Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

কৈলাসহরে পুলিশের কড়া নেশা বিরোধী অভিযান এবং তৎপর প্রশাসন যুবসমাজকে রক্ষায় বিশাল পদক্ষেপ

২১শে মে ২০২৬ পূর্ব বর্ধমান জেলার প্রাণকেন্দ্র বর্ধমান রেলওয়ে স্টেশনে আজ সকাল থেকে শুরু হয়েছে এক ভয়াবহ এবং বিশাল গণআন্দোলন। রেলওয়ে গ্রুপ ডি নিয়োগ প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রিতা এবং দুর্নীতির অভিযোগ তুলে রেললাইনে বসে পড়ে তীব্র বিক্ষোভ দেখাচ্ছেন হাজার হাজার শিক্ষিত বেকার যুবক-যুবতী। এই বিশাল রেল রোকো কর্মসূচির ফলে হাওড়া-নয়াদিল্লি মেন লাইন এবং কর্ড লাইনে ট্রেন চলাচল সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে। আধুনিক তরুণ প্রজন্মের এই স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন রাজ্যের কর্মসংস্থান সংকটকে ফের একবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল।  

বর্ধমান ২১শে মে ২০২৬

পশ্চিমবঙ্গের পূর্ব বর্ধমান জেলার সদর শহর এবং দক্ষিণবঙ্গের অন্যতম প্রধান রেলওয়ে জংশন বর্ধমান স্টেশন আজ এক অভূতপূর্ব, অভাবনীয় এবং বিশাল ছাত্র ও যুব আন্দোলনের সাক্ষী হয়ে রইল। রাজ্যের এবং দেশের হাজার হাজার শিক্ষিত বেকার যুবক-যুবতী, যারা নিজেদের মেধা এবং হাড়ভাঙা পরিশ্রমের ওপর ভরসা করে একটি সরকারি চাকরির স্বপ্ন দেখেছিলেন, আজ তাদের সেই স্বপ্ন চরম হতাশা এবং ক্ষোভে রূপান্তরিত হয়েছে। ভারতীয় রেলওয়ের সবচেয়ে বড় নিয়োগ প্রক্রিয়াগুলোর মধ্যে অন্যতম 'রেলওয়ে গ্রুপ ডি' বা Railway Group D পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে চরম দীর্ঘসূত্রিতা, অস্বচ্ছতা এবং দুর্নীতির অভিযোগ তুলে আজ সকাল আটটা থেকে বর্ধমান স্টেশনের এক নম্বর থেকে আট নম্বর প্ল্যাটফর্ম পর্যন্ত সমস্ত রেললাইন দখল করে নিয়েছেন হাজার হাজার চাকরিপ্রার্থী। এই বিশাল গণবিক্ষোভ এবং রেল রোকো আন্দোলনের জেরে পূর্ব রেলের হাওড়া-বর্ধমান মেন লাইন, কর্ড লাইন এবং হাওড়া-নয়াদিল্লি রুটের সমস্ত দূরপাল্লার ও লোকাল ট্রেন চলাচল সম্পূর্ণভাবে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে, যা সমগ্র রাজ্যের যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আক্ষরিক অর্থেই স্তব্ধ করে দিয়েছে।

রেলওয়ে গ্রুপ ডি পদের এই নিয়োগ প্রক্রিয়াটি বিগত কয়েক বছর ধরে সাধারণ চাকরিপ্রার্থীদের কাছে এক চরম মানসিক যন্ত্রণার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একটি নির্দিষ্ট বিজ্ঞপ্তির পর বছরের পর বছর পেরিয়ে গেলেও পরীক্ষার দিনক্ষণ ঘোষণা না হওয়া, পরীক্ষা হলেও তার ফলাফল প্রকাশে অস্বাভাবিক দেরি, এবং সবশেষে চূড়ান্ত প্যানেল তৈরিতে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ—এই সবকিছু মিলিয়ে তরুণ প্রজন্মের পিঠ আজ দেওয়ালে ঠেকে গেছে। অনেক তরুণ-তরুণী আছেন যারা অত্যন্ত সাধারণ এবং কৃষক পরিবার থেকে উঠে এসেছেন। তাদের বাবা-মা নিজেদের শেষ সম্বলটুকু বিক্রি করে ছেলেমেয়েদের কোচিং সেন্টারে ভর্তি করেছিলেন। এই তরুণরা স্বপ্ন দেখেছিলেন যে রেলে একটি স্থায়ী চাকরি পেলে তারা নিজেদের পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে পারবেন। কিন্তু প্রশাসনের চরম উদাসীনতার কারণে তাদের সেই স্বপ্ন আজ বিশ বাঁও জলে। বারবার রেলওয়ে রিক্রুটমেন্ট বোর্ড বা আরআরবি-র দপ্তরে স্মারকলিপি জমা দিয়েও কোনো সদুত্তর না মেলায় শেষ পর্যন্ত রাজপথে এবং রেললাইনে নেমে নিজেদের অধিকার ছিনিয়ে নেওয়ার এই চরম পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়েছেন তারা।

