উজ্জ্বল রঙ আর বড় আকারের ফুলের জন্য জবা গাছ বাগানপ্রেমীদের প্রথম পছন্দ। নার্সারিতে যেখানে একটি ভালো হাইব্রিড জবার দাম ১৫০ থেকে ৩০০ টাকা সেখানে ঘরোয়া উপায়ে নিজের উঠোনেই বিনা খরচে জবা গাছ তৈরি করা সম্ভব।
বাগানে ফুল ফোটানো মানুষের চিরকালের শখ। দিনের শুরুতে কিংবা সন্ধ্যার অবসরে নিজের বাগানে রঙিন ফুলের দিকে তাকালে মন ভালো হয়ে যায়। বিশেষ করে লাল রঙের জবাগাছ অনেক বাড়িতেই আলাদা আকর্ষণ তৈরি করে। বড় আকারের উজ্জ্বল ফুল শুধু চোখের আরাম দেয় না, বাড়ির পরিবেশকেও করে তোলে প্রাণবন্ত ও ইতিবাচক। অনেকেই ভাবেন সুন্দর বড় ফুল পেতে হলে নার্সারি থেকে দামি গাছ কিনতেই হবে। কিন্তু বাস্তবে বিষয়টি একেবারেই তা নয়। সামান্য ধৈর্য আর সঠিক পদ্ধতি জানলে এক পয়সাও খরচ না করে নিজের উঠোনেই নতুন জবাগাছ তৈরি করা সম্ভব। সবচেয়ে সহজ এবং কার্যকর উপায় হল কাটিং পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে অল্প সময়ের মধ্যেই গাছ বড় হয় এবং নিয়মিত ফুল দেয়।
প্রথমেই আসা যাক কাটিংয়ের জন্য সঠিক শাখা নির্বাচন প্রসঙ্গে। ভালো গাছ তৈরি হওয়ার মূল চাবিকাঠি এখানেই। আপনি চাইলে বন্ধু বা প্রতিবেশীর বাড়ি থেকে একটি সুস্থ জবাগাছের শাখা নিতে পারেন। খেয়াল রাখতে হবে শাখাটি যেন খুব বেশি পুরানো না হয় আবার খুব বেশি কচিও না হয়। খুব পুরানো শাখা সাধারণত বাদামী রঙের হয় এবং শিকড় গজানোর ক্ষমতা কম থাকে। আবার খুব নরম কচি ডাল সহজেই পচে যেতে পারে। তাই মাঝামাঝি অবস্থার একটি আধা শক্ত কাঠের শাখা সবচেয়ে উপযুক্ত। পেন্সিলের মতো পুরু এবং প্রায় ছয় থেকে আট ইঞ্চি লম্বা শাখা হলে সবচেয়ে ভালো ফল পাওয়া যায়।
শাখা নির্বাচন করার পর তার সঠিক প্রস্তুতি অত্যন্ত জরুরি। শাখাটি গাছ থেকে কাটার সময় অবশ্যই পরিষ্কার ও ধারালো ছুরি বা কাঁচি ব্যবহার করবেন। শাখার নিচের অংশটি পঁয়তাল্লিশ ডিগ্রি কোণে কেটে নিন। এই কোণে কাটলে শাখাটি মাটির ভেতরে বেশি জায়গা পায় এবং জল শোষণের ক্ষমতা বাড়ে। এরপর শাখার নিচের দিকের সব পাতা ও কুঁড়ি তুলে ফেলুন। উপরের দিকে শুধু দুই থেকে তিনটি পাতা রাখলেই যথেষ্ট। এতে গাছ তার সমস্ত শক্তি শিকড় গজানোর দিকে দিতে পারে এবং নতুন গাছ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়।
অনেকেই ভাবেন কাটিং থেকে গাছ তৈরি করতে হলে বাজারের দামি রুটিং হরমোন কিনতেই হবে। কিন্তু প্রকৃতি আমাদের হাতে এমন কিছু উপাদান দিয়েছে যা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে এবং খুবই কার্যকর। এর মধ্যে অন্যতম হল অ্যালোভেরা জেল। কাটিং শাখার নিচের অংশটি তাজা অ্যালোভেরা জেলে ডুবিয়ে নিলে এটি প্রাকৃতিক রুটিং হরমোন হিসেবে কাজ করে। অ্যালোভেরা জেল শাখাটিকে ছত্রাক ও ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণ থেকে রক্ষা করে এবং শিকড় দ্রুত গজাতে সাহায্য করে। এছাড়াও এটি শাখার আর্দ্রতা ধরে রাখতে সাহায্য করে, যা নতুন গাছ তৈরির জন্য খুবই প্রয়োজনীয়।
