Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

ঠাকুর পৌঁছে দিতে হাড়ভাঙা পরিশ্রম, তবুও শূন্য পকেট! পুজোর মুখে চরম আর্থিক সংকটে পরিবহন শ্রমিকরা

দুর্গাপূজার মণ্ডপে মণ্ডপে প্রতিমা পৌঁছে দিতে রাতদিন এক করে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করছেন শ্রমিকরা। কিন্তু এত খাটুনির পরও মিলছে না কাঙ্ক্ষিত রোজগার। গত বছর ৩৬টি প্রতিমা পৌছে দিয়ে মাথা পিছু প্রায় ৬,০০০ টাকা আয় হলেও, এ বছর কাটছাঁট ও মন্দার বাজারে সেই সামান্য আয়েও টান পড়েছে। অনিশ্চয়তার মুখে প্রতিমা বহনকারী শ্রমিকদের সংসার।

উমার আবাহনের নেপথ্যে রক্তজল করা শ্রম: আলোকোজ্জ্বল মণ্ডপের অন্তরালে প্রতিমা বাহকদের হাহাকার

শরতের ভোরে শিউলি ফুলের গন্ধ আর ঢাকের বাদ্যি জানান দেয় আদ্যাশক্তির আগমনী বার বার্তা। শহর থেকে গ্রাম—সর্বত্রই যেন উৎসবের রঙে রঙিন। নতুন জামাকাপড়, চোখধাঁধানো লাইটিং, কোটি কোটি টাকার থিম মণ্ডপ আর দর্শনার্থীদের ভিড়ে মেতে ওঠে বাংলা। কিন্তু এই উৎসবের আলোয় ঢাকা পড়ে যায় এমন কিছু মানুষের মুখ, যাঁদের রক্ত জল করা পরিশ্রম ছাড়া দুর্গাপূজা অসম্ভব। মৃৎশিল্পীর কারখানা থেকে উমাকে যত্নসহকারে মণ্ডপের বেদিতে এনে বসানোর দায়িত্ব যাঁদের কাঁধে, সেই প্রতিমা পরিবহন শ্রমিকরা আজ চরম দুর্দশায়। পিঠের হাড়ভাঙা পরিশ্রম সত্ত্বে পকেটে জুটছে না কাঙ্ক্ষিত অর্থ। উৎসবের রঙিন মরসুমে তাঁদের ঘরে কেবলই অভাব ও অনিশ্চয়তার নিকষ কালো অন্ধকার।

কুমোরটুলির সংকীর্ণ গলি থেকে রাজপথ: মৃত্যুর ঝুঁকি ও অমানুষিক খাটুনি

উত্তর কলকাতার কুমোরটুলির মতো ঐতিহ্যবাহী পটপাড়া কিংবা আঞ্চলিক মৃৎশিল্পীদের সরু গলিগুলো থেকে ১০-১২ ফুটের বিশালাকার প্রতিমা বের করে আনা এক ধরনের শিল্পকলা বললে ভুল হবে না। প্রতিটি প্রতিমার ওজন কয়েকশো কেজি থেকে শুরু করে কয়েক টন পর্যন্ত হতে পারে। এই কাঁচা মাটি ও খড়ের তৈরি ভঙ্গুর প্রতিমাকে অক্ষত অবস্থায় ট্রাকে তোলা এবং সেখান থেকে নিরাপদে মণ্ডপে নিয়ে যাওয়া চরম সতর্কতার কাজ।

প্রতিমা পরিবহনের সময় সামান্য এক মিলিমিটারের ভুল বা অসাবধানতা ডেকে আনতে পারে বিরাট বিপদ। হাত বা মুখের অলংকার ভাঙা থেকে শুরু করে পুরো কাঠামোটি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ফলে এই শ্রমিকদের কেবল শারীরিক শক্তিয় প্রয়োগ করলেই চলে না, রাখতে হয় অসীম ধৈর্য ও বিচক্ষণতা।

  • বিপদসংকুল যাত্রা: কড়া রোদে পুড়ে বা ভাদ্র-আশ্বিনের ঝুম বৃষ্টিতে ভিজে খোলা ট্রাকে দাঁড়িয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভ্রমণ করতে হয়। অনেক সময় মাথার উপর ঝুলন্ত হাই-ভোল্টেজ ইলেকট্রিক তার সরিয়ে, গাছের ডালপালা সামলে পথ চলতে হয়।

  • নিদ্রাহীন রাত: পূজার আগের দিনগুলোতে টানা ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টা পর্যন্ত চোখের পাতা এক করতে পারেন না এই শ্রমিকরা। একটার পর একটা প্রতিমা লোড ও আনলোড করতেই কেটে যায় তাঁদের সময়।