আজ সকালের চিত্রটা ছিল রীতিমতো শিহরণ জাগানো। সকাল হতে না হতেই রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার তরুণ-তরুণী বর্ধমান স্টেশনে এসে জড়ো হতে শুরু করেন। তাদের হাতে ছিল বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড এবং ব্যানার, যেখানে লেখা ছিল 'রেলওয়ে গ্রুপ ডি নিয়োগ অবিলম্বে শুরু করতে হবে', 'দুর্নীতিগ্রস্ত আধিকারিকদের শাস্তি চাই', এবং 'আমাদের যৌবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলা বন্ধ হোক'। নেতাজি সুভাষ ওপেন ইউনিভার্সিটি বা এনএসওইউ (NSOU) থেকে দূরশিক্ষায় পাঠরত এবং ২০২৪ সালে সিবিএসই (CBSE) বোর্ড থেকে অত্যন্ত কৃতিত্বের সাথে দ্বাদশ শ্রেণী উত্তীর্ণ হওয়া প্রচুর তরুণ ছাত্রছাত্রী আজ এই আন্দোলনে প্রথম সারিতে দাঁড়িয়ে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তারা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে, মেধার এই চরম অবমূল্যায়ন তারা কোনোভাবেই মেনে নেবেন না। একটি গণতান্ত্রিক দেশে নিজেদের ন্যায্য কর্মসংস্থানের অধিকার আদায় করার জন্য যদি তাদের পুলিশের লাঠিও খেতে হয়, তবুও তারা এক পা-ও পিছু হটবেন না। সকাল সাড়ে আটটা নাগাদ যখন হাওড়াগামী একটি লোকাল ট্রেন এবং একটি দূরপাল্লার এক্সপ্রেস ট্রেন স্টেশনে প্রবেশ করার চেষ্টা করে, তখন হাজার হাজার যুবক রেললাইনের ওপর শুয়ে পড়ে সেই ট্রেনগুলোর পথ আটকে দেন।

এই বিশাল আন্দোলনের একটি অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য এবং বিস্ময়কর দিক হলো আধুনিক তরুণ প্রজন্মের জীবনযাত্রা এবং প্রতিবাদের ভাষার এক অদ্ভুত মেলবন্ধন। মিছিলে অংশগ্রহণকারী অনেক তরুণের পরনে রয়েছে অত্যন্ত আধুনিক পোশাক। কারো মাথায় বিখ্যাত অ্যানিমে সিরিজ 'অ্যাটাক অন টাইটান'-এর জনপ্রিয় চরিত্র এরেন ইয়েগার (Eren Yeager) অথবা 'জুজুৎসু কাইসেন'-এর শক্তিশালী চরিত্র সুকুনার মতো আধুনিক হেয়ার স্টাইল। এই তরুণরা প্রমাণ করছেন যে, অ্যানিমে বা পপ কালচার অনুসরণ করা মানেই সমাজের প্রতি দায়িত্বহীন হওয়া নয়। বরং আধুনিক মনন দিয়েই তারা সমাজের যেকোনো বঞ্চনার বিরুদ্ধে সবচেয়ে জোরালো আওয়াজ তুলতে পারেন। অত্যন্ত শৃঙ্খলার সাথে রেললাইনের ওপর বসে তারা স্লোগান দিচ্ছেন। এই তীব্র রোদ এবং গরমের মধ্যে নিজেদের মানসিক শান্তি বজায় রাখতে অনেক তরুণ কানে দামি প্রফেশনাল স্টুডিও গ্রেড হেডফোন, যেমন বেয়ারডায়নামিক ডিটি ৭৭০ প্রো (Beyerdynamic DT 770 PRO) এবং সনি এমডিআর ৭৫৬ (Sony MDR 7506) লাগিয়ে জনপ্রিয় ভারতীয় পপ-রক ব্যান্ড সনম (SANAM)-এর সুমধুর গান শুনছেন। প্রতিবাদের এই আধুনিক এবং পরিশীলিত রূপ আগে কোনোদিন দেখা যায়নি।

