Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

শেষবারের মতো আর্জেন্তিনার জার্সিতে মেসি, বিদায়ী ম্যাচ ঘিরে আবেগে ভাসছে দেশ; রাজকীয় সম্মানের প্রস্তুতি

আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা আগেই দিয়েছেন লিওনেল মেসি। এবার আর্জেন্তিনার জার্সিতে শেষবার মাঠে নামছেন তিনি। বেনিনের বিরুদ্ধে মনুমেন্টাল স্টেডিয়ামের এই ম্যাচকে ঘিরে আবেগে ভাসছে গোটা দেশ। মেসিকে স্মরণীয় বিদায় দিতে বিশেষ আয়োজন করেছে আর্জেন্তিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন।

আন্তর্জাতিক ফুটবলে লিওনেল মেসির অধ্যায়ের শেষ পাতা লেখা হয়ে গিয়েছে। কয়েক সপ্তাহ আগেই আর্জেন্তিনা জাতীয় দলের হয়ে আর না খেলার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছিলেন তিনি। কিন্তু এমন একজন ফুটবলারকে কি আর সাধারণভাবে বিদায় জানানো যায়? যাঁর পায়ের জাদুতে বদলে গিয়েছে আর্জেন্তিনার ফুটবলের ইতিহাস, যাঁর হাত ধরে দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে বিশ্বকাপ এসেছে দেশে, যাঁকে ঘিরে তৈরি হয়েছে এক প্রজন্মের আবেগ—তাঁর বিদায়ও যে হতে হবে রাজকীয়, সেটাই স্বাভাবিক। আর সেই কারণেই মেসির শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচকে ঘিরে এখন আবেগে ভাসছে আর্জেন্তিনা।

৬ অক্টোবর বুয়েনস আইরেসের ঐতিহাসিক মনুমেন্টাল স্টেডিয়ামে বেনিনের বিরুদ্ধে মাঠে নামবে আর্জেন্তিনা। ম্যাচটি শুধুমাত্র একটি আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচ নয়। এটি হয়ে উঠেছে লিওনেল মেসির আর্জেন্তিনার জার্সিতে শেষবার মাঠে নামার মুহূর্ত। ফিফাও জানিয়েছিল, বেনিনের বিরুদ্ধে এই ম্যাচেই জাতীয় দলের হয়ে শেষবারের মতো দেখা যাবে মেসিকে। 

আর্জেন্তিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনও মেসির বিদায়কে বিশেষ মর্যাদা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এএফএ-র প্রেসিডেন্ট ক্লদিও তাপিয়া আগেই জানিয়েছিলেন, দেশের মাটিতে মেসিকে তাঁর প্রাপ্য বিদায় দেওয়ার জন্যই এই বিশেষ ম্যাচের আয়োজন। শুধু তাই নয়, ২০২২ সালের বিশ্বকাপজয়ী আর্জেন্তিনা দলের সদস্যদেরও তাঁদের পরিবারের সঙ্গে অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানোর পরিকল্পনা করা হয়েছিল।

মেসির বিদায়, অথচ শেষ নয় আবেগের

মেসির সঙ্গে আর্জেন্তিনার সম্পর্ক কখনওই শুধু একজন ফুটবলার ও একটি জাতীয় দলের সম্পর্ক ছিল না। এর মধ্যে রয়েছে ভালোবাসা, প্রত্যাশা, হতাশা, সমালোচনা, কান্না, প্রত্যাবর্তন এবং শেষ পর্যন্ত এক অভূতপূর্ব গৌরবের গল্প।

দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে আর্জেন্তিনার জার্সি পরেছেন মেসি। যুব দল থেকে শুরু করে সিনিয়র জাতীয় দল—প্রতিটি পর্যায়েই তিনি নিজের ছাপ রেখেছেন। ২০০৫ সালে অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপ জয় তাঁর আন্তর্জাতিক যাত্রার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক অধ্যায়। এরপর সিনিয়র দলের হয়ে অভিষেক এবং ধীরে ধীরে দেশের ফুটবলের সবচেয়ে বড় তারকা হয়ে ওঠা