  • দুর্ঘটনার ভয়: বাঁশের মাচা বা সরু সিঁড়ি বেয়ে যখন ভারী প্রতিমা বেদিতে তোলা হয়, তখন যেকোনো মুহূর্তে হাত পিছলে বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকে। তবুও জীবনের ঝুঁকি নিয়েই কাজ চালিয়ে যান এই মানুষেরা।

অর্থনৈতিক মন্দা ও বাজেট ছাঁটাই: গত বছরের তুলনায় ধাক্কা

উৎসবের মরসুমে পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর আশায় সারা বছর ধরে অপেক্ষা করে থাকেন এই মৌসুমি শ্রমিকরা। কিন্তু চলতি বছরের চিত্রটা তাঁদের চরম হতাশ করেছে।

গত বছরও পরিস্থিতির কিছুটা সুরাহা হয়েছিল। শ্রমিকদের তথ্য অনুযায়ী, আগের বছর এক একটি দল অন্তত ৩৬টি ছোট ও বড় প্রতিমা বিভিন্ন মণ্ডপে পৌঁছে দেওয়ার কাজ পেয়েছিল। অমানুষিক খাটুনির পর দিনশেষে এক একজন শ্রমিকের গড়ে প্রায় ৬,০০০ টাকার মতো উপার্জন হয়েছিল। এই টাকায় তারা পরিবারের জন্য নতুন পোশাক, পূজার দিনগুলোতে একটু ভালো খাবার এবং ছোটখাটো ধারদেনা শোধ করার সুযোগ পেয়েছিলেন।

কিন্তু এ বছর সব হিসেব উল্টে গেছে। শ্রমিকদের ভাষ্য অনুযায়ী, "এবার সেটুকুও হলো না।"

news image
আরও খবর

১. পুজো কমিটির বাজেট কাটছাঁট: লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধির কারণে ছোট ও মাঝারি পুজো কমিটিগুলো তাদের বাজেট কমাতে বাধ্য হয়েছে। স্পনসরশিপ কমে যাওয়ায় অনেক ক্লাব পরিবহনের মতো খাতে খরচ মারাত্মক হারে কমিয়ে দিয়েছে। ২. পরিবহন ব্যবস্থার পরিবর্তন: খরচের হাত থেকে বাঁচতে অনেক কমিটি একাধিক ছোট প্রতিমা এক ট্রাকে গাদাগাদি করে নিয়ে যাচ্ছে, অথবা ট্রলি ও ছোট গাড়ির পরিবর্তে বিকল্প উপায় খুঁজছে। এতে কাজ কমে গেছে বহু অভিজ্ঞ শ্রমিকের। ৩. মজুরির নিম্নমুখী দর: যেখানে বাজারদর বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে, সেখানে প্রতিমা বহনের শ্রমিকদের প্রতি প্রতিমা পিছু দেওয়া মজুরি আরও কমে গেছে। ফলস্বরূপ, কঠোর পরিশ্রমের পরেও খালি হাতে বাড়ি ফিরতে হচ্ছে শ্রমিকদের।

আকাশছোঁয়া মূল্যবৃদ্ধি ও বেঁচে থাকার করুণ লড়াই

দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম যেভাবে আকাশ ছুঁয়েছে, তাতে এই সামান্য উপার্জনে সংসার চালানো দায় হয়ে পড়েছে। চাল, ডাল, রান্নার তেল, সবজি থেকে শুরু করে চালের দাম—সবকিছুর মূল্য অপরিবর্তিত বা ঊর্ধ্বমুখী।

এক প্রবীণ পরিবহন শ্রমিক অত্যন্ত ভারাক্রান্ত কণ্ঠে নিজের অভিজ্ঞতা ব্যক্ত করে বলেন:

"আমরা যখন মণ্ডপে ঠাকুর বসাই, তখন লোকে হাতজোড় করে প্রণাম করে। কিন্তু আমাদের পেট তো আর ওই প্রণাামে ভরে না! সারা রাত খেটে যখন ভোরে বাড়ি ফিরি, তখন শরীর আর চলে না। হাত-পা ব্যথায় ছিঁড়ে যায়। ভেবেছিলাম এবার পুজোয় অন্তত ৬-৭ হাজার টাকা হাতে এলে মেজো ছেলের স্কুলের ফি-টা দেব আর ছোট মেয়েটাকে একটা নতুন জামা কিনে দেব। কিন্তু যা হাতে পেয়েছি, তাতে দেনা শোধ করতেই সব শেষ। বাচ্চাদের মুখের দিকে তাকাতে পারছি না।"

