ত্বকের তারুণ্য ধরে রাখতে শুধু প্রসাধনী নয়, প্রয়োজন সঠিক যত্ন ও নিয়মিত যোগাসন। জেনে নিন, ত্বক সতেজ রাখতে সহায়ক ৩টি সহজ যোগাসন।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ত্বকে বলিরেখা, শুষ্কতা ও জেল্লা কমে যাওয়ার সমস্যা দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে পুজোর আগে ত্বক নিয়ে অনেকেই চিন্তায় থাকেন। কেউ দামি প্রসাধনী ব্যবহার করেন, কেউ আবার পার্লারে গিয়ে নানা রকম পরিচর্যা করান। কিন্তু শুধু বাইরে থেকে ত্বকের যত্ন নিলেই কি তারুণ্যের দীপ্তি ধরে রাখা সম্ভব? ত্বক ভালো রাখতে নিয়মিত শরীরচর্চা, পর্যাপ্ত ঘুম, সুষম খাবার এবং মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
এই কারণেই দৈনন্দিন জীবনে যোগাসন অভ্যাস করার পরামর্শ দেওয়া হয়। নিয়মিত যোগাসন করলে শরীরের নমনীয়তা বাড়ে, পেশি সক্রিয় থাকে এবং মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে। আর মানসিক চাপ কমানো ও পর্যাপ্ত বিশ্রাম ত্বকের সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। তবে মনে রাখতে হবে, কোনও যোগাসন সরাসরি বলিরেখা দূর করে বা ত্বকের বয়স কমিয়ে দেয়, এমন নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এখনও নেই।
পুজোর আগে শরীর ও মনকে সতেজ রাখতে চাইলে প্রতিদিনের রুটিনে যোগ করতে পারেন তিনটি সহজ আসন। মৎস্যাসন, অধোমুখ শ্বানাসন এবং বালাসন। কী ভাবে করবেন এই আসনগুলি? কোন বিষয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন? জেনে নিন বিস্তারিত।
মৎস্যাসন যোগব্যায়ামের একটি পরিচিত আসন। এই আসনে বুক প্রসারিত হয় এবং ঘাড় ও পিঠের পেশিতে টান অনুভূত হতে পারে। যাঁরা দীর্ঘক্ষণ বসে কাজ করেন, তাঁদের ক্ষেত্রে সঠিক পদ্ধতিতে এই আসন অভ্যাস করলে শরীরের নমনীয়তা বাড়াতে সাহায্য করতে পারে। তবে ঘাড়ে ব্যথা থাকলে বা মেরুদণ্ডের সমস্যা থাকলে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন।
কী ভাবে করবেন মৎস্যাসন?
1. প্রথমে সমতল জায়গায় একটি যোগম্যাট বিছিয়ে চিত হয়ে শুয়ে পড়ুন।
2. দু’টি পা একসঙ্গে সোজা করে রাখুন। হাত দু’টি শরীরের পাশে রাখুন।
3. এ বার কনুইয়ে ভর দিয়ে ধীরে ধীরে বুক উপরের দিকে তুলুন।
4. বুক তোলার সময় মাথা সামান্য পিছনের দিকে হেলিয়ে দিন। তবে ঘাড়ের উপর অতিরিক্ত চাপ দেবেন না।
5. স্বাভাবিক ভাবে শ্বাস নিতে থাকুন। নিজের স্বাচ্ছন্দ্য অনুযায়ী কয়েক সেকেন্ড এই অবস্থানে থাকুন।
6. ধীরে ধীরে বুক ও মাথা নামিয়ে আগের অবস্থায় ফিরে আসুন।
প্রথম দিকে অল্প সময়ের জন্য এই আসন অভ্যাস করুন। অভিজ্ঞ প্রশিক্ষকের পরামর্শ নিয়ে ধীরে ধীরে সময় বাড়াতে পারেন।
কী কী উপকার হতে পারে?
মৎস্যাসন বুক ও কাঁধের সামনের অংশ প্রসারিত করতে সাহায্য করে। নিয়মিত অভ্যাসে শরীরের নমনীয়তা বজায় রাখা সহজ হতে পারে। পাশাপাশি সঠিক ভাবে শ্বাস নেওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতেও এটি সহায়ক। তবে শুধু মৎস্যাসন করলেই ত্বকের জেল্লা বাড়বে বা বলিরেখা দূর হবে, এমনটা মনে করার কারণ নেই।
অধোমুখ শ্বানাসন যোগব্যায়ামের অন্যতম পরিচিত একটি ভঙ্গি। দেখতে অনেকটা ইংরেজি ‘V’ অক্ষরের মতো। এই আসনে হাত, পা, কাঁধ ও পিঠের পেশি সক্রিয় থাকে। নিয়মিত অভ্যাস করলে শরীরের নমনীয়তা ও ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করতে পারে।
কী ভাবে করবেন অধোমুখ শ্বানাসন?