কিন্তু এই যাত্রা মোটেই সহজ ছিল না।

একসময় আর্জেন্তিনার সমর্থকদেরই একটা অংশ প্রশ্ন তুলেছিলেন, ক্লাব ফুটবলে মেসি যতটা দুর্দান্ত, জাতীয় দলের হয়ে তিনি কি ততটাই কার্যকর? স্পেনের মাটিতে বড় হওয়া এবং ইউরোপীয় ফুটবলে তাঁর বেড়ে ওঠার কারণেও তাঁকে ঘিরে তৈরি হয়েছিল নানা বিতর্ক। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই সংশয় বদলে যায় শ্রদ্ধায়।

আর সেই পরিবর্তনের পেছনে ছিল মেসির একের পর এক লড়াই।

একের পর এক হার, তারপর প্রত্যাবর্তন

মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সবচেয়ে আবেগঘন অধ্যায়গুলির মধ্যে রয়েছে পরপর ফাইনাল হার। কোপা আমেরিকার মঞ্চে ব্যর্থতা, বিশ্বকাপের হতাশা—সবকিছুর মধ্যেই তাঁকে শুনতে হয়েছে সমালোচনা। ২০১৬ সালে কোপা আমেরিকার ফাইনালে হারের পর জাতীয় দল থেকে অবসর নেওয়ার সিদ্ধান্তও জানিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ফিরে আসেন।

সেই প্রত্যাবর্তনই যেন মেসির গল্পকে নতুন দিকে নিয়ে যায়।

জাতীয় দলের হয়ে একের পর এক ব্যর্থতার পর অবশেষে আসে ২০২১ সাল। কোপা আমেরিকার ফাইনালে ব্রাজিলকে হারিয়ে আর্জেন্তিনা চ্যাম্পিয়ন হয়। মেসির জন্য সেটি ছিল জাতীয় দলের হয়ে প্রথম বড় সিনিয়র আন্তর্জাতিক ট্রফি। সেই মুহূর্তে বহু বছরের জমে থাকা আবেগ যেন একসঙ্গে বিস্ফোরিত হয়েছি

এরপর ২০২২ সালে আসে ফাইনালিসিমা জয়। আর তারপর সেই মুহূর্ত, যার জন্য মেসি এবং আর্জেন্তিনার সমর্থকেরা অপেক্ষা করেছিলেন বছরের পর বছর—কাতার বিশ্বকাপ।

কাতারে পূর্ণ হয়েছিল স্বপ্ন

২০২২ সালের বিশ্বকাপ মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায়। কাতারে আর্জেন্তিনার অধিনায়ক হিসেবে দলকে নেতৃত্ব দিয়ে বিশ্বকাপ জেতেন তিনি। ফাইনালে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে সেই নাটকীয় ম্যাচ আজও ফুটবলপ্রেমীদের স্মৃতিতে উজ্জ্বল।

বিশ্বকাপ জয়ের সঙ্গে সঙ্গে মেসির বিরুদ্ধে জাতীয় দলের হয়ে সাফল্যের অভাবের পুরনো অভিযোগ কার্যত শেষ হয়ে যায়। যাঁরা একসময় প্রশ্ন তুলেছিলেন, তাঁরাই তাঁকে আর্জেন্তিনার ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা নায়ক হিসেবে গ্রহণ করেন।

এরপর ২০২৪ সালে আবার কোপা আমেরিকা জয়। অর্থাৎ জাতীয় দলের হয়ে মেসির শেষ অধ্যায় হয়ে ওঠে সাফল্যে ভর

এই কারণেই তাঁর বিদায় শুধু একজন খেলোয়াড়ের বিদায় নয়। এটি একটি যুগের অবসান।

২০২৬ বিশ্বকাপেও শেষ লড়াই

আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে বিদায়ের আগে ২০২৬ বিশ্বকাপেও আর্জেন্তিনার হয়ে খেলেছেন মেসি। ৩৯ বছর বয়সে ষষ্ঠ বিশ্বকাপ খেলেন তিনি। আর্জেন্তিনা শেষ পর্যন্ত ফাইনালে স্পেনের কাছে ১-০ গোলে হেরে রানার্স-আপ হয়। তবে মেসির ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স ছিল অসাধারণ—টুর্নামেন্টে তিনি আটটি গোল এবং চারটি অ্যাসিস্ট করেন।

বিশ্বকাপের সেই ফাইনালের পরই মেসির আন্তর্জাতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে জল্পনা আরও তীব্র হয়। অবশেষে ৩১ আগস্ট জাতীয় দল থেকে অবসরের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন তিনি। দুই দশকেরও বেশি সময়ের আন্তর্জাতিক অধ্যায়ের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটে সেই ঘোষণায়। 