বছরের বাকি সময়টায় এই শ্রমিকদের অধিকাংশই ভ্যান চালিয়ে, দিনমজুরের কাজ করে বা নির্মাণকাজে রাজমিস্ত্রির সহকারী হিসেবে জীবিকা নির্বাহ করেন। দুর্গাপূজার এই কয়েক দিনের অতিরিক্ত উপার্জনই ছিল তাঁদের সারা বছরের 'বোঝা' হালকা করার একমাত্র সম্বল। কিন্তু সেই আশাতেও এখন ছাই পড়েছে।

সামাজিক সুরক্ষার অভাব ও অসংগঠিত ক্ষেত্রের ভবিষ্যৎ

প্রতিমা পরিবহন শ্রমিকরা কোনো নিবন্ধিত বা সংগঠিত ইউনিয়নের আওতায় আসেন না। তাঁদের নির্দিষ্ট কোনো বীমা বা সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্প নেই। কাজের সময় দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হলেও মালিক বা ক্লাব কর্তৃপক্ষের থেকে কোনো বিশেষ ক্ষতিপূরণ পাওয়া যায় না।

এই অনিশ্চয়তা ও আর্থিক অবমূল্যায়নের কারণে নতুন প্রজন্ম আর এই ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় আসতে চাইছে না। অনেকেই জীবিকার তাগিদে ভিন রাজ্যে নির্মাণ শ্রমিক বা নিরাপত্তাকর্মীর কাজে পাড়ি দিচ্ছেন। এভাবে চলতে থাকলে আগামী দিনে ঐতিহ্যবাহী দুর্গাপূজায় প্রতিমা নিরাপদে মণ্ডপে নিয়ে যাওয়ার মতো দক্ষ লোকবলের অভাব দেখা দেবে বলে আশঙ্কা করছেন পুজো বিশেষজ্ঞ ও শিল্পীরা।

উপসংহার

মণ্ডপে মণ্ডপে আলোর রোশনাই, ঢাকের আওয়াজ আর মন্ত্রোচ্চারণে যখন আকাশ-বাতাস মুখরিত হয়, তখন মণ্ডপের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা এই শ্রমজীবী মানুষগুলোর চোখে জল শুকিয়ে যায়। পূজার উৎসব সবার জীবনে আলো নিয়ে এলেও, উমাকে মণ্ডপে পৌঁছে দেওয়া এই নেপথ্য নায়কদের জীবন অন্ধকারেই থেকে যাচ্ছে। সমাজ ও প্রশাসনের কি উচিত নয় এই অসংগঠিত শ্রমিকদের জন্য নির্দিষ্ট ন্যূনতম মজুরি ও সামাজিক সুরক্ষার ব্যবস্থা করা? নাকি প্রতি বছরই মায়ের আবাহনের সঙ্গে সঙ্গে অমলিন থেকে যাবে তাঁদের এই দীর্ঘশ্বাস?মণ্ডপে মণ্ডপে আলোর রোশনাই, ঢাকের আওয়াজ আর মন্ত্রোচ্চারণে যখন আকাশ-বাতাস মুখরিত হয়, তখন মণ্ডপের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা এই শ্রমজীবী মানুষগুলোর চোখে জল শুকিয়ে যায়। পূজার উৎসব সবার জীবনে আলো নিয়ে এলেও, উমাকে মণ্ডপে পৌঁছে দেওয়া এই নেপথ্য নায়কদের জীবন অন্ধকারেই থেকে যাচ্ছে। সমাজ ও প্রশাসনের কি উচিত নয় এই অসংগঠিত শ্রমিকদের জন্য নির্দিষ্ট ন্যূনতম মজুরি ও সামাজিক সুরক্ষার ব্যবস্থা করা? নাকি প্রতি বছরই মায়ের আবাহনের সঙ্গে সঙ্গে অমলিন থেকে যাবে তাঁদের এই দীর্ঘশ্বাস?মণ্ডপে মণ্ডপে আলোর রোশনাই, ঢাকের আওয়াজ আর মন্ত্রোচ্চারণে যখন আকাশ-বাতাস মুখরিত হয়, তখন মণ্ডপের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা এই শ্রমজীবী মানুষগুলোর চোখে জল শুকিয়ে যায়। পূজার উৎসব সবার জীবনে আলো নিয়ে এলেও, উমাকে মণ্ডপে পৌঁছে দেওয়া এই নেপথ্য নায়কদের জীবন অন্ধকারেই থেকে যাচ্ছে। সমাজ ও প্রশাসনের কি উচিত নয় এই অসংগঠিত শ্রমিকদের জন্য নির্দিষ্ট ন্যূনতম মজুরি ও সামাজিক সুরক্ষার ব্যবস্থা করা? নাকি প্রতি বছরই মায়ের আবাহনের সঙ্গে সঙ্গে অমলিন থেকে যাবে তাঁদের এই দীর্ঘশ্বাস?

Preview image