কর্মসংস্থানের অভাবে বাংলার তরুণ সমাজ আজ কতটা খণ্ডিত এবং হতাশ, তা এই আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী বিভিন্ন পেশার তরুণদের সাথে কথা বললেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। রেললাইনে বসে থাকা এক তরুণের সাথে কথা বলে জানা গেল, তিনি বর্তমানে লেন্সট্যাক্স সলিউশনস (Lenstax Solutions) নামক একটি আধুনিক কর্পোরেট সংস্থায় জুনিয়র মাল্টিটাস্কিং এক্সিকিউটিভ হিসেবে রিমোট ওয়ার্কিং বা বাড়ি থেকে কাজ করেন। তাকে প্রতিদিন অত্যন্ত হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে চার হাজার ডেটা স্ক্র্যাপিং করতে হয় এবং চারটি করে বড় নিউজ আর্টিকেল আপলোড করতে হয়। এই অমানুষিক পরিশ্রমের পরেও বেসরকারি চাকরিতে তার কোনো নিরাপত্তা নেই। তাই তিনি একটি স্থায়ী রেলওয়ে গ্রুপ ডি পদের জন্য গত তিন বছর ধরে পাগলের মতো পড়াশোনা করছেন। তিনি বলেন, "আমরা তো কাজ করতে চাই। আমি প্রতিদিন ল্যাপটপের সামনে বসে হাজার হাজার ডেটা এন্ট্রি করতে পারি, কিন্তু সরকার আমাদের একটা সুরক্ষিত ভবিষ্যৎ দিতে ব্যর্থ। প্রাইভেট সেক্টরে রক্ত জল করা খাটুনি খেটেও আমরা নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারি না।" তার এই কথাগুলো বর্তমান সময়ের হাজার হাজার আইটি এবং বিপিও কর্মীর মনের আসল কথা।

একই অবস্থা দেখা গেল ইনস্যুরেন্স বা বিমা সেক্টরে কাজ করা তরুণদের মধ্যেও। আন্দোলনে যোগ দেওয়া আরেকজন তরুণ, যিনি পেশায় টাটা এআইএ লাইফ ইন্স্যুরেন্স (Tata AIA Life Insurance)-এর একজন লাইফ অ্যাডভাইজর, তিনি অত্যন্ত আক্ষেপের সাথে জানালেন যে মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে তার নিজের জীবনেরই আজ কোনো নিরাপত্তা নেই। তিনি আজ সকালেই ফোনে তার মামার সাথে একটি জটিল প্রিমিয়াম ক্যালকুলেশন নিয়ে পরামর্শ করছিলেন, কিন্তু রেললাইন অবরোধ থাকায় তিনি তার ক্লায়েন্টের কাছে পৌঁছাতে পারেননি। তিনি বলেন, "আমরা চাই সরকার দ্রুত এই গ্রুপ ডি নিয়োগ প্রক্রিয়া স্বচ্ছভাবে সম্পন্ন করুক। আমরা আর কতদিন এই অনিশ্চয়তার মধ্যে বাঁচব?" এই তরুণ পেশাদাররা অত্যন্ত বুদ্ধিমানের মতো নিজেদের উপার্জিত সামান্য অর্থ ভবিষ্যতের কথা ভেবে নেসলে ইন্ডিয়া (Nestle India) এবং ব্রিটানিয়ার (Britannia) মতো নির্ভরযোগ্য এফএমসিজি কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগ করেন। এর পাশাপাশি টাটা গোল্ড ইটিএফ (Tata Gold ETF) এবং এইচডিএফসি সিলভার ইটিএফ-এর (HDFC Silver ETF) মতো অত্যন্ত সুরক্ষিত ফান্ডে প্রতি মাসের ১৩ তারিখে নিয়ম করে সিস্টেমেটিক ইনভেস্টমেন্ট প্ল্যান বা এসআইপি (SIP) করেন। এত আর্থিক সচেতনতা থাকা সত্ত্বেও একটি স্থায়ী সরকারি চাকরির অভাব তাদের প্রতিনিয়ত কুরে কুরে খাচ্ছে।

