয়ার আকস্মিক পরিবর্তন এবং সেই সঙ্গে ভাইরাসের সক্রিয়তা বৃদ্ধি। যখন শীতের পরে হঠাৎ করে গরম পড়তে শুরু করে, তখন পরিবেশে বিভিন্ন ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া ও পরজীবীর প্রভাব বেড়ে যায়। এই সময়ে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়ে, ফলে সংক্রমণের সম্ভাবনা বেড়ে যায়।

চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বর্তমানে সবচেয়ে বেশি যে সমস্যাগুলি দেখা যাচ্ছে তার মধ্যে রয়েছে দীর্ঘস্থায়ী জ্বর, যা অনেক ক্ষেত্রে ১৫ থেকে ২০ দিন পর্যন্ত থাকতে পারে। সাধারণত ভাইরাল জ্বর কয়েক দিনের মধ্যেই কমে যায়, কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে তাপমাত্রা সহজে কমছে না এবং রোগীরা দীর্ঘদিন ধরে ভুগছেন।

এছাড়াও পেটের সমস্যা এখন অত্যন্ত সাধারণ হয়ে উঠেছে। খাওয়ার পরেই অনেকের পেটে ব্যথা শুরু হচ্ছে, সঙ্গে বমি ও ডায়রিয়া দেখা দিচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে দিনে একাধিকবার মলত্যাগ হচ্ছে, যা শরীরকে দ্রুত দুর্বল করে দিচ্ছে। এই সমস্যাগুলি মূলত গ্যাস্ট্রোইনটেস্টিনাল সংক্রমণের কারণে হচ্ছে, যা ভাইরাস দ্বারা সৃষ্ট।

বর্তমান পরিস্থিতিতে যে ভাইরাসগুলির দাপট সবচেয়ে বেশি, তার মধ্যে অন্যতম হল অ্যাডিনোভাইরাস, নোরোভাইরাস এবং রোটাভাইরাস। এই ভাইরাসগুলির বৈশিষ্ট্য হল তারা দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং শরীরে প্রবেশ করার পর দ্রুত উপসর্গ তৈরি করে।

নোরোভাইরাস বিশেষভাবে সংক্রামক। এটি সাধারণত দূষিত খাবার ও পানীয়ের মাধ্যমে ছড়ায়, তবে সংক্রমিত ব্যক্তির সংস্পর্শেও এটি ছড়াতে পারে। এই ভাইরাস শরীরে প্রবেশ করার ১২ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই লক্ষণ দেখা দিতে শুরু করে। রোগীরা হঠাৎ করে বমি, ডায়রিয়া, পেটের ব্যথা ও জ্বরের মতো সমস্যায় ভুগতে থাকেন।

রোটাভাইরাস মূলত শিশুদের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে এই ভাইরাস মারাত্মক ডিহাইড্রেশন বা জলশূন্যতার কারণ হতে পারে। বারবার বমি ও ডায়রিয়ার ফলে শরীর থেকে প্রচুর জল ও লবণ বেরিয়ে যায়, যা শিশুর জন্য প্রাণঘাতী হতে পারে যদি সময়মতো চিকিৎসা না করা হয়।

অ্যাডিনোভাইরাসও বর্তমানে তার রূপ পরিবর্তন করে আরও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এই ভাইরাস শুধুমাত্র শ্বাসতন্ত্র নয়, পেটের সমস্যাও তৈরি করতে পারে। ফলে রোগীরা একই সঙ্গে জ্বর ও পেটের সমস্যায় ভুগছেন।

এই ভাইরাসগুলির সংক্রমণের একটি বড় কারণ হল অস্বাস্থ্যকর খাবার ও পানীয় গ্রহণ। রাস্তার খাবার, খোলা জল, লস্যি বা শরবতের মতো পানীয় এই সময়ে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। অনেক সময় এগুলি পরিষ্কার পরিবেশে তৈরি হয় না, ফলে ভাইরাস সহজেই শরীরে প্রবেশ করতে পারে।

এছাড়াও, সংক্রমিত ব্যক্তির সংস্পর্শেও এই রোগ ছড়াতে পারে। কারও ব্যবহৃত পাত্র, গ্লাস বা চামচ ব্যবহার করলে সংক্রমণের সম্ভাবনা বেড়ে যায়। একইভাবে, হাত না ধুয়ে খাবার খেলে ভাইরাস শরীরে প্রবেশ করতে পারে।

এই পরিস্থিতিতে ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি। বাইরে থেকে বাড়িতে ফিরে অবশ্যই হাত ও মুখ ভালোভাবে ধুতে হবে। খাওয়ার আগে সাবান দিয়ে হাত ধোয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিশুদের ক্ষেত্রেও এই অভ্যাস গড়ে তোলা উচিত।

বাজার থেকে আনা সবজি, ফল, মাছ ও মাংস ভালোভাবে ধুয়ে রান্না করা উচিত। বিশেষ করে শাকপাতা গরম নুন জলে ধুয়ে নেওয়া উচিত, যাতে কোনও জীবাণু থেকে না যায়।

ফ্রিজে দীর্ঘদিন রাখা খাবার খাওয়া এড়িয়ে চলা উচিত। বাসি ভাত বা কেটে রাখা ফল এই সময়ে খাওয়া অত্যন্ত বিপজ্জনক হতে পারে। কারণ এই খাবারগুলিতে সহজেই ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাস জন্মাতে পারে।

news image
আরও খবর

যদি বাড়িতে কেউ অসুস্থ হয়ে পড়েন, তাহলে তাকে আলাদা রাখা উচিত। তার ব্যবহৃত জিনিসপত্র আলাদা রাখা এবং পরিষ্কার রাখা জরুরি। এতে অন্যদের মধ্যে সংক্রমণ ছড়ানোর সম্ভাবনা কমে যায়।

