ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ভাষায় একে বলা হয় ‘টানেল ব্রেকথ্রু’। দীর্ঘদিন মাটির নিচে সুড়ঙ্গ খোঁড়ার পর টানেল বোরিং মেশিন নির্ধারিত গন্তব্যে পৌঁছনোর এই মুহূর্তই প্রকল্পের বড় সাফল্য।
কলকাতা মেট্রোর সম্প্রসারণের ইতিহাসে যুক্ত হলো আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। জোকা–এসপ্ল্যানেড পার্পল লাইন মেট্রো প্রকল্পে নির্মীয়মাণ ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল মেট্রো স্টেশনে সফলভাবে পৌঁছল বিশালাকার টানেল বোরিং মেশিন বা টিবিএম ‘দুর্গা’। খিদিরপুর থেকে মাটির নীচে সুড়ঙ্গ খোঁড়ার কাজ শুরু করার ঠিক এক বছরের মাথায় ভিক্টোরিয়া স্টেশনে পৌঁছে প্রথম পর্যায়ের কাজ সম্পূর্ণ করল যন্ত্রটি।
ইঞ্জিনিয়ারিং পরিভাষায় এই ঘটনাকে বলা হচ্ছে ‘টানেল ব্রেকথ্রু’। মাটির গভীরে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে সুড়ঙ্গ নির্মাণের জন্য ব্যবহৃত টানেল বোরিং মেশিন যখন নির্ধারিত ভূগর্ভস্থ স্টেশনের শেষ দেওয়াল বা পাথরের বাধা কেটে ভিতরে প্রবেশ করে, তখন সেই মুহূর্তকে টানেল ব্রেকথ্রু হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। যেকোনও ভূগর্ভস্থ মেট্রো প্রকল্পে এই মুহূর্তটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এর মধ্য দিয়ে সুড়ঙ্গ নির্মাণের একটি বড় ও জটিল পর্যায় সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়।
এ দিন সকাল সাড়ে ১০টা নাগাদ টিবিএম ‘দুর্গা’ ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল মেট্রো স্টেশনের সুড়ঙ্গের শেষ প্রান্তে পৌঁছে যায়। যন্ত্রটির কাটার হেড শেষ বাধা ভেদ করে স্টেশন এলাকায় প্রবেশ করতেই প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত আধিকারিক, ইঞ্জিনিয়ার ও কর্মীদের মধ্যে উচ্ছ্বাস দেখা যায়। দীর্ঘ এক বছরের পরিকল্পনা, পরিশ্রম, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং নিরবচ্ছিন্ন নজরদারির ফলেই এই সাফল্য অর্জিত হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এই গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে উপস্থিত ছিলেন মেট্রো রেলের জেনারেল ম্যানেজার প্রেমসাগর গুপ্ত এবং রেল বিকাশ নিগম লিমিটেডের উচ্চপদস্থ কর্তারা। প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত ইঞ্জিনিয়ার, প্রযুক্তিবিদ, শ্রমিক এবং নিরাপত্তাকর্মীদের অভিনন্দন জানান মেট্রো রেলের জেনারেল ম্যানেজার। তিনি জানান, সর্বোচ্চ নিরাপত্তাবিধি মেনে সুড়ঙ্গ খোঁড়ার কাজ পরিচালিত হয়েছে। একই সঙ্গে কলকাতার ব্যস্ত সড়কপথে যান চলাচল যাতে কোনওভাবে ব্যাহত না হয়, সেই বিষয়েও বিশেষ নজর রাখা হয়েছিল।