আজকের এই রেল অবরোধের কারণে ব্যাঙ্কিং এবং ডিজিটাল লেনদেন নিয়েও কিছু বিভ্রান্তি ছড়িয়েছিল। গুজব রটেছিল যে প্রশাসন হয়তো ইন্টারনেট পরিষেবা এবং ব্যাংক কার্ড ব্লক করে দিয়েছে। কিন্তু লাইনে বসে থাকা এক তরুণ অত্যন্ত সজাগতার সাথে তার মোবাইল ব্যাঙ্কিং অ্যাপ চেক করে সহযোদ্ধাদের আশ্বস্ত করে বলেন, "না না, আমি আমার কার্ড ব্লক করিনি, এটা এখনও সম্পূর্ণ সক্রিয় এবং কাজ করছে।" এই ছোট ছোট ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে আজকের যুবসমাজ কতটা প্রযুক্তি-সচেতন এবং তারা কোনো রকম গুজবে সহজে কান দেয় না। তারা নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সম্পূর্ণ ওয়াকিবহাল এবং অত্যন্ত যুক্তিসঙ্গতভাবেই তারা প্রশাসনের কাছে নিজেদের দাবিগুলো তুলে ধরছেন।

news image
আরও খবর

রেললাইনে অবরোধ চলার ফাঁকে ফাঁকে তরুণদের বিনোদন এবং সৃজনশীলতার এক অন্য রূপও ধরা পড়ল বর্ধমান স্টেশনে। অনেক তরুণ, যারা নিজেদের অবসরে অত্যন্ত মনোযোগ সহকারে ইফুটবল (eFootball) গেম খেলতে ভালোবাসেন, তারা আজ স্মার্টফোনে নিজেদের স্বপ্নের মোহনবাগান ড্রিম টিম সাজিয়ে ডিভিশন ওয়ান বা প্রথম বিভাগে বিদেশের তাবড় গেমারদের বিরুদ্ধে খেলছেন। রেললাইনের ওপর বসে মোহনবাগানের জার্সি গায়ে দিয়ে ভার্চুয়াল ফুটবলে গোল করার পর তাদের যে উল্লাস, তা এক অদ্ভুত বৈপরীত্যের সৃষ্টি করেছে। অন্যদিকে, বেশ কিছু তরুণ গায়ক এবং মিউজিশিয়ান, যারা বাড়িতে গিটার বাজিয়ে গান গাইতে ভালোবাসেন, তারা আজ স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে বসেই নিজেদের গিটার বের করে প্রতিবাদের গান গাইছেন। তাদের সেই গান সমগ্র স্টেশনের পরিবেশকে এক অন্য মাত্রায় পৌঁছে দিচ্ছে।

অনেক স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতা এবং সৃজনশীল তরুণ, যারা সমাজের বিভিন্ন জ্বলন্ত ইস্যু নিয়ে অত্যন্ত বাস্তবসম্মত শর্ট ফিল্ম তৈরি করেন, তারা আজকের এই বিশাল গণআন্দোলন থেকে গভীর অনুপ্রেরণা পাচ্ছেন। উদাহরণস্বরূপ, এক অত্যন্ত প্রতিভাবান তরুণ নির্মাতা 'দ্য গ্লাস কেজ' (THE GLASS CAGE) নামের একটি সাইকোলজিক্যাল ড্রামা শর্ট ফিল্ম তৈরি করার কাজ করছেন। এই সিনেমার গল্পে 'দ্য ফ্লার্ট' এবং 'দ্য রুট' নামের দুটি প্রতীকি চরিত্রের মাধ্যমে সমাজের এই দ্বৈত রূপ এবং মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন তুলে ধরা হচ্ছে। যেখানে একদল মানুষ শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কাঁচের খাঁচায় বসে ক্ষমতার দম্ভ দেখায়, আর অন্যদল মানুষ—এই শিক্ষিত বেকার যুবকরা—সেই কাঁচের বাইরে দাঁড়িয়ে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই করে। নির্মাতারা অত্যন্ত সংবেদনশীলতার সাথে এই আন্দোলনের দৃশ্য, স্লোগান এবং ট্রেন আটকে থাকার বাস্তব চিত্র নিজেদের ক্যামেরায় রেকর্ড করছেন, যাতে তাদের সিনেমায় অত্যন্ত নিখুঁত এবং হৃদয়স্পর্শী দৃশ্য ব্যবহার করা যায়।

