‘ভূত বাংলা’ ছবির ‘রাম জি আকে ভলা করেঙ্গে’ গানটি গেয়ে তিনি এখন জনপ্রিয়। তবে বদলে গিয়েছে নাম। এখন তিনি আর দেব অরিজিৎ নন। এখন তিনি পরিচিত ‘আর্ভান’ নামে। নাম বদলে ফেললেন কেন?গান গাইছেন বেশ কয়েক বছর হয়ে গেল। পরিচিত ছিলেন দেব অরিজিৎ নামে। তবে ‘ভূত বাংলা’ ছবির ‘রাম জি আকে ভলা করেঙ্গে’ গানটি গেয়ে তিনি এখন জনপ্রিয়। তবে বদলে গিয়েছে নাম। এখন তিনি আর দেব অরিজিৎ নন। এখন তিনি পরিচিত ‘আর্ভান’ নামে। নাম বদলে ফেললেন কেন?
মুর্শিদাবাদের বহরমপুরে জন্ম ও বড় হয়ে ওঠা গায়কের। সেখানে নিজের একটি ব্যান্ড ছিল দেব অরিজিৎ তথা আর্ভানের। পাশাপাশি ‘মিউজ়িক প্রোগ্রামিং’-এর কাজও করতে থাকেন তিনি। বাড়িতেই একটি ছোট স্টুডিয়োর আয়োজন করেন। সেই স্টুডিয়োর মাধ্যমেই অরিজিৎ সিংহের সঙ্গে আলাপ। আর্ভানের কথায়, “হঠাৎই এক রাতে অরিজিৎদা ও আমার দু’জনেরই পরিচিত, সৌগতদা আমাকে ফোন করে। একটা স্টুডিয়োর দরকার ছিল। ওই বলল, আমার স্টুডিয়োয় একটা রেকর্ডিং করতে আসবেন অরিজিৎদা।”
স্টুডিয়োয় এসে আর্ভানের ব্যান্ডের গানবাজনাও শোনেন অরিজিৎ। তাঁর পছন্দ হয়। প্রযুক্তিগত কিছু পরামর্শও দেন তিনি। সেখান থেকেই দুই অরিজিতের সখ্য। দেব অরিজিৎ তথা আর্ভান প্রায়ই বহরমপুর থেকে জিয়াগঞ্জ যেতেন অরিজিৎ সিংহের সঙ্গে কাজ করতে। এর মাঝেই সুরকার প্রীতম চক্রবর্তীর সঙ্গে কাজের সুযোগ আসে তাঁর কাছে। মধ্যস্থতা করেছিলেন অরিজিৎ সিংহই। প্রীতমের সহকারী হিসাবে কাজ করার সুযোগ পেয়ে ২০১৩ সালে মুম্বই চলে যান দেব অরিজিৎ।
সঙ্গীতায়োজনের কাজ করার পাশাপাশি প্লেব্যাক গাওয়ার কাজও করতে থাকেন আর্ভান। কিন্তু হঠাৎই নাম বদল কেন? গায়কের উত্তর, “অরিজিৎদার সঙ্গে নাম মিলে যাওয়ায় একটা বিভ্রান্তি তো মানুষের মধ্যে ছিল বটেই। অনেকেই ভাবতেন আমি অরিজিৎ-কণ্ঠী। অনেকেই ভাবতেন, আমি অরিজিৎদার গানের ভক্ত বলেই আমার এমন নাম।”
তবে নাম বদলের ক্ষেত্রে আরও বেশ কিছু কারণ রয়েছে বলে জানান আর্ভান তথা দেব অরিজিৎ। গায়কের বক্তব্য, “ইন্টারনেটে নাম খুঁজতে গেলেও বিভ্রান্তি তৈরি হত। আমার নাম খুঁজলে কেউ খুঁজে পেতেন বাংলার তারকা দেবদাকে অথবা অরিজিৎদাকে। কেউ কেউ আবার আর একজন গায়ক দেব নেগীর সঙ্গেও আমাকে গুলিয়ে ফেলতেন।”
কয়েক বছর আগে প্রীতমের সুরে ‘সত্যানাশ’ নামে একটি গান গেয়েছিলেন আর্ভান। তিনি ছাড়াও অরিজিৎ সিংহ এবং দেব নেগীর কণ্ঠ ছিল সেই গানে। সঙ্গীত পরিচালক বুঝে উঠতে পারছিলেন না, কী ভাবে গায়কদের নামগুলি রাখবেন। তখন প্রীতম নিজেই আর্ভানকে বলেছিলেন, “ভাই, তোর নামটা আমি কী ভাবে যোগ করব? এক দিকে অরিজিৎ সিংহ, অন্য দিকে দেব নেগী। আবার তুই— দেব অরিজিৎ। কী বিভ্রান্তিকর!”
