Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

সাহিত্যিক শংকরের প্রয়াণ জন অরণ্যে আজ শোকের আবহ বাংলার সাংস্কৃতিক জগতে গভীর শূন্যতা

প্রয়াত প্রখ্যাত লেখক মণিশংকর মুখোপাধ্যায় বাংলা সাহিত্যের এক জনপ্রিয় ও প্রভাবশালী নাম সাহিত্যজীবনের শুরু থেকেই তিনি পাঠকের ভালোবাসা ও সাফল্য অর্জন করেছিলেন অল্প বয়সেই লেখালেখিতে হাতেখড়ি এবং ১৯৫৫ সালে প্রকাশিত প্রথম বইয়ের মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যে নিজের শক্ত অবস্থান গড়ে তোলেন

প্রয়াত প্রখ্যাত সাহিত্যিক মণিশংকর মুখোপাধ্যায় যিনি পাঠকমহলে শংকর নামেই অধিক পরিচিত ছিলেন তাঁর প্রয়াণে বাংলা সাহিত্যজগতে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। নব্বই পেরোনো জীবনের দীর্ঘ সাহিত্যযাত্রা শেষে বিরানব্বই বছর বয়সে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। বার্ধক্যজনিত অসুস্থতায় ভুগছিলেন বেশ কিছুদিন ধরেই। তবে শারীরিক অবসাদ তাঁকে যতটা না ক্লান্ত করেছিল তার চেয়েও অনেক বেশি সক্রিয় ছিল তাঁর স্মৃতি ও সৃষ্টির ভুবন। তাঁর চলে যাওয়া মানে কেবল একজন জনপ্রিয় লেখকের মৃত্যু নয়, বাংলা সাহিত্যের এক স্বর্ণযুগের অবসান।

শংকরের সাহিত্যজীবন শুরু হয়েছিল খুব অল্প বয়সে। কৈশোরেই তিনি কলম ধরেন। জীবনকে কাছ থেকে দেখার এক অদম্য কৌতূহল ছিল তাঁর মধ্যে। সাধারণ মানুষের জীবনযাপন, শহরের ব্যস্ততা, মধ্যবিত্তের স্বপ্নভঙ্গ, উচ্চবিত্তের আড়ম্বর, চাকরিজীবনের প্রতিযোগিতা, কর্পোরেট সংস্কৃতির চাপ, নৈতিক দ্বন্দ্ব এই সবকিছুকে তিনি অত্যন্ত সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে শব্দে রূপ দিয়েছেন। তাঁর প্রথম বই প্রকাশিত হয় উনিশশো পঞ্চান্ন সালে। সেই সূচনালগ্ন থেকেই পাঠকমহলে তিনি সাড়া ফেলেন। তাঁর লেখায় ছিল বাস্তবতার নির্মম স্বচ্ছতা আবার ছিল গভীর মানবিকতা।

‘কত অজানারে’ উপন্যাস প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই পাঠক বুঝতে পেরেছিলেন এক নতুন কণ্ঠস্বরের আবির্ভাব ঘটেছে। কত অজানারে কেবল একটি উপন্যাস ছিল না, এটি ছিল আত্মঅনুসন্ধানের এক যাত্রা। শহুরে জীবনের অচেনা দিক, সম্পর্কের টানাপোড়েন, কর্মক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা সব মিলিয়ে এই বই শংকরকে প্রতিষ্ঠা দেয় বাংলা সাহিত্যে। এরপর একের পর এক সৃষ্টি তাঁকে পৌঁছে দেয় জনপ্রিয়তার শিখরে।

কলকাতার সাহেবপাড়ার জীবন নিয়ে তাঁর অমর সৃষ্টি চৌরঙ্গি বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে। হোটেল শিল্পের অন্তরালের গল্প, অতিথিদের জীবন, কর্মীদের সংগ্রাম, নগর সভ্যতার বহুমাত্রিক রূপ সবকিছু এমন জীবন্তভাবে তিনি এঁকেছেন যে পাঠক যেন চোখের সামনে দেখতে পান সেই সময়ের কলকাতাকে। চৌরঙ্গি কেবল একটি উপন্যাস নয়, এটি শহরের চরিত্রচিত্রণ। এই বইয়ের মাধ্যমে শংকর দেখিয়েছিলেন নগর জীবনের ভেতরে লুকিয়ে থাকা এক জটিল মানচিত্র।