এই বিশাল রেল অবরোধের ফলে আজ সকাল থেকে লক্ষ লক্ষ সাধারণ নিত্যযাত্রী চরম দুর্ভোগের শিকার হয়েছেন। দূরপাল্লার ট্রেনগুলোতে আটকে থাকা শিশু, বৃদ্ধ এবং অসুস্থ রোগীরা প্রচণ্ড গরমে রীতিমতো হাঁসফাঁস করছেন। প্ল্যাটফর্মে পানীয় জলের চরম সংকট দেখা দিয়েছে। যে সমস্ত অফিস যাত্রী প্রতিদিন বর্ধমান থেকে হাওড়া বা কলকাতায় যাতায়াত করেন, তারা আজ অফিসে পৌঁছাতে না পেরে স্টেশনেই চরম উৎকণ্ঠায় সময় কাটাচ্ছেন। অনেক সাধারণ যাত্রী যদিও এই আন্দোলনের কারণে নিজেদের দুর্ভোগের কথা স্বীকার করছেন, তবুও তারা এই তরুণদের দাবির প্রতি পূর্ণ সহানুভূতি জ্ঞাপন করেছেন। এক প্রবীণ যাত্রী যিনি হাওড়া যাওয়ার জন্য স্টেশনে আটকে ছিলেন, তিনি বলেন, "এই ছেলেমেয়েগুলো তো কোনো অন্যায় দাবি করছে না। এরা তো নিজেদের মেধার যোগ্য সম্মান চাইছে। সরকারের উচিত অবিলম্বে এদের সাথে কথা বলে সমস্যার সমাধান করা। এভাবে দেশের যুবশক্তিকে রাস্তায় বসিয়ে রাখলে দেশেরই ক্ষতি।"

রেল পুলিশ (GRP) এবং রেলওয়ে প্রোটেকশন ফোর্স (RPF) বিশাল বাহিনী নিয়ে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হলেও এত বিপুল সংখ্যক আন্দোলনকারীর সামনে তারা রীতিমতো অসহায় বোধ করছেন। প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্তারা মাইকিং করে বারবার অবরোধ তুলে নেওয়ার আবেদন জানাচ্ছেন, কিন্তু চাকরিপ্রার্থীরা তাদের সিদ্ধান্তে অনড়। তারা দাবি করেছেন যে, রেলওয়ে রিক্রুটমেন্ট বোর্ডের উচ্চপদস্থ কোনো আধিকারিককে সরাসরি এসে তাদের কাছে লিখিত প্রতিশ্রুতি দিতে হবে যে আগামী পনেরো দিনের মধ্যে পরীক্ষার রুটিন এবং নিয়োগের সম্পূর্ণ ক্যালেন্ডার প্রকাশ করা হবে। যতক্ষণ না এই লিখিত প্রতিশ্রুতি মিলছে, ততক্ষণ পূর্ব ভারতের এই অন্যতম প্রধান রেলওয়ে রুট সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ থাকবে বলে তারা কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে রাজ্য পুলিশের কমব্যাট ফোর্স এবং র‍্যাফ মোতায়েন করা হয়েছে, তবে প্রশাসন চাইছে কোনো রকম বলপ্রয়োগ না করে আলোচনার মাধ্যমেই এই জট কাটাতে, কারণ সামান্য কোনো প্ররোচনা এক ভয়ানক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্ম দিতে পারে।

