ছোটপর্দায় জনপ্রিয়তা থাকলেও বড়পর্দা একেবারেই নতুন মঞ্চ তবু সেই আনকোরা জুটিকেই নায়ক নায়িকা করে বাজি ধরেছেন প্রযোজক পরিচালক এ সিদ্ধান্ত কতটা কৌশল, আর কতটা ঝুঁকি
বাংলা ছবিতে বিশুদ্ধ প্রেমের গল্প কি সত্যিই হারিয়ে যাচ্ছে? টলিউডের সাম্প্রতিক ছবির দিকে তাকালে অনেকেরই এমন প্রশ্ন জাগে। কখনও থ্রিলার, কখনও অ্যাকশন, কখনও রাজনৈতিক ড্রামা—গল্প বলার ধারা বদলেছে, বদলেছে দর্শকের রুচিও। কিন্তু তার মাঝেই একটা দীর্ঘশ্বাস শোনা যায়—দেব-শুভশ্রীর মতো রোম্যান্টিক জুটি আর কই?
বলিউডে অ্যাকশনধর্মী ছবির ভিড়েও মাঝেমধ্যে প্রেমের ছবি জায়গা করে নেয়। যেমন ‘সইয়ারা’-র মতো ছবি প্রমাণ করে, রোম্যান্স কখনও পুরনো হয় না। প্রেমের গল্পের আবেদন চিরকালীন। অথচ টলিউডে বিশুদ্ধ প্রেমের ছবি যেন ক্রমশ ‘সোনার পাথরবাটি’ হয়ে উঠছে—সবাই খোঁজে, কিন্তু হাতে গোনা উদাহরণই পাওয়া যায়।
এই শূন্যতার জায়গা থেকেই এক নতুন চেষ্টার খবর মিলছে। এ বছরের প্রেম দিবসে ঘোষণা হয়েছে নতুন ছবি—‘রেড ফ্ল্যাগ: ভালবাসা বেশি’। প্রযোজক Rana Sarkar এবং পরিচালক Abhimanyu Mukherjee প্রথম বার জুটি বেঁধে আনছেন বিশুদ্ধ প্রেমের গল্প। আর সেই গল্পের ভরসা ছোটপর্দার দুই জনপ্রিয় মুখ—Dibyajyoti Dutta এবং Dibyani Mondal।
দু’জনেই টেলিভিশনের পরিচিত মুখ। দিব্যজ্যোতি ‘অনুরাগের ছোঁয়া’ ধারাবাহিকে ‘সূর্য’ চরিত্রে বিপুল জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন। সম্প্রতি তিনি প্রযোজক রানারই ছবি ‘লহ গৌরাঙ্গের নাম রে’-তে চৈতন্যদেবের ভূমিকায় অভিনয় করে নজর কেড়েছেন। অন্যদিকে দিব্যাণীর ঝুলিতেও ইতিমধ্যে একাধিক ছবি। তালিকায় রয়েছে ‘এম্পারর ভার্সেস শরৎচন্দ্র’ এবং ‘গুনগুন করে মন মহুয়া’। প্রথম ছবির পরিচালক Srijit Mukherji। দ্বিতীয়টি মহুয়া রায়চৌধুরীর জীবনীভিত্তিক ছবি, যেখানে তরুণী মহুয়ার চরিত্রে দেখা যাবে দিব্যাণীকে।
তবু প্রশ্ন থেকেই যায়—ছোটপর্দায় জনপ্রিয়তা থাকলেই কি বড়পর্দায় সেই ম্যাজিক কাজ করে? সিনেমা অন্য ভাষা, অন্য মাপের মাধ্যম। ক্যামেরার ফ্রেম বড়, প্রত্যাশার চাপ বেশি, বক্স অফিসের অঙ্ক নির্মম।
প্রযোজক-পরিচালকের যুক্তি পরিষ্কার। দেব বা জিৎ আজ যে জায়গায়, সেখানে পৌঁছতে তাঁদেরও কেউ না কেউ সুযোগ দিয়েছিলেন। ঝুঁকি না নিলে নতুন তারকা তৈরি হয় না। সেই জায়গা থেকেই দিব্যজ্যোতি-দিব্যাণীকে নায়ক-নায়িকা হিসেবে সামনে আনার সিদ্ধান্ত।
টলিউডে দেব-শুভশ্রীর জুটির রসায়ন এক সময় বক্স অফিসে ঝড় তুলেছিল। তাঁদের ছবিগুলি শহর থেকে গ্রাম—সব জায়গায় সমান জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। সেই স্মৃতি এখনও টাটকা। কিন্তু সময় বদলেছে। জুটি বদলেছে। গল্পের ধরন বদলেছে। তবু দর্শকের একাংশের প্রত্যাশা রয়ে গেছে—আবার কি সেই নির্ভেজাল প্রেম ফিরবে?