গত বছরের ১০ জুলাই খিদিরপুর থেকে টিবিএম ‘দুর্গা’র ভূগর্ভস্থ যাত্রা শুরু হয়েছিল। কলকাতার ঘনবসতিপূর্ণ এবং অত্যন্ত ব্যস্ত এলাকার মাটির নীচে সুড়ঙ্গ নির্মাণ মোটেই সহজ কাজ নয়। ভূগর্ভে থাকা বিভিন্ন পরিষেবা লাইন, পুরনো নিকাশি ব্যবস্থা, জলের পাইপ, বৈদ্যুতিক সংযোগ, রাস্তার উপর যানবাহনের চাপ এবং আশপাশে থাকা গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার কথা মাথায় রেখে প্রতিটি ধাপে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে কাজ এগিয়ে নিয়ে যেতে হয়েছে।
খিদিরপুর থেকে ভিক্টোরিয়া পর্যন্ত সুড়ঙ্গ খোঁড়ার সময় টিবিএম ‘দুর্গা’কে বিভিন্ন ধরনের মাটির স্তর ভেদ করতে হয়েছে। কোথাও নরম পলিমাটি, কোথাও জলযুক্ত ভূমি, আবার কোথাও তুলনামূলকভাবে শক্ত স্তরের মুখোমুখি হতে হয়েছে। প্রতিটি পরিস্থিতি অনুযায়ী যন্ত্রের গতি, চাপ এবং মাটি কাটার পদ্ধতি নিয়ন্ত্রণ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। সুড়ঙ্গের ভিতরে জল বা মাটি ঢুকে পড়া আটকানো, উপরিভাগের রাস্তা ও ভবনের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং নির্ধারিত পথে যন্ত্রটিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়াই ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
টিবিএম একটি অত্যাধুনিক এবং বিশালাকার যন্ত্র। মাটির নীচে সামনের অংশ দিয়ে মাটি কাটার পাশাপাশি যন্ত্রটি পিছনের দিকে সুড়ঙ্গের দেওয়াল তৈরির কাজও করে। মাটি কাটার পর সুড়ঙ্গের ভিতরে পর্যায়ক্রমে কংক্রিটের সেগমেন্ট বসানো হয়। এই সেগমেন্টগুলি একত্রিত হয়ে একটি শক্তিশালী বৃত্তাকার কাঠামো তৈরি করে, যা সুড়ঙ্গকে মাটির চাপ, ভূগর্ভস্থ জল এবং অন্যান্য সম্ভাব্য ঝুঁকি থেকে সুরক্ষিত রাখে।
সাধারণ মানুষের কাছে ‘টানেল ব্রেকথ্রু’ শব্দটি কিছুটা প্রযুক্তিনির্ভর মনে হলেও এর অর্থ তুলনামূলকভাবে সহজ। কোনও নির্দিষ্ট স্থান থেকে সুড়ঙ্গ খোঁড়া শুরু করার পর টানেল বোরিং মেশিন যখন পরিকল্পনা অনুযায়ী অন্য প্রান্তের স্টেশন বা নির্ধারিত জায়গায় পৌঁছে শেষ দেওয়ালটি কেটে বেরিয়ে আসে, তখন সেই ঘটনাকেই টানেল ব্রেকথ্রু বলা হয়।
ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ নির্মাণে কয়েক মিলিমিটার বা কয়েক সেন্টিমিটারের বিচ্যুতিও পরবর্তী সময়ে বড় সমস্যা তৈরি করতে পারে। তাই টিবিএমের অবস্থান, দিক, গভীরতা এবং অগ্রগতির উপর প্রতিনিয়ত নজর রাখা হয়। আধুনিক সেন্সর, লেজার গাইডেন্স ব্যবস্থা, কম্পিউটারভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ এবং বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে যন্ত্রটিকে নির্ধারিত পথে চালানো হয়।
একটি টিবিএম মাটির নীচে প্রবেশ করার পর সাধারণভাবে বাইরে থেকে সেটিকে দেখা সম্ভব হয় না। যন্ত্রটির প্রতিটি অগ্রগতি নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে নজরদারি করা হয়। কোথাও মাটির চাপ বেড়ে গেলে বা জলস্তরে পরিবর্তন হলে সঙ্গে সঙ্গে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়। ফলে নির্ধারিত স্টেশনে সফলভাবে পৌঁছনো শুধু একটি যান্ত্রিক সাফল্য নয়, এটি পরিকল্পনা, জরিপ, প্রযুক্তি এবং মানবশ্রমের সম্মিলিত সাফল্য।
ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল স্টেশনে ‘দুর্গা’র পৌঁছনোর ঘটনাটি সেই কারণেই পার্পল লাইন প্রকল্পের জন্য একটি বড় মাইলফলক। দীর্ঘ সময় ধরে মাটির নীচে চলা কাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ সফলভাবে শেষ হয়েছে। এর ফলে প্রকল্পের পরবর্তী পর্যায়ের কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পথ আরও সুগম হবে।
কলকাতা দেশের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ এবং ঐতিহ্যবাহী মহানগর। শহরের বিভিন্ন অংশে শতাব্দীপ্রাচীন ভবন, গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনা, হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বাজার এবং ব্যস্ত রাস্তা রয়েছে। ফলে এই শহরে ভূগর্ভস্থ মেট্রো নির্মাণের সময় শুধু সুড়ঙ্গ খোঁড়াই যথেষ্ট নয়; উপরিভাগের প্রতিটি স্থাপনার নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতে হয়।
খিদিরপুর থেকে ভিক্টোরিয়া পর্যন্ত এলাকাটি যানবাহনের চাপ এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার কারণে বিশেষভাবে সংবেদনশীল। এই অঞ্চলে সুড়ঙ্গ খোঁড়ার সময় রাস্তার উপর যান চলাচল স্বাভাবিক রাখা ছিল প্রকল্প কর্তৃপক্ষের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। বড় ধরনের রাস্তা বন্ধ বা দীর্ঘমেয়াদি যান নিয়ন্ত্রণের কারণে সাধারণ মানুষের অসুবিধা হতে পারত। সেই পরিস্থিতি এড়িয়ে মাটির গভীরে কাজ চালিয়ে যাওয়া প্রকল্পের একটি উল্লেখযোগ্য দিক।
মেট্রো রেলের জেনারেল ম্যানেজার প্রেমসাগর গুপ্ত জানিয়েছেন, সর্বোচ্চ নিরাপত্তা বজায় রেখে কাজ করা হয়েছে। শহরের যান চলাচলে যাতে কোনও প্রভাব না পড়ে, সেই বিষয়েও নজর রাখা হয়েছিল। তাঁর বক্তব্য থেকে স্পষ্ট, সুড়ঙ্গ নির্মাণের পাশাপাশি জনজীবন স্বাভাবিক রাখাকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এই ধরনের প্রকল্পে মাটির উপরের ভবনগুলির কম্পন এবং বসে যাওয়ার সম্ভাবনা নিয়মিত পরীক্ষা করা হয়। বিভিন্ন স্থানে বিশেষ পর্যবেক্ষণ যন্ত্র বসিয়ে মাটি ও নির্মাণের গতিবিধি রেকর্ড করা হয়। কোনও অস্বাভাবিকতা দেখা দিলে দ্রুত কাজের গতি পরিবর্তন বা প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। টিবিএমের ভিতরের চাপও এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়, যাতে সামনে থাকা মাটি হঠাৎ ধসে না পড়ে।
ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল শুধু কলকাতার নয়, গোটা দেশের অন্যতম পরিচিত ঐতিহাসিক স্থাপনা। প্রতিদিন বহু দেশি-বিদেশি পর্যটক এই এলাকায় আসেন। ময়দান, রবীন্দ্র সদন, নন্দন, বিড়লা প্ল্যানেটোরিয়াম এবং আশপাশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জায়গার কারণে এই অঞ্চল কলকাতার সাংস্কৃতিক ও পর্যটন মানচিত্রে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