তবে আর্জেন্তিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন চেয়েছিল, তাঁর শেষ ম্যাচটি যেন দেশের মাটিতে, দেশের সমর্থকদের সামনে হয়।

সেখান থেকেই আসে বিদায়ী ম্যাচের পরিকল্পনা।

মনুমেন্টালেই শেষ ‘ট্যাঙ্গো’

বুয়েনস আইরেসের মনুমেন্টাল স্টেডিয়াম আর্জেন্তিনার ফুটবলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ। সেই মাঠেই জাতীয় দলের জার্সিতে শেষবারের মতো মেসিকে দেখতে চলেছেন দেশের সমর্থকেরা।

এএফএ নিজেই এই বিদায়কে ‘শেষ ট্যাঙ্গো’ হিসেবে তুলে ধরেছে। সংস্থার বক্তব্য অনুযায়ী, মেসি এবং আর্জেন্তিনার গল্পের শেষ অধ্যায়টি দেশের মাটিতেই লেখা উচিত ছিল। 

এই প্রতীকী অর্থটাই ম্যাচটিকে আরও বিশেষ করে তুলেছে।

একদিকে মাঠে থাকবে আর্জেন্তিনার বর্তমান প্রজন্মের ফুটবলাররা। অন্যদিকে গ্যালারিতে থাকবে এমন লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রতিনিধিত্ব, যাঁরা ছোটবেলা থেকে মেসিকে দেখে বড় হয়েছেন। কেউ তাঁকে প্রথম দেখেছেন বার্সেলোনার জার্সিতে, কেউ আর্জেন্তিনার তরুণ প্রতিভা হিসেবে, আবার কেউ তাঁকে বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক হিসেবে।

কিন্তু সবাই তাঁকে দেখেছেন।

১০ নম্বর জার্সির সঙ্গে মেসির সম্পর্ক

আর্জেন্তিনার ১০ নম্বর জার্সি এখন কার্যত মেসির সমার্থক। দিয়েগো মারাদোনার পর এই জার্সিকে নতুন প্রজন্মের কাছে নতুন অর্থ দিয়েছেন মেসি।

একসময় মারাদোনার সঙ্গে তুলনা ছিল তাঁর জন্য বড় চাপ। আর্জেন্তিনায় ফুটবল শুধু খেলা নয়; এটি জাতীয় পরিচয়ের অংশ। আর সেই দেশের হয়ে ১০ নম্বর জার্সি পরার অর্থও আলাদা।

মেসি সেই চাপ সামলেছেন দীর্ঘ সময় ধরে।

শুধু গোল নয়, অ্যাসিস্ট, পাস, ড্রিবল, ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ, নেতৃত্ব—সব মিলিয়ে তিনি জাতীয় দলের খেলায় নিজের একটি আলাদা ছাপ তৈরি করেছেন। তাঁর খেলা দেখেই ফুটবলের একটি প্রজন্ম শিখেছে, কীভাবে একজন খেলোয়াড় একই সঙ্গে সৃষ্টিশীল এবং কার্যকর হতে পারেন।

সংখ্যাতেও অনন্য মেসি

আর্জেন্তিনার হয়ে মেসির পরিসংখ্যান তাঁর দীর্ঘ ক্যারিয়ারের বিশালতা বোঝায়। এএফএ-র তথ্য অনুযায়ী, বেনিনের বিরুদ্ধে শেষ ম্যাচের আগে জাতীয় দলের হয়ে ২০৭টি ম্যাচে ১২৫টি গোল এবং ৬৬টি অ্যাসিস্ট রয়েছে তাঁর। তিনি আর্জেন্তিনার ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলা এবং সর্বোচ্চ গোলদাতা ফুটবলার

এই সংখ্যাগুলি শুধু রেকর্ড নয়। প্রতিটি সংখ্যার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে একটি করে গল্প

কোনও গোল এসেছে কঠিন বাছাইপর্বে, কোনওটি বিশ্বকাপে, কোনওটি কোপা আমেরিকায়। কখনও তিনি ম্যাচ জিতিয়েছেন, কখনও তাঁর গোল দলকে বিপদ থেকে উদ্ধার করেছে। আবার এমন রাতও এসেছে যখন মেসি নিজে কেঁদেছেন এবং সমর্থকেরাও তাঁর সঙ্গে কেঁদেছেন।