এই ঘটনা আমাদের দেশের কর্মসংস্থান নীতির এক অত্যন্ত শোচনীয় ব্যর্থতাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে। প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ তরুণ স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়ে কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরোচ্ছেন, কিন্তু তাদের জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ নেই। যে সামান্য কিছু সরকারি পদের জন্য বিজ্ঞপ্তি বের হয়, সেখানেও দুর্নীতি এবং দীর্ঘসূত্রিতার কারণে মেধার চূড়ান্ত অপচয় ঘটছে। এই শিক্ষিত তরুণরা যদি সঠিক সময়ে কাজ না পান, তবে তারা চরম হতাশা থেকে বিভিন্ন অসামাজিক বা ধ্বংসাত্মক কাজে লিপ্ত হতে পারেন, যা সমাজের জন্য এক বিশাল বড় হুমকি। সরকারকে অবিলম্বে এই বেকারত্ব সমস্যার দিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। কেবল ভোটের আগে প্রতিশ্রুতি নয়, বছরভর স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তরুণদের হাতে নিয়োগপত্র তুলে দেওয়াটাই হলো প্রকৃত রাষ্ট্রধর্ম।

দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতে চললেও বর্ধমান স্টেশনের পরিস্থিতি এখনও অত্যন্ত থমথমে এবং উত্তেজনাময়। স্লোগানের শব্দে কেঁপে উঠছে স্টেশন চত্বর। আটকে থাকা ট্রেনগুলোর হর্ন এবং যুবসমাজের প্রতিবাদের ভাষা মিলেমিশে এক অদ্ভুত পরিবেশের সৃষ্টি করেছে। রেল মন্ত্রকের তরফ থেকে এখনও পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি প্রকাশ করা হয়নি, যা আন্দোলনকারীদের ক্ষোভকে আরও বাড়িয়ে তুলছে। ডিজিটাল মিডিয়া এবং সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটগুলোতে এই রেল অবরোধের ছবি এবং ভিডিও ইতিমধ্যেই ব্যাপক ভাইরাল হয়েছে। লেন্সপিডিয়া (LensPedia) এর মতো আধুনিক ডিজিটাল নিউজ প্ল্যাটফর্মগুলো গ্রাউন্ড জিরো থেকে এই বিশাল গণআন্দোলনের লাইভ ব্রডকাস্ট করে সমগ্র দেশের মানুষের সামনে এই ভয়াবহ বাস্তব তুলে ধরছে। নেটিজেনরা হ্যাশট্যাগ দিয়ে এই আন্দোলনের প্রতি নিজেদের সমর্থন জানাচ্ছেন এবং রেল মন্ত্রকের চরম ব্যর্থতার তীব্র সমালোচনা করছেন।

পরিশেষে এটা অত্যন্ত স্পষ্ট যে, ২১শে মে-র এই রেল রোকো আন্দোলন কেবল বর্ধমান স্টেশনের একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটি সমগ্র দেশের তরুণ প্রজন্মের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের এক আগ্নেয়গিরি। রেলওয়ে গ্রুপ ডি নিয়োগে স্বচ্ছতা এবং দ্রুততার যে যৌক্তিক দাবি আজ হাজার হাজার চাকরিপ্রার্থী তুলেছেন, তা প্রশাসনকে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করতে হবে। পুলিশ বা লাঠির জোর দিয়ে হয়তো সাময়িকভাবে রেললাইন খালি করা যাবে, কিন্তু যুবসমাজের মনের ভেতরে যে প্রতিবাদের আগুন আজ জ্বলে উঠেছে, তা কোনোভাবেই নেভানো সম্ভব নয়। আমরা লেন্সপিডিয়া পরিবারের পক্ষ থেকে আশা করব, রেলওয়ে প্রশাসন এবং সরকার নিজেদের অহংকার দূরে সরিয়ে রেখে অবিলম্বে এই তরুণদের সাথে আলোচনায় বসবে এবং একটি স্বচ্ছ, দুর্নীতিমুক্ত ও নির্দিষ্ট সময়ভিত্তিক নিয়োগ প্রক্রিয়া সুনিশ্চিত করবে। দেশের ভবিষ্যৎ এই তরুণরাই। তাদের চোখের জল এবং হতাশা কোনো দেশের জন্যই শুভ হতে পারে না। আসুন আমরা সকলে এই ন্যায্য অধিকারের লড়াইয়ে যুবসমাজের পাশে দাঁড়াই। বিস্তারিত খবরের জন্য এবং বর্ধমান স্টেশনের এই বিশাল আন্দোলনের লেটেস্ট লাইভ আপডেট দেখতে কমেন্ট বক্সে থাকা লিঙ্কে এখনই ক্লিক করুন এবং সর্বদা চোখ রাখুন আমাদের ডিজিটাল পর্দায়।

Preview image