এই এলাকায় মেট্রো স্টেশন নির্মিত হলে ভবিষ্যতে পর্যটক, অফিসযাত্রী, ছাত্রছাত্রী এবং সাধারণ যাত্রীদের যাতায়াত আরও সহজ হতে পারে। দক্ষিণ-পশ্চিম কলকাতা থেকে শহরের কেন্দ্রীয় অংশে পৌঁছতে বর্তমানে বহু মানুষকে বাস, অটো, ট্যাক্সি বা একাধিক পরিবহণ ব্যবস্থা ব্যবহার করতে হয়। পার্পল লাইনের সম্পূর্ণ অংশ চালু হলে যাত্রার সময় কমার পাশাপাশি সড়কপথের উপর চাপও কিছুটা হ্রাস পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের মতো ঐতিহ্যবাহী স্থাপনার কাছে ভূগর্ভস্থ নির্মাণকাজ করার সময় বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন। কম্পন, মাটির স্তরের পরিবর্তন এবং নির্মাণজনিত অন্যান্য প্রভাব যেন ঐতিহাসিক স্থাপনায় না পড়ে, তা নিশ্চিত করেই কাজ এগিয়ে নিয়ে যেতে হয়। এই কারণেও ভিক্টোরিয়া স্টেশনে টিবিএমের সফলভাবে পৌঁছনো বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
মেট্রো কর্তৃপক্ষ এই সাফল্যকে প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত সমস্ত কর্মীর দলগত পরিশ্রমের ফল হিসেবে উল্লেখ করেছে। একটি টানেল বোরিং মেশিন পরিচালনার পিছনে শুধু কয়েকজন চালক বা ইঞ্জিনিয়ার নন, বহু বিভাগের কর্মীরা যুক্ত থাকেন। মাটি ও ভূতাত্ত্বিক পরিস্থিতি পরীক্ষা করা থেকে শুরু করে যন্ত্রের রক্ষণাবেক্ষণ, বিদ্যুৎ সরবরাহ, কংক্রিট সেগমেন্ট পৌঁছে দেওয়া, খনন করা মাটি সরানো, নিরাপত্তা পরীক্ষা এবং তথ্য বিশ্লেষণ—প্রতিটি ক্ষেত্রেই আলাদা বিশেষজ্ঞ দল কাজ করে।
দিনের পাশাপাশি রাতেও সুড়ঙ্গ নির্মাণের কাজ চলতে পারে। টিবিএম একবার ভূগর্ভে কাজ শুরু করলে তার কার্যক্রম নিয়মিত চালু রাখা গুরুত্বপূর্ণ। যন্ত্র থেমে গেলে বা কোনও প্রযুক্তিগত সমস্যা দেখা দিলে দ্রুত বিশেষজ্ঞদের ঘটনাস্থলে পৌঁছে সমাধান করতে হয়। মাটির নীচে সীমিত জায়গায় দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করা শ্রমিক ও প্রযুক্তিবিদদের জন্য শারীরিক এবং মানসিকভাবে যথেষ্ট কঠিন।
সুড়ঙ্গের ভিতরে পর্যাপ্ত আলো, বাতাস, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং জরুরি অবস্থায় দ্রুত বেরিয়ে আসার পথ নিশ্চিত করতে হয়। নিয়মিত নিরাপত্তা মহড়া এবং স্বাস্থ্য পরীক্ষার ব্যবস্থাও এই ধরনের প্রকল্পে গুরুত্বপূর্ণ। ফলে টানেল ব্রেকথ্রুর সাফল্য প্রকল্পের সমস্ত বিভাগের সমন্বয় এবং নিরলস পরিশ্রমের প্রতিফলন।
টিবিএম ‘দুর্গা’ শুধু মাটি কেটে এগিয়ে যায়নি। যন্ত্রটি সামনে মাটি কাটার সঙ্গে সঙ্গে পিছনের অংশে সুড়ঙ্গের স্থায়ী কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। আগে থেকে প্রস্তুত বিশেষ কংক্রিট সেগমেন্ট সুড়ঙ্গের ভিতরে নিয়ে গিয়ে বৃত্তাকারভাবে বসানো হয়। প্রতিটি রিং সম্পূর্ণ হওয়ার পর যন্ত্রটি সামনের দিকে এগিয়ে যায় এবং একই প্রক্রিয়া আবার শুরু হয়।
এই কংক্রিট সেগমেন্টগুলি সুড়ঙ্গের স্থায়িত্ব রক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মাটির চাপ এবং ভূগর্ভস্থ জলের প্রভাব থেকে সুড়ঙ্গকে সুরক্ষিত রাখতে সেগুলি বিশেষভাবে তৈরি করা হয়। সেগমেন্টের সংযোগস্থলে জলরোধী ব্যবস্থা থাকে, যাতে ভবিষ্যতে সুড়ঙ্গের ভিতরে জল প্রবেশের ঝুঁকি কমানো যায়।