তাঁর আরেক উল্লেখযোগ্য সৃষ্টি সীমাবদ্ধ যেখানে কর্পোরেট জগতের প্রতিযোগিতা, সাফল্যের মোহ এবং নৈতিক আপসের গল্প উঠে এসেছে। এই উপন্যাসে আধুনিক কর্মসংস্কৃতির চাপ এবং মানুষের মানসিক দ্বন্দ্বকে তিনি অসাধারণ দক্ষতায় তুলে ধরেছেন। একইভাবে জন অরণ্য উপন্যাসে দেখা যায় শহুরে বেকারত্ব, ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তা এবং নৈতিক সংকটের কাহিনি। মধ্যবিত্ত যুবকের সংগ্রাম এবং আত্মসম্মানের লড়াইকে তিনি এমনভাবে লিখেছেন যা আজও সমান প্রাসঙ্গিক।

এই দুটি উপন্যাস এবং তাঁর সৃষ্ট জগত চলচ্চিত্রকারদেরও আকৃষ্ট করেছিল। কিংবদন্তি পরিচালক সত্যজিৎ রায় সীমাবদ্ধ এবং জন অরণ্য অবলম্বনে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। সাহিত্য থেকে চলচ্চিত্রে রূপান্তরের ক্ষেত্রে এই কাজগুলি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। রায়ের দৃষ্টিতে শংকরের কাহিনি নতুন মাত্রা পায়, আবার শংকরের লেখনীও প্রমাণ করে তার গভীর ভিজ্যুয়াল শক্তি। সাহিত্য ও সিনেমার এই সংযোগ বাংলা সংস্কৃতির ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

শংকরের রচনায় শহর কলকাতা যেন এক জীবন্ত চরিত্র। তিনি শহরকে কেবল পটভূমি হিসেবে ব্যবহার করেননি, বরং শহরের ভেতরের স্রোত, পরিবর্তন, মানুষের আকাঙ্ক্ষা, সাফল্যের লোভ, ব্যর্থতার যন্ত্রণা সবকিছুকে একত্রিত করে নির্মাণ করেছেন এক বহুমাত্রিক সমাজচিত্র। তাঁর ট্রিলজি স্বর্গ মর্ত পাতাল মূলত সীমাবদ্ধ জন অরণ্য এবং আশা আকাঙ্ক্ষা নিয়ে গঠিত। এই ত্রয়ীতে তিনি উচ্চবিত্ত কর্পোরেট স্তর থেকে শুরু করে মধ্যবিত্তের সংগ্রাম এবং নিম্নস্তরের বাস্তবতাকে একই ধারাবাহিকতায় উপস্থাপন করেছেন। সমাজের তিন স্তরের তিন রূপ সেখানে স্পষ্ট।

শংকরের ভাষা ছিল সহজ অথচ গভীর। তিনি জটিল দর্শন বা অলংকারের আড়ালে গল্প বলেননি। বরং সরল বর্ণনায় চরিত্রদের সামনে এনে পাঠককে ভাবতে বাধ্য করেছেন। তাঁর চরিত্ররা নিখুঁত নায়ক নয়, তারা ত্রুটিপূর্ণ মানুষ। তাদের স্বপ্ন আছে, লোভ আছে, দ্বিধা আছে, আবার আছে অনুশোচনা। এই মানবিক দুর্বলতাই তাঁর লেখাকে বাস্তব ও বিশ্বাসযোগ্য করেছে।