রানা সরকার এবং অভিমন্যু মুখোপাধ্যায় দু’জনেই স্বীকার করেছেন—নতুন জুটি তৈরি না করার জন্যই বারবার একই আক্ষেপ ঘুরে ফিরে আসে। তাই ‘রেড ফ্ল্যাগ: ভালবাসা বেশি’ তাঁদের কাছে কেবল একটি ছবি নয়, বরং এক প্রজন্মের রোম্যান্টিক স্মৃতিকে নতুন মোড়কে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা।
ছবির গল্পে গ্রাম্য ছেলে জয় এবং শহুরে মেয়ে রঞ্জা। রঞ্জা গ্রামে বেড়াতে এসে প্রেমে পড়ে জয়-এর। চেনা প্লট? হ্যাঁ। কিন্তু পরিচালকের দাবি, এই চেনা গল্পকেই আজকের প্রজন্মের বাস্তবতায় মুড়ে উপস্থাপন করা হবে।
এ প্রজন্মের প্রেমে রয়েছে ‘বেঞ্চিং’, ‘ক্রাম্বিং’, অস্থিরতা, কমিটমেন্টের ভয়। সেই সমস্ত পর্ব পেরিয়ে কী ভাবে দু’জন মানুষ গভীর সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে—সেই যাত্রাই ছবির মূল সুর। প্রেম, অ্যাকশন, ইমোশন আর গানে সাজানো হবে পুরো ক্যানভাস।
শুটিং শুরু হওয়ার কথা মে মাসে। এখন চলছে চিত্রনাট্যের শেষ পর্যায়ের ঘষামাজা। পরিচালকের কথায়, ঘষামাজা শুধু স্ক্রিপ্টে নয়, নায়ক-নায়িকার প্রস্তুতিতেও। দিব্যাণীকে ছবিতে বাইক চালাতে ও অ্যাকশন দৃশ্যে দেখা যাবে। দিব্যজ্যোতি মন দিয়েছেন শরীরচর্চায়।
দিব্যজ্যোতির ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ বড়। ‘লহ গৌরাঙ্গের নাম রে’-তে তিনি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে থাকলেও পাশে ছিলেন প্রতিষ্ঠিত তারকারা। কিন্তু ‘রেড ফ্ল্যাগ’-এ তাঁকেই ছবির মুখ হয়ে উঠতে হবে। তাঁর কথায়, ভয় করছে—তবে সেই ভয়কেই চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিচ্ছেন।
দিব্যাণী তুলনায় সংযত। তাঁর সামনে একাধিক প্রকল্প। সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের ছবির কাজ সেরে, মহুয়ার চরিত্রে অভিনয় শেষ করে তিনি মন দেবেন এই ছবিতে। তাঁর বক্তব্য স্পষ্ট—ভাল অভিনয় না হলে দর্শক প্রেক্ষাগৃহে আসবেন না।
দু’জনের ব্যক্তিগত সম্বোধনে ‘দাদা’ থাকলেও পর্দায় সেই দূরত্ব থাকবে না। প্রেমের দৃশ্য, ঘনিষ্ঠতা—সবই থাকবে। কিন্তু আসল প্রশ্ন, তাঁদের রসায়ন দর্শক কতটা গ্রহণ করবেন?