প্রতিটি সেগমেন্ট বসানোর পর তার গুণমান, সংযোগ এবং অবস্থান পরীক্ষা করা হয়। কোথাও সামান্য ত্রুটি দেখা দিলেও তা দ্রুত সংশোধন করা প্রয়োজন। কারণ মেট্রো পরিষেবা শুরু হওয়ার পর প্রতিদিন অসংখ্য যাত্রী এই সুড়ঙ্গ দিয়ে যাতায়াত করবেন। তাই নির্মাণের প্রতিটি পর্যায়ে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা এবং স্থায়িত্বকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়।
টানেল ব্রেকথ্রু গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য হলেও এর অর্থ এই নয় যে সুড়ঙ্গ বা স্টেশনের সমস্ত কাজ শেষ হয়ে গিয়েছে। টিবিএম ভিক্টোরিয়া স্টেশনে পৌঁছনোর পর যন্ত্রটির প্রয়োজনীয় অংশ খুলে বের করা বা পরবর্তী কাজের জন্য প্রস্তুত করার প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে। একই সঙ্গে সুড়ঙ্গের ভিতরে বাকি নির্মাণ, জলরোধী ব্যবস্থা, রেললাইন বসানো এবং প্রযুক্তিগত পরিকাঠামো তৈরির কাজ এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।
সুড়ঙ্গের ভিতরে ট্র্যাক বসানোর পাশাপাশি বিদ্যুৎ সরবরাহ, সিগন্যালিং ব্যবস্থা, টেলিযোগাযোগ, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা এবং জরুরি আলো স্থাপন করতে হবে। স্টেশনে প্ল্যাটফর্ম, প্রবেশ ও প্রস্থান পথ, লিফট, এসকেলেটর, টিকিট কাউন্টার এবং যাত্রী নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা তৈরি করা হবে। অগ্নিকাণ্ড বা অন্য কোনও জরুরি পরিস্থিতিতে যাত্রীদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় পথ এবং সরঞ্জামও রাখতে হবে।
স্টেশনের কাঠামোগত কাজ শেষ হওয়ার পর বিভিন্ন বিভাগের যৌথ পরীক্ষা করা হয়। ট্র্যাক, বিদ্যুৎ এবং সিগন্যালিংয়ের মধ্যে সঠিক সমন্বয় না থাকলে মেট্রো চালানো সম্ভব নয়। এরপর পরীক্ষামূলকভাবে ট্রেন চালিয়ে গতি, ব্রেক, কম্পন, যাত্রী নিরাপত্তা এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা যাচাই করা হয়। প্রতিটি পরীক্ষা সফল হওয়ার পর প্রয়োজনীয় অনুমোদন নিয়ে যাত্রী পরিষেবা শুরু করা যায়।
ফলে টিবিএম ‘দুর্গা’র সাফল্য গোটা প্রকল্পের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলেও সামনে এখনও একাধিক প্রযুক্তিগত এবং নির্মাণসংক্রান্ত কাজ রয়েছে। তবে কঠিন সুড়ঙ্গ নির্মাণপর্বের বড় অংশ সফলভাবে অতিক্রম করায় নির্ধারিত লক্ষ্য পূরণের পথে প্রকল্পটি আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল।
জোকা–এসপ্ল্যানেড মেট্রো করিডরটি পার্পল লাইন নামে পরিচিত। এই করিডরের লক্ষ্য দক্ষিণ-পশ্চিম কলকাতা এবং শহরতলির বিস্তীর্ণ এলাকাকে কলকাতার কেন্দ্রীয় অংশের সঙ্গে দ্রুত ও আধুনিক গণপরিবহণ ব্যবস্থায় যুক্ত করা। জোকা, তারাতলা, মাঝেরহাট, খিদিরপুর, ভিক্টোরিয়া এবং এসপ্ল্যানেডের মতো গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল এই করিডরের সঙ্গে যুক্ত।