প্রীতমই গায়ককে নাম বদলে ফেলার পরামর্শ দিয়েছিলেন। সেখান থেকেই নাম বদলের ভাবনা শুরু। “প্রথমে ভাবছিলাম, নিজের নাম কেন বদল করব? পরে যুক্তি দিয়ে বিবেচনা করলাম।” বলেন আর্ভান। নিজের কী নাম রাখবেন তা নিয়ে বহু ভাবনাচিন্তা করেছিলেন। অবশেষে বেছে নেন নিজের পছন্দের নাম। গায়কের কথায়, “‘আর্ভান’ নামের অর্থ হল ধার্মিক বা ন্যায়পরায়ণ। এই নামটা আমার ব্যক্তিত্বের সঙ্গেও মেলে। আমার বাবা-মাও পছন্দ করেন নামটা।”
নাম একটি মানুষের পরিচয়ের অন্যতম প্রধান উপাদান। বিশেষ করে শিল্পীদের ক্ষেত্রে নাম শুধু পরিচয় নয়, বরং তাদের ব্র্যান্ড, পরিচিতি এবং দর্শকের সঙ্গে সংযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। সঙ্গীত জগতে এমন বহু শিল্পী রয়েছেন যারা তাঁদের ক্যারিয়ারের বিভিন্ন পর্যায়ে নাম পরিবর্তন করেছেন, এবং সেই পরিবর্তনের পেছনে থাকে নানা কারণ—ব্যক্তিগত, পেশাগত কিংবা কৌশলগত। ঠিক তেমনই এক গল্প আর্ভান তথা দেব অরিজিৎ-এর।
দেব অরিজিৎ নামটি শুনলে প্রথমেই অনেকের মনে পড়ে যেত জনপ্রিয় গায়ক অরিজিৎ সিংহ-এর কথা। নামের মিলের কারণে বিভ্রান্তি তৈরি হওয়া খুবই স্বাভাবিক। এই বিভ্রান্তিই ধীরে ধীরে একসময় শিল্পীর জন্য সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কারণ, একজন নতুন শিল্পীর পক্ষে নিজের আলাদা পরিচয় তৈরি করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি শ্রোতারা বারবার তাকে অন্য কারও সঙ্গে গুলিয়ে ফেলেন, তাহলে তার নিজস্ব সত্তা, প্রতিভা এবং পরিচিতি চাপা পড়ে যায়।
আর্ভান নিজেই জানিয়েছেন, অনেকেই ভাবতেন তিনি অরিজিৎ সিংহ-এর ভক্ত বলেই নিজের নাম এমন রেখেছেন। আবার কেউ কেউ ভাবতেন তিনি অরিজিৎ-এর কণ্ঠ নকল করেন। এই ধারণাগুলি শিল্পীর জন্য মোটেও সুখকর ছিল না, কারণ তিনি নিজস্ব স্টাইল এবং স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি করতে চাইছিলেন। কিন্তু নামের কারণে সেই পথ বারবার বাধাগ্রস্ত হচ্ছিল।
শুধু অরিজিৎ সিংহ নন, আরও অনেকের সঙ্গে তার নামের মিল থাকায় সমস্যা আরও বাড়ে। কেউ কেউ তাকে অভিনেতা দেব-এর সঙ্গে গুলিয়ে ফেলতেন, আবার কেউ ভাবতেন তিনি গায়ক দেব নেগী। ফলে, যখন কেউ ইন্টারনেটে তার নাম সার্চ করতেন, তখন সঠিকভাবে তাকে খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে যেত। ডিজিটাল যুগে যেখানে অনলাইন উপস্থিতি একজন শিল্পীর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, সেখানে এই ধরনের বিভ্রান্তি ক্যারিয়ারের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
এই সমস্যার প্রকৃত গুরুত্ব বোঝা যায় একটি নির্দিষ্ট ঘটনার মাধ্যমে। কয়েক বছর আগে ‘সত্যানাশ’ নামের একটি গানে কাজ করেছিলেন আর্ভান, যেখানে আরও দুইজন বিখ্যাত গায়ক—অরিজিৎ সিংহ এবং দেব নেগী—কণ্ঠ দিয়েছিলেন। গানটির সঙ্গীত পরিচালক প্রীতম তখন বুঝতেই পারছিলেন না কীভাবে গায়কদের নাম আলাদা করে উপস্থাপন করবেন। “একদিকে অরিজিৎ সিংহ, অন্যদিকে দেব নেগী, আর তুই—দেব অরিজিৎ। কী বিভ্রান্তিকর!”—এই মন্তব্য থেকেই স্পষ্ট হয়ে যায় সমস্যার গভীরতা।
প্রীতমের এই মন্তব্যই ছিল একটি টার্নিং পয়েন্ট। তিনি সরাসরি আর্ভানকে নাম পরিবর্তনের পরামর্শ দেন। প্রথমে এই পরামর্শ গ্রহণ করা সহজ ছিল না। কারণ, একটি নামের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে ব্যক্তিগত পরিচয়, আত্মপরিচয়ের অনুভূতি এবং আবেগ। নিজের নাম পরিবর্তন করা মানে নিজের একটি অংশকে বদলে ফেলা, যা অনেকের কাছেই কঠিন সিদ্ধান্ত।