বাংলা সাহিত্যে জনপ্রিয়তা পাওয়া সহজ নয়, ধরে রাখা আরও কঠিন। কিন্তু শংকর দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে পাঠকের আগ্রহ ধরে রাখতে পেরেছেন। প্রজন্মের পর প্রজন্ম তাঁর বই পড়েছে। একসময়ের তরুণ পাঠক যখন পরিণত বয়সে পৌঁছেছেন তখনও শংকরের লেখা তাঁদের কাছে সমান প্রাসঙ্গিক থেকেছে। সময় বদলেছে, প্রযুক্তি বদলেছে, সমাজের কাঠামো বদলেছে, কিন্তু তাঁর উপন্যাসের অন্তর্নিহিত প্রশ্নগুলি আজও অমলিন।

তাঁর লেখায় নৈতিকতার প্রশ্ন বারবার ফিরে আসে। সাফল্য কি সবকিছু, নাকি আত্মসম্মান বেশি গুরুত্বপূর্ণ। জীবনের প্রতিযোগিতায় জিততে গিয়ে মানুষ কতটা আপস করতে পারে। সম্পর্কের মূল্য কতখানি। এই প্রশ্নগুলির নির্দিষ্ট উত্তর তিনি দেননি, বরং পাঠকের উপর ছেড়ে দিয়েছেন। এটাই তাঁর সাহিত্যিক পরিণততা।

মণিশংকর মুখোপাধ্যায় ব্যক্তিজীবনেও ছিলেন অত্যন্ত সংযত ও পরিশ্রমী। সাহিত্যচর্চাকে তিনি পেশা হিসেবে গ্রহণ করলেও এর প্রতি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল সাধনার মতো। নিয়মিত লেখা, পর্যবেক্ষণ, গবেষণা সব মিলিয়ে তিনি নিজেকে ক্রমাগত শাণিত করেছেন। তাঁর সৃষ্টিশীলতার পেছনে ছিল কঠোর পরিশ্রম এবং গভীর মনন।

news image
আরও খবর

তাঁর প্রয়াণে বাংলা সাহিত্য এক অভিভাবককে হারাল। তবে তিনি রেখে গেলেন বিপুল সৃষ্টি। যতদিন বাংলা ভাষা থাকবে, ততদিন তাঁর বই পড়া হবে। নতুন পাঠক তাঁর উপন্যাসে খুঁজে পাবে পুরোনো কলকাতার ছবি, খুঁজে পাবে সমাজের বিবর্তনের গল্প, খুঁজে পাবে নিজের জীবনের প্রতিফলন।

আজ যখন আমরা তাঁর জীবন ও কর্মের দিকে ফিরে তাকাই, তখন স্পষ্ট হয় যে শংকর কেবল একজন গল্পকার নন, তিনি সময়ের ভাষ্যকার। তাঁর কলমে ধরা পড়েছে স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলার সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের ইতিহাস। কর্পোরেট সংস্কৃতির উত্থান, মধ্যবিত্তের সংকট, যুবসমাজের হতাশা, উচ্চবিত্তের চাকচিক্য সবকিছুর দলিল তাঁর রচনাসম্ভার।

তাঁর চলে যাওয়া এক অপূরণীয় ক্ষতি। কিন্তু সাহিত্যিকরা আসলে কখনও সম্পূর্ণ বিদায় নেন না। তাঁদের শব্দ, তাঁদের চরিত্র, তাঁদের গল্প বেঁচে থাকে পাঠকের মনের ভেতর। শংকরও তেমনই বেঁচে থাকবেন। চৌরঙ্গির করিডরে, সীমাবদ্ধর অফিস কক্ষে, জন অরণ্যের ব্যস্ত রাস্তায়, কত অজানারের আত্মঅন্বেষণে সবখানেই তাঁর উপস্থিতি অনুভূত হবে।

বাংলা সাহিত্য তাঁর কাছে চিরঋণী। তাঁর সৃষ্টির আলো আগামী দিনেও পথ দেখাবে। তাঁর জীবন প্রমাণ করে দিয়েছে নিষ্ঠা এবং প্রতিভা মিললে সাহিত্য কেবল বিনোদন নয়, সময়ের দলিল হয়ে উঠতে পারে। তাঁর প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধা ও প্রণাম।