তাঁর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সৌন্দর্য এখানেই—এটি নিখুঁত ছিল না, কিন্তু ছিল বাস্তব।

সমালোচনা থেকে ভালোবাসা

মেসির আর্জেন্তিনা অধ্যায়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন সম্ভবত সমর্থকদের মনোভাবের পরিবর্তন।

শুরুতে তাঁকে নিয়ে ছিল প্রত্যাশা। তারপর এল তুলনা। এরপর সমালোচনা। একসময় এমনও পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল যখন জাতীয় দলের ব্যর্থতার দায়ের বড় অংশ তাঁর কাঁধে চাপানো হত।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে মেসি প্রমাণ করেছেন, তিনি শুধু প্রতিভাবান ফুটবলার নন; তিনি একজন লড়াকু খেলোয়াড়ও।

ফাইনালে হারার পর আবার ফিরে আসা, অবসরের সিদ্ধান্ত বদলে জাতীয় দলের হয়ে খেলা চালিয়ে যাওয়া, নতুন প্রজন্মের ফুটবলারদের সঙ্গে দল তৈরি করা এবং শেষ পর্যন্ত ট্রফি জেতা—এই পুরো যাত্রাই তাঁকে সমর্থকদের হৃদয়ে স্থায়ী জায়গা দিয়েছে।

এএফএ-ও মেসির বিদায় উপলক্ষে জানিয়েছে, তাঁর উত্তরাধিকার শুধু ট্রফি বা রেকর্ডে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে আর্জেন্তিনার পরিচয় এবং কোটি মানুষের আবেগ।

সতীর্থদের কাছেও বিশেষ মেসি

মেসির জাতীয় দলের অধ্যায় শুধু তাঁর নিজের গল্প নয়। এটি একটি দলের গল্পও।

লিওনেল স্কালোনির অধীনে আর্জেন্তিনা যে সাফল্য পেয়েছে, তার অন্যতম কেন্দ্র ছিলেন মেসি। তবে তাঁর চারপাশে তৈরি হয়েছিল একটি শক্তিশালী দল। অ্যাঞ্জেল দি মারিয়া, রদ্রিগো দি পল, লাউতারো মার্তিনেজ, হুলিয়ান আলভারেজ, এমিলিয়ানো মার্তিনেজ, এনজো ফের্নান্দেজসহ একাধিক ফুটবলার মেসির সঙ্গে জাতীয় দলের সাফল্যের অংশ হয়েছেন।

২০২২ সালের বিশ্বকাপজয়ী সেই দলের সদস্যদের বিদায়ী অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানোর পরিকল্পনাও তাই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। 

কারণ মেসির ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায়কে শুধু একজন ফুটবলারের বিদায় হিসেবে দেখা হচ্ছে না। এটি একটি গোটা প্রজন্মের বিদায়।

গ্যালারিতে আবেগের বিস্ফোরণ

মনুমেন্টালের গ্যালারিতে যে আবেগ তৈরি হবে, তার পূর্বাভাস ম্যাচের আগেই পাওয়া গিয়েছে। মেসির শেষ ম্যাচের টিকিট দ্রুত শেষ হয়ে যাওয়ার খবরও এসেছে। 

স্বাভাবিকভাবেই, সমর্থকেরা চান তাঁদের প্রিয় তারকাকে শেষবার জাতীয় দলের জার্সিতে সামনে থেকে দেখতে।

মেসির নাম উচ্চারণে যে গর্জন উঠবে, তা হয়তো ম্যাচের ফলাফলের থেকেও বড় হয়ে উঠবে। কারণ সেদিন গ্যালারির অনেকের কাছে স্কোরলাইন গুরুত্বপূর্ণ হবে না। গুরুত্বপূর্ণ হবে ১০ নম্বর জার্সির মানুষটিকে শেষবার দেখা।

মেসি গোল করুন বা না করুন, অ্যাসিস্ট করুন বা না করুন—সমর্থকেরা তাঁকে উদযাপন করতেই প্রস্তুত।

বেনিন ম্যাচ কেন বিশেষ?