তবে আর্ভান বিষয়টি বাস্তবতার দৃষ্টিতে বিচার করেন। তিনি বুঝতে পারেন, পেশাগত জীবনে এগিয়ে যেতে হলে কখনও কখনও কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়। বিশেষ করে সঙ্গীত জগতে, যেখানে প্রতিযোগিতা তীব্র এবং পরিচিতি তৈরি করা কঠিন, সেখানে একটি স্বতন্ত্র নাম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অনেক চিন্তাভাবনার পর তিনি বেছে নেন ‘আর্ভান’ নামটি। এই নামের অর্থ ‘ধার্মিক’ বা ‘ন্যায়পরায়ণ’। শুধু অর্থ নয়, এই নামটি তার ব্যক্তিত্বের সঙ্গেও মেলে বলে তিনি মনে করেন। একটি নাম তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা শুধু বাহ্যিক পরিচয় নয়, বরং ব্যক্তির ভেতরের গুণাবলিকেও প্রতিফলিত করে। আর্ভানের ক্ষেত্রে সেটাই ঘটেছে।
নাম পরিবর্তনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো পারিবারিক সমর্থন। অনেক সময় পরিবার নতুন নাম গ্রহণ করতে দ্বিধা বোধ করে, কিন্তু আর্ভানের ক্ষেত্রে তার বাবা-মাও এই নামটি পছন্দ করেন। ফলে, এই পরিবর্তনটি তার জন্য আরও সহজ হয়ে ওঠে।
নাম পরিবর্তনের পর একজন শিল্পীর সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ আসে—নতুন নামটি প্রতিষ্ঠিত করা। কারণ, পুরনো নামের সঙ্গে কিছুটা পরিচিতি তৈরি হয়ে থাকলে সেটিকে ছেড়ে নতুনভাবে শুরু করা সহজ নয়। তবে আর্ভান এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছেন এবং নিজের প্রতিভা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে নতুন পরিচয় গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন।
এই ঘটনাটি আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়—নিজস্ব পরিচয় তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি। অন্যের সঙ্গে মিল থাকলে বা অন্যের ছায়ায় থাকলে দীর্ঘমেয়াদে সফল হওয়া কঠিন। তাই কখনও কখনও নিজের পথ তৈরি করতে হলে কিছু পরিবর্তন আনতেই হয়।
সঙ্গীত জগতে ব্র্যান্ডিং একটি বড় বিষয়। একটি নামই একজন শিল্পীর প্রথম পরিচয়। সেই নাম যদি সহজ, স্বতন্ত্র এবং স্মরণযোগ্য হয়, তাহলে তা দর্শকদের মনে জায়গা করে নিতে সাহায্য করে। আর্ভানের নতুন নামটি ঠিক সেই দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ—এটি আলাদা, অর্থবহ এবং সহজে মনে রাখার মতো।
এছাড়া, এই ঘটনাটি ডিজিটাল যুগের বাস্তবতাকেও তুলে ধরে। এখনকার দিনে একজন শিল্পীর পরিচিতি অনেকটাই নির্ভর করে অনলাইন উপস্থিতির উপর। যদি কেউ সার্চ করেও সঠিকভাবে তাকে খুঁজে না পান, তাহলে তার কাজ মানুষের কাছে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে। তাই একটি ইউনিক নাম থাকা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
আর্ভানের গল্পটি শুধু একজন গায়কের নাম পরিবর্তনের গল্প নয়, বরং এটি একজন শিল্পীর নিজের পরিচয় খুঁজে পাওয়ার গল্প। এটি সাহসের গল্প, যেখানে তিনি নিজের কমফোর্ট জোন থেকে বেরিয়ে এসে নতুন পথে হাঁটার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
সবশেষে বলা যায়, নাম পরিবর্তন কখনও কখনও শুধুই একটি আনুষ্ঠানিক পরিবর্তন নয়—এটি হতে পারে একটি নতুন শুরু, একটি নতুন পরিচয়ের সূচনা। আর্ভান সেই নতুন পথেই এগিয়ে চলেছেন, নিজের প্রতিভা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করতে চাইছেন যে, একটি নাম বদলালেও তার সঙ্গীতের প্রতি ভালোবাসা এবং নিষ্ঠা একই রকম রয়েছে।
এই গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়—নিজেকে আলাদা করে তুলতে হলে কখনও কখনও সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে হয়। আর সেই সিদ্ধান্তই একসময় আমাদের সাফল্যের পথে এগিয়ে নিয়ে যায়।