1. প্রথমে যোগম্যাটের উপর হাত ও হাঁটুতে ভর দিয়ে বসুন। হাঁটু থাকবে কোমরের ঠিক নীচে এবং হাত থাকবে কাঁধের নীচে।
2. এ বার ধীরে ধীরে হাঁটু মাটি থেকে তুলুন। কোমর উপরের দিকে তুলে শরীরকে উল্টানো ‘V’ আকৃতি দিন।
3. হাতের তালু মাটিতে ভালো ভাবে রাখুন। আঙুলগুলি ছড়িয়ে রাখলে ভারসাম্য বজায় রাখতে সুবিধা হতে পারে।
4. মাথা দুই হাতের মাঝখানে রাখুন। ঘাড়ে অযথা চাপ দেবেন না।
5. পা সোজা রাখার চেষ্টা করুন। তবে গোড়ালি মাটিতে ঠেকানোর জন্য জোর করবেন না। প্রয়োজন হলে হাঁটু সামান্য ভাঁজ করে রাখুন।
6. স্বাভাবিক ভাবে শ্বাস নিতে নিতে ১৫ থেকে ২০ সেকেন্ড এই অবস্থানে থাকুন।
7. ধীরে ধীরে হাঁটু মাটিতে নামিয়ে আগের অবস্থায় ফিরে আসুন।
শুরুতে এই আসন কঠিন মনে হলে প্রশিক্ষকের সাহায্য নিতে পারেন। কবজি, কাঁধ বা পিঠে ব্যথা থাকলে আগে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
কী কী উপকার হতে পারে?
অধোমুখ শ্বানাসন হাত, কাঁধ, পা ও পিঠের পেশিকে সক্রিয় রাখতে সাহায্য করে। নিয়মিত অভ্যাসে শরীরের নমনীয়তা ও ভারসাম্য বাড়তে পারে। দীর্ঘক্ষণ বসে থাকার ফলে শরীরে যে জড়তা তৈরি হয়, তা কমাতেও এই আসন সহায়ক হতে পারে। তবে এই আসন ত্বকের কোষের পুনর্গঠন করে বা বলিরেখা দূর করে, এমন কোনও নিশ্চিত প্রমাণ নেই।
বালাসন বা চাইল্ড পোজ খুব সহজ একটি যোগাসন। যাঁরা নতুন করে যোগব্যায়াম শুরু করছেন, তাঁদের জন্যও এই আসনটি বেশ পরিচিত। এই আসনে শরীরকে বিশ্রাম দেওয়ার পাশাপাশি মন শান্ত রাখার অভ্যাস করা যায়। বিশেষ করে সারাদিনের ব্যস্ততা ও কাজের চাপের পরে কিছুক্ষণ বালাসন করলে আরাম অনুভব হতে পারে।
কী ভাবে করবেন বালাসন?
1. প্রথমে যোগম্যাটের উপর হাঁটু মুড়ে গোড়ালির উপর বসুন।
2. এ বার ধীরে ধীরে শরীরের উপরের অংশ সামনের দিকে ঝুঁকিয়ে দিন।
3. কপাল মাটিতে রাখুন। হাত দু’টি সামনের দিকে প্রসারিত করে রাখতে পারেন। চাইলে শরীরের দু’পাশেও রাখতে পারেন।
4. নিতম্ব গোড়ালির উপর রাখার চেষ্টা করুন। তবে অস্বস্তি হলে জোর করবেন না।
5. এ বার চোখ বন্ধ করে ধীরে ধীরে শ্বাস নিন ও ছাড়ুন।
6. ২০ থেকে ৩০ সেকেন্ড এই অবস্থানে থেকে ধীরে ধীরে আগের অবস্থায় ফিরে আসুন।
হাঁটুতে ব্যথা থাকলে বা এই ভঙ্গিতে অস্বস্তি হলে আসনটি এড়িয়ে চলুন। প্রয়োজনে হাঁটুর নীচে নরম বালিশ ব্যবহার করতে পারেন।
কী কী উপকার হতে পারে?