আর্জেন্তিনা বনাম বেনিন ম্যাচটি মূলত একটি আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচ। কিন্তু মেসির বিদায়ের কারণে সেটির গুরুত্ব সম্পূর্ণ বদলে গিয়েছে।

বেনিনের কোচ গেরনট রোরও জানিয়েছেন, ম্যাচটি আবেগঘন হলেও তাঁদের দল প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক মনোভাব নিয়েই মাঠে নামবে। অর্থাৎ বিদায়ী আবহ থাকলেও ফুটবল ম্যাচের লড়াই থাকবে। 

news image
আরও খবর

আর্জেন্তিনার জন্য অবশ্য এই ম্যাচের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য হবে মেসিকে একটি স্মরণীয় রাত উপহার দেওয়া।

ফলাফলের চেয়েও বড় বিদায়

সাধারণত ফুটবলে কোনও ম্যাচের আগে প্রশ্ন থাকে—কে জিতবে? কত গোল হবে? কোন খেলোয়াড় সেরা হবে?

কিন্তু মেসির বিদায়ী ম্যাচে প্রশ্নটা অন্যরকম।

কীভাবে তাঁকে বিদায় জানানো হবে?

কতটা আবেগঘন হবে সেই মুহূর্ত?

ম্যাচের শেষে মেসি কী বলবেন?

তিনি কি গ্যালারির দিকে তাকিয়ে হাত নেড়ে বিদায় জানাবেন?

এই প্রশ্নগুলিই এখন সমর্থকদের আলোচনার কেন্দ্রে।

এএফএ-ও স্পষ্ট করেছে, ম্যাচটি শুধু একটি ফলাফলের জন্য নয়, মেসির দীর্ঘ যাত্রাকে উদযাপন করার জন্য। 

একটি যুগের অবসান

ফুটবলে কিংবদন্তিরা একদিন অবসর নেন। কিন্তু তাঁদের প্রভাব থেকে যায়।

মেসির ক্ষেত্রেও সেটাই হবে।

আর্জেন্তিনার জাতীয় দলে তাঁর জায়গা পূরণ করা কোনও একজন খেলোয়াড়ের পক্ষে সহজ হবে না। ১০ নম্বর জার্সি হয়তো ভবিষ্যতেও কোনও প্রতিভাবান ফুটবলার পরবেন, কিন্তু সেই জার্সির সঙ্গে মেসির যে আবেগ তৈরি হয়েছে, তা পুনরায় তৈরি হতে সময় লাগবে।

কারণ মেসি শুধু গোলের রেকর্ড রেখে যাচ্ছেন না। তিনি রেখে যাচ্ছেন একটি ফুটবল দর্শন।

তিনি দেখিয়েছেন, প্রতিভার পাশাপাশি ধৈর্যও প্রয়োজন। ব্যর্থতার পরও ফিরে আসতে হয়। সমালোচনা সহ্য করতে হয়। বারবার চেষ্টা করতে হয়।

আর সবচেয়ে বড় কথা, স্বপ্ন পূরণ হতে দেরি হলেও স্বপ্ন দেখা বন্ধ করা যায় না।

আর্জেন্তিনার কাছে মেসি কী?

এই প্রশ্নের উত্তর কোনও পরিসংখ্যান দিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়।

মেসি আর্জেন্তিনার কাছে একই সঙ্গে একজন ফুটবলার, অধিনায়ক, নায়ক এবং আবেগের নাম।

যে দেশ মারাদোনাকে দেবতার আসনে বসিয়েছে, সেই দেশই শেষ পর্যন্ত মেসিকেও নিজের হৃদয়ে জায়গা দিয়েছে।

এএফএ-র ভাষায়, মেসির উত্তরাধিকার কোনও একটি ট্রফি বা রেকর্ডের মধ্যে আটকে নেই। তিনি আর্জেন্তিনার জাতীয় দলের ইতিহাসের অংশ হয়ে গিয়েছেন।

এই কারণেই তাঁর বিদায় নিয়ে এত আয়োজন।

শেষবারের মতো ‘আলবিসেলেস্তে’

মেসির জাতীয় দলের অধ্যায়ের শেষ ম্যাচটি যেন তাঁর পুরো যাত্রার প্রতিচ্ছবি।

একদিকে রয়েছে ২০০৫ সালের তরুণ মেসি।

অন্যদিকে রয়েছে ২০২২-এর বিশ্বচ্যাম্পিয়ন অধিনায়ক।

তার মাঝে রয়েছে অসংখ্য ম্যাচ, অসংখ্য গোল, হার, কান্না, প্রত্যাবর্তন, ট্রফি এবং কোটি মানুষের ভালোবাসা।