দক্ষিণ-পশ্চিম কলকাতার বহু মানুষকে প্রতিদিন কাজ, শিক্ষা, চিকিৎসা এবং অন্যান্য প্রয়োজনে শহরের কেন্দ্রীয় এলাকায় আসতে হয়। সড়কপথে যানজটের কারণে অনেক সময় যাত্রা দীর্ঘ এবং অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। সম্পূর্ণ পার্পল লাইন চালু হলে যাত্রীরা নির্দিষ্ট সময়ে গন্তব্যে পৌঁছতে পারবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
মেট্রো পরিষেবার আরেকটি বড় সুবিধা হলো একই সময়ে বিপুল সংখ্যক যাত্রী পরিবহণ করা সম্ভব। এর ফলে বাস, ব্যক্তিগত গাড়ি এবং অন্যান্য সড়ক পরিবহণের উপর নির্ভরতা কিছুটা কমতে পারে। যানজট এবং বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণেও আধুনিক গণপরিবহণ ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
এসপ্ল্যানেড কলকাতার অন্যতম প্রধান পরিবহণ কেন্দ্র। সেখানে পৌঁছনোর পর যাত্রীরা শহরের বিভিন্ন মেট্রো রুট এবং অন্যান্য গণপরিবহণ ব্যবস্থার সঙ্গে সংযোগের সুযোগ পেতে পারেন। ফলে পার্পল লাইন শুধু একটি পৃথক মেট্রো করিডর হিসেবে নয়, কলকাতার বৃহত্তর পরিবহণ নেটওয়ার্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।
কলকাতার ব্যস্ত এলাকায় কোনও বড় নির্মাণকাজ শুরু হলে সাধারণত যানজট এবং রাস্তা সংকীর্ণ হওয়ার আশঙ্কা থাকে। বিশেষ করে মেট্রো স্টেশন নির্মাণের জন্য বিভিন্ন জায়গায় রাস্তার অংশ ঘিরে রাখতে হয়। কিন্তু সুড়ঙ্গ নির্মাণের বড় সুবিধা হলো অধিকাংশ কাজ মাটির গভীরে করা যায়।
মেট্রো কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, যান চলাচলের উপর যাতে কম প্রভাব পড়ে, সেই বিষয়টি মাথায় রেখেই কাজের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। সুড়ঙ্গের উপরে থাকা রাস্তা দিয়ে স্বাভাবিকভাবে যানবাহন চলাচল করেছে। প্রয়োজন অনুযায়ী সীমিত এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করা হলেও শহরের দৈনন্দিন জীবন যাতে বড় ধরনের সমস্যার মুখে না পড়ে, সেদিকে নজর রাখা হয়েছে।
একই সঙ্গে নির্মাণসামগ্রী আনা, খনন করা মাটি বের করে নিয়ে যাওয়া এবং ভারী যন্ত্রপাতি স্থানান্তরের সময়ও পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করতে হয়েছে। ব্যস্ত সময়ে ভারী গাড়ি চলাচল করলে যানজট বাড়তে পারত। তাই অনেক ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময়সূচি মেনে নির্মাণসংক্রান্ত পরিবহণ পরিচালনা করা হয়।
ভূগর্ভস্থ মেট্রো প্রকল্পে সামান্য অসতর্কতাও বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। সেই কারণে নির্মাণের প্রতিটি ধাপে নিরাপত্তা সংক্রান্ত একাধিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। টিবিএমের ভিতরে অক্সিজেনের মাত্রা, তাপমাত্রা, বাতাসের গুণমান এবং সম্ভাব্য ক্ষতিকর গ্যাসের উপস্থিতি পরীক্ষা করা হয়।