এবার আসা যাক রোপণ পদ্ধতিতে। কাটিং রোপণের জন্য বড় টবের দরকার নেই। আপনি একটি ডিসপোজেবল কাপ বা পুরানো ছোট পাত্র ব্যবহার করতে পারেন। পাত্রের নিচে অবশ্যই জল বেরোনোর ছিদ্র থাকতে হবে। মাটির মিশ্রণ তৈরি করতে সাধারণ বাগানের মাটির সঙ্গে সামান্য বালি মিশিয়ে নিন। এতে মাটি ঝুরঝুরে থাকবে এবং জল জমে থাকবে না। অতিরিক্ত জল জমে থাকলে কাটিং সহজেই পচে যেতে পারে। মাটিতে পেন্সিল বা কাঠি দিয়ে একটি ছোট গর্ত করুন এবং শাখাটি প্রায় দুই ইঞ্চি গভীরে বসান। এরপর চারপাশের মাটি আলতো করে চেপে ধরুন যাতে ভেতরে বাতাস না থাকে।
কাটিং রোপণের পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল সঠিক পরিবেশ তৈরি করা। কাটিং এমন জায়গায় রাখুন যেখানে সরাসরি রোদ পড়ে না কিন্তু পর্যাপ্ত আলো থাকে। খুব বেশি রোদে কাটিং শুকিয়ে যেতে পারে। আবার একেবারে অন্ধকার জায়গায় রাখলেও শিকড় গজাতে সমস্যা হয়। প্রাথমিক অবস্থায় আর্দ্রতা বজায় রাখা খুব দরকার। এজন্য আপনি একটি স্বচ্ছ প্লাস্টিকের ব্যাগ দিয়ে পাত্রটি ঢেকে দিতে পারেন। এতে একটি ছোট গ্রিনহাউসের মতো পরিবেশ তৈরি হবে। প্রতিদিন একবার ব্যাগ খুলে কিছুক্ষণ বাতাস ঢুকতে দিন যাতে ছত্রাক না ধরে।
সঠিকভাবে যত্ন নিলে পনেরো থেকে কুড়ি দিনের মধ্যেই কাটিং থেকে নতুন অঙ্কুর বের হতে শুরু করবে। এই সময় ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করা খুব জরুরি। অনেকেই অল্পদিন পরেই কাটিং তুলে দেখে শিকড় হয়েছে কিনা। এতে শিকড় নষ্ট হয়ে যায় এবং পুরো প্রচেষ্টা ব্যর্থ হতে পারে। একবার নতুন পাতা ও অঙ্কুর দেখা গেলে বুঝবেন শিকড় ভালোভাবে তৈরি হচ্ছে। তখন ধীরে ধীরে প্লাস্টিকের ব্যাগ খুলে ফেলতে পারেন এবং গাছকে বাইরের পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে দিন।
গাছ একটু বড় হলে তাকে বড় টবে বা মাটিতে রোপণ করা যেতে পারে। জবাগাছ এমন জায়গায় লাগানো ভালো যেখানে দিনে অন্তত চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা রোদ পায়। নিয়মিত জল দিতে হবে কিন্তু জল যেন জমে না থাকে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। অতিরিক্ত জল জবাগাছের শিকড় পচিয়ে দিতে পারে।
এবার আসা যাক ফুল ফোটানোর গোপন কৌশলে। শুধু গাছ বড় হলেই চলবে না, নিয়মিত বড় এবং উজ্জ্বল ফুল পেতে হলে সঠিক পুষ্টি দেওয়া জরুরি। জবাগাছ কলার খোসার সার খুব পছন্দ করে। কলার খোসা রোদে শুকিয়ে গুঁড়ো করে নিন এবং মাসে একবার মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিন। চাইলে কলার খোসা কয়েক ঘণ্টা জলে ভিজিয়ে রেখে সেই জল গাছের গোড়ায় দিতে পারেন। এতে পটাশিয়াম ও অন্যান্য খনিজ উপাদান গাছ পায় যা ফুলের আকার ও রঙ দুটোই বাড়াতে সাহায্য করে।
এছাড়াও মাঝেমধ্যে সরিষার খোল ভেজানো জল বা পচা গোবর সার অল্প পরিমাণে দেওয়া যেতে পারে। তবে খেয়াল রাখতে হবে সার যেন অতিরিক্ত না হয়। বেশি সার দিলে গাছ পুড়ে যেতে পারে বা শুধু পাতা বাড়বে কিন্তু ফুল কম আসবে। নিয়মিত শুকনো ও রোগাক্রান্ত ডাল ছেঁটে দিলে গাছ আরও ঝোপালো হয় এবং বেশি ফুল দেয়।