আজ সেই সব স্মৃতি এক জায়গায় এসে মিলবে।

মনুমেন্টালের মাঠে যখন মেসি আর্জেন্তিনার জার্সি পরে নামবেন, তখন শুধু বর্তমান নয়, অতীতও যেন তাঁর সঙ্গে মাঠে নামবে।

কাতারের রাত, কোপা আমেরিকার সাফল্য, ব্রাজিলের বিরুদ্ধে ফাইনাল, ২০১৬-এর হতাশা, ২০১৪ বিশ্বকাপ ফাইনালের যন্ত্রণা—সব স্মৃতি হয়তো সমর্থকদের চোখের সামনে ভেসে উঠবে।

আর ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হবে নতুন এক অধ্যায়।

মেসি জাতীয় দলের হয়ে আর মাঠে নামবেন না। কিন্তু তাঁর গল্প শেষ হবে না।

বিদায় মানেই শেষ নয়

একজন কিংবদন্তির ক্ষেত্রে বিদায় কখনওই সম্পূর্ণ বিদায় নয়।

মেসি জাতীয় দলের জার্সি তুলে রাখলেও তাঁর গোল, তাঁর ড্রিবল, তাঁর পাস, তাঁর নেতৃত্ব এবং তাঁর বিশ্বকাপ জয় আর্জেন্তিনার ফুটবল ইতিহাসে থেকে যাবে।

ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ফুটবলাররা তাঁকে দেখে অনুপ্রাণিত হবে। ছোটরা তাঁর ভিডিও দেখে ড্রিবল শিখবে। নতুন খেলোয়াড়েরা তাঁর রেকর্ড ভাঙার স্বপ্ন দেখবে।

কিন্তু মেসির মতো একজন ফুটবলারকে আবার পাওয়া যাবে কি না, সেই উত্তর সময়ই দেবে।

এখন শুধু সময় এসেছে তাঁকে উদযাপন করার।

রাজকীয় বিদায়ের অপেক্ষা

আর্জেন্তিনার সমর্থকদের কাছে ৬ অক্টোবরের রাত তাই শুধুমাত্র একটি ফুটবল ম্যাচ নয়। এটি তাঁদের প্রিয় অধিনায়ককে ধন্যবাদ জানানোর রাত।

ধন্যবাদ বলতে সেই ছেলেটিকে, যে বছরের পর বছর জাতীয় দলের হয়ে লড়েছেন।

ধন্যবাদ বলতে সেই অধিনায়ককে, যিনি একের পর এক ব্যর্থতার পরও ফিরে এসেছেন।

ধন্যবাদ বলতে সেই ফুটবলারকে, যিনি আর্জেন্তিনাকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন করেছেন।

আর ধন্যবাদ বলতে সেই মানুষটিকে, যিনি ফুটবলকে আরও সুন্দর করে তুলেছেন।

মেসির শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচের আগে এএফএ-ও সেই আবেগকেই সামনে এনেছে। সংস্থার বক্তব্য—এই বিদায় এমন একটি মুহূর্ত, যা বহু প্রজন্ম মনে রাখবে। 

মনুমেন্টালের আলো জ্বলবে। গ্যালারি ভরে উঠবে আর্জেন্তিনার নীল-সাদা পতাকায়। হাজার হাজার কণ্ঠে উঠবে ‘মেসি, মেসি’ ধ্বনি। মাঠে নামবেন ১০ নম্বর জার্সির সেই মানুষটি, যাঁর সঙ্গে আর্জেন্তিনার ফুটবলের দুই দশকেরও বেশি ইতিহাস জড়িয়ে।

হয়তো ম্যাচের শেষে চোখে জল থাকবে মেসিরও।

হয়তো থাকবে সতীর্থদের আলিঙ্গন।

হয়তো তিনি গ্যালারির দিকে তাকিয়ে শেষবারের মতো হাত নেড়ে বলবেন—বিদায়।

কিন্তু আর্জেন্তিনার মানুষের কাছে সেই বিদায় কোনও শেষ নয়।

কারণ মেসি তাঁদের জাতীয় দলের ইতিহাসে এমন একটি অধ্যায় লিখে গিয়েছেন, যার শেষ পাতা থাকলেও গল্প শেষ হওয়ার নয়।

আর্জেন্তিনার জার্সিতে শেষ ম্যাচ, কিন্তু মেসির কিংবদন্তির কোনও শেষ ম্যাচ নেই।

Preview image