রোম্যান্টিক জুটির সাফল্য শুধু স্ক্রিপ্টের উপর নির্ভর করে না। নির্ভর করে চোখের ভাষা, দেহভঙ্গি, নীরব মুহূর্তের বিশ্বাসযোগ্যতার উপর। দেব-শুভশ্রীর ক্ষেত্রে এই স্বতঃস্ফূর্ততা কাজ করেছিল। দিব্যজ্যোতি-দিব্যাণীর ক্ষেত্রেও সেটিই বড় পরীক্ষা।
টলিউডের বর্তমান প্রেক্ষাপটে ‘ব্যবসার অঙ্ক’ শব্দবন্ধটি এখন আর নিছক প্রযোজকদের আলোচনার বিষয় নয়—এটি একটি বাস্তব চ্যালেঞ্জ। ছবি তৈরির আগে এখন ভাবতে হয় বাজেট, প্রেক্ষাগৃহে মুক্তির সময়, প্রতিদ্বন্দ্বী বড় ছবি, স্যাটেলাইট অধিকার, ওটিটি প্ল্যাটফর্মে বিক্রির সম্ভাবনা—সব মিলিয়ে একটি জটিল সমীকরণ। এই প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে বিশুদ্ধ প্রেমের ছবি বানানো নিঃসন্দেহে সাহসী সিদ্ধান্ত। কারণ গত কয়েক বছরে থ্রিলার, ক্রাইম ড্রামা বা অ্যাকশনধর্মী ছবিই তুলনায় বেশি ‘সেফ জোন’ বলে বিবেচিত হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতেই প্রযোজক রানা সরকার এবং পরিচালক অভিমন্যু মুখোপাধ্যায় এগিয়ে এসেছেন ‘রেড ফ্ল্যাগ: ভালবাসা বেশি’ নিয়ে। তাঁদের দাবি, বাংলায় বিশুদ্ধ প্রেমের ছবির যে সোনালি সময় ছিল, তা একেবারে হারিয়ে যায়নি—শুধু নির্মাতাদের সাহস কমেছে। এক সময় গ্রামের প্রেক্ষাগৃহ থেকে শহরের মাল্টিপ্লেক্স—সব জায়গাতেই প্রেমের গল্প চলত রমরমিয়ে। দর্শক তখন নায়ক-নায়িকার প্রেম, গান, আবেগ—সব কিছুর সঙ্গে নিজেকে মিলিয়ে নিতে পারতেন। এখন প্রশ্ন, সেই দর্শক কি এখনও আছেন? নাকি নতুন প্রজন্মের প্রেমের সংজ্ঞাই বদলে গিয়েছে?
আজকের প্রজন্ম ‘বেঞ্চিং’, ‘ক্রাম্বিং’, ‘সিচুয়েশনশিপ’—এই নতুন সম্পর্কের পরিভাষায় অভ্যস্ত। সোশ্যাল মিডিয়া, দ্রুত সম্পর্ক গড়ে ওঠা ও ভেঙে যাওয়া—সব মিলিয়ে প্রেমের প্রকাশভঙ্গি বদলেছে। কিন্তু কি সত্যিই আবেগ বদলেছে? নাকি প্রকাশের ধরনটাই কেবল পাল্টেছে? পরিচালক অভিমন্যুর বিশ্বাস, মূল অনুভূতি একই আছে—মানুষ এখনও ভালবাসার গল্প দেখতে চায়, যদি সেই গল্পে নিজেদের ছায়া খুঁজে পায়। তাই তিনি চেনা গ্রাম-শহরের প্রেমকাহিনিকে নতুন প্রজন্মের বাস্তবতার মোড়কে তুলে ধরতে চাইছেন।
এই ছবির সবচেয়ে বড় বাজি নিঃসন্দেহে নতুন জুটি। ছোটপর্দায় বিপুল জনপ্রিয়তা থাকা সত্ত্বেও বড়পর্দায় নায়ক-নায়িকা হিসেবে আত্মপ্রকাশ সম্পূর্ণ আলাদা চ্যালেঞ্জ। দিব্যজ্যোতি দত্ত এবং দিব্যাণী মণ্ডল—দু’জনেই ধারাবাহিকের মাধ্যমে ঘরে ঘরে পরিচিত মুখ। দর্শক তাঁদের প্রতিদিনের চরিত্রে দেখেছেন, আবেগে জড়িয়েছেন, সামাজিক মাধ্যমে সমর্থন জানিয়েছেন। কিন্তু সিনেমার পর্দা অনেক বড়, প্রত্যাশাও অনেক বেশি। এখানে কেবল অভিনয় দক্ষতা নয়, পর্দার উপস্থিতি, কেমিস্ট্রি, নাচ-গান, অ্যাকশন—সব মিলিয়ে পূর্ণাঙ্গ নায়ক-নায়িকা হয়ে ওঠার পরীক্ষা দিতে হয়।