সব মিলিয়ে বলা যায়, জবাগাছ লাগানো ও ফুল ফোটানো মোটেও ব্যয়বহুল বা কঠিন কাজ নয়। সঠিক শাখা নির্বাচন, ধৈর্য সহকারে কাটিং প্রস্তুত, ঘরোয়া উপায়ে রুটিং হরমোন ব্যবহার এবং নিয়মিত যত্ন নিলেই আপনার বাগান ভরে উঠবে বড় বড় উজ্জ্বল জবা ফুলে। এক পয়সাও খরচ না করে নিজের হাতে তৈরি গাছে যখন প্রথম ফুল ফুটবে, সেই আনন্দ সত্যিই আলাদা। এই সহজ পদ্ধতিগুলি মেনে চললে আপনার বাড়ির জবাগাছ হয়ে উঠবে সকলের নজরকাড়া আকর্ষণ।
জবাগাছের যত্নে আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল নিয়মিত পর্যবেক্ষণ। প্রতিদিন গাছের পাতা রং ও অবস্থার দিকে নজর রাখা উচিত। পাতা যদি হলুদ হয়ে যেতে শুরু করে বা কুঁচকে যায় তবে বুঝতে হবে গাছ হয় অতিরিক্ত জল পাচ্ছে নয়তো প্রয়োজনীয় পুষ্টির অভাব হচ্ছে। এই অবস্থায় জল দেওয়ার পরিমাণ কমিয়ে কয়েক দিন গাছের প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করুন। প্রয়োজনে হালকা জৈব সার ব্যবহার করা যেতে পারে। জবাগাছ খুব স্পর্শকাতর নয় কিন্তু নিয়মিত যত্ন পেলে সে তার সৌন্দর্য দ্বিগুণ করে দেয়।
আর একটি কার্যকর কৌশল হল নিয়মিত ডাল ছাঁটাই করা। অনেকেই ভাবেন ডাল কাটলে গাছ দুর্বল হয়ে যাবে কিন্তু বাস্তবে ঠিক তার উল্টোটা ঘটে। পুরোনো ডাল ছেঁটে দিলে গাছ নতুন শাখা ছাড়ে এবং সেই নতুন শাখাতেই বেশি ফুল আসে। ফুল ফোটার মৌসুম শেষ হলে হালকা ছাঁটাই করলে পরবর্তী সময়ে গাছ আরও ঝোপালো হয়। এতে একসঙ্গে অনেক ফুল ফোটার সম্ভাবনা বাড়ে।
জবাগাছ সাধারণত উষ্ণ আবহাওয়া পছন্দ করে। শীতকালে গাছের বৃদ্ধি কিছুটা কমে যায়। এই সময় জল দেওয়ার পরিমাণ কমিয়ে দিতে হবে এবং খুব ঠান্ডা হাওয়া থেকে গাছকে বাঁচাতে হবে। চাইলে গাছ টবে থাকলে বারান্দার একটু উষ্ণ কোণে সরিয়ে রাখা যেতে পারে। শীত শেষে আবার নিয়মিত যত্ন শুরু করলে গাছ দ্রুত আগের অবস্থায় ফিরে আসে।
অনেক সময় গাছে পোকামাকড় দেখা যায় যেমন এফিড বা ছোট সাদা পোকা। এসবের জন্য রাসায়নিক ওষুধ ব্যবহার না করাই ভালো। ঘরোয়া উপায়ে নিমপাতা ভেজানো জল বা সামান্য সাবান জল স্প্রে করলে পোকামাকড় দূরে থাকে। এতে গাছের কোনো ক্ষতি হয় না এবং পরিবেশও নিরাপদ থাকে। সপ্তাহে একবার এমন জল ব্যবহার করলেই সাধারণত সমস্যা নিয়ন্ত্রণে থাকে।
যখন কাটিং থেকে তৈরি গাছটি পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে তখন তার ফুল দেখলে আলাদা তৃপ্তি পাওয়া যায়। নিজের হাতে তৈরি গাছের ফুল অন্যরকম আনন্দ দেয় যা নার্সারি থেকে কেনা গাছে পাওয়া যায় না। পাশাপাশি এটি পরিবারের সদস্যদের বিশেষ করে শিশুদের প্রকৃতির সঙ্গে যুক্ত করে। তারা শিখতে পারে ধৈর্য যত্ন আর ভালোবাসা দিলে কীভাবে একটি ছোট ডাল থেকে সুন্দর ফুলে ভরা গাছ তৈরি হয়।
সবশেষে বলা যায় জবাগাছ শুধু একটি ফুলের গাছ নয় এটি বাড়ির সৌন্দর্য মানসিক শান্তি এবং প্রকৃতির সঙ্গে সংযোগের প্রতীক। এক পয়সাও খরচ না করে কাটিং পদ্ধতিতে জবাগাছ তৈরি করা যেমন সহজ তেমনই আনন্দদায়ক। নিয়মিত যত্ন আর সামান্য সচেতনতা থাকলেই আপনার বাগান সারা বছর রঙিন জবা ফুলে ভরে থাকবে এবং প্রতিবেশী থেকে অতিথি সবাই মুগ্ধ হবে।