এই রোগগুলির একটি বড় ঝুঁকি হল জলশূন্যতা। বারবার বমি ও ডায়রিয়ার ফলে শরীর থেকে প্রচুর জল বেরিয়ে যায়। ফলে মাথা ঘোরা, দুর্বলতা, এমনকি শ্বাসকষ্টের মতো সমস্যাও দেখা দিতে পারে। তাই রোগীকে পর্যাপ্ত পরিমাণে জল ও ওআরএস খাওয়ানো অত্যন্ত জরুরি।

অনেকেই ভুল করে এই সময়ে নিজের মতো করে অ্যান্টিবায়োটিক খেতে শুরু করেন, যা একেবারেই ঠিক নয়। কারণ ভাইরাসঘটিত রোগে অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করে না। বরং এতে শরীরের ক্ষতি হতে পারে এবং ভবিষ্যতে অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যকারিতা কমে যেতে পারে।

যদি জ্বর দীর্ঘদিন থাকে বা বমি ও ডায়রিয়া খুব বেশি হয়, তাহলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। কিছু ক্ষেত্রে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ারও প্রয়োজন হতে পারে।

বর্তমান পরিস্থিতি থেকে স্পষ্ট যে গরম পড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভাইরাসজনিত রোগের প্রকোপ বেড়ে গেছে। তাই এই সময়ে সচেতনতা এবং সতর্কতাই হল সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ।

সঠিক খাদ্যাভ্যাস, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং সময়মতো চিকিৎসা—এই তিনটি বিষয় মেনে চললে এই ধরনের রোগ থেকে অনেকটাই নিরাপদ থাকা সম্ভব। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে আরও বেশি সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

সবশেষে বলা যায়, এই ধরনের সংক্রমণ নতুন কিছু নয়, তবে এর তীব্রতা এ বছর কিছুটা বেশি। তাই আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন থাকা এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়াই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ। শরীরের প্রতি যত্নবান হলে এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চললে এই সমস্যাগুলিকে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।

এছাড়াও এই সময়ে শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গরমের শুরুতেই অনেকের শরীর হঠাৎ করে আবহাওয়ার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারে না, ফলে সহজেই সংক্রমণ আক্রমণ করে। তাই প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় এমন কিছু খাবার রাখা দরকার যা শরীরকে ভিতর থেকে শক্তিশালী করে তোলে। যেমন তাজা ফল, সবজি, লেবু, ডাবের জল এবং হালকা সুষম খাবার শরীরকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে। অতিরিক্ত তেল-মশলাযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলাই ভালো, কারণ এগুলি হজমের সমস্যা বাড়িয়ে দিতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, পর্যাপ্ত ঘুম এবং বিশ্রাম এই সময়ে খুবই জরুরি। শরীর যদি পর্যাপ্ত বিশ্রাম না পায়, তাহলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা আরও কমে যায় এবং ভাইরাসের সংক্রমণ সহজে হয়। তাই প্রতিদিন অন্তত ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা ঘুমানো উচিত এবং অযথা শরীরকে ক্লান্ত করা থেকে বিরত থাকা দরকার।

গরমকালে জলশূন্যতা একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। তাই শুধু জল নয়, ওআরএস, ফলের রস এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ইলেকট্রোলাইটযুক্ত পানীয় গ্রহণ করা উচিত। বিশেষ করে যারা ইতিমধ্যেই বমি বা ডায়রিয়ায় ভুগছেন, তাদের জন্য এই বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শরীরে জল এবং লবণের ভারসাম্য ঠিক রাখা না গেলে পরিস্থিতি দ্রুত খারাপ হতে পারে।

অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, মানুষ প্রাথমিক লক্ষণগুলোকে গুরুত্ব দেন না এবং বাড়িতেই সাধারণ ওষুধ খেয়ে সময় নষ্ট করেন। কিন্তু জ্বর যদি তিন দিনের বেশি স্থায়ী হয় বা বমি ও ডায়রিয়া নিয়ন্ত্রণে না আসে, তাহলে দেরি না করে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত। দ্রুত চিকিৎসা শুরু হলে জটিলতা অনেকটাই কমানো যায়।

স্কুল, অফিস বা জনসমাগমের জায়গাগুলিতেও এই সময়ে সংক্রমণ দ্রুত ছড়াতে পারে। তাই অসুস্থ অবস্থায় বাইরে যাওয়া এড়িয়ে চলা উচিত এবং প্রয়োজনে মাস্ক ব্যবহার করাও উপকারী হতে পারে। এতে অন্যদের মধ্যে সংক্রমণ ছড়ানোর সম্ভাবনা কমে যায়।

সব মিলিয়ে বলা যায়, গরমের শুরুতে এই ধরনের ভাইরাসজনিত অসুখ এখন একটি সাধারণ প্রবণতা হয়ে উঠছে। তবে সচেতনতা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, সঠিক খাদ্যাভ্যাস এবং সময়মতো চিকিৎসার মাধ্যমে এই সমস্যাকে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। নিজের এবং পরিবারের সকলের স্বাস্থ্যের দিকে নজর রাখলেই এই কঠিন সময়েও সুস্থ থাকা সম্ভব।

Preview image