ছোটপর্দার জনপ্রিয়তা কি সত্যিই প্রেক্ষাগৃহে টিকিট বিক্রিতে রূপান্তরিত হতে পারে? এই প্রশ্নের উত্তর সহজ নয়। টেলিভিশন দর্শক আর সিনেমা হলের দর্শক অনেক সময় আলাদা মানসিকতার। ধারাবাহিকের দর্শক হয়তো ঘরে বসে প্রিয় তারকাকে দেখতে অভ্যস্ত; কিন্তু সেই দর্শককে হল পর্যন্ত টেনে আনা অন্য সমীকরণ। আবার উল্টো দিকও রয়েছে—সোশ্যাল মিডিয়া যুগে ছোটপর্দার তারকারাই অনেক সময় তরুণ প্রজন্মের কাছে বেশি পরিচিত ও গ্রহণযোগ্য। ফলে তাঁদের প্রথম বড়পর্দার উপস্থিতি ঘিরে কৌতূহলও তৈরি হয় বেশি। এই কৌতূহলকে যদি নির্মাতারা সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারেন, তা হলে সেটিই হতে পারে ছবির সবচেয়ে বড় শক্তি।
ব্যর্থ হলে সমালোচনার ঝড় উঠবে—‘অভিজ্ঞ তারকা ছেড়ে নতুনদের নিয়ে ঝুঁকি কেন?’—এই প্রশ্ন শোনা অস্বাভাবিক নয়। ব্যবসার অঙ্কে যেখানে নিশ্চিত নামই নিরাপদ, সেখানে নতুন মুখ মানেই অনিশ্চয়তা। কিন্তু সফল হলে ছবিটি হয়ে উঠতে পারে এক নতুন দৃষ্টান্ত। তখন হয়তো বলা হবে, টলিউডে আবার জুটি তৈরির যুগ ফিরছে। এক সময় জনপ্রিয় জুটির উপর ভর করেই বাংলা ইন্ডাস্ট্রি বহু হিট উপহার দিয়েছে। দর্শক শুধু গল্প নয়, নায়ক-নায়িকার রসায়ন দেখতে হলে গিয়েছেন। সেই ঐতিহ্যই কি আবার ফিরে আসতে পারে?
‘রেড ফ্ল্যাগ: ভালবাসা বেশি’ তাই নিছক একটি রোমান্টিক ছবি নয়—এটি এক পরীক্ষাগার। এখানে যাচাই হবে, বাংলা ছবির দর্শক এখনও কি হৃদয়ের গল্পে বিশ্বাস রাখেন? নাকি তারা সম্পূর্ণভাবে থ্রিলার-অ্যাকশনমুখী হয়ে গেছেন? এই ছবিতে গ্রাম-শহরের প্রেম, আধুনিক সম্পর্কের টানাপোড়েন, গান-অ্যাকশন—সব মিলিয়ে এক মিশ্র স্বাদ পরিবেশনের চেষ্টা চলছে। অর্থাৎ নির্মাতারা একদিকে নস্টালজিয়ার সুর ধরছেন, অন্যদিকে সমসাময়িক বাস্তবতার ছোঁয়া রাখছেন।
এই ছবির সাফল্য বা ব্যর্থতা ভবিষ্যতের রোম্যান্টিক ছবির পথ অনেকটাই নির্ধারণ করতে পারে। যদি দর্শক ইতিবাচক সাড়া দেন, তবে প্রযোজকরা হয়তো আবার প্রেমকেন্দ্রিক চিত্রনাট্যে বিনিয়োগ করতে সাহস পাবেন। আর যদি প্রত্যাশা পূরণ না হয়, তা হলে ‘বিশুদ্ধ প্রেমের ছবি আর চলে না’—এই ধারণাই আরও জোরালো হবে।
শীতের মুক্তির পরই স্পষ্ট হবে—দিব্যজ্যোতি-দিব্যাণীর নতুন জুটি দর্শকের হৃদয়ে জায়গা করে নিতে পারল কি না। তত দিন পর্যন্ত ছবিটিকে ঘিরে থাকবে কৌতূহল, প্রত্যাশা, এবং খানিকটা সংশয়। কারণ আজকের দিনে প্রেমের গল্প শুধু আবেগের পরীক্ষা নয়—এটি একই সঙ্গে বাজারেরও বড় বাজি।