বালাসন শরীরকে বিশ্রাম দিতে এবং মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করতে পারে। নিয়মিত অভ্যাসে শরীরের জড়তা কমানো ও আরাম অনুভব করা সহজ হতে পারে। মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণে থাকলে ঘুমের মানও ভালো হতে পারে। পর্যাপ্ত ঘুম ত্বকের স্বাভাবিক স্বাস্থ্য বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
ত্বকের যত্নের ক্ষেত্রে যোগাসন সহায়ক হলেও একে একমাত্র উপায় ভাবা ঠিক নয়। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ত্বকে কোলাজেনের পরিমাণ ও স্থিতিস্থাপকতা কমতে পারে। এর ফলে বলিরেখা ও ত্বক ঝুলে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দেয়। পাশাপাশি সূর্যের অতিবেগনি রশ্মি, ধূমপান, দূষণ ও অনিয়মিত জীবনযাপনও ত্বকের বয়স বাড়ার প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে।
তাই ত্বকের যত্নে কয়েকটি অভ্যাস মেনে চলা জরুরি।
সানস্ক্রিন ব্যবহার করুন: বাইরে বেরোনোর আগে অন্তত এসপিএফ ৩০ যুক্ত ব্রড-স্পেকট্রাম সানস্ক্রিন ব্যবহার করুন। দীর্ঘক্ষণ বাইরে থাকলে নিয়ম মেনে আবার লাগান। সূর্যের ক্ষতিকর রশ্মি থেকে ত্বককে রক্ষা করতে এটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
পর্যাপ্ত ঘুমান: প্রতিদিন নিয়মিত সাত থেকে ন' ঘণ্টা ঘুমানোর চেষ্টা করুন। পর্যাপ্ত ঘুম শরীরের স্বাভাবিক পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়ায় সাহায্য করে।
সুষম খাবার খান: খাদ্যতালিকায় ফল, শাকসব্জি, ডাল, বাদাম ও প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার রাখুন। এগুলি শরীরের সামগ্রিক সুস্থতার জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি জোগায়।
পর্যাপ্ত জল পান করুন: শরীরের জলের চাহিদা অনুযায়ী জল পান করুন। শরীরে জলের ঘাটতি হলে ত্বক শুষ্ক দেখাতে পারে।
নিয়মিত শরীরচর্চা করুন: যোগাসনের পাশাপাশি হাঁটা বা অন্য কোনও সহজ শরীরচর্চাও করতে পারেন। নিয়মিত শরীরচর্চা শরীর ও মন সুস্থ রাখতে সাহায্য করে।
যোগাসন করার সময় শরীরের সক্ষমতার দিকে নজর দেওয়া জরুরি। প্রথম দিন থেকেই কঠিন আসন করার চেষ্টা করবেন না। সহজ আসন দিয়ে শুরু করুন এবং ধীরে ধীরে অভ্যাস বাড়ান। কোনও আসন করার সময় ব্যথা, মাথা ঘোরা বা শ্বাসকষ্ট হলে সঙ্গে সঙ্গে থেমে যান।
বিশেষ করে যাঁদের ঘাড়, কোমর, হাঁটু বা কবজিতে দীর্ঘদিনের সমস্যা রয়েছে, তাঁরা প্রশিক্ষকের পরামর্শ ছাড়া কঠিন যোগাসন করবেন না। গর্ভাবস্থায় বা অস্ত্রোপচারের পরে যোগাসন শুরু করার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
প্রতিদিন একই সময়ে অল্প অল্প করে যোগাসন অভ্যাস করার চেষ্টা করুন। এক দিন অনেকক্ষণ যোগাসন করে পরের কয়েক দিন বন্ধ রাখার চেয়ে নিয়মিত অল্প সময় অভ্যাস করা বেশি সুবিধাজনক।
শেষ কথা
পুজোর আগে ত্বকের যত্ন নিতে গিয়ে শুধু প্রসাধনীর উপর নির্ভর করবেন না। নিয়মিত যোগাসন, পর্যাপ্ত ঘুম, সুষম খাবার ও সানস্ক্রিন ব্যবহারের অভ্যাস গড়ে তুলুন। মৎস্যাসন, অধোমুখ শ্বানাসন ও বালাসন শরীরকে সক্রিয় রাখতে এবং মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করতে পারে। তবে ত্বকের বলিরেখা দূর করার নিশ্চয়তা দেয় না। সুস্থ জীবনযাপনই ত্বকের স্বাভাবিক সৌন্দর্য বজায় রাখার অন্যতম উপায়।