সুড়ঙ্গের ভিতরে কর্মীদের জন্য হেলমেট, প্রতিফলকযুক্ত পোশাক, নিরাপত্তা জুতো এবং অন্যান্য সুরক্ষা সরঞ্জাম ব্যবহার বাধ্যতামূলক। যন্ত্রের কোনও অংশে সমস্যা হলে বা মাটির চাপের অস্বাভাবিক পরিবর্তন হলে দ্রুত কাজ বন্ধ করার ব্যবস্থা থাকে। জরুরি পরিস্থিতিতে যোগাযোগের জন্য আলাদা ব্যবস্থা এবং উদ্ধার পরিকল্পনাও প্রস্তুত রাখা হয়।
মাটির উপরিভাগেও নিয়মিত পরীক্ষা চালানো হয়। রাস্তা, ভবন বা অন্য কোনও স্থাপনায় অস্বাভাবিক ফাটল বা বসে যাওয়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে কি না, তা পর্যবেক্ষণ করা হয়। আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে খুব সামান্য পরিবর্তনও শনাক্ত করা সম্ভব। ফলে কোনও ঝুঁকির ইঙ্গিত পাওয়া গেলে আগেভাগেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যায়।
প্রেমসাগর গুপ্তের বক্তব্য অনুযায়ী, সর্বোচ্চ নিরাপত্তা বজায় রেখেই সুড়ঙ্গ খোঁড়ার কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এই বার্তা প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত কর্মীদের পাশাপাশি শহরের সাধারণ মানুষের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ব্যস্ত এবং ঐতিহাসিক এলাকার নীচে নির্মাণকাজ চলাকালীন নিরাপত্তা নিয়ে মানুষের স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ থাকে।
কলকাতা দেশের প্রথম মেট্রো শহর। সময়ের সঙ্গে শহরের জনসংখ্যা, যানবাহনের সংখ্যা এবং যাতায়াতের প্রয়োজন বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। শুধু একটি মেট্রো রুটের মাধ্যমে এই বিপুল চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নয়। তাই শহরের বিভিন্ন প্রান্তকে যুক্ত করতে একাধিক নতুন মেট্রো করিডর নির্মাণ করা হচ্ছে।
পার্পল লাইন সেই সম্প্রসারণ পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। জোকা ও আশপাশের এলাকা থেকে শহরের কেন্দ্র পর্যন্ত দ্রুত যোগাযোগ তৈরি হলে দক্ষিণ-পশ্চিম কলকাতার পরিবহণ ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আসতে পারে। বর্তমানে যেসব এলাকায় মেট্রোর সরাসরি সুবিধা সীমিত, সেখানকার মানুষও আধুনিক রেলভিত্তিক গণপরিবহণের সুযোগ পাবেন।
মেট্রো পরিষেবা সময়নিষ্ঠ হওয়ায় কর্মজীবী মানুষ এবং ছাত্রছাত্রীদের বিশেষ সুবিধা হতে পারে। সড়কপথের যানজট, বৃষ্টি অথবা অন্যান্য সমস্যার কারণে যাত্রার সময় পরিবর্তিত হওয়ার আশঙ্কা তুলনামূলকভাবে কম থাকে। এছাড়া শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ট্রেন, স্বয়ংক্রিয় টিকিট ব্যবস্থা এবং আধুনিক স্টেশন যাত্রীদের আরামদায়ক ভ্রমণের সুযোগ দেয়।
ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের কাছে মেট্রো স্টেশন তৈরি কলকাতার ঐতিহ্য এবং আধুনিক প্রযুক্তির এক বিশেষ সমন্বয় হিসেবে দেখা যেতে পারে। একদিকে রয়েছে শতাব্দীপ্রাচীন স্থাপত্য ও ইতিহাস, অন্যদিকে রয়েছে অত্যাধুনিক টানেল বোরিং মেশিন, কম্পিউটারভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং আধুনিক ভূগর্ভস্থ পরিবহণ পরিকাঠামো।