শংকরের সাহিত্যিক অবদান শুধু জনপ্রিয় উপন্যাসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি ছিলেন সময়ের গভীর পর্যবেক্ষক। সমাজের পরিবর্তন তিনি দেখেছেন খুব কাছ থেকে এবং সেই পরিবর্তনের অভিঘাত মানুষের জীবনে কীভাবে পড়ছে তা তাঁর লেখায় বারবার উঠে এসেছে। স্বাধীনতা পরবর্তী ভারতের অর্থনৈতিক কাঠামো ধীরে ধীরে বদলাচ্ছিল। চাকরি ব্যবসা কর্পোরেট সংস্কৃতি মধ্যবিত্তের স্বপ্ন এবং হতাশা সবকিছুরই নিখুঁত দলিল হয়ে উঠেছে তাঁর রচনা। এই কারণেই শংকরের লেখা কোনও নির্দিষ্ট সময়ে আটকে থাকেনি বরং প্রজন্মের পর প্রজন্ম তা পড়ে নিজের জীবনের সঙ্গে মিল খুঁজে পেয়েছে।

তাঁর উপন্যাসে নারী চরিত্রগুলিও ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা শুধুই সহচরী বা পার্শ্বচরিত্র নয় বরং সমাজের বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে থাকা স্বতন্ত্র মানুষ। কর্মজীবী নারী সংসার সামলানো নারী কিংবা উচ্চবিত্ত সমাজের অন্তর্লীন টানাপোড়েনে জড়িয়ে থাকা নারী চরিত্রগুলিকে তিনি যথাযথ সম্মান ও গভীরতায় তুলে ধরেছেন। এই দিক থেকে তাঁর সাহিত্য ছিল সময়ের থেকে অনেক এগিয়ে।

শংকর কখনও চমক দেওয়ার জন্য লিখতেন না। তাঁর গল্প ধীরে ধীরে এগোয় চরিত্রদের চিন্তা কথোপকথন এবং সিদ্ধান্তের মাধ্যমে। পাঠককে তিনি বিশ্বাস করতেন। পাঠক নিজেই যেন চরিত্রগুলির সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে জীবনের জটিল প্রশ্নগুলির মুখোমুখি হন। এই ধীর অথচ শক্তিশালী বর্ণনাশৈলীই তাঁর লেখাকে আলাদা করে তুলেছে।

তাঁর অনেক উপন্যাসে দেখা যায় সাফল্যের চূড়ায় পৌঁছেও মানুষের মনে এক ধরনের শূন্যতা কাজ করছে। আবার কেউ ব্যর্থ হয়েও নিজের নৈতিক অবস্থান ধরে রাখার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। এই দ্বন্দ্বই শংকরের সাহিত্যের মূল সুর। তিনি দেখিয়েছেন জীবনে সব প্রশ্নের সহজ উত্তর থাকে না এবং প্রতিটি সিদ্ধান্তেরই মূল্য দিতে হয়।

শংকরের সাহিত্যচর্চা বাংলা সাহিত্যে একটি সেতুবন্ধন তৈরি করেছে। একদিকে তিনি ছিলেন ধারাবাহিক উপন্যাসের জনপ্রিয় লেখক অন্যদিকে তাঁর লেখায় ছিল গভীর সামাজিক বিশ্লেষণ। এই দুইয়ের মেলবন্ধন খুব কম লেখকের মধ্যেই দেখা যায়। ফলে তাঁর বই যেমন সাধারণ পাঠক উপভোগ করেছেন তেমনই সমালোচকরাও তাঁর কাজের গুরুত্ব স্বীকার করেছেন।

আজ তাঁর প্রয়াণের পর বাংলা সাহিত্য যেন একটু বেশি নীরব। তবে সেই নীরবতার মধ্যেই রয়েছে তাঁর সৃষ্ট চরিত্রদের কোলাহল। তারা কথা বলবে ভবিষ্যতেও। নতুন পাঠক তাঁর বই খুলে আবার আবিষ্কার করবে শহরের অচেনা দিক মানুষের অন্তর্লীন টানাপোড়েন এবং নিজের জীবনের প্রতিচ্ছবি। এইভাবেই শংকর বেঁচে থাকবেন বাংলা সাহিত্যের অমলিন স্মৃতিতে।

 

Preview image