এই ধরনের এলাকায় নির্মাণের সময় শুধু প্রযুক্তিগত দক্ষতা নয়, ঐতিহ্য সংরক্ষণের দায়িত্বও থাকে। স্টেশন এবং তার প্রবেশপথের নকশা থেকে শুরু করে নির্মাণের পদ্ধতি—সব ক্ষেত্রেই আশপাশের পরিবেশ ও স্থাপত্যের গুরুত্ব বিবেচনা করা প্রয়োজন।
ভবিষ্যতে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল মেট্রো স্টেশন চালু হলে পর্যটকদের জন্য এই ঐতিহাসিক স্থানে পৌঁছনো আরও সহজ হতে পারে। শহরের অন্য প্রান্ত থেকে মেট্রোয় এসে কম সময়ে ভিক্টোরিয়া এলাকায় পৌঁছনোর সুযোগ তৈরি হবে। এর ফলে পর্যটন এবং স্থানীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
টিবিএম ‘দুর্গা’র যাত্রা শুরু হয়েছিল গত বছরের ১০ জুলাই। ঠিক এক বছরের মাথায় নির্ধারিত স্টেশনে পৌঁছনো প্রকল্পের পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়নের সাফল্যকেই তুলে ধরে। ভূগর্ভস্থ নির্মাণে বিভিন্ন অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। মাটির প্রকৃতি, জলস্তর, যন্ত্রের রক্ষণাবেক্ষণ এবং নিরাপত্তা সংক্রান্ত কারণে কাজের গতিতে পরিবর্তন আসতে পারে।
তা সত্ত্বেও এক বছরের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় শেষ করা প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত প্রতিটি ব্যক্তির দক্ষতা এবং দায়বদ্ধতার প্রমাণ। দিনের পর দিন মাটির গভীরে কঠিন পরিবেশে কাজ করা কর্মীদের কাছে টানেল ব্রেকথ্রুর মুহূর্তটি বিশেষ আবেগের। তাঁদের দীর্ঘ পরিশ্রমের দৃশ্যমান ফল পাওয়া যায় এই মুহূর্তে।
শেষ দেওয়াল ভেদ করে টিবিএমের কাটার হেড যখন স্টেশনের ভিতরে দেখা যায়, তখন সেটি শুধু একটি যন্ত্রের গন্তব্যে পৌঁছনো নয়। এটি প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত অসংখ্য মানুষের স্বপ্ন, পরিকল্পনা এবং পরিশ্রমের সফল পরিণতি।
ভিক্টোরিয়া স্টেশনে টিবিএম ‘দুর্গা’র পৌঁছনোর খবর কলকাতাবাসীর কাছে নতুন আশার বার্তা নিয়ে এসেছে। শহরের বিভিন্ন মেট্রো প্রকল্প নিয়ে সাধারণ মানুষের আগ্রহ দীর্ঘদিনের। কোনও প্রকল্পের একটি বড় নির্মাণপর্ব সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ার অর্থ হলো ভবিষ্যৎ পরিষেবার দিকে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ এগিয়ে যাওয়া।
তবে সাধারণ যাত্রীদের পরিষেবা পাওয়ার আগে স্টেশন, ট্র্যাক, বিদ্যুৎ, সিগন্যালিং এবং নিরাপত্তা সংক্রান্ত বহু কাজ সম্পূর্ণ করতে হবে। সমস্ত পরীক্ষা ও অনুমোদনের পরই মেট্রো পরিষেবা চালু করা সম্ভব হবে। তাই টানেল ব্রেকথ্রু নিয়ে উচ্ছ্বাস থাকলেও পরবর্তী পর্যায়ের কাজ সমান গুরুত্ব দিয়ে শেষ করা প্রয়োজন।
মেট্রো কর্তৃপক্ষের দাবি অনুযায়ী, প্রকল্পের প্রতিটি পর্যায়ে নিরাপত্তা এবং গুণমান বজায় রাখা হচ্ছে। নির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী বাকি কাজ সম্পন্ন হলে কলকাতার পরিবহণ মানচিত্রে পার